।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সঞ্চালী দও

শিউলি

“বাজলো তোমার আলোর বেণু….”আওয়াজটা ধীরে ধীরে মিলেয়ে গেল। পাড়ার সুমিত দা মাইকে এ জোরে জোরে বলতে লাগলো “আমাদের অষ্টমী পুজোর অঞ্জলি শুরু হয়ে গেছে, যারা যারা অঞ্জলি দিতে ইচ্ছুক তারাতারি মণ্ডপে এসে উপস্থিত হন”। রাই বাড়ির ছাদে দারিয়ে আছে, ছাদে পরে থাকা “শিউলি” ফুল গুলো কে দেখছে, “শিউলি” ফুল রাই এর খুব প্রিয়; অনেক পুরনো কথা মনে করিয়ে দেয় রাই কে..
“কি রে আজ ট্রেন টা মিস করবি নাকি” মা ডাকল । বেরনোর সময় মা বলল “আজ ফেরার পথে তোর বাবার জন্য কিছু একটা নিয়ে ফিরিস”।
“ঈশ আজ অনেক রাত হয়ে গেল,১০.১০ এর হাওড়া বর্ধমান লোকালটা কি বেরিয়ে গেছে” বলতে বলতে ছুটতে থাকে রাই ৩ নাম্বার প্ল্যাটফর্ম এর দিকে, এই রে ট্রেন তো ছেড়ে যেতে শুরু করেছে এক মুহূর্ত না ভেবে ছুটতে শুরু করল রাই, অনেকেই চিৎকার করতে লাগল ছুটবেন না; ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, রাই ছুটতে ছুটতে লাস্ট গেটের হাতল টাকে ধরে ফেলেছে, বইরে থেকে ভিতর থেকে প্রায় অনেকেই চিৎকার করছে ছেড়ে দিন ছেড়ে দিন, কোনরকমে শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে রাই শেষের জেনারেল কোচটা তে উঠে পড়ল, রাই এর হাত পা থর থর করে কাপছে, ট্রেনের হাতল টাকে ধরে দাঁড়াবারও শক্তি নেই আর, অনেকেই তখনও রাই কে নিয়ে নানা কথা বলছে; “কেউ কেউ আবার বলল এরা লেডিস এ কেন ওঠে না”, অথচ তারা কেউই রাই কে একটু বসার জায়গা দিল না । একটি ভদ্রলোক নিজে কিছুটা সরে রাই কে ঠেস দিয়ে দাড়াতে দিল আর যেন কিছুটা আড়াল করেই দাঁড়ালো রাই কে । কোনরকমে ব্যাগ থেকে জল বের করে এক ঢোক খেয়েই রাই ওই অচেনা ভদ্রলোকটিকে ধন্যবাদ জানালো, তবে এক পাশ থেকে লোকটির মুখটা দেখে রাই র কেমন যেন চেনা চেনা লাগল..
একটা দুটো ষ্টেশন পার হল, ভিড় কিছুটা কমলো রাই গিয়ে ভিতর এ চ্যানেল এ দাঁড়ালো; শেওরাফুলি ষ্টেশন পার হওয়ার পর রাই বসার জায়গা পেল, ভদ্রলোক তখনও গেটের মুখে দারিয়ে; রাই কিছুতেই তার মুখটা দেখতে পাচ্ছে না, একবার মনে মনে ভাবল বসার জায়গা টাকি লোকটি কে ডেকে দেবে রাই; কিন্তু তার পরই মনে হল না যদি কিছু ভাবেন..
