ক্যাফে ধারাবাহিক গল্পে সুবল দত্ত (পর্ব – ১)

হন্যতে

উত্‍পলা ও কটাশ

এই আধা আধুরা কমপ্লেক্সটা দেখে উত্‍পলার নালন্দার ভগ্নস্তুপের কথা মনে পড়ে। এপার্টমেন্ট তৈরি হল কি হলনা মুর্গা ডেকে দিল। অনেকগুলো ঘরের প্লিন্থ লেবেল অব্দি, ভাঙ্গাচোরা অবস্থায়। জনবিরল অথচ মাত্র দু কিলোমিটার দুরেই কসমোপলিটন শহর। বিশাল বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপার ফেন্সি মল রংমহল ব্যস্ত ট্রাফিক। যে বাড়িতে এখন সে আছে তার খুব কাছ দিয়ে একটা হাইওয়ে। বাস ভারী মালবাহী লরি ট্যাক্সি কার খুব চলে কিন্তু কেমন যেন শব্দহীন। উত্পলা থাকে তিনতলার একটা ঘরে বাকি সব ফ্লাটেই তালা মারা। প্রথম প্রথম ভাল লাগার ঘোরে উত্পলার আদর্শ আশ্রয় মনে হয়েছে। কিন্তু এখন বড় একা লাগে। মনের ভিতর এক অজানা ভয় খচখচ করে। কিন্তু তার মধ্যেও স্বস্তি। সে আর সবার মতো নয় যে? সমাজের মাঝে থাকার মতো সবার সাথে মেলামেশার মতো তার কি রূপ আছে? তার চেয়ে এই ভালো।

উত্‍পলা আয়নাপ্রেমী। কিন্তু কালো চশমা পরেই মুখ দেখে। ঘরে বাইরে সবসময় সে সান গ্লাস পরেই থাকে। যখন সে একা থাকে চুপিচুপি গগলস খুলে নিজেকে দেখে। আয়নায় প্রতিবিম্বকে জিজ্ঞেস করে ‘ও এক নম্বর পলা? তুমি ডানদিকে কেন তাকাচ্ছ গো? ও দু নম্বর পলা তুমি বাঁ দিকে কেন তাকাচ্ছ গো?’ প্রতিবিম্ব কোনো উত্তর দেয় না। উত্‍পলা দু চোখেই ট্যারা। শুধু তাই নয়। ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন অবয়বে সে নিজেকে দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠে, কালো চশমা পরে নেয়। লোকের সামনে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

উত্পলার বাবা জেলা পশুপালন বিভাগের কর্মচারী। মোষ গরুর কৃত্তিম প্রজনন করতে করতে নিজেরই ছয়টি কন্যা সন্তান। এত বাচ্চা কেন? এই প্রশ্নে মা হাতজোড় করে ষাটি মায়ের উদ্দেশ্যে প্রণাম করতো। উত্‍পলা চার নম্বর। বীভত্স টেরা চোখ, উঁচু কপাল, সামনের দিকে ঠেলে ওঠা হনু আর উঁচু দাঁতের জন্য সে হেলাফেলা। মা বলত উঁচ কপালি চিরুণ দাঁতি, মর মর। মরলেই আমার হাড় জুড়োয়। কিন্তু সবার এত গালমন্দ হেনস্থা সত্ত্বেও উত্‍পলা নীরোগা সুস্থ সবল হয়ে তরতর করে লম্বা হতে লাগল। মাত্র আট বছরেই সে গাছে চাপত পুকুরে সাঁতার কাটতে পারতো ডুব দিয়ে পুকুরের তল থেকে মাটি উঠিয়ে দেখাতো। বছর দশেকের উত্পলার কাছে এমন কোনও গাছ ছিলনা যাতে সে চাপতে পারতো না। বাবা আর সব মেয়েদের ষোল পার হতে না হতেই বিয়ে দিয়ে দেয়। উত্পলাকে জোর করে এক বিকলাঙ্গ স্কুলে ভর্তি করাতেও নিয়ে গেছিল সেটা তার মনে আছে। কিন্তু এই অবহেলিত দূরছাই করা মেয়েটি একসময় জেলাস্তরের এক অবৈতনিক বিদ্যালয়ের উচ্চমাধ্যমিক হোস্টেলে চান্স পেয়ে গেল। বাড়ি ছেড়ে উত্পলা সেখানে ভর্তি হল। তারপর আর কি। সেখান থেকে অন্য এক শহরে এক টেকনিক্যাল কলেজে। তাও ফ্রীতে থাকা ও পড়া। বাড়ির সাথে বলতে গেলে সম্পর্কই রইল না।

