গল্পেসল্পে সুবল দত্ত – ৪

ক্রমহনন
Beauty of infectious
ভোর রাতে একটা বড় গিরগিটি গায়ের উপর দিয়ে লাফ দিতে মাদুরার ঘুম ভেঙে গেল। গিরগিটিটা ওর বুকের উপরে চেপে মাথা নাড়ছে। গায়ের রঙ গাঢ়বেগুনী থেকে ক্রমশ বেগুলি লাল ফিকে লাল হচ্ছে। এটা বহুরূপী। মাদুরা হেসে বলেই ফেলল, ভালোই আমাকে বুঝেছ দোস্ত। তুমি আমি একই ক্যাটাগরির। রঙ বদলু। উঠে বসতে গিয়ে ওটা লাফ দিয়ে পালিয়ে গেল। গাছের ডালের সাথে একটা শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল নিজেকে। ড্রেস চেঞ্জ করে সন্ধে সন্ধে ঘুমিয়ে পড়েছিল। দড়ি খুলে নেমে তাঁবুর কাছে গিয়ে দেখে রায়া তাঁবুর ভিতরে যায়নি। পোড়া কয়েকটা কাঠের পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে। কাঠগুলোর পাশে পোড়া লুন পাখিটা। খায়নি রায়া। বড় অভিমানী মেয়ে। মাদুরার বুকে আবেগ উথলে উঠল। মাদুরা একবার এখানে এসে রায়ার জন্যে একটা স্লিপিং ব্যাগ আর ওর ব্যাগটা রেখে গেছিল। রায়া একবার মুখতুলে হেসেছিল মাত্র। কিচ্ছুটি বলেনি। এখন স্লিপিং ব্যাগ তেমনিই পড়ে রয়েছে। ওর কাছে যাওয়ার আগে পিপিই পরা উচিত এই ভেবে মাদুরা ফিরে গিয়ে সব প্রোটেকটিভ ড্রেস পরে ফেলল। সারা গায়ে মদের গন্ধ। আর একটু হাতে গায়ে মদ ঢেলে তাঁবুর কাছে এসে রায়াকে পাজকোলা করে তুলে স্লিপিং ব্যাগে ঢোকাতেই মাদুরা সাবধান হয়ে গেল। রায়ার গা বেশ গরম। তবে কি? ওকে আবার তুলে তাঁবুর ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। এখনো আঁধার কাটেনি। উত্তর আকাশে রঙিন রোশনাই। অরোরা বোরিয়ালিস খেল দেখাচ্ছে। এক একটি রঙ এক একরকমের দুশ্চিন্তা হাজির করছে মাদুরার সামনে। কি হবে? এবার কি? তাঁবুর ভিতর থেকে কাশির শব্দ এলো। আবার সেই ননস্টপ কাশির টান। মাদুরা তাঁবুর কাপড় তুলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিস্পন্দ দেখতেই থাকল। রায়া উঠে বসেছে। ওর মুখ সিঁদুরের মত লাল হয়ে উঠেছে। কষ বেয়ে লালা ঝরছে। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। তাহলে ও নিশ্চয়ই ইনফেকশাস। ফাইব্রোসিস শুরু হলো কি? মাদুরার শরীর ঝিম মেরে গেল। রায়ার সাথে এখন অব্দি মোট বাহাত্তর ঘণ্টাও হয়নি সঙ্গে থাকার,তবু ওর জন্যে গলা ঠেলে উঠে আসছে কষ্ট। কেন আমি ওর কাছে যেতে পারছিনা? প্রাণের ভয়? আমি এতো স্বার্থপর? মাদুরা ভাবতে ভাবতে ওর কাছে এল। এই কষ্টের মধ্যেও রায়ার ক্লান্ত হাসি। -‘প্লিজ ডোন্ট থিংক অফ মি বেবি। আমার কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি। আমার ব্যাগে মেডিসিন আছে,আই উইল বি ফিট ইন নেক্সট টেন মিনিটস’।
সত্যি সত্যি দশমিনিটের ভিতরে রায়ার কাশি বন্ধ হল আর ও হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল। এবার ও আদেশের সুরে বলল,-‘নাও গেট রেডি ফর ব্রেকফাস্ট’। মাদুরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাছের গোড়ায় রাখা জিনিসপত্রের দিকে গেল।
