গল্পেরা জোনাকি তে সীমন্তীনি দাশগুপ্ত (শেষ অংশ)

অস্তিত্ব
(তিন মাস আগে)
“ঈশ্বরী… ঈশ্বরী… “
“কী হয়েছে? ডাকছো কেন?”
“জামাকাপড়গুলো… একদম ভুলে গেছি!”
” সেকি! সব তো এতক্ষণে ভিজে একাকার! বৃষ্টি নামার এতক্ষণ পর মনে পড়লো তোমার?”
“একদম ভুলে গেছি… “
“বাদ দাও। আমি ফাইলটা বসকে মেইল করে দিয়ে যাব একেবারে। প্রায় আধঘন্টার ওপর ভিজছে ওগুলো। আরেকটু ভিজলে বাড়তি কোনো ক্ষতি হবে না। আরেকটু আগে যে কেন বললে না। বসে বসে আকাশ-পাতাল ভেবেই যাও শুধু।”
*****
“ইশ্! কী অবস্থা জামাকাপড়গুলোর… আরে, সিদ্ধার্থ, তুমি কখন ওপরে উঠলে? যাক এসে যখন পড়েছো, তাড়াতাড়ি একটু হেল্প করে দাও।”
“… “
“একি দাঁড়িয়ে কেন!”
“… “
“ছাড়ো। তোমার কাজ শুরু করতে করতে আমার শেষও হয়ে যাবে।”
“… “
“সিদ্ধার্থ, একটু এই শেডটার তলায় এসে জামাগুলো ধরো তো, চশমাটা পুরো ঝাপসা হয়ে গেছে। এই অবস্থায় এই খাড়া খাড়া সিঁড়িগুলো দিয়ে নামলে মৃত্যু অনিবার্য।”
“দাও।”
“এই নাও… ইশ্! কূর্তিটাও পুরো ভিজে গেছে। এই দিয়ে মুছে আদৌ কোনো লাভ হবে বলে তো-
সিদ্ধার্থ!!!!!”
“ঈশ্বরী!!! ঈশ্বরী!!! কেউ আছেন?! প্লিজ! হেল্প! আমার ওয়াইফ-!”
*****
*****
“সেদিন সিঁড়ি দিয়ে পড়ার সময়েই হার্ট অ্যাটাক্ হয়েছিল আমার। আর তুমি ঠিক এটাই চেয়েছিলে। তাইতো? তুমি যে এতো সুন্দর নাটক করতে পারো, সেদিনের ঘটনাটা না ঘটলে জানতেই পারতাম না। কত সুন্দর করে গোটা ঘটনাটা সাজালে যে বৃষ্টির সময়ে পা স্লিপ কেটে পড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক্ হওয়ার কারণে মৃত্যু হয় আমার। সমস্ত মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখলেই সবাই জেনে যাবে যে আমার এর আগে হার্ট অ্যাটাকের হিস্ট্রি ছিল। আর ঘটনাটা এমনই যে এটাকে কেউ খুন বলে সন্দেহও করতে পারবে না। সবাই ভাববে যে সেদিন বৃষ্টি না হলে কোনোটাই ঘটতো না। তুমি জানতে যে আমি অনাথ হওয়ায় সেই অর্থে আমার খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই। রইলো বাকি আমাদের বন্ধু বান্ধব অর্থাৎ অফিস কলিগ, তারা সবাই জানে যে তুমি মানুষ হিসেবে কত শ্রেষ্ঠ, আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক কত সুন্দর। রোজ রোজ একসাথে অফিস যাওয়া-আসা, আমি যতক্ষণ না কাজ শেষ করে খেতে বসবো, ততক্ষণ অপেক্ষা করা, “আমার ওয়াইফের মতো হয়ে দেখাক!”, বলে একে-তাকে নিয়ে মজা করা, এসব দেখলে শুধু অন্যরা কেন, আমি নিজেও হয়তো বিশ্বাস করতে পারতাম না যে তোমার মতো একটা ছেলে এতটা ঠান্ডা মাথায় কাউকে খুন করতে পারে। কিন্তু আমি তোমায় চিনতাম। আমি জানতাম যে দিন দিন আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব বেড়েই চলেছে। যেদিন উত্তরা অফিস জয়েন করার পর এই বাড়িতে প্রথম গেট টুগেদার অ্যারেঞ্জ করলো, আমরা সবাই এলাম, আমি সেদিনই বুঝেছিলাম যে উত্তরাকে তুমি পছন্দ করো। কিন্তু তারপর থেকে আমাদের দূরত্ব আরো বাড়তে থাকে।”
এতক্ষণ কথা বলার পর খামলো ঈশ্বরী। সিদ্ধার্থের মুখে লেগে থাকা ভয় আর অপরাধবোধ তার মনে সিদ্ধার্থের প্রতি তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি করে।
“এত কিছুর পরেও আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না যে তুমি এমন কিছু একটা করবে, যদি না সেইদিন বিকেলে আমি ঐ ছাদে উপস্থিত থাকতাম, যদি না আমি শুনতে পেতাম যে ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলার ঠিক আগের মুহূর্তে তুমি খুব আস্তে করে অবজ্ঞার হাসি হেসেছিলে।”
