সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৫৪)

সীমানা ছাড়িয়ে

এবার সুনীল একা হয়ে পড়লো। সে ছাদে চলে গেলো। দেখলো, মায়ের মুখের মত উজ্জ্বল চাঁদটা তাকে ডাকছে। সে ভাবে, হয়ত মা তাকে ডাকছে। আর ভালো লাগছে না। দিদির বিয়ের পরের দিন চলে যাবে। বাবা বলছিলে, কন্যাযাত্রী যাবি না। সুনীল যাবে না বলে দিয়েছে।

তারপর রাত হলে সকলে বিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো সবাই। খাবার সময় খেলো।

তারপর সুনীল ঘুরে বেড়ায় বাড়িময় । মায়ের মত মুখ খোঁজে।কাকিমার মেয়ে এসে বলে,এই সুনীল,এদিকে আয়।আমার কাছে বোস। কালকে আমার বিয়ে হয়ে যাবে। একটু কথা বলি তোর সঙ্গে। তোর কোন ক্লাস হোলো রে? আমি ভুলে গেছি।

সুনীল বলে, এবার ক্লাস এইট হবে।

তাহলে তুই এত বোকা হাবার মত চুপ করে থাকিস কেন?

আচ্ছা বলো তো দিদি, মানুষের তিন চোখ পিছনে হয়।

দিদি হেসে ওঠে। বলে,তুই এত বোকা কেন? এইটে পড়িস অথচ কি বোকা তুই। পিঠে কারও তিনচোখ হয় না। আর কাউকে জিজ্ঞেসও করবি না।
সুনীল কি করে বোঝায়,বাবার মুখ থেকে শোনা কথা কি করে মিথ্যা হয়। সে কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

দিদি বলে, তুই আর ভাই মিলেমিশে থাকবি। তোরা দুইভাই আমার শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাবি।
সুনীল বলে, যাবো।
সুনীল দেখে দিদির চোখে জল। দিদিকে ঠিক এখন মায়ের মত লাগছে। মায়ের চোখের জলও ঠিক এইরকম। সব মায়ের চোখের জল কি এইরকম হয়। হতেও পারে। মায়ের জাত তো।

একবার সুনীল গ্রামে বন্ধুর বাড়ি গেছিলো। সেখানেও সে তার মায়ের চোখে এইরকম জল টলটল করতে দেখেছিলো। চোখের জলের তো রঙ হয় না। তবু সুনীল একটা মিল খুঁজে পায়। আর কেউ পায় কি? সুনীল জানে না।

আজ বিয়ে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। কে কোথায় শোবে সব ব্যবস্থা হচ্ছে। পাড়ার প্রতিবেশীদের ঘর নেওয়া হয়েছে। কাছাকাছি সব বাড়ি। বেশ ভালো লাগছে সুনীলের। বাবাকে বেশি দেখতে পাচ্ছে না সে। হয়ত কাজে ব্যস্ত আছে।
সুনীলও মোবাইল নিয়ে গেম খেলে মাঝে মাঝে। চিড়িয়াখানার ছবিগুলো দেখে। কাকার ছেলে সন্তুকে দেখায়। সন্তুর আবার অনেক বন্ধু। মেগাসিটির ছেলে। বেশিক্ষণ এক জায়গার থাকে না। সে স্মার্ট। কথাবার্তা সুন্দর। অনেক বন্ধু। ছেলে মেয়েরা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু সুনীল একা একা থাকতেই ভালোবাসে।
বেশি মাথা তার পছন্দ নয়। ভিড় এড়িয়ে চলাই তার মজ্জাগত অভ্যাস। একজন বললো,কি রে হাবাগোবার মত বসে আছিস কেন? যা খেলা কর। আনন্দ কর। কিন্তু সুনীলের খেলতে এখন ভালো লাগছে না। খেতেও ভালো লাগছে না। মা হয়ত খেতেও পাচ্ছে না আমার কথা মনে করে। মায়ের তো আর কেউ নেই, আমি ছাড়া। আমি মায়ের কাছে যাবো। সুনীল চঞ্চল হয়ে উঠলো।