কফির জন্যে আবার কাঠ জ্বালানো হলো, সাথে কেক ও স্ন্যাক্স। মাদুরা দেখল রায়ার কপাল থেকে ঘাম ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে নুয়ে পড়ছে। লেকে সকালবেলায় প্রচুর সারস। কয়েকটা লুন। এই লেগুন লেকে প্রচুর মাছ,কাঁকড়া আর সেলফিশ। কফিতে চুমুক দিয়ে মাদুরা বলল,
-রায়া, ওই রোস্টেড লুন বার্ডটা গরম করে নিয়ে খেতে পারো। নাহলে আমি কয়েকটা কাঁকড়া ধরে আনি? তোমার ফুড দরকার। রায়ার হাতে কফি আর ভেজ প্যাট্রিস। আগুনের দিকে চেয়ে থেকে খুব শান্ত হয়ে বলল,-‘নাঃ, ওসব আর খাবো না। বেবি,আমি জানি আমার ক্যানাইন টিথ দেখে আর আমার ফুড চয়েস দেখে তোমার খুব ইরিটেশন হয়। অনেকের হয়। বাট প্লিজ ডোন্ট হেট মি। এই দ্যাখো? আমি মাস্ক পরে আছি। যতক্ষণ বাঁচবো আর খুলবো না। ডিয়ার,আমি তোমার বিহেভিয়ার এডপ্ট করব ভাবছি,রাইট নাউ। আমি কার্নিভোরাস তুমি ভেজিটারিয়ান, আমি এগ্রেসিভ তুমি রিলাকটেণ্ট, তুমি বাঁচতে চাও,পিপিই পরে থাকো,আমি মৃত্যুর দরজায় পা রেখে দাঁড়িয়ে। অনেক ছোট থেকেই জানি আমার লাইফ আনস্টেবল। বহু বছর ধরে আমি মৃত্যুর দুয়ারে বসে আছি। আমার কোনো ভয় নেই। আমি তো ইন ফ্যাক্ট ডেথ এনজয় করার জন্যেই তোমার সাথে এখানে আসার প্ল্যান করেছি। তুমি…’। মাদুরা আর ওকে বলতে দিল না। ঝট করে ওর কাছে গিয়ে মুখে হাত দিল।
-‘তোমার কিছু হয়নি। তুমি ঠিক হয়ে যাবে রায়া। তুমি আর আমি একই পথের পথিক। এই ভিন দেশে আমাদের আর কে আছে রায়া? আচ্ছা? তোমার কিসের অভিমান? তুমি কি চাও আমি পিপিই জ্যাকেট না পরে থাকি? এই দেখো এক্ষুনি খুলে ফেলছি’। রায়া উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল।–‘নো নো বেবি। স্টপ। প্লিজ ডোন্ট ডু দ্যাট। আমি জানি আমি সিভিয়ারলি ইনফেক্টেড। কিন্তু আমার মন তো নয়? আমার মনের কি সেক্স থাকতে নেই বেবি? দ্যাটস হোয়াই ওয়াজ মাই ন্যুড গেসচার। আমি জানি আমার হাতে খুব কম সময়। আমি যে কি করবো বুঝে পারছিনা। আই এম টায়ার্ড অফ মাইসেল্ফ ডিয়ার’। রায়ার চোখ দিয়ে জল টপটপ করে গড়াতে লাগলো।
-‘রায়া কেঁদোনা, এই দেখ’। মাদুরা একটু পিছিয়ে গিয়ে জামা কাপড় সব খুলে নগ্ন হলো। -‘এইতো আমি একটু সেফ ডিস্টেন্সে এইভাবে থাকতেই পারি’। মাদুরা নাচতে নাচতে ‘ইউ আর সো বিউটিফুল…এম ফলিং ইন লাভ’ গাইতে লাগলো। কার্পেটের মত বিছানো অকৃত্রিম ঘাসের উপরে শিশির বিন্দুতে ভোরের লাল রঙ ধরেছে। তার উপর ছায়া ফেলে একটি নগ্ন বাঙালি যুবক ইংলিশ কায়দায় ব্যালে নাচতে নাচতে উদাত্ত কন্ঠে গাইছে। উত্তর আকাশে একবার ঝলকে উঠল অরোরা। ধরিত্রী আকাশে ছুঁড়ে মারলো এক মুঠো সিঁদুরে আবির। রায়া হঠাত্ খিলখিল করে হেসে তালি দিতে লাগলো। মাদুরা নাচ থামিয়ে বলল,-তুমি যা চাও আমি তাই করবো। শুধু তুমি সুস্থ থাকো রায়া। আই লাভ ইউ’। রায়া হাসতে হাসতে স্ট্রিপটিজের কায়দায় একে একে পরনের কাপড় খুলতে লাগলো। মাদুরা গান থামিয়ে হাত নেড়ে প্রবল মানা করতে লাগলো,-‘খুলো না রায়া খুলো না।তোমার যে জ্বর!’ কিন্তু কে শোনে। রায়া এখন উদ্দাম অবাধ,চিত্কার করে জবাব দিল,-‘আমিঠিক আছি,আমার আর জ্বর নেই’।
