সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ১৫)

সীমান ছাড়িয়ে
এদিকে বিমলের বোনরা চেপে ধরে দাদাকে। বলে, তোমার আস্কারা পেয়ে বৌটা একদম কোনো কথা শোনে না। কি আর বলবো। কোনো সময় দেখা হলেই কথা শোনাতে ছাড়ে না। মোবাইল নেই। তাই বোনরা ঠিকমতো যোগাযোগ রাখতে পারে না। তারা বলে , দাদা একটা মোবাইল কিনতে পারো না। তাহলে যোগাযোগ ভালো হয়। এখন আর পোষ্ট কার্ডে কেউ সংবাদ পাঠায় না। ওসব ব্যাক ডেটেড। বিমলের মোবাইল ভালো লাগে না। কবিতা আর কাজ নিয়েই তার সময় কেটে যায়।
দুদিন ধরে নিম্নচাপ। প্রচন্ড ঝড়, বৃষ্টি। তবু রুমা ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো বাপের বাড়ি। যাক। ঠাকুর রক্ষা করো। বড়ো ভয় হয়। প্রিয়জন বাইরে গেলে সকলের হয়। রাস্তঘাট সারাই হচ্ছে। সাবধানে যেও… বিমলের আর্তি।
কিন্তু রুমা, ছেলের কোনো খবর নেই। দুপুরে রুমার মা জানালো, বাবা সবুজ আর নেই। বিমলের দম বন্ধ। নিশ্বাস নিতে পারছে না। ওরা বলেছে,বাসআ্যক্সিডেন্টে রুমা বাঁচলেও সবুজ রক্ষা পায় নি। তিনদিন খায় নি বিমল। আজকে বাইরে গেলো। কয়েন বুথ থেকে ফোন করে রুমার মাকে জানিয়ে দিলো,রুমাকে আর এখানে পাঠাবেন না। আমি সব বিক্রি করে আপনার মেয়েকে টাকা পয়সা দিয়ে আসবো।
রুমাও আসতে চায়নি। স্মৃতি দিয়ে ঘেরা সবুজের বাড়িতে এক মূহুর্ত কাটানো শক্ত।
বিমলের শরীর গাছের মতো শিকড় ছাড়া হলো। শিকড় ছিঁড়ে গাছ বাঁচে না। তবু তাকে নিয়ে কোলকাতা ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলাম। তাকে পি জি হাসপাতালে ভরতি করে দিলাম। তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হবে। হার্টের অবস্থা ভালো নয়।
আমার পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। চাকরি হলেই কেল্লাফতে। কিন্তু গিয়ে দেখলাম প্রচন্ড ভিড়। ভিড় ঠেলে এগোতেই দেখি,লিষ্টে নাম নেই। হতাশ হয়ে বসে পরেছি। ফিরে আসার আগে আর একবার দেখলাম। পেয়েছি,এক নম্বরে নাম। আমি নিচের দিকে দেখেছিলাম। এক নম্বরে আমার নাম থাকবে বুঝতেই পারিনি। আমি শিক্ষক হলাম। এবার বাড়ি যাবো। কিন্তু ওই ছোটো ছেলেগুলোর কি হবে,কোথায় যাবে।
মনে পরছে তাদের কথা।
একটা আট বছরের বাচ্চা বাজারে ঘুরে বেড়ায়। কে ওর বাবা কে যে ওর মা কেউ জানে না। বাজারে কারও জলএনে, কারও চা এনে ও কাজ করে আপনমনে। তারপর পাঁচটাকা করে সবার কাছে নিয়ে ভাত খায় আধপেটা। কারণ এখন আর হোটেলে কম পয়সায় খাবার পাওয়া যায় না। বেশ মানিয়ে নিয়েছে বিধাতার দেওয়া বিচারের রায়। হোটেল মালিক রিন্টু বলে।
ওকে বাধা দিয়ে গগন বলে, বিধাতার দোহাই দিয়ে মানুষের দোষ আমরা লুকিয়ে ফেলি লজ্জা সরম ভুলে। ভাগ্যিস বিধাতা বলে ম্যান মেড শব্দটা ছিলো। কোনো নারী ধর্ষিতা হলেও বিধিলিপি বলে চালাতে বাধা নেই। মাঝে মাঝে সমাজের খাঁচাটা ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করে।
রিন্টু সব জানে,সব বোঝে। তবু তার হোটেলেও তিনটি নাবালক সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি শুধু দুমুঠো খবারের আশায় পরে থাকে।
সত্যি কথাগুলো শুনলেই রিন্টুর মুখটা জোঁকের মুখে নুন পরার মতো হয়ে যায়। ও বলে, সব বড়ো বড়ো কথা। আরে কাজ না করলে ওদের বসে বসে খাওয়াবে কে?
কেন মানুষ। প্রতিটি মানুষ যদি একজনের দায়িত্ব নেয় তাহলেই তো হবে। গগন বললো কথাগুলো।
কিন্তু কথা বলা আর কাজ করে দেখানোর মধ্যে বিস্তর ফারাক।
আমি বাজার যেতাম আর বাচ্চাগুলোকে দেখতাম। আজ কয়েকদিন হলো বাজারে ভজনকে দেখা যাচ্ছে না। বেশ কয়েক বছর আগে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পরেছিলো। তখন ভজন পাঁচ বছরের।
সবার মুখেএকটাই কথা। ছেলেটা গেলো কোথা? হোটেলে যে বাচ্চাটি কাজ করে সে এসে বললো, গতরাতে একজন রুমাল দিয়ে মুখ বেঁধে ভজনকে নিয়ে যায়। আমরা চিৎকার করেছি কিন্তু রাতে কাউকে পাই নি।
রিন্টু বললো, তাহলে কেউ কাজের জন্যেই নিয়ে গেছে। ছেরে দে, যা কাজ কর।
তারপর সুখে দুখে কেটে গেছে অনেকটা সময়। সরকার থেকে আইন করা হয়েছে শিশুশ্রম বন্ধের। কিন্তু সে আইন শুধু কাগুজে আইন।
তারপর অনেক দিন পর চা দোকানে দেখলাম একটা দশ বছরের ছেলে কাজ করছে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। শরতের শেষে মন খারাপের ঘুঘু পাখিটা ডেকে চলেছে একসুরে।
আমি দোকানে জিজ্ঞাসা করলাম,কি গো ভাই,একে পেলেন কোথায়?
— আর বলবেন না। সমুদ্রের ধারে ওদের বাড়ি ছিলো। একদিন সুনামিতে ভেসে গেলো ওর মা বাবা ভাই বাড়ি ঘর সব। সেই থেকে ও ঘুরে ঘুরে বেড়ায় আর কাজ করে খায়। ছেলেটা খুব ভালো। কথা কম কাজ বেশি করে।
আমি বললাম, ও কথা বলবে কি করে। বিধাতা ওর কথার মেয়াদ শেষ করে দিয়েছে।
–; অত বুঝি না স্যার। খাটে খায়। কাজ পুরোদম,পয়সা হজম। বলুন কে কে লিকার খাবেন।
আমি পাশে সরে এলাম। আজ আর চা পান করলাম না। সুনামি কে দেখলাম, সে আধা বাংলা আধা হিন্দীতে বলছে,বাবু চা লিজিয়ে গরম চায়…