পূর্ব বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি। সেখানে একটা ছোট্ট নদী আছে তার নাম ঈশানি। একটা বড় ভাঙ্গা বাড়ি। সেই বাড়ির বয়স অনেকে বলে হাজার বছরের উপর। ভাঙাচোরা বাড়িটার ভেতরে একটা গলি ছিল। অন্ধকার গলি। পূর্ব বর্ধমানের ভাষায় যাকে বলতো ‘আদিরে গলি।।’
আমাদের এ কথাটা আঁধার থেকে এসেছে। সবাই মুখে মুখে বলতো আদিরে গলিতে যাবিনা আদিরে গলিতে ভূত আছে। কিন্তু আমাদের ছোট থেকেই গলির প্রতি আকর্ষণ ছিল বেশি।
ভবদেব বরাবরই আঁধারে গিয়ে বসে থাকতো। আর তার সময় কাটাতো গরু ছাগল চরাতে। বাকি সময়টা ওই আদিরে গলিতে গিয়ে বসে থাকতো। তাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে আমরা সবাই ওখানে চলে যেতাম। ওখানে ঠিক দেখতাম ভবদেব শুয়ে আছি আদিরের গলিতে।
কিন্তু এবার আর পাওয়া যাচ্ছেনা আদির এর গলিতে গিয়ে। ভবদেব কে আর পাওয়া যাচ্ছেনা ভবদেব কোথায় গেল চিন্তিত বাড়ির সবাই কোথায় গেল। কোথায় যেতে পারে। সে তো আর কোথাও যায় না।
সে কথা কম বলে নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকে গরু ছাগল চরায় আর বাকি সময় তো ওখানেই থাকে। বিড়ি খায় গাঁজা খায় মদও খায়। কিন্তু আর তো কোথাও যায় না।
ছোটবেলায় আমরা সবাই দল মিলে এই আদিরে গলিতে লুকোচুরি খেলা করতাম।
লুকোচুরি খেলতে খেলতে হঠাৎ দেখলাম এক বিরাট লম্বা লোক। তাদের লম্বা হাত। তারা আমাদের ধরতে চাইছে। বস্তা ছুঁড়ে দিচ্ছে আমরা ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। এই কথাটা বলা মাত্রই বাড়িতে বড়রা সবাই বলতো, অই গলিতে যাবিনা।
অনেকে ভয় পায়। অনেকে মরে গেছে। আজ পর্যন্ত তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
কিন্তু আমরা শুনতাম না। বারবার সেই আঁধারে গলিতে গিয়ে বসে থাকতাম। কি ঠান্ডা শীতল হাওয়া আর এয়ারকন্ডিশনড ঘরের মত।
গরম সেখানে পৌঁছাতে পারতো না। কি সুন্দর ঠাণ্ডা হাওয়ায় এখানে বসে থাকতাম স্যাঁতসেতে গলি।
হাজার বছরের পুরনো সেই গলি। এখানে নাকি কারাগার ছিল। এই কারাগারে বন্দীদের বন্দি করে রাখা হতো।
তাদের ওপর অত্যাচার করা হতো। কত মানুষের প্রাণ যে এখানে বলি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
ইতিহাস তাই বলে।
ইতিহাস এখানে ফিসফিস করে কথা বলে। কারাগারগুলোর দরজা ভেঙে গেছে সব। অন্ধকারের আকর্ষণে আমরা বারবার ছুটে আসতাম। আমরা ভয় পেতাম না।
ভবদেবকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা ঠিক আঁধারে পেয়ে যেতাম।
সেই পুজো বাড়ির আঁধারের গলিতে। সেখানে সে কালো ছাগল, কালো কুকুর নিয়ে বসে খেলা করতো। পাগলের মত বলত, এবার কালোদা আসবে। আমাকে মদ দেবে মাংস দেবে। আমি খাব। আমরা বলতাম, কালোদা কে? ভবদেব কিছু না বলে মুচকি হেসে বলত, ও এক অপদেবতা। উড়িয়ে নিয়ে যায় অন্ধকার জগতে। কি ভালো লোক। ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না।
আমরা বলতাম, পাগলে কিনা বলে, ছাগলে….