রাত হয়ে গেলো। বর যাত্রীর বাস চলে গেলো। তবু প্যান্ডেল ভরতি লোকজন। কিন্তু সুনিল বাবাকে দেখতে পায় না। বাবা কোথায় গেলো। এবার তো শুয়ে ঘুমোতে হবে। সকালে উঠেই বাড়ি যেতে হবে। আর ভালো লাগছে না মাকে ছেড়ে। মাকে ছেড়ে সুনীলের এই প্রথম থাকা। গুটি গুটি পায়ে সুনীল বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে গেলো রায়বাড়ি। এই বাড়িতে তাদের শোয়া খাওয়ার ব্যবস্থা। ঘর খোলা।অন্ধকার ঘর। তবু পাশের বাড়ির জানালা গলে এক চিলতে আলো পড়েছে ঘরের মেঝেতে। একটা আলোছায়ার মত ঘরের মায়াময় অবস্থা। সুনীল দেখলো দুটো মানুষ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠগুলো আড়াআড়ি ভাবে আছে। ঠোঁটে ঠোঁট একবার লাগছে আবার খুলে যাচ্ছে। বাবাকে চিনতে পারা যাচ্ছে। আর ওটা কে? মাছ খাচ্ছে মনে হচ্ছে। এ নিশ্চয়ই মেছো পেত্নি। দুজনের কাপড় চোপড় এলোমেলো। বাবাকে ধরেছে, যাদু করেছে পেত্নীটা।পেত্নীটার বড় বড় মাথার চুল।দুধগুলো দুলছে বাতাবি লেবুর মত। সুনীল বাতাবি লেবু দেখেছে বাবুদের গোয়াল বাড়িতে।

দুজনের ঠোঁটে একটা করে, মোট দুটো তেচোখা মাছ। লালায় সাঁতার কাটছে। একবার এদিকে যাচ্ছে আর একবার ওদিকে। চুমু খাওয়ার সময় চোখ বন্ধ হয় কেন? সুনীল জানে না। ওদের দুজনের পিঠ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে দেখা যেতো দুজনেরই কি পিঠে তিনটে চোখ?

সুনীল দেখছে মেছো পেত্নীর গালের কষ বেয়ে বাবার দাবনার কাছে তিনচোখের মাঝখানে রক্ত পড়ছে টপ টপ করে। মোবাইল তার হাতে আছে। কিন্তু ছবি তুললেই ফ্ল্যাশ হবে। জেগে যাবে তিনচোখ। আর ভস্ম হয়ে যেতে পারে তার চোখ মুখ মন। তার থেকে এই মেছোপেত্নী তাড়াবার মন্ত্রটা বলি মনে মনে। মায়ের কাছে শোনা মন্ত্র।
‘খটাং খটাং খটাং, সাত ভুবনের জাহাজ খটাং। আসতে কাটে, যেতে কাটে, ছেদ কাটে, ভেদ কাটে। আমার বাবাকে যে করে হান , তার বুকে মারি শ্রীরামচন্দ্রের জলপড়া বাণ।’

