গল্পেসল্পে সুবল দত্ত – ২

ক্রমহনন

Remembering the days we laughed

রায়ার কয়েকটাই নাম। পাসপোর্ট ভিসাতে ওর নাম রেবেকা। রাঁচীর বাড়িতে ওকে রেবু ও রেবিয়া বলে ডাকতো সবাই। কল্যাণী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে একটা আট ফুট বাই দশ ফুট কামরাতে চারজন গাদাগাদি হয়ে থাকতো তখন ওখানেই রায়া নামের জন্ম। আজ তিন বছর ভিসা রিন্যুয়াল করিয়ে নিউইয়র্ক ম্যানহাটানে থাকতে থাকতে ওর নাম রাবেয়া হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটিতে বায়োকেমিস্ট্রিতে পি এইচ ডির সুত্রে ও এখন পনেরো বছর স্টেটে থাকতে পারে। মাদুরার নিজের দেশ এখন ঠিক মনে পড়ে না কবে সে মথুর থেকে মাদুরা সেটাও আর মনে করতে চায় না। জ্ঞান হতে না হতেই মা বাপ হারা। দেশে একটা ছোটো কারখানার টেকনিক্যাল হ্যাণ্ড ছিল, কিভাবে যে অনেক হাতফেরতা হয়ে এখানে একটা ফেমাস বিল্ডারের কাছে কাজ পেয়েছে মনে নেই। তবুও প্রতিদিন অস্থায়ী। এসব কথা মাদুরা সব রায়াকে ফোনে বলেছে। রায়া ওকে আশ্বাস দিয়েছে, বিয়ের পর এখানে স্থায়ীভাবে থাকার নিশ্চয়ই কিছু করবে। মাদুরার জন্যে রায়া একটা বড় আশা। গাড়ি চালাতে চালাতে মাদুরার এইসব কথা মনে হতে লাগলো। ঠিক দেড়বছর আগে এই সময় একটা মেট্রিমোনিয়াল সাইট রায়ার ছবি পাঠিয়েছিল। মাত্র কদিনেই চট জলদি সম্মন্ধ পাকা। নিউয়র্কেই হলো বিয়ে ও রেজিস্ট্রি। তারপর মাদুরার এক কাকা পরদিন সেইখানেই ঘোষণা করলেন এই বিয়ে ক্যানসেল। বিয়ে হয়ে যাবার পর সাথে সাথে বিচ্ছেদ? অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। রায়ার বাবা মা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত ছিল রায়ার নীরব অশ্রু। ছাড়াছাড়ির একটা ভাইট্যাল কারণ। রায়ার শরীরে ইমিউনিটি ভীষন কম।ডাক্তার বলেছে ওর বোন ম্যারো ডিপ্রেশন হয়েছে,এটা এডস নয় তবে ও বেশিদিন বাঁচবে না। যেকোনো রোগে ও মারা যেতে পারে।এই কথাটা রায়ার এক ডাক্তার মামা ডিসক্লোজ করেছে।কিন্তু তারপর বেশ কদিন পর রায়ার সাথে মাদুরার পরোক্ষ সম্পর্ক এমন হলো, রোজ রাতে ভিডিও কল। একে অপরকে না দেখে থাকতে পারে না। দুজনের ছবি প্রেম মাঝে এক খন্ড পৃথিবী। আচ্ছা? আমি তো আমার মনকে বুঝতে পারিনা ও কি চায় না চায়। আমি কি রায়ার সাথে ম্যাটিং চাইছি? মাদুরা ভাবে। সামনে আবার সেই সপাট ন্যাড়া বৈচিত্রহীন পৃথিবী।

-রায়া? কাঁদছো কি? তোমার সাথে কি আমার কান্নার সম্পর্ক? কিছু বলো রায়া,চুপ করে থেকো না। আমরা তো হানিমুনে যাচ্ছি! যাচ্ছিই তো! ইজিন্ট ইট? তোমার উইন্ড গ্লাস নামিয়ে একটু বাতাস নাও। প্রশান্ত মহাসাগরের গন্ধ ভেসে আসছে। সমুদ্র আর বেশি দূরে নয়।

মাদুরা আয়নায় দেখলো,রায়া মুখ তুলে সোজা হয়ে বসলো। চোখ দেখে মনে হলো ওর কোনো কষ্ট হচ্ছে। তবে কি?