ভবদেব বলতো, অন্ধকারকে কেন কালো বলে? অন্ধকারে এলেই এলইডি র মত আমার মন আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়। আলোয় আলোয় ভরে যায় আমার অন্তর। আমার অন্ধকার ভালো লাগে। আমি অন্ধকার কে পছন্দ করি। আমি অন্ধকারের সন্তান। গভীর জলধি কালো। গর্ভ কালো। কালোয় ভুবন ভরা।
আমরা বলতাম, ভবদা এখানে অনেক সাপখোপ আছেরে। আসিস না দাদা। ভবদেব বলত, তোদের কোনদিন দেবে কামড়ে। দেখবি বিষাক্ত সাপ। কয়েক হাজার বছরের পুরনো বাড়ি। গলিতে এলে ঠান্ডা লেগে শুরু হয়ে যেতে পারে সর্দি-কাশি।জ্বরে আক্রান্ত হতে পারিস খবর্দার এখানে আসিস না।
ভবদা চাইত না, আমরা এখানে আসি।
তবুও বলতো আমার এখানে এলে ভালো লাগে এখানে এসে বসে থাকলে আমার মন খারাপ গুলো ভালো হয়ে যায়। আমি এখানে বারবার ছুটে ছুটে আসবো। আমার কথা আলাদা। তোরা আসিস না। কালোদা কালো জোব্বা পরে আসে। দেখলে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দেখবি তখন মজা। ভয়ে মরবি তোরা।
সে আমাদের বারণ শুনত না। কোন খেয়াল হলেই সে চলে আসত এই অন্ধকারে গলিতে। অন্ধকার গলিতে ভেতরে এসে শুয়ে থাকতো গামছা পেতে। আর সবসময় সঙ্গে সঙ্গে থাকত কুকুরটা আর কালো ছাগলটা।
ছাগল গরু চলে যেত বনে। আর দুপুরবেলায় তো বাড়িতে। তারপর আবার সেই অন্ধকার গলিতে।
অন্ধকার গলিতে তার 24 ঘন্টার মধ্যে 18 ঘন্টা কেটে যেত।
কি এক অমোঘ আকর্ষণে চলে আসত এই আঁধারের গলিতে।
আমরা বুঝতে পারতাম না। আমরা বারবার তাকে বলতাম ভয়ের কথা। কিন্তু সে সব ভয় জয় করে বসে আছে।
অনেকে তাকে পাগল বলতো। কিন্তু সে বলতো যে যাই বলুক আমার এই অন্ধকার খুব ভালো লাগে। কালোদা আমার বন্ধু। আমি ওর কাছে একদিন চলে যাব। দেখবি আমাকে আর খুঁজেও পাবি না।
আমরা শুনেছি, ওই বাড়ির যে দাদু আগে থাকতেন উপর ঘরে। রাতে ভয় পেতেন। তিনি এখন মারা গেছেন।
তিনি বলতেন হাজার বছর এই বাড়িতে ওই অন্ধকার গলিতে কারাগার ছিল।
ওখানে বন্দী করে রাখা হতো সরল সহজ মানুষকে। জোর করে তাদের জমি কেড়ে নিয়ে মা বোনদের অত্যাচার করত রাজা।
কয়েক হাজার বন্দীকে বেঁধে মারধোর করত রাজা।
রাজা তাদের শাসন করতোএবং কোন অপরাধ না হলেও সেই অন্ধকারে তাকে বন্দী করে দিত।এখনও তাদের কান্না শোনা যায়। এখানে মৃত্যু ঘটেছে অনেকের। ওখানে অনেক অতৃপ্ত আত্মা থাকে।
আত্মাগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। তাদের অতৃপ্ত আত্মা গুলো এখনো সেখানে থাকে।
আর দাদু অনেকবার নাকি দেখেছেন তাদের এবং আমরা আমাদের বললে আমরা বুঝতে পারতাম হয়তো ভয় দেখানোর জন্য বলছেন। হয়তো বাড়িতে না যাওয়ার জন্যই কথাগুলো বলছেন।
আসলে তা নয়। সব সত্যি কথা, আজ বড় হয়ে বুঝেছি ।
দাদু বলতেন, গলায় ফাঁসি দিয়ে লোকগুলোকে মারত আর মেয়েছেলেদের ধর্ষণ করার পরে গেঁথে রাখত দেওয়ালে। লন্ডনের টুকুসাহেব একবার মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে শব্দ পেয়েছিলেন দেওয়ালে। মনে করলেন হয়ত গুপ্তধন আছে। বড্ড লোভি সাহেব। রাজাদের বংশধর।অই সাহেব লন্ডনে যাওয়ার সময় আমাকে দায়ীত্ব দিয়েছিল এই বাড়ির দেখাশোনা করার জন্য। আমি অবিবাহিত বেকার লোক। তাই গ্রামের সবাই বলল, নে দায়ীত্ব নে। পুজো করবি আর খাবি প্রসাদ। কোনদিন রাতে আমি শুতে পারতাম না ছাদের ঘরে। রাত হলেই গান বাজনা আর মদের আসর বসাত মৃত রাজার পারিষদবর্গ। মৃত রাজা এক আলখাল্লা পরে সিংহাসনে বসতেন। সকাল হলেই পরিষ্কার ঘর সব। সেইরাতে আমার ঘুম হয় নি। তারপর থেকে আর কোনো রাতে আমি পুরোনো বাড়িতে থাকতাম না।
