T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সংযুক্তা দত্ত

পৌরাণিক কাহিনী –

হিন্দু পুরাণ অনুসারে দেবী পার্বতীর নয়টি বিভিন্ন রূপ। কৃষ্ণ পক্ষ অবসানের পর সূচনা হয় দেবীপক্ষের । শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গার নয়টি রূপের পুজো করা হয়। আসলে এই নয়টি রূপের গুন মিলিয়ে দেবী পার্বতীর দূর্গা রূপ।
শৈল পূত্রী
দেবীর প্রথম রূপ,নাম আক্ষরিক অর্থ, হিমালয়ের কন্যা, তাই জন্যে শৈল পুত্রী অন্য নাম পার্বতী। পুরাণ অনুসারে শৈলপূত্রি সতীর নবজন্ম ।সেই দক্ষের যজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করেন আর মহাদেব রেগে সতীর দেহ নিয়ে নৃত্য করেন, ইনি সেই সতী।
এই রুপ ধৈর্যের আর ফিরে আসার প্রতীক। “রাইসিং ফ্রম দা আসেজ” যাকে বলা যায়।
ব্রহ্মচারিনী
শৈলপূত্রির জন্ম তো হল, কিন্তু শিব ধ্যানমগ্ন, শিব ও শক্তির মিলন হবে কী করে? নারদের পরামর্শে কঠোর তপস্যা করলেন দেবী। তার মধ্যে বেশ কিছু বছর শুধু একটি পাতা খেতেন তিনি। কয়েক হাজার বছর এই কঠোর তপস্যার ফলে ব্রহ্মা র বরে শিব কে আবার পতি হিসাবে লাভ করলেন।
এই রুপ ভক্তি, মনের জোর ও অদম্য চেষ্টার কাহিনী বলে।
চন্দ্রঘন্টা
পার্বতীর সাথে বিয়ে করতে এসেছেন শিব, সঙ্গে নন্দী ভৃঙ্গী, একপাল ভূত প্রেতের দল। সেই দেখে মা মেনকা গেলেন মূর্ছা, কিছুতেই দেবেন না বিয়ে। এমন সময় তেজস্বিনী , শক্তিরূপিনি, ব্যাঘ্র বাহিনী চন্দ্রঘণ্টা রূপে প্রকট হলেন দেবী পার্বতী। ভয় পেয়ে চন্ড রুপ পরিত্যাগ করে বর বেশে সজ্জিত হয়ে মা মেনকার সন্মতি পেয়ে বিয়েতে বসেন।
এই রূপ শেখায় কখনো নতী স্বীকার না করতে, তা সে যতই প্রিয়জন হোক বা তপস্যার ফল। বীরত্ব আর সাহসের প্রতীক।
কুষ্মাণ্ডা
‘কু’ শব্দের অর্থ কুৎসিত এবং ‘উষ্মা’ শব্দের অর্থ ‘তাপ’; ‘কুষ্মা’ শব্দের অর্থ তাই ত্রিতাপ বা দুঃখ–দেবী জগতের দুঃখ গ্রাস করে নিজের উদরে ধারণ করেন, তাই তার নাম ‘কুষ্মাণ্ডা’।যেমন মহাদেব সমুদ্রমন্থনের সময় সমস্ত হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হয়েছেন, তেমনি জগজ্জননী দুর্গা আদ্যাশক্তি জগতের সর্বপ্রকার জ্বালা-যন্ত্রণার হাত থেকে সন্তানদের সর্বদা রক্ষা করতে করুণায় দ্রবীভূত হয়ে স্বেচ্ছায় সব তাপ নিজের শরীরে গ্রহণ করেন। দূরিতবারিণী–‘ত্রিতাপহারিণী’ মায়ের নাম তাই কুষ্মাণ্ডা।”
এই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যে জগত সংসারের বিষ পান করতেই হবে কিন্তু থেমে গেলে চলবে না।
স্কন্দমাতা
জন্মের সময় কার্তিকের ছিল ছয়টি মাথা, তাই অপর নাম ষরানন স্কন্দ। এই রূপেই তারাকাসুর বধ করেছিলেন মাতা ও পুত্র। তাই এই রূপ বোঝায় মাতৃত্ব, বাৎসল্য সেই সঙ্গে শক্তির দাপট।
কাত্যায়নী
পুরাণ মতে  দেবী কাত্যায়নীর উদ্ভবের কাহিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে: “দেবগণ চরম দুরবস্থায় বিষ্ণুর নিকট সহায়তা প্রার্থনা করলে, বিষ্ণু ও তাঁর আদেশে শিব, ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবগন দেবী পার্বতীর অংশ নিয়ে তাকে কায়া রূপ দেন সকলের দেহ হতে দিব্য তেজ বিনির্গত হয়ে এক জ্যোতিপর্বতের সৃষ্টি করল। এই জ্যোতিপর্বত ধারণ করল অষ্টাদশভূজা, কৃষ্ণকেশী, ত্রিনয়না ও সহস্র সূর্যের প্রভাযুক্তা দেবী কাত্যায়নীর রূপ।
শিব তাঁকে ত্রিশূল প্রদান করলেন। বিষ্ণু দিলেন সুদর্শন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনুক, সূর্য দিলেন তীরভরা তূণীর, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, কুবের দিলেন গদা, ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, কাল দিলেন খড়্গ ও ঢাল এবং বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। এইভাবে অস্ত্রসজ্জিতা হয়ে দেবী গেলেন বিন্ধ্যাচলে।
এই রূপেই প্রথম টক্কর শুরু মহিষাসুর এর সঙ্গে।
সুন্দরী মানেই কিন্তু দুর্বল নয়।
কালরাত্রি
সপ্তম দিন  পুজো করা হয় দুর্গার ভীষণ রূপ দেবী কালরাত্রি। তাঁর প্রচণ্ড ভীতিপ্রদ রূপের জন্য দেবীর এই নামকরণ। কাজলের মতো ঘোর কালো এই দেবীর গাত্রবর্ণ। পুরাণ অনুসারে দুই রাক্ষস শুম্ভ ও নিশুম্ভ এবং তাঁদের দৈত্যসেনাকে দেখে অত্যন্ত ক্র‌ুদ্ধ হয়ে ওঠেন দেবী দুর্গা। তখন এই ভয়ানক রূপ ধারণ করেন তিনি।
ভগবত্‍ পুরাণ অনুসারে দেবী কালরাত্রি চণ্ড ও মুণ্ডর চুলের মুঠি ধরে তা ধড় থেকে আলাদা করে দেন। চণ্ড ও মুণ্ডের হত্যা করার জন্য দেবী কালরাত্রি চামুণ্ডা নামেও পরিচিত। এই দেবীর প্রিয় ফুল হল রক্তজবা। ১০৮টি জবা ফুল দিয়ে গাঁথা মালা দেবীর চরণে অর্পণ করতে হয়।
কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী। তাই তাঁর অপর নাম শুভঙ্করী।
সৃষ্টি বাঁচাতে গেলে অশুভের নাশ বড্ড দরকার।