-ইটস ওকে বেবি। এভরিথিং ইজ ফাইন। ইয়া আই এম এনজয়িং। রায়া হাসার চেষ্টা করলো। মাদুরা দেখল ওর মুখ বিকৃত হয়ে উঠল,এবং শরীর নুয়ে গেল। -কি? কি হলো রায়া? কোনো কষ্ট হচ্ছে? বলো। আমাকে বলো রায়া। মাদুরা একেবারে ডানদিকে ঘেঁষে একটা পার্কিং লেনে থামল।

-নাথিং সিরিয়াস। সি শোর আর কতদূরে বলতে পারো ডিয়ার? অনেকদিন ঠিকমত পটি হয়নি।ওঃ ওঃ মাই স্টম্যাক। আমাকে যেতে হবে। আই এম ফিলিংগ আর্জ। গাড়ির দরজা খুলে রায়া দৌড় মারলো। পিছন পিছন মাদুরা। এটা কী রোগের লক্ষণ?

ডানদিকে ছোটো ছোটো কয়েকটি ধুসর কটেজ।ওগুলো ওল্ড এজ হোম।বাঁদিকে গির্জা স্টাইলের একটা ছোটো প্রাসাদ। এটা চার্চই। মোর্মন সম্প্রদায়ের। খৃস্টান ধর্মের একটা শাখা। খৃষ্টানদের পরবর্তী সাধু সম্প্রদায়, ক্রুশ বাদ দিয়ে এরা ধর্মপালন করে। কিন্তু চার্চের সামনে এতবড় ট্রেঞ্চ কাটা কেন? কয়েকটা সাদা কফিন এদিক ওদিক ছড়ানো। সামুহিক ক্রিমেশন? রায়া তখন দৌড়ে সামনের একটা কটেজে ঢুকে পড়েছে।কটেজের গেট দরজা দুটোই হাঁ খোলা।মাদুরা একটু এগোতেই নাকে ভক করে সেইরকম একটা দুর্গন্ধ লাগতেই পিছিয়ে গেল।মাংস পচা গন্ধটা ওই ঘরের ভিতর থেকেই আসছে।ওই ঘরটা নিশ্চয়ই বুড়োদের। মহামারীর প্রকোপ। সর্বত্র। পালিয়ে যে যাবো ভাবছি, কোথায় পালাবো? মাদুরা পিছিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসলো। রায়া ফ্রেশ হয়ে আসুক। দেরি লাগবে।

একটু পরেই রায়া দৌড়ে বেরিয়ে এলো কটেজ থেকে বমি করতে করতে।মুর্গীর মুন্ডহীন ধড়ের মত মেয়েটা লটপট করে ছুটে আসছে।মাদুরা হতচকিত। নগ্ন পা কোমর। প্যান্ট খুলে এসেছে সে। সামলাতে পারেনি। ওখানেই ছেড়ে এসেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে রায়া নিজের সিটে এলিয়ে পড়লো। -মুভ মুভ। ফাস্ট।ইটস এবসোল্যুট হেল হিয়ার। বুড়ো বুড়ি মরে পচে ফুলে আছে। লটস অফ ডার্টি ফ্লাইজ। নো ওয়াটার। নো টিস্যু।

-ডিড ইউ টাচ এনিথিং দেয়ার?

-নো নট এট অল। বাট আই কুডন্ট বি ফ্রেশ।

মাদুরা ঘাড় ঘুরিয়ে আড় চোখে তাকালো পিছনে। দুহাতে মুখ ঢেকে আধ শোয়া। ওপরের বগলকাটা টপ পেট অব্দি।নিচে বস্ত্রহীন।নাভি শ্রোণী যোনি জঙ্ঘা পায়ের আঙুল সবদৃশ্যমান।যেন রবার গার্ল।এতো কাছে,এতো কাছে যে হাত বাড়ালেই ছুই ছুই। নিজেরই গরম শ্বাস ঠোঁট দিয়ে চাটতে লাগলো মাদুরা। অতি নারকীয় আতঙ্কের সময়ে এমন কুকুরের মত সেক্স আর্জ?এ কি স্বার্থপরতা? মৃত্যু ছুঁয়ে দেখার কামনা? পিপিইর ভিতরে ঘাম পায়ের ফাঁক দিয়ে ঝরতে লাগলো।মাদুরা জোর করে মাথা সোজা রেখে ড্রাইভিং এ মন দিল। রাস্তার দুপাশে এবার ঝাউগাছের সারি। ফাঁক দিয়ে এক দুটো ইয়াট ও কয়েকটা বোট উঁকি মারছে। লেক শুরু হোলো। হারবার পৌছতে দেরি নেই।

