ক্যাফে ধারাবাহিক গল্পে সুবল দত্ত (পর্ব – ৭)

হন্যতে
মেনরোড থেকে নেমে জঙ্গলের দিকে দৌড়তে লাগলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কটাশের পাল তার পিছনে। উত্পলা আরো জোরে দৌড়তে লাগলো। সেই দৌড়, স্কুলে কেউ তাকে হারাতে পারতো না। তবু পিছনে কটাশগুলো তার কাছাকাছি চলে এসেছে। ও ঘুরে গিয়ে সেই শিরীষগাছটার দিকে দৌড়তে লাগলো। এই গাছটায় তাকে চাপতে হবে। কাছে গিয়ে দেখে গাছের গা মসৃণ পিছল কিন্তু গাঁঠ আছে। অবশ্য উত্পলার কাছে কোনো গাছই দুর্জয় নয়। কটাশের পাল লাফ দিয়ে তার কাছাকাছি আসার আগেই তরতর করে গাছে চেপে গেল সে। বেশ উঁচুতে একটা মোটা ডাল আশ্রয় পেয়ে সেখানে বসে পড়ে হাফাতে লাগলো। শরীর কমজোর। অনবরত রক্তক্ষরণে চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।মুখের ভিতর চ্যাটচ্যাটে উত্তেজনা।তলপেট অসাড়। উত্পলা দেখলো নিচে প্রচুর বড়বড় গর্ত। কটাশগুলো উধাউ। উত্পলা ডালের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয় আর পৃথিবীতে কোথাও নেই। নিরাপদ স্নেহময় প্রশান্তি। সে দেখলো কটাশগুলো গর্ত থেকে উঁকি মারছে। মুখে একটা করে হাড়।ওরা একে একে বেরিয়ে হাড়গুলো গাছের নিচে জমা করতে লাগলো। মানুষের পাঁজরার হাড়, হাত পা কোমর করোটির টুকরো।সব সাদা। ওরা চেটেচেটে পরিষ্কার করেছে। অনেকগুলো হাড়। তাহলে শুধু নারায়ণী নয়,আরো কয়েকজনের? উল্লাস যে একটা সিরিয়াল কিলার এই ধারনা তবে ঠিক? দূরে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল উত্পলা। কি আশ্চর্য! এতদিন ওই বাড়িটাতে একটা নররাক্ষসের সাথে ও কাল কাটিয়েছে? ও দেখলো উল্লাস উদ্ভ্রান্তের মত গেট থেকে ছুটে বেরিয়ে আসছে। হাতে একটা বড় কাল ব্যাগ। উত্পলা একটু সরে গিয়ে পাতার আড়ালে লুকোলো।
উল্লাস ও কটাশ
ঘর খোলা রেখে গেট বন্ধ না করেই উদ্ভ্রান্ত হয়ে উল্লাস এদিক ওদিক দৌড়াতে লাগল। কোথায় উবে গেল উত্পলা? ও এতো বেশি হুশিয়ার অথচ উত্পলার ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া কল্পনাতেও আসেনি। বাথরুমের কমবিনেশন লক ফ্রিজের তালা খুলে দেখা ওর পক্ষে কেন কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। তাছাড়া মেয়েটা একেবারেই বোকা গর্ধভ। একদম আলুভাতে মার্কা। ওই খোঁড়া মেয়েটা চালাক ছিল তাই ও কষ্ট পেয়ে মরল।
পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাল সে। একটি মাত্র বাসিন্দা দোতলায় এবং সে নিজে। নিচের ফ্ল্যাটগুলো তালাবন্ধ খালি। কে আর আসবে এই একান্তে নির্জনে থাকতে? বেশীরভাগ মানুষ ভীতু আত্মকেন্দ্রিক ও সাবধানী। উল্লাস দেখেছে তার এই উগ্র মনোবাসনা চরিতার্থ করার জন্য সে যা যা উপকরন পরিবেশ শিকার চেয়েছে তাই পেয়েছে। বাধাহীন। অতি সহজে এই নিঃসঙ্গ বাসা, মেয়েদের ফাঁসিয়ে নিয়ে আসা। কেউই জানল না পরপর চারজনকে হত্যা করে লাশ গায়েব করার কথা। তারপর ওই খুনখার জন্তুগুলোকে আদমখোর বানানো, এসবই উপরওয়ালার কৃপা। তাকে যে তার পূর্বপুরুষদের মুক্ত করে স্বর্গে স্থান দিতে হবে? তারপরই হবে তার স্বর্গে যাবার রাস্তা সাফ। দাদু বলেছিল, স্বর্গে প্রচুর অপ্সরা। অনন্ত সময় ধরে ওদের সাথে তোর মিলন হবে। তুই দেবতা হয়ে যাবি। উল্লাসের কানে এখনো দাদুর কথাগুলো বাজে। এবার কি শেষতম শিকার কি ফস্কে যাবে? এ হতে পারেনা। কিন্তু ঘর দরজা সব যে বাইরে থেকে বন্ধ করা ছিল? ছাদে যাবার টিনের দরজা তো তালা দেওয়া? কি করে সম্ভব? নিশ্চয় জানলার গ্রিল খুলে নিচে লাফিয়েছে আর হায়েনাগুলো টেনে নিয়ে গেছে।
শিরীষগাছের নিচে এসে উল্লাস হতবাক! প্রচুর হাড় গর্ত থেকে বার করে এনেছে জানোয়ারগুলো। উল্লাস ঠিক করে ছিল সব শেষ হয়ে যাবার পর এক ট্রাক রাবিশ এনে গর্তগুলো বন্ধ করে বুলডোজার চালিয়ে দেবে। জানোয়ারগুলো মরবে আর কোনো সবুত থাকবেনা। কিন্তু এটা কি হলো? চমক ভাঙতেই দেখে জানোয়ারগুলো তার খুব কাছে রক্ত চোখে দাঁত বেরকরে তার দিকে তাকিয়ে। উল্লাসের হুঁশ হলো।তাইতো? ভুলের পর ভুল হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে এখন এখানে দৌড়ে আসা উচিত ছিল না। ও তো রাত দুটোর সময় এখানে আসে। মড়ার খন্ডগুলো দূর থেকে ছুঁড়ে দেয়। জন্তুগুলো ওতেই ব্যস্ত থাকে আর সেই সুযোগে সে পালিয়ে যায়। কিন্তু এখন কি করা যায়?
উল্লাস কাটারি উঁচিয়ে হ্যাট হ্যাট করে তাড়াতে গিয়ে মনে পড়ল ওর একহাতে লাশের অর্ধেক মুন্ডু রয়েছে। উলাস ব্যাগ খুলে খোপড়ির চুলের মুঠি ধরে দোলাতে দোলাতে কটাশগুলোর দিকে ছুড়তে গেল, কিন্তু মুন্ডু থেকে চুল খসে গিয়ে ভট করে তার পায়ের উপরেই পড়ল। আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে উল্লাস দেখল, তার সামনে একটা বড় কালো হায়েনা তার দিকে লাফ দেবার জন্যে তৈরি।