মহাগৌরী

মৃন্ময়ী রূপে প্রাণ প্রতিষ্ঠার পরেই মা চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন অষ্টম দিনে।। ওইদিন দেবীকে মহাগৌরী রূপে উপাসনা করা হয়।
মহাগৌরী দেবী দুর্গার অষ্টম শক্তি, রূপেও অষ্টম। দেবীর বয়েসও আট, ‘অষ্টমবর্ষা ভবেদ গৌরী’ ‘দেবী অপ্রাপ্ত বয়স্কা, বালিকারূপী।’ চণ্ডীতে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রিয় সমস্তাঃ সকলাজগৎসু’ অর্থাৎ জগতের সকল স্ত্রীই তোমার অংশস্বরূপ। এই রূপ থেকে দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীতে এসেছে কুমারী পুজোর অমৃতময় ভাবনা।
সাধকরা মনে করেন দেবী পার্বতীর এই স্বরূপ পরমসাত্ত্বিকের আধার। তিনি পরম পবিত্রতার প্রতীক ও করুণাময়ী দেবী লীলামূর্তি ধারণ করেন। দেবী কালরাত্রির ক্রোধ যখন শান্ত হয়, তখন তিনি নিজের উগ্ররূপ ত্যাগ করে মহাগৌরী রূপে আবির্ভূত হন।
ক্রোধ সংবরণ, এই সদগুন টির ও জীবনে প্রয়োজন আছে।

সিদ্ধিদাত্রী

নবরাত্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটি হল নবমী। এই দিনে, দেবী তাঁর সিদ্ধিদাত্রী রুপে পূজিত হন।এই দেবী সবধরনের সিদ্ধি দান করে থাকেন।
সিদ্ধি হল আধ্যাত্মিক ক্ষমতা যা একজন ব্যক্তিকে জীবনের সাধারণ জিনিসের চেয়ে আরও বেশি করে সফল হতে সহায়তা করে। ন’দিন ব্যাপী এই নবরাত্র পূজনের শেষে মহানবমী তিথিতে সিদ্ধি বা সাফল্যলাভ হেতু দেবী সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করা হয়।
ভগবত্‍ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন। এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন।
অর্ধনারীশ্বর রূপে পরমেশ্বর শিবের বাম অঙ্গে দেবী সিদ্ধিদাত্রী অবস্থান করেন।
সেই আদি ও অনন্ত সত্য, পুরুষ ও প্রকৃতি দুই মিলিয়ে সৃষ্টি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।