মধু বাস কন্ডাকটার। খড়ের চাল ফুটো। মাটির ঘর। মাটির মানুষ। তবু তার অবসর সময়ে সে পড়ে। তার আশা পড়াশোনা করে সে বড় হবে। কালো কালো অক্ষরগুলো তার চোখে আলো জ্বালে। সে চলে যায় অন্য এক জগতে। আশায় আশায় বাড়ে তার বয়স। বাড়ি থেকে বলে, এবার বিয়ে থা করে নে। ভালো আয় করিস। তোর আর চিন্তা কিসের? মধু বলে, না বিয়ে করলেই সব শেষ। পড়াশোনা, আশা সব শেষ হয়ে যায় সংসারের জালে। সে জাল কেটে বের হওয়া কঠিন ব্যাপার। কোনোকালে কেউ পারে নি। মহাপুরুষ হলে আলাদা ব্যাপার।মধু ভাবে অবসর সময়ে, সংসারে সং সেজে দিবারাতি নিজেকে ঠকিয়ে কোন ঠিকানায় ঠাঁই হবে আমার ।নিজেকে নিজের প্রশ্ন কুরে কুরে কবর দেয় আমার অন্তরের গোপন স্বপ্ন । জানি রাত শেষ হলেই ভোরের পাখিদের আনাগোনা আরম্ভ হয় খোলা আকাশে । আমার টোনা মাসিকে টোন কেটে অনেকে অভিশাপ দিতো । আমি দেখেছি ধৈর্য্য কাকে বলে । আজ কালের কাঠগোড়ায় তিনি রাজলক্ষ্মী প্রমাণিত হয়েছেন । কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খান না । তাই তাঁর বিচারের আশায় দিন গোনে শিশুর শব, সব অবিচার ,অনাচার কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবে আগামী পৃথিবীর ভাবি শিশু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি। অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে । সাবধান খুনীর দল ,একবার হলেও অন্তত নিজের সন্তানের জন্য শান্ত পৃথিবী রেখে যা । ঋতু পরিবর্তন কিন্তু তোর হত্যালীলায় বন্ধ হবে না নির্বোধ ।শান্ত হোক হত্যার শাণিত তরবারি ।নেমে আসুক শান্তির অবিরল ধারা। রক্ত রঙের রাত শেষে আলো রঙের নতুন পৃথিবী আগামী অঙ্কুরের অপেক্ষায়।
শিউলি শরতের ঘ্রাণে শিহরিত শরীর। শিউলি নামের শিউলি কুড়োনো মেয়েটি আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়।
মনে পড়ে পিসির বাড়ির শিউলি গাছটার তলায় অপেক্ষা করতো ঝরা ফুলের দল। সে জানত ফুল ঝরে গেলেও
তার কদর হয় ভাবি প্রজন্মের হাতে । সে আমাদের ফুল জীবনের পাঠ শেখায়। মানুষও একদিন ফুলের মত ঝরে যায়। । শুধু সুন্দর হৃদয় ফুলের কদর হয়। বিদেশে ষাট বছরেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। নিজেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরখ করার সুযোগ মেলে।
কত বসন্ত এল গেল। মধুর এখনও শীতসময়। ঝরা পাতার সময়ে সে মগ্ন হত সরব পাঠে। পাড়ার বন্ধুরা বলত, বুড়ো বয়সে পাঠশালায় পড়াশোনার ভিমরতি। এ ঘোড়া ঘুরে ঘাস খাবে না। মধুর মন খারাপ হত। বই গুটিয়ে বসে পড়ুত মাটির বারান্দায়। একটা পায়রা দেখত সে। একটা একটা করে কাঠি সংগ্রহ করে বাসা বুনত। প্রথমে কাঠিগুলো ঠোঁট থেকে পড়ে যেত। আবার সে চেষ্টা করত। এইভাবে পায়রাটি সফল হত তার কাজে। মধু ভাবত, সে মানুষ। প্রাণীজগতের শ্রেষ্ঠ জীব। তাহলে, একটা পাখি যদি পারে সে পারবে না কেন? সে শক্ত দড়িতে হৃদয় বেঁধে লেগে পড়ত কাজে। পড়াশুনা করত মনযোগ দিয়ে।
সকাল হলেই বেড়িয়ে পড়ত কাজে। কাঁধে বাস কন্ডাকটারের ব্যাগ। বাসে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হত। কেউ কেউ অসম্মানও করত। ভাড়া না দিয়ে নেমে পড়ত। বলতে গেলে ভয় দেখাত। মধু মনে মনে পড়ার বিষয়গুলো মনে মনে আউড়াত। অনেকে বলত, ছেলেটা পাগল নাকি? একমাত্র গাড়ির খালাসি জানত তার বিষয়টি। সে মধুর বন্ধু। সে বলত, তোর কাজের চাপ হলে আমাকে বলবি। আমি তোকে সাহায্য করব। বাসের ভিতরে বাসস্টপে সে পড়ত মাঝে মাঝে।
মধু পড়াশোনা করে যখন, সে শুনতে পায় আলোর আগমনী সংগীত। আর কেউ শুনতে পায় না। আলোময় চোখে আশার আলো দেখতে দেখতেই সে বিভিন্ন পরীক্ষায় বসে। হয় না। বিফলতাগুলো তার আশার আলো নেভাতে পারে না। বিফল হতে হতে সেএকদিন আই এ এস পরীক্ষায় সফল হল। চারিদিকে ঢাকের কাঠি পড়তে লাগল। শুধু প্রশংসার বন্যা। কিন্তু মধুএ বন্যায় হারিয়ে যাওয়ার ছেলে নয়। বিফলতাগুলো তার মনের তার শক্ত করে বেঁধেছে। সহজে তা ছেঁড়া যাবে না।