ধারাবাহিক রম্য রচনায় সংযুক্তা দত্ত – ৬

নাচ, আমার জীবনের অনেক মূল্যবান সময়তেও সবসময় পাশে পাশে থেকেছে।
ইন্দোর থেকে কলকাতা ফিরেছি। একটি হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিউটে মার্কেটিং পড়াই। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগের একটি অনুষ্ঠান হবে নলবনে। হ্যা হ্যা ঠিকই পড়ছো, সেই প্রেমের বৃন্দাবন নলবনই বটে। সেখানে আমি যে ইন্সটিউটের শিক্ষিকা তারাও যোগদান করবে। যেহেতু আমার রেসুমেতে লেখা থাকত এক্সট্রা কারিকুলারে নাচ, নাটক ইত্যাদি তাই এইসব অনুষ্ঠান পরিচালনার দায় পড়ত আমারই।
ঠিক হলো চিত্রাঙ্গদার একটি ছোট অংশ মঞ্চস্থ হবে। সুরূপার ভূমিকায় একটি ছাত্রী আর কূরূপার ভূমিকায় আমি। বাকি অংশটি পাঠের মাধ্যমে হবে। জোর কদমে শুরু হল অনুশীলন। সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার চলতে লাগল। ক্লাসে পড়াচ্ছি বাণিজ্যিক বিশ্লেষণের জটিল তত্ত্ব, তখন কড়া টিচার, ছাত্র ছাত্রীরা অন্যমনষ্ক হলেই বকুনি। ক্লাস শেষের পরে শুরু হত রিহার্সাল, তখন বোঝাচ্ছি চিত্রাঙ্গদার প্রেম। কী বৈপরীত্য ভাবো, এ একেবারে যাকে বলে আ মরণ! এযে অক্সিমোরন । যে ছাত্রীটি সুরূপা করছিল, চমৎকার নাচে কিন্তু কিছুইতে “আমার অঙ্গে অঙ্গে কে” নাচটির জন্য সঠিক ভাবটা কিছুতেই ফুটে উঠছে না।একে তো সামনে টিচার তাছাড়া বিকেলে ওদের ডেটিং এর সময়। সুরূপার রিয়েল লাইফ প্রেমিক অপেক্ষায়। আর সুূরূপা পড়েছে আমার খপ্পরে। বকুনি দিতে গিয়ে ছাত্রীর আর তার প্রেমিকের করুণ দৃষ্টি চোখে পড়ল। বললাম যা, তোরা পনেরো মিনিট ঘুরে আয়। জমিয়ে প্রেম করবি কিন্তু ফিরে এসে যদি এক্সপ্রেসন ভুল হয় তো দেখবি। সে বেচারীরা ভেবে পাচ্ছে না টিচার মশকরা করছে না সত্যি বলছে। আর একবার ধমক দিতে তারা দৌড়ে পালাল , পনেরো মিনিটের প্রেম ব্রেকে। আসলে আমার ও খুব ক্লান্ত লাগছিল। কেন ক্লান্ত লাগছিল সেই গল্পটায় একটু পড়ে আসছি। যাই হোক ওই ব্রেক থেকে ফেরার পর সুরূপা ফাটিয়ে এক্সপ্রেসান দিল। সেই থেকে প্রতিদিনই রিহার্সালে ওই ব্রেক টুকু ম্যাজিকের মত কাজ করত। অন্য কেউ অবশ্য এই ব্যাপারটা জানত না। অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসতে লাগল, আমার কেন বুঝতাম না খুব ক্লান্ত লাগত রিহার্সালের সময়, ভাবতাম হয়ত নিয়মিত নাচ করি না,তাই এরম হচ্ছে। অনুষ্ঠানের দিন স্টেজ দেখে তো রোমাঞ্চিত আমরা। লেকের ওপর ফ্লোটিং স্টেজ, একদম একটা নতুন অভিজ্ঞতা।
সুরূপাকে বলে দিয়েছিলাম সেদিন আর প্রেম ব্রেক দেওয়া যাবে না, মন চাঙ্গা করার রসদ আগের দিনই জোগার করে রাখিস। সেদিন অনুষ্ঠান খুবই ভালো হয়েছিল। অপূর্ব পাঠ, সুরূপার নাচ,আমার নাচ. ” আমি চিত্রাঙ্গদা, রাজেন্দ্রনন্দিনী” খুবই প্রশংসা পেয়েছিল। এই ভাসমান মঞ্চে নাচের সুযোগ অভিজ্ঞতা সত্যি অনন্য ছিল।
তবে এই অনুষ্ঠান আরো একটি কারণে আমার খুউব মনের কাছাকাছি কারণ আমার ক্লান্তির কারণটা জানা গেল দুদিন পর। আমার শরীরের ভিতর বেড়ে উঠছে আরো একটি প্রাণ। ভাগ্যিস দুদিন আগে জানা যায় নি তাহলে অনুষ্ঠানটাই করা হত না। তাই আমার কন্যের নাচের ওপর ভালোবাসাটা জন্মগত, একদম আক্ষরিক অর্থে যাকে বলে।