এখন উল্লাসের এই ঘরটি উত্পলার খুব ভাল লেগেছে। উল্লাসের সাথে ও এখানে লিভ টুগেদার করে থাকে। উল্লাসই তাকে এখানে এনেছে। দুটো রুম ও ডাইনিং স্পেস। উত্পলার একটা রুম নিজস্ব। কম্পিউটার প্যানেল তিনটে ফোন আর প্রিন্টার। ওয়ার্ক ফ্রম হোমের জন্য যথেষ্ট। দুপুর আড়াইটে থেকে চারটে অব্দি বিরতি। ঠিক বিকেল তিনটের সময় উল্লাস রোজ একবার অফিসে বেরিয়ে যায়। সেইসময় উত্‍পলা অসমাপ্ত ভাঙ্গাচোরা সিঁড়ি বেয়ে ছাদের টিনের দরজা খুলে উপরে ওঠে।বাড়ির পিছনে তিনতলা ছাদের নিচে ঘন জঙ্গল। নিচে তাকিয়ে দেখে রোজকার মত পাঁচটা কটাশ হাজির। ছুঁচালো মুখ,নিচের সাদা লম্বা দাঁত ঠোঁটের উপরে ঠেলে বেরিয়ে। সাদা কালো ডোরাকাটা গা। ওই বিকট ভামগুলো রক্তচোখে উপরে তাকায়। উত্পলাকে দেখে লাফাতে থাকে। ওরা কোনো শব্দ করেনা,নিজেদের মধ্যে লড়াই করেনা। উত্‍পলা দু তিনটে রুটির টুকরো নিচে ছুঁড়ে দেয়। ওরা কখনো খায় কখনো খায় না। কিন্তু রোজ ঠিক টাইম ধরে আসে। উল্লাসের ঘর ফিরতে সন্ধে। রাতের আর সকালের খাবার নিয়ে আসে। ওর নিজের ঘরে খাবার রাখে আর সময় করে গরম করে উত্পলাকে দেয়। সবসময় হাসে আর হাসায়। ওকে কিচ্ছুটি করতে দেয়না। ওকে এত আদর করে যে উত্পলা ভুলে যায় নিজের কূরূপ মুখশ্রীর কথা। উত্পলা ওকে ছাড়া অন্য কারোর কথা ভাবতেই পারেনা। সবসময় ওর মুখ ওর হাসি মনের ভিতরে খেলতে থাকে। খুব মিষ্টি করে কথা বলে। সব কথাতেই গো।হাসিমাখা চোখ যেন কথা বলে। ওর নিজের রুমে তিনটে প্যানেল মনিটর।সবসময় অন করা থাকে। ওরও টেবিলে চারটে ফোন।সকাল আটটায় ও কাজ শুরু করে দশটায় বিরতি।ব্রেকফাস্ট।তারপর আবার কাজ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। তবুও দুপুর তিনটে থেকে পাঁচটা অব্দি ও অফিসে থাকে। ও সদর দরজা বাইরে থেকে লক করে যায়। বাইরে যাবার কোনো প্রয়োজন নেই উত্পলার। তাছাড়া এটা তাদের একটা অলিখিত চুক্তি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।