ধারাবাহিক রম্য রচনায় সংযুক্তা দত্ত – ১০

 

আমার নাচের গল্প অনেক হল, এবার একটু শেখানোর গল্প বলি…
কলকাতায় আমার বাড়ির কাছেই “মা সারদা সেবা সমিতি ” নামক একটি প্রতিষ্ঠান আছে। পাড়ার অল্প কয়েকটি মেয়ে( যাদের বাবারা রিক্সা চালক অথবা মুটে আর মায়েরা গৃহপরিচারিকার কাজ করে)নিয়ে এক মহিলা শুরু করেন এই সমিতি। উদ্দেশ্য ছিল এদের একটা সুস্থ জীবন দেওয়া। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি হাতের কাজ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রামকৃষ্ণদেব, সারদা মা ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে তাদের অনুপ্রাণিত করা। আমার মা এই সংস্থার এক সক্রিয় সদস্যা হওয়ার পর থেকে অনুষ্ঠানের দায়িত্ব খানিকটা এল আমার উপর। ধান ভাঙতে একটু শিবের গীত হল বটে কিন্তু পটভূমিকাটা একটু বলতে হবে বইকী!
ওদের নাচ শেখানোর অভিজ্ঞতা একেবারেই অন‍্যরকম অনন‍্য। এত উৎসাহ আর এত চেষ্টা ওদের সে বলে বোঝানো যাবে না। ওরা যে অনেক না পাওয়ার দেশের মেয়েরা তাই নাচ ও সাজ ছিল ওদের কাছে একটা স্বপ্ন পূরণের গল্প।
গরমের ছুটিতে কলকাতা গিয়ে ওদের নিয়ে রবীন্দ্র জয়ন্তী করাতাম আর শীতের ছুটিতে বার্ষিক অনুষ্ঠান। সেই বার্ষিক অনুষ্ঠানে পদধূলি পড়ত কখন গদাধর আশ্রমের স্বামীজী অথবা সারদা মিশনের বড় মা।
আমি কলকাতা পৌঁছলেই ওরা একদৌড়ে হাজির আমার বাড়ি। নাচ যে প্রাণের আনন্দ তাই তো নৃত‍্যরসে চিত্ত ওদের উছল হয়ে বাজত।
একবার অনুরোধ এল,দিদি আমাদের দিয়ে একটা নৃত‍্যনাট‍্য করাও। দিদি তো নেচেই আছে, ঠিক করলাম ‘চন্ডালিকার একটি অংশ করাব। ওদের বসিয়ে গল্পটা শোনালাম, খুব পছন্দ হল। এখানে বলে রাখি আমার মেয়ে খুশি ছোট থেকেই ওদের সাথে সমানভাবে অনুষ্ঠান করত। চন্ডালিকাতে প্রকৃতি হল খুশি, বাকী চরিত্রে সমিতির মেয়েরা।
সেবারে অন‍্য হল ভাড়া নেওয়া হয় নি একটা মাঠের অল্প খানিকটা ঘিরে তৈরী হল মঞ্চ। পাড়ার ইলেকট্রিকের দোকান থেকে লাইট এল আর সাজ হল মা কাকিমাদের শাড়ী ইত্যাদি নিয়েই। মেকাপের দায়িত্বে আমি আর সহযোগিতায় এই বাচ্চাগুলোর মায়েরা আর সাথে সমিতির কিছু সদস‍্যা।
এই সামান‍্য উপকরণেই তৈরি হয়েছিল আমাদের চন্ডালিকা। অনেক কিছুই ছিল না কিন্তু সব খামতি ঢেকে গেছিল আন্তরিকতায়। রবি ঠাকুরের ‘চন্ডালিকা’ প্রাণ পেয়েছিল এই সাধারনীদের অদম‍্য উৎসাহ ও উদ্দীপনায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।