ট্রেন ভিড় ধিরে ধিরে কমতে লাগল; ব্যান্ডেল ষ্টেশন এলে প্রায় ফাকাই হয়ে গেল হাত এ গনা ২০-২২ টা লোক হবে, ব্যান্ডেল ষ্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়লে; রাই একবার মুখ তুলে গেটের দিকে দেখতে গিয়ে দেখল লোকটি উধাউ; “তবে কি সে ব্যান্ডেল ষ্টেশন এই নেমে গেল; রাই বার দুয়েক এদিক ওদিক দেখল, না লোকটা তো আর নেই”, এবার কেমন যেন একা একা মনে হতে লাগল রাই এর নিজেকে; সত্যি বলতে ওই অচেনা ভদ্রলোক টি যেন রাই কে অজান্তেই সাহস জোগাচ্ছিল । এবার ট্রেন থামল মাগরা ষ্টেশনে, রাই নামল; হাত এ গনা ১০-১২ টা লোক নেমেছে হবে; গোটা ষ্টেশন ফাঁকা, সাবওয়ে দিয়ে নিচে নেমে এসে রাই দেখে সর্বনাশ একটা রিকশাও নেই; টোটো, অটো তো দুরের কথা, বাকিরা প্রায় সকলেই কেউ গাড়ি, কেউ বা সাইকেল নিয়ে চলে গেল, কাউকে কাউকে আবার নিতেও এসেছে, সকলেই একে একে চলে গেল; চারিদিকে একটা গভীর নিস্তব্ধতা, রাই একা দারিয়ে, এরকম অভিজ্ঞতা রাই এর এই প্রথম বার হল; এর আগে দেরি হলেও রাই এর বাবা রাই কে গাড়ি করে নিতে আসতেন; এখন বাবা অসুস্থ; গাড়িটাও অকেজো হয়েছে বহুদিন; রাই এর চোখে জল এল; হঠাৎ পেছন থেকে সেই লোকটি; অন্ধকার এ মুখটা তখনও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না রাই, “ কোন দিকে যাবেন পোলবা নাকি ত্রিবেণী?” “ত্রিবেণী”; তবে হাঁটতে পারেন আমার সাথে আমিও ওই দিকই যাব; এতো রাত এ এভাবে দারিয়ে থেকে আর টোটো বা অটো কোনটাই পাবেন বলে মনে হ্য় না ।
এক মুহূর্ত ভেবে রাই রাজি হয়ে গেল, হাঁটতে শুরু করলো; খানিকক্ষণ এর স্তবধতা..
লোকটিই প্রথম নিরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলো; “তা বাড়িতে বাবা, ভাই, বা হাসবেন্ড কেউ নেই?” যদি কেউ থাকেন তবে ফোন করে দিন না; যদি কিছুটা এগিয়ে আসেন..
“না আমর বাবা অসুস্থ, আর আমার কোন ভাই নেই” । আবার কয়েক সেকেন্ড দুজনে চুপ, লোকটি আবার প্রশ্ন করলো “আর আপনার হাসবেনড?”, “বিয়ে হয় নি”। “দুর্গা পুজোর দিনও অফিস করছেন, ডাবল পে বলে নিশ্চয়ই?” “হ্যাঁ, কিছুটা তাই, বাড়িতে বাবা অসুস্থ; মা ও তেমন সুস্থ নন; তাই আর কি”.. সে যাই হোক, আপনার আজকের উপকার আমি সারাজীবন মনে রাখবো ।
“আমি না করলে অন্য কেউ করত”, লোকটার কথা গুলো যেন রাই এর ভিষণ চেনা মনে হচ্ছে। এবারে রাই প্রশ্ন করলো, “আপনার বাড়িতে কে কে আছে?” “আমি আর মা”, “বিয়ে করেন নি?” লোকটা বেশ মজা করেই বলল “করতাম তো কিন্তু কেউ একজন যে আমাক বলেছিল, ভাল চাকরি পেয়ে আমি ঠিক যাব তোমার কাছে”।
কথাটা শুনে রাই এর বুকটা ধরাস করে উঠল, এই একি কথা যে সেও তার ঋক কে বলেছিল, তা আজ থেকে প্রায় ৬ বছর আগের কথা; সেই সময় ঋক বা রাই কারোরই চাকরি ছিল না বলে ওদের সম্পর্ক টাকে; রাই এর বাড়ি থেকে মেনে নেয় নি, রাই তখন এরকমই বলেছিল ঋক কে ।কিন্ত সে সব শুধু কথার কথাই হয়ে রইল; সংসার আর পরিস্থিতির চাপে রাই এর আর পড়াশুনা এগোনোর সুযোগ হয় নি; এখন রাই একটা চাকরি করে বটে; তবে তা খুবই অল্প মাইনের..
লোকটার কথায় রাই এর হুশ ফিরল, “কি ভাবছেন এতো?” “এসে গেলাম তো প্রায়”, কিন্তু আমার বাড়ি তো এখনও ৫-৬ মিনিট হেঁটে গেলে তবে, লোকটা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েই বলল “কিন্তু এটাই তো আমার বাউন্ডারি”। মুহূর্তে রাই এর দু হাত ঠাণ্ডা হয়ে গেল, আর একটুও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না রাই এর, এতক্ষণ ধরে অচেনা ভাবা মানুষটা আসলে তার খুব চেনা, তার প্রিয় সেই মানুষ, ঋক । চোখের জল যেন বাধ মানছে না রাই এর; রাই এর চোখের জল মুছে দিয়ে; ঋক আজ আর একবার বলল “এ কোন ভোরে শিউলি ফোটাই, দোরে কড়া নেড়ে বলে যায়, হারিয়ে যাবো চলে আয়..”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।