রায়ার হাততালি আর নাচ দেখে মাদুরা সব ভুলে গেল। আরো উঁচু গলায় মাইকেল জ্যাকশনের গান ধরল। অনেকটা জুড়ে ব্রেক ড্যান্স। রায়াও আগে পিছে কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগলো। গায়ে একটা সুতোও নেই মুখে মাস্ক ছাড়া। ঘন নীল লেগুনে ফিট সাদা সারসের ওড়াউড়ি, পাড় ভর্তি সাদা কালো ছোট ছোট নুড়ি পাথর,তার ওপর লাল কাঁকড়াগুলো রোদ পোহাতে উঠেছে। মনে হয় সত্যিকারের নয়, বিশাল আঙন জুড়ে কালারফুল মোজাইক বিছানো। নাচতে নাচতে মাদুরার সব ভুলে বছর পনেরো আগের দেশের কথা মনে পড়ে গেল। জঙ্গল ঘেরা একটি আদিবাসী গ্রামে বেশ কদিন ধামসার বোলের সাথে ছৌ নাচ প্র্যাকটিস করেছিল। বহুদিন বিদেশে যন্ত্রের মত থাকার পর এখন সেই বুনো আদিম উন্মাদনা ফিরে এল যেন। সেই বোল,তাং গিজা গিজা ধা/ধিতাং তাং ধিতাং তাং/ধিন তা গেদা ধিনি ধা। আদিবাসী সুরে প্রকৃতি বন্দনা,’ওলো ভবের প্রকৃতি সুন্দরি…’। লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে মুখে বোল তুলে গাইতে লাগলো উদোম মাদুরা। প্রকৃতি বন্দনায় মুখর হয়ে উঠলো একটুকরো ভিনদেশী স্বর্গ।
একটু পরই হাঁফাতে হাঁফাতে দুজনই ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল। মিষ্টি রোদে বসন্তের আমেজ। এতো ভালো আর কখনো লাগেনি মাদুরার। আমেজে মাথার ভিতরে ছেঁড়া কিছু স্বপ্ন আসা যাওয়া করছে। রায়া কি গান গাইছে? ভালো লাগা বেদনার গান? মাদুরা কান পাতল।‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না/মন উড়েছে উড়ুক না রে মেলে দিয়ে গানের পাখনা’। গান শেষ হতে না হতে অল্প অল্প কাশি। কাশিতে টান। একটু পরে নীরব। অদ্ভুত মেয়ে। যেমন মায়াবী চোখ তেমনি ভয়ানক হাঁ মুখ। যেমন হিংস্র মাংসখোর তেমনি তার সমর্পণ। ওর বিদেশী চলন বলন দেখে কে বলবে ও এমন মর্মভেদী রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়? ও গান গেয়ে বলতে চাইছে না? যে ও বাঁচতে চায়? মাদুরা জল স্থল অন্তরীক্ষে জোড় হাত ঘুরিয়ে কপালে হাত ঠুকে ওর প্রাণ ভিক্ষা চাইল। চোখ থেকে জল উপচে পড়ছে। রায়ার কাছে গিয়ে দেখে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে। সবুজ মখমলের উপর এক শুভ্র গোলাপী নগ্ন নারী। নির্বাধ। কিন্তু তাকে ছোঁয়া যায়না। তাকে ঘিরে আছে মৃত্যু বিসর্পিল,হুতাশ,বিষন্নতা। পরনের কাপড়গুলো তুলে রায়ার গায়ে চাপিয়ে দিয়ে ফিরে গেল ওকগাছের তলায়। গাছে উঠে কিছুক্ষন পা দুলিয়ে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। বড় বেশি নিঃসঙ্গ লাগছে নিজেকে। জীবনে আজঅব্দি এত বেশি উদ্দেশ্যহীন লাগেনি নিজেকে। এরপর কি করতে হবে মাথায় আসছেনা। তবে সারা শরীরে একটা অদ্ভুত উষ্ণ প্রবাহ চলছে পা থেকে মাথা অব্দি। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। সেক্সুয়াল আর্জ? না না এ কি ভাবছি। শেষমেষ ঠিক করল ভালো করে স্নান করতে হবে।