ঈশ্বরীর চোখ-মুখের অভিব্যক্তি ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে থাকে। সিদ্ধার্থ কোনোক্রমে রেলিংটা ছেড়ে ঈশ্বরীর পাশ কাটিয়ে পালাবার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরী তার পথ আটকে দাঁড়ায়। তার শরীরের গতি যেন হাওয়ার থেকেও বেশি। চমকে যায় সিদ্ধার্থ। ঈশ্বরী তার দু-হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে সিদ্ধার্থের গলা। তার গোটা মুখের ভঙ্গি পাল্টে এক ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সিদ্ধার্থ চেষ্টা করে ঈশ্বরীর হাত দুটো আলগা করার, কিন্তু ঈশ্বরীর গায়ে তখন অমানবিক শক্তি। চেঁচিয়ে বলে ওঠে ঈশ্বরী,
“কেন? কেন খুন করলে আমায়? এতগুলো মাস ধরে এই একটা জিনিসেরই উত্তর মেলাতে পারিনি আমি। কেন খুন করলে? সেদিনের পর থেকে আমি ওই বাড়িতে বন্দী। প্রতিদিন চোখ খুলে দেখি আমি পড়ে আছি মাটিতে, সেদিন সিঁড়ি দিয়ে পড়ে যাওয়ার পর যেভাবে পড়ে মারা গিয়েছিলাম, ঠিক সেভাবে। চারপাশে রক্ত ভেসে যাচ্ছে। প্রতিদিন দেখছি। প্রতিদিন। খুব কম সময়ের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম যে আমার মৃত্যু যার জন্য, তার যতক্ষণ না শাস্তি হচ্ছে, ততক্ষণ আমার মুক্তি হবে না। তাই আজই তোমায় শেষ করবো আমি। কিন্তু তার আগে আমাকে জানতেই হবে যে কেন খুন করেছিলে আমায়? তুমি যদি একবার বলতে যে আমার সাথে থাকাটা তোমার জন্য এতটাই অসহ্য হয়ে উঠেছে, আমি নিজেই তোমার থেকে দূরে সরে যেতাম। তুমি কি সেটা জানতে না? তবু কেন খুন করলে? কেন?”
সিদ্ধার্থের গলা তখনও ঈশ্বরীর দুটো হাতের মধ্যে চাপা। কোনোক্রমে সে বলে উঠলো, “কারণ সেটা করলে আমায় নিজের কাছে নিজেকে হার মেনে নিতে হতো…” ঈশ্বরীর হাতের চাপে গলা বন্ধ হয়ে আসতে থাকলো তার। “আ- আমি- আমি জানতাম যে তোমায়- সবটা বললে- তুমি আমার জীবন থেকে দূরে সরে যেতে। কি- কিন্তু সেটা করলে- আমায় এটা স্বীকার করে নিতে হতো যে- যে আমি হেরে গেলাম। তুমি সব দিক থেকে ঠিক ছিলে- পারফেক্ট ছিলে- সবার চোখে তুমি আইডিয়াল ছিলে- মহান ছিলে। তোমার এই মহত্ব আমার কোনদিনই- সহ্য হতো না। আমি তাই সবসময় চাইতাম যে- সবাই ভাবুক আমিও- আ- আমিও হাসব্যান্ড হিসেবে পারফেক্ট। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা আমি ভাঙলে- আমি- আ- আর পারফেক্ট থাকতাম না। বা-বাকিদের কাছেও না, নি-নিজের কাছেও না। খু- খুনটা আমায় করতেই হতো ঈশ্বরী।”
কথাগুলো শোনার পর ঈশ্বরী সিদ্ধার্থের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। সিদ্ধার্থের মুখটা নীল হয়ে আসছে। চোখগুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে বাইরে। এই মানুষটার সাথে বারো বছর কাটিয়েছে ঈশ্বরী। কলেজ লাইফের শেষ দিকে প্রেম, একই কোম্পানিতে চাকরি, বিয়ে… বারোটা বছর… সত্যিই কোনদিন চিনতে পারেনি সে সিদ্ধার্থকে।
মৃদু হেসে ওঠে ঈশ্বরী। হাত দুটো আলগা করে দেয়। সিদ্ধার্থ পড়ে যায় ছাদের মাটিতে। তার শরীরে উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি নেই। ঈশ্বরী সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “তুমি হেরে গেছো সিদ্ধার্থ। আমার যে মহত্বের প্রতি ঘৃণায়, হিংসায় তুমি আমায় খুন করেছিলে, তোমার ভাষায়, সেই মহত্বের জন্যই তোমায় আমি তোমার বাকি জীবনটা বাঁচতে দিলাম। যে মানুষটাকে আমি এতগুলো বছরে একটুও চিনে উঠতে পারিনি, তার প্রতি আমার আর কোনো রাগ নেই। এতকিছু করার পরেও শেষ পর্যন্ত তুমি হেরে গেলে।”
সিদ্ধার্থের মাথা ঘুরতে লাগলো।
“আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি… ভালো থেকো সিদ্ধার্থ।”
ঈশ্বরীর আস্তে আস্তে সিদ্ধার্থের থেকে পিছিয়ে যেতে থাকলো। সে বুঝতে পারলো যে তার শরীরটা ক্রমশ হাল্কা হচ্ছে। তার শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা আস্তে আস্তে কমতে থাকলো। শেষবারের মতো সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে সে দেখলো যে সিদ্ধার্থ অজ্ঞান হয়ে গেছে। এরপর ঈশ্বরীর শরীরটা শূন্যে উঠতে শুরু করলো। ঈশ্বরী বুঝতে পারলো যে এবার সে মুক্ত।