-হাউ বিউটিফুল! লাভলি। রায়ার গলা। অনেক চেষ্টা করেও মাদুরা নিজেকে থামাতে পারলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল রায়ার দিকে। রায়া একটা শর্টস পরে নিয়েছে। হাতে একটা সফট ড্রিংক্স। একটা কাঁচা বিষ্ঠার গন্ধ গাড়ির ভিতর।

-তোমার গা থেকে বাজে গন্ধ রায়া।

-ইয়েস আই নো। আই নিড টু টেক বাথ।গত দশদিন আমি স্নান করিনি।ডু ইউ হেট মি ডিয়ার?

-না কখনোই নয়। রায়া আমরা হানিমুনে যাচ্ছি। কেন এমন কথা বলো? কি খেয়েছ গতকাল?

-জানো তো,ম্যানহাটানে আমার বিল্ডিং ব্লকে দুশোজন বাসিন্দা। সবার কমন ওয়াশিং মেশিন রুম,কমন গারবেজ রুম, অনেককিছু কমন। আমি ভালোকরে খেতে পাইনা বেবি।ভালো থাকিনা। হ্যাবিটেটস ভালো না। ব্লকের সবাইকে আইসোলেশনে রেখেছিল। হরিবল! ওহ,তুমি আমার ফ্লাইটের টিকিট না কাটলে আমি সুইসাইড করে নিতাম ডিয়ার। আমি কি লাকি না? লাস্ট ফ্লাইট ওয়াজ অন ইয়েসটারডে টুয়েন্টি ফার্স্ট মার্চ।ইটস অল ডিউ টু ইউ মাই লাভ।

নন স্টপ বলে চলল রায়া। মাদুরা বাধা দিল না।

-গড নোজ,ওই দশদিন আমার কোনও সিম্পটম ছিল না কেন। এমনিতেই আমার সর্দি কাশি জ্বর লেগেই থাকে। ওরা সবার এন্টিবডি টেস্ট করেছিল।রোজ এক দুজন করে আই সি ইউতে চালান করতো।আমার তো লো ইমিউন সিষ্টেম কেস হিস্ট্রিতে আছেই। আমাকে ওখান থেকে বেরিয়ে আসার পারমিশন দিয়ে দিল।এয়ারপোর্টএ যাবার আগে একটা ফেমাস চাইনিজ রেস্তোরাঁ হুনান ম্যানরে ঢুকে পড়লাম।সেটাও দু ঘণ্টা পর লক ডাউন হচ্ছিল। আমার ড্রিম ফুড,আমার সুপার চয়েস ডিসেস অর্ডার করলাম।

-কি ডিস? চাউ?

-চাউ? মাই ফুট। আমি খেয়েছি মশালা দিয়ে অক্স টাং আর ট্রাইপ, আর ফ্র্যাগরান্ট পিগ ইয়ারস।

রায়া এক ঢোঁক ড্রিংক্স নিয়ে মুখ খুলে হাসতে লাগলো। ওর উঁচু ছুচালো দুটো কুকুর দাঁত স্পষ্ট সামনে থেকে দেখে মাদুরার গা শিরশির করে উঠলো। আগে দেখেছে কিন্তু ভিডিওতে। এই কারণেই ওর ঐসব রাক্ষুসে খানা পছন্দ?

-মানে, ষাড়ের জিভ আঁত,আর শুওরের কান? ঐসব তোমার খাওয়া উচিত নয় রায়া। কেন খেতে গেলে? একটু চুপ। রায়ার বিষন্ন গলা। -না,একটু ইচ্ছে হোলো তাই খেলাম। জানিতো,আমি আর বেশিদিনের নই।জীবনে সবরকমের টেস্ট নেওয়ার ইচ্ছে আরকি। তুমি কি রাগ করলে বেবি?