মাদুরা লেগুনের জলে লিকুইড সোপ মেখে স্নান করতে করতে গ্রামের পুকুরের কথা মনে পড়ল। জলে গা ভাসিয়ে হাত পা ছুঁড়ে সাঁতার কাটতে কাটতে দেখল কয়েকটা সারস ও লুন তাকে ঘিরে ডুবকি লাগাচ্ছে। এখানের প্রাণীরা দেখি মানুষকে ভয় পায় না। খুব ইকো ফ্রেণ্ডলি। হয়তো ওরা মানুষ দেখেইনি আজ অব্দি। স্নান সেরে সোজা গাছের নিচে এসে ঘাসের উপর নির্বস্ত্র মাদুরা শুয়ে পড়ল। শুতে না শুতেই রাজ্যের ঘুম নামল চোখে। ঘুম ভাঙলো যখন খুব কষ্টে চোখ খুলল। চোখ ধাঁধানো সবুজ। যেন গলা টিপতে আসছে। এতো নিস্তব্ধ যে নিজেরই হার্ট বিট শোনা যায়। যেন শরীরটাই ঢিপ ঢিপ সচল,নিজের অমূর্ত অস্তিত্ব শরীরের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে,বন্দী। বাকি সব দৃশ্য ভার্চুয়াল। আমার কিছু হয়নি তো? মাদুরা ভাবে। এখানে আসাটা কি ঠিক হোলো? এমন রিস্ক নিয়ে আসা গোয়ার্তুমি। অবশ্য পনেরো কুড়ি দিনের খাবার নিয়ে এসেছি। তার সাথে ওষুধ। তবুও আর ভাল্লাগছেনা। নাঃ,রায়ার কাছে যাই। মাদুরা জামাকাপড় পড়ে ফেলল,তার ওপরে পিপিই জ্যাকেট গ্লাভস। রায়া নিশ্চয় এখন ঠিক আছে? ওকে বলি,চলো আমরা ফিরে যাই। অনেক এনজয় করলাম। আর না। সোজা ওকে নিয়ে কোভিড হসপিটালে। আমরা দুজনই কোয়ারেনটাইনে থাকবো। তারপর আমার স্টেটের বাড়িতে উঠবো। এখনকার মেয়েরা কেউ সিঁদুর পরতে চায় না। আমি নিজে ওকে সিঁদুর পরাবো। চোখে কাজল টেনে দেব,শাড়ি পরিয়ে দেব। আর সেইদিন হবে আমাদের ফুলশয্যা।
এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে মাদুরা রায়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে,হুঁশ নেই। ঝিলের নিস্তরঙ্গ সপাট নীল জল। একটাও পাখি নেই,না কোনো কাঁকড়া শেলফিশ। নিঝুম দুপুর। রায়ার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো মাদুরা। জামাকাপড় পরে নিজেই স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে ঢুকে শুয়ে আছে। মুখ খোলা। হাঁ মুখে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, চোখ আধ খোলা। বুকটা হাপরের মত উঠছে নামছে। এসময় কি করা উচিত মাদুরা ভেবে পাচ্ছিল না। তাহলে কি শী ইজ নাউ এট হার লাস্ট গ্যাস্প? নাভিশ্বাস? কোনোমতে এক আঁজলা জল নিয়ে রায়ার মুখের উপর ছুঁড়ে দিতেই রায়া চোখ মেলে চাইল। ধড়ে প্রাণ এলো যেন মাদুরার। ইশারায় আঙুল বাড়িয়ে টেণ্টএর ভিতর থেকে দুটো ওষুধের শিশি বের করে আনতে বলল রায়া। দুটো ট্যাবলেট খেয়ে পাশ ফিরে শুল।
-রায়া লাঞ্চ?