তারপর সাহেব বললেন,দেওয়াল ভাঙ শালা। নিশ্চয় গুপ্তধন আছে।
দেওয়াল ভেঙ্গে দেখা গেল চুড়ি পরা একটা কঙ্কাল। এই কঙ্কালটা সাহেব অই বাড়িতে রেখেছিলেন। সাহেবের সাহস খুব। তিনি অই বাড়িতেই রাতে শুতেন কঙ্কাল ঘরের পাশে।
সেই কঙ্কাল প্রতিরাতে সুন্দরী মেয়ে সেজে সাহেবের সামনে আসত। মাতাল সাহেব রমণ করত তাকে সারারাত। সুন্দরীও কম যেত না। এক প্রতিশোধ স্পৃহায় সে সারারাত উলঙ্গ হয়ে নাচত। গ্রামের অনেকে জানালা দিয়ে সাহেবের ঘরে নোংরামি দেখত। সাহেব চরিত্রহীন লম্পট মাতাল ছিলেন। ভয়ডর তার ছিল না।মদ মাংস আর মেয়ে এই তিনে তার সংসার সাজিয়ে রাখতেন। সাহেব বলতেন, আমার স্ত্রী, মেয়ে সব মরে গেছে। ভালোই হয়েছে। এখন শুধু মদ আর মাগি নিয়ে থাকি।
ভোর হলেই কঙ্কাল চলে যেত নিজের জায়গায়। এইভাবে বছরখানেক পরে সাহেব দেখল এক রাতে, সুন্দরীর হাতের চুড়িটা লাল। সাহেব বলল, এই চুড়ি তো কঙ্কালের হাতে আছে। সুন্দরী বলল, আমিই সেই কঙ্কাল। তুই অই রাজার বংশধর। আমি তোকে আজ খুন করব।
পরের দিন সকালে কেউ আর সাহেবের খোঁজ পায় নি। লাশও গায়েব হয়েছিল। লোকে একথাই বলে।
আমরা বললাম, ভবদা তো এখানে অন্ধকারে আনন্দ করে। মজা পায়। কালো জোব্বা পরা লোকটা ওর বন্ধু।
দাদু বলতেন অন্ধকারে প্রতি আকর্ষণ মানুষের চিরন্তন। মানুষ যতদিন থাকবে অন্ধকারে প্রতি আকর্ষণ কোনমতেই কমবে না।
দাদুর কথা শুনে আমরা বুঝতাম দাদু নিশ্চয়ই কিছু জানেন আমরা বলতাম দাদু বল না কি দেখেছো। তিনি বলতেন , তোরা তো মনে করবি আমি ভয় দেখাবার জন্য বলেছি।
বলছি আসলে ওখানে ভূতেদের বাস।
ভূত পেত্নীরা এখনও বাস করে।
ওখানে গেলেই দেখবি হাত নিয়ে এগিয়ে আসছে কালো জোব্বা।
তোরা কোনদিন ওখানে যাস না। ওদের খপ্পরে পরে পরিণতি একদিন খারাপ হবে দেখবি। ভবদেব তো কালো জোব্বার বন্ধু। ওর কথা আলাদা। তবে দেখবি ভবদেবও সাহেবের মত ভ্যানিস হয়ে যাবে একদিন।
তারপর পুজো দাদু মরে গেলেন বয়সের ভারে। প্রায় একশ পাঁচ বছর বেঁচেছিলেন দাদু।
ঠিক তাই ভবদেবের পরিণতি খারাপ হয়েছিল। দাদু মরার তিনবছর পরে ভবদেবও লা পাত্তা।
আমরা জানি, ভবদেবকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় নি ওই অন্ধকার গলিতে। তার লাশও গায়েব হয়েছিলো একদিন।
আমার এক শহুরে বন্ধু বলল, চল তো দেখি তোদের গ্রামের বাড়িটা। ও দেখেছিল।
বন্ধু বলল,আমি অন্ধকারে যাই দেখি। আমি টেনে ধরেছিলাম। অভিশপ্ত অন্ধকার গলিটা আজও আছে। কোনদিন কেউ বেড়াতে এলে আমাকে বলবেন। আমি দেখাতে পারি বাড়িটা। বাকি দায়ীত্ব আপনার। একদম সত্য।
কে বা কারা তাদের খুন করেছে বা কেন ভবদেব মারা গেছে আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারে নি।
কোন অজানা অসুখে কিনা তা আজ পর্যন্ত কূলকিনারা খুঁজে পায়নি পুলিশ।তাহলে তো লাশটা পাওয়া যেত।
পুলিশ এসেছিল তারা লাশ পায় নি। একরাশ ভয় নিয়ে চলে গেছিল।
কিন্তু কোনো কারণ এখনো পর্যন্ত খুঁজে পায়নি।পাবে বলে মনে হয় না…