সুনীল ভাবে, মাকে বাড়ি গিয়ে এই মেছো পেত্নী আর তিনচোখের কথা বলতেই হবে। তারপর সুনীল, আমি বিশু একবার কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি গিয়েছিলাম। সুনীল ওর বাবার কথা আমাদের বলেছিল। বিশু বলল,চেপে যা সব কথা মাকে বলতে নেই। সংসার ভেঙ্গে যায়। বিশু কবির বাড়ি গিয়ে তাদের একজন রক্ষককে বললেন, আমাদের কবির কথা বলুন। তার জীবনী থেকে শুরু করে কাজের বর্ণনা শোনাবেন দয়া করে। আমরা পড়েছি তবে আপনার মুখে শুনলে ভাল লাগবে। কাকার নাম নীলু। উনি বললেন, শোনো কবির কথা।। বর্তমান পূর্ববর্ধমান জেলা অনেক কবি সাহিত্যিকের পীঠস্থান। কবি কাশীরাম দাস থেকে শুরু করে কবিশেখর কালিদাস রায়, কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক ইত্যাদি। আজ আমি কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের জীবনী ও সাহিত্য সম্পর্কে দু চার কথা বলব। উনবিংশ শতকে সমগ্র বাংলা সাহিত্য জগত যখন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের কাব্যগাথার ছটায় উদ্ভাসিত , ঠিক সেই সময় নিজের স্বতন্ত্র লেখনী প্রতিভা নিয়ে কাব্য জগতে আবির্ভূত হলেন কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক। তিনি ১৮৮৩ সনের ৩রা মার্চ অবিভক্ত বাংলার, বর্ধমান জেলার কোগ্রাম নামক গ্রামে এক বৈদ্য ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র হিসাবে তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। ১৯০৫ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন এবং বঙ্কিম চন্দ্র স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন।

পরবর্তীকালে বর্ধমানের মাথ্রন নবীনচন্দ্র বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন এবং এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার আলোকেই পরবর্তীকালে বাংলার আর এক স্বনামধন্য কবি বিদ্রোহী কবি রূপে আত্মপ্রকাশ করেন ।কথিত আছে তাঁর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অজয় ও কুনুর নদীই তাঁর কবিতার মুখ্য প্রেরণা। তাঁর কবিতা মুখ্যত বৈষ্ণব ভাবনায় সম্পৃক্ত হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গ্রাম বাংলার প্রতি ভালবাসা তাঁর কবিতাগুলিকে করেছে এক অনবদ্য সৃষ্টির আধার। তাঁর কবিতায় ধর্মের উপস্থিতি থাকলেও তা ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতার উরদ্ধে। তাঁর রচিতউল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল উজানী (১৯১১), বনতুলসী (১৯১১), অজয়(১৯২৭), স্বর্ণ সন্ধ্যা (১৯৪৮) প্রভৃতি। তবে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মকে কাব্য জগতে আবদ্ধ না রেখে নাট্য রচনার দিকেও প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক হল দ্বারাবতী (১৯২০)। তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক এবং স্বাধীনতার পর ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন |
কুমুদরঞ্জন ১৯০১ সালে এন্ট্রান্স, ১৯০৩ সালে রিপন কলেজ থেকে এফএ এবং ১৯০৫ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে বর্ধমানের মাথরুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ১৯৩৮ সালে প্রধান শিক্ষকরূপে অবসর গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম ওই স্কুলে তাঁর ছাত্র ছিলেন। কুমুদরঞ্জনের কবিত্বশক্তির বিকাশ ঘটে বাল্যকালেই। পল্লীর মানুষ ও প্রকৃতি তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয়। তাঁর কবিতায় নির্জন গ্রামজীবনের সহজ-সরল রূপ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। পল্লী-প্রবণতার সঙ্গে বৈষ্ণবভাবুকতা যুক্ত হয়ে তাঁর কবিতার ভাব ও ভাষাকে স্নিগ্ধতা ও মাধুর্য দান করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কুমুদরঞ্জনের কবিতা পড়লে বাঙলার গ্রামের তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাপ্রদীপ, মঙ্গলশঙ্খের কথা মনে পড়ে।’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা: উজানী (১৯১১), বনতুলসী (১৯১১), শতদল (১৯১১), একতারা (১৯১৪), বনমল্লিকা (১৯১৮), নূপুর (১৯২০), রজনীগন্ধা (১৯২১), অজয় (১৯২৭), তূণীর (১৯২৮), স্বর্ণসন্ধ্যা (১৯৪৮) ইত্যাদি।শিক্ষাবিদ, কবি। ১৮৮৩ সালের ১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কোগ্রামে মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস একই জেলার শ্রীখন্ড গ্রামে। পিতা পূর্ণচন্দ্র মল্লিক ছিলেন কাশ্মীর রাজসরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।