-কিচ্ছু চাইনা আমি। ঘুমোতে চাই। শেষ ঘুম। আই নো। আয়াম ফিনিশড।
শুনেই আবার শরীর অবশ হয়ে এল মাদুরার। থপ করে বসে পড়ল সেখানে। স্তব্ধ দুপুর। নির্জন সবুজ নীল যেন গিলে খাচ্ছে। বিকেল অব্দি মাদুরা সেখানেই পাথরের মত অনড় বসে রইল। উত্তর আকাশে এক ঝলক সবুজ আলোর ফোয়ারা উঠতেই জলাশয় ও চরাচর সবুজ হয়ে উঠল। রায়ার মুখ সবুজ প্রেতের মত দেখাতে মাদুরা চমকে উঠলো। মুখ তো সবুজ নয়? নীল? এতো তাড়াতাড়ি?
–রায়া,তোমার কি কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো? তুমি যে সব জানো রায়া? ডক্টরেট করছো। রায়া আমি যে কিছুই জানিনা। আমি কি করব বলো রায়া? বলো তো এখনই ফ্রাইডে হারবারের দিকে রওনা হই? ওখানে মেডিক্যাল সাপোর্ট নিশ্চয় পাব।
একটু ঝুঁকে রায়ার মুখ দেখতে যেতেই ও চোখ মেলে তাকিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে মাদুরা ব্যাগটা পিঠের কাছে দিতেই আধশোওয়া হয়ে বসল। ইশারায় হাত বাড়িয়ে মানা করে ওয়াইনের বোতল দিতে বলল। মাদুরা গ্লাসে ঢেলে জল মিশিয়ে দিল তাকে। শ্বাসের টান তেমনিই। মুখের রঙ কালচে মেরে গেছে। চোখ বড়বড়। এক চুমুকেই খেয়ে নিয়ে ওই অবস্থাতেই রায়ার মুখে এক ঝলক হাসি। এক হাত গলায় চেপে অন্য হাত বাড়িয়ে দিল পাড়ের দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে মাদুরা দেখলো কখন এই ফাঁকে একটা হরিণ এসে জল খাচ্ছে। ও আসতে পরিবেশ যেন সরব হয়ে উঠলো।
-রায়া? ওটাকে ধরে নিয়ে আসব? বেশ ফ্লেশি,তাই না?