-নো ওয়ে। তবে ওই,তোমার পেট খারাপ। গাড়ি তখন লেকের খুব কাছে এসে গেছে। একেবারে নির্জন। মাদুরা গাড়ি থামিয়ে বলল,-‘এনাফ টাইম ইন হ্যান্ড। তুমি লেকে গিয়ে স্নান সেরে আসতে পারো’।

গাড়ির দরজা খুলে একটানে কাঁধের উপর দিয়ে টপ খুলে ফেলে রায়া হাতছানি দিয়ে মাদুরাকে নামতে বলল। মাদুরা জবাব দিল না। হুড আর মাস্কের ভিতরে একটু দ্বিধান্বিত হাসি। সেই অসহায় হাসি কেউই দেখল না এমনকি চরাচরও। হাত নেড়ে রায়াকে বাই করে দিল। রায়া দৌড়ে গেল জলের দিকে সাদা কাগজের মতো নিদাগ বালুচরে পায়ের ছাপ ফেলে। নীল আকাশে একটুকরো উজ্জ্বল সাদা মেঘ,দিগন্তে এক চিলতে ঘন নীল জল,বালুরাশিতে ছন্দায়িত পায়ের ছাপ ও একটি অর্ধনগ্ন নারী। সামনে প্রকৃতির স্বর্গীয় নির্মল হাসি কিন্তু মাদুরাকে ঘিরে ভয় ঘৃণা উত্কণ্ঠা ও অদৃশ্য বিষানুর উপস্থিতি বোধ। মাদুরা গাড়িতে বসেই ভিতরে স্যানিটাইজার স্প্রে করল। নেমে গাড়ির বাইরে ও নিজের পিপিই ড্রেসের উপর। রায়ার হাঁখোলা মুখের ভিতর দুটো ক্যানাইন টিথ বারবার মনে পড়তে গা ইচপিচ করে উঠলো। ও তো সিভিয়ারলি ইনফেকটেড। আজ নয় কাল লক্ষণ ফুটে বেরবে। কয়েকদিনের মেহমান। ওর শরীর ভোগ করার নয়। মুখে মুখ রাখবো কি? যা ওর রাক্ষুসে দাঁত। ছেড়ে পালিয়ে যাই? এই সুযোগ। কিন্তু। একটা কিন্তু মাদুরাকে স্ট্যাচু বানিয়ে দিল। মাদুরা ওর আশৈশব স্মৃতি হাতড়াতে থাকল। ভালোবাসাহীনতায় মানুষ হয়েছে সে। কপালের ফেরে এ হাত সে হাত হয়ে আমেরিকাতে আসা ও ভালো চাকরি করা। এখনো এইচ বি ওয়ান ভিসা হয়নি। এই পেণ্ডেমিক থেকে দেশ পরিত্রাণ পেলেই ওরা স্টেট থেকে ওকে বার করে দেবে। তারপর বেঁচে থাকলে খাব কি? কে আছে ভালোবাসার জন? কে দেবে আশ্রয়?এই সময়ে হৃদয় হাতড়ালে একটিই মুখ ভেসে উঠছে। সে রায়া। রায়ার আশ্রয় ভেবেই তো এই বিয়ে? তাছাড়া রায়া যে আমাকে ভালোবাসে? ওর চোখদুটো যে হৃদয়ের কথা বলে? নাঃ। যা হয় হোক। আমার আগে পিছু তো কেউ নেই কিছু নেই,ও আমার সঙ্গে থাকুক। নাঃ। আর ঘৃনাবোধ নয়। একদম নর্মাল। বুঝেছ? মাদুরা নিজেকে শাসাল।

রায়া ফিরে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে গাড়ির ভিতরে বসল। ওকে এত ফ্রেশ লাগছে যে মাদুরার সন্দেহ হলো ওর কিছুই হয়নি। ভালোও লাগলো। গাড়ি সমুদ্রতটে হারবারে পৌঁছে ডকইয়ার্ডে ঢুকতে দেখল খুব কম গাড়ি। একেবারেই ভিড় নেই। নো ওয়েটিং। জাহাজটি এসেছে নিউইয়র্ক থেকে। যাবে কানাডাতে। জাহাজের বেসমেন্টে কার ঢোকাতেই সিকিউরিটি কাগজপত্র দেখল। মাদুরা সিট থেকে নামতেই যাচ্ছিল,সিকিউরিটি হাত তুলে মানা করল। উপরের ডেক ও কেবিন এখন হটস্পট। কাইণ্ডলি গাড়ির ভিতরে থাকো। স্টে সেফ হিয়ার। মাদুরা দেখলো এই বেসমেণ্টএ রাশ কম।গাড়ির ভিতরে থেকেই সমুদ্র দেখতে দেখতে যাত্রা হবে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।