রায়া টেনে টেনে বলল,-ডোন্ট সে এবাউট ফ্লেশ ডিয়ার। আমি আমি ওর কাছে যেতে চাই। প্লিজ হেল্প মি বেবি।
যেন রায়ার অন্তিম ইচ্ছে পূরণ করতেই হবে এই বাধ্যতা নিয়ে মাদুরা তক্ষুনি উঠে দাঁড়িয়ে রায়াকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল হরিণটার দিকে। হরিণটা জল থেকে মুখ তুলে ঘুরে দাঁড়াল ওদের দিকে। মাদুরার অবাক লাগলো। এই ঘাসভূমি জল আকাশ পশু পাখি নগ্নতা যৌনতা মৃত্যু যাতনা চাওয়া পাওয়া আর দেখা এইসবের কারো সাথে কারো কোনো বিবাদ বিভেদ নেই? অদ্ভুদ নীরব হয়ে একে অপরকে কেমন মেনে নিয়েছে? এই পরিবেশই কি স্বর্গ? ওরা হরিণটার খুব কাছে এগিয়ে গেল। গভীর কালো বড় বড় চোখে ওদের দিকে চোখের দিকে তাকিয়ে। সম্মোহক চোখ। কোথাও কোনো শব্দ নেই শুধু রায়ার শ্বাসের হিক্কার। একটু যেন কাঁদছে? মাদুরা দেখল ও পলকহীন হরিণের চোখে তাকিয়ে। গাল বেয়ে উপচে পড়ছে অশ্রু। মাদুরা হরিণটাকে ছোঁবার জন্যে হাত বাড়াতেই লাফ দিয়ে পিছন ফিরে দৌড়।মাদুরা ওটার পিছনে দৌড়ে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই রায়া পুরো শরীরের ভর দিয়ে চেপে ধরে না না করতে করতে ওখানেই এলিয়ে পড়ল।
রায়াকে তুলে স্লিপিং ব্যাগের কাছে নামালো মাদুরা। এর মধ্যেই গা বেশ গরম হয়ে উঠেছে। পিপিই জ্যাকেট ভেদ করে ওর উষ্ণতা প্রবাহ মাদুরার ফ্যাক্টরী ফার্নেসের অসহ তাপের মতন। তার উপর ওর মুখ দিয়ে দ্রুত গরম শ্বাস। কষ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। অসহ্য অসহায় লাগছে মাদুরার। মাদুরা স্লিপিং ব্যাগে রায়াকে ভরে দিয়ে আবার কাঁধে তুলে টলমল করতে করতে দৌড় লাগালো বোটের দিকে। দৌড়তে দৌড়তে আ আ আ চিত্কার করতে লাগলো। তার সেই আওয়াজ শান্ত অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি শুষে নিল। বোটের কাছাকাছি গিয়ে বিশাল সমুদ্র দেখেই মাদুরা ভয়ে থেমে রায়াকে নিয়ে বালিতে থপ করে বসে পড়ল। সমুদ্র ও আকাশ যেন আলো নিভিয়ে হাঁ মুখ বাড়িয়ে রয়েছে। গিলে খাবে। এখন এই আঁধার মহাসমুদ্রে পাড়ি দেয়া মানেই দিকভ্রষ্ট হয়ে ঘুরতে থাকা। এখন রওনা দেওয়া মানেই মৃত্যু বরণ করা। মাদুরা আবার রায়াকে তুলে নিলো কাঁধে। টলতে টলতে তাঁবুর কাছে এসে ওকে শুইয়ে দিল। রায়ার হঠাত্ কাশি শুরু হয়ে গেল। দমকে দমকে কাশি। কাশির সাথে বমি। অন্ধকার নেমে এসেছে। আকাশে অসংখ্য তারা তার সাথে নর্দার্ন লাইটের ঝলক। ওই আধো অন্ধকারেই রায়ার কালো কালো বমি দেখা যাচ্ছিল। উদ্বিগ্ন মাদুরা সমানে চিত্কার করে যাচ্ছে ‘রায়া মেডিসিন মেডিসিন’। রায়ার হুঁশ নেই। মাদুরা দুহাতে মুখ ঢেকে সেখানেই বসে রইল।
একটু পরে রায়া উঠে বসল। শ্বাসের শব্দ হাপরের মত। অস্পষ্ট ভাঙ্গা গলায় থেমে থেমে বলে চলল,-বেবি,মাই হোল বডি ইজ ক্যাপচার্ড। কোনো আশা নেই। আমার খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। আমাকে ওয়াইন দাও আর ওই ওষুধের শিশি দুটো দাও। ডিয়ার, তুমি একটু দূরেই থাকো। তুমি ঠিক থাকো। এখন আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে চেও না বেবি। কাল সকালে ট্রাই কোরো।
-রায়া, আর ইউ শিওর? মাদুরার রুদ্ধ গলা। রায়া মৌন। শীত করছে। মাদুরা একটা কম্বল এনে ওর গায়ে ঢাকা দিল। থেকে থেকে ওর দেহ কেঁপে কেঁপে উঠছে। পরিবেশ স্তব্ধ যেন শ্মশান। কেবল রায়ার শ্বাসের সো সো শব্দ। মাদুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আ আ করে চিত্কার করে উঠল। হাত জোড় করে নুয়ে পড়ল শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। মনের ভিতরে একটাই প্রার্থনা এই পরিস্থিতি দুঃস্বপ্ন হয়ে যাক। চোখ খুলতেই যেন দেখি স্টেটে নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। মাথার চুল দু হাতে টানতে টানতে এক সময় মাদুরা সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙতেই মাদুরা ধড়মড় করে উঠে পড়ল। কোথায় শুয়ে ছিল সেটা বুঝতে একটু সময় লেগে গেল। আজ একফালি চাঁদ দেখতে পেল আকাশে। রায়ার কথা মনে পড়তেই আচ্ছন্ন ভাব পুরোপুরি কেটে গেল। ভীষণ শীত শীত করছে। আকাশে এতো আলো,তার উপর বিশাল জলাশয়ে তার প্রতিফলনে মোটামুটি সবকিছুই প্রতিভাত। তাঁবুর কাছে জড়ো করে রাখা শুকনো ডালপালা কাঠ তুলে মাদুরা রায়ার কাছে রাখল। তাঁবুতে রাখা লাইটার বের করে আগুন জ্বালালো। জানিনা কেন মনের ভিতর ভারী পাথরের মতো চাপটা আর নেই। মন একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। আগুনের আলোতে মাদুরা দেখল রায়া চিত হয়ে শুয়ে গভীর ঘুমে। হাতদুটো স্লিপিং ব্যাগ ও কম্বল থেকে বেরিয়ে বাইরে,বুকের ওপর। হাতে ধরা ওষুধের শিশি। মাদুরার খুব ইচ্ছে হল রায়ার ঠোঁটে ঠোঁট রাখার। রায়া কিকরে জানতে পারলো ওর কুকুরে দাঁত দুটোর জন্যে আমার মনে একটু না একটু ঘৃণা ছিল? আমি তো সেকথা ইঙ্গিতেও বলিনি? ছিল তো ছিল। এখন আমি প্রমাণ করতে পারি আমি আর সেরকম নই। আর সংক্রমণের আমি তোয়াক্কা করিনা। এখন অব্দি ওই ডেডলি ভাইরাস আমাকে কি ছেড়ে দিয়েছে নাকি? আর দু চার ঘণ্টা পরই তো রওনা দেব। সব ঠিক হয়ে যাবে। সব।
মাদুরা আস্তে আস্তে ঠোঁট বাড়িয়ে দিল রায়ার ঠোঁটের দিকে। রায়ার ঠোঁট এত শক্ত ঠান্ডা কেন? অনেকক্ষণ ঠান্ডা এক্সপোজার হয়েছে তাই হয়তো। মাদুরা নিজের প্রশ্নে নিজেই জবাব দিল। কিন্তু ওর যেন শ্বাস পড়ছেনা? মাদুরা দুহাত দিয়ে ওর কাঁধ ঝাঁকাতে লাগলো। রায়ার শরীরও শক্ত হয়ে গেছে। হাতে ধরা ওষুধের শিশিটা জোর করে খুলে নিতে সক্ষম হলো মাদুরা। আগুন তখন লেলিহান শিখায় আকাশের দিকে উঠছে। মাদুরা দেখলো ওষুধের শিশি খালি। গতকাল নিজে সে সিল ওপেন করেছে। তবে ট্যাবলেটগুলো কোথায়? মাদুরা পড়ে দেখলো,ওষুধটার নাম ওপিয়ড। ওষুধটা কি ও জানে। পেন কিলার অন দি রক। ওপিয়াম থেকে তৈরি। মাদুরা ওষুধের শিশি হাতে ভোর অব্দি বসেই রইল সেখানে। নিস্পন্দ।