সম্পাদকীয়

এসো মানব কল্যাণকর সেতু গড়ি
আমরা যখন গাছ কেটে রাস্তা চওড়া করছি, ফ্লাইওভার বানাতে অভয়ারণ্যের শত শত গাছ কেটে সাফ করছি নিমেষে, তখন মেঘালয়ের দক্ষিণ অংশের খাসি ও জয়ন্তিয়া বা আরও স্পেসিফিক ভাবে বললে ওয়ার খাসি ও ওয়ার জয়ন্তিয়া ট্রাইবের মানুষেরা (মেঘালয় বাংলাদেশ সীমান্তে পাহাড়ের কোলে বসবাসকারী খাসি বা জয়ন্তিয়া ট্রাইব ওয়ার নামে পরিচিত) তৈরি করছে এমন এক সেতু যা নির্মানে গাছ তো কাটতে হয়ই না, উপরন্তু গাছ লাগাতে হয়, ওদের পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। স্ট্রীমলেটের দুই পাশে থাকা দুটি ভারতীয় রবার গাছ যা বৈজ্ঞানিক ভাবে Ficus elastica নামে পরিচিত, তার স্তম্ভমূলের সাহায্যে এই সেতু তৈরি হয়। নোহয়েট, রিওয়াই, মাওলিননং, নংগ্রিয়াট, নংথাইমাই, মাওকিরনট, নংব্লাই, কোংগ্লাহ, পাডু, কুডেং রিম, শ্নোংডেং প্রভৃতি আরও অনেক গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে এই পরিবেশ বান্ধব সেতু। এই জনজাতিদ্বয় ভীষণ ভাবে প্রকৃতিকে বিশ্বাস করে, আর প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলও। কে নয়? তবে পার্থক্য হলো পরিবর্তে আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, আর ওরা আগলে রাখে। এই অঞ্চলের মানুষদের বসতি পাহাড়ের কোলে হলেও তাদের আবাদী জমি রয়েছে উপত্যকায়, যেখানে পৌঁছতে হলে পাড়ি দিতে হয় খাদ, ঝর্ণা, জলধারা সমৃদ্ধ দুর্গম পথ। পৃথিবীর সিক্ততম অংশের ছোট ছোট নদী গুলো যে কি ভয়ঙ্কর আর খরস্রোতা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এদিকে ভারী বৃষ্টির ফলে বাঁশ বা কাঠের সেতুও বেশি দিন টিকে থাকে না। কথাতেই আছে প্রয়োজন সকল উদ্ভাবনের জননী। এখানে প্রয়োজন ছিল দুর্গম পথকে সুগম করার। তাই এই অভিনব উদ্ভাবন তাদের। এবারে এ তো গেলো কি প্রয়োজন তা জানা, কিন্তু সমাধান কোন পথে এলো, তাও তো জানা দরকার। নদীর দুইপারের দুটি Ficus elastica গাছের স্তম্ভমূল সুপারি গাছের ফাঁপা কাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করিয়ে নদীর এপার ওপারে ছড়িয়ে দিতে হয়। তারপর অন্য প্রান্তের মাটিতে প্রথিত করা হয় ও স্তম্ভমূলগুলিকে একে অপরের সঙ্গে বোনা হয়, পরিচর্যা করা হয়। এরপর সেগুলো পরিণত হয়ে গেলে মানুষের ওজন নিতে সক্ষম হলে সেতুর উদ্বোধন হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে লাগতে পারে প্রায় ১৫ থেকে পঁচিশটি বর্ষা, তারপর শত শত বর্ষার জন্য নিশ্চিন্ত। এখনও পর্যন্ত দীর্ঘতম এমন সেতুর দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। পঞ্চাশ জন মানুষের ওজন নিতে সক্ষম একবারে। চওড়ায় দেড় ফুটের এই সেতুতে নির্ভয়ে হাঁটতে, রয়েছে বাঁশের বা কাঠের রেলিং। কখনো কখনো সুবিধার্থে তৈরি হয়েছে জীবন্ত স্তম্ভমূল সেতুর ডাবলডেকার ভার্সন। আমাদের তৈরি কংক্রিটের সেতু, তৈরির পর থেকে প্রতিনিয়ত আবহবিকারের ফলে তার আয়ুক্ষয় করে, কিন্তু এই সেতু যত দিন যায়, তত তার স্তম্ভমূলগুলি মোটা ও শক্ত হয়ে সুদৃঢ় হয়। মেঘালয় বাদেও নাগাল্যান্ডে ও ভারতের বাইরে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপে এই ধরনের লিভিং রুট ব্রীজ দেখা গেছে। মেঘালয়ের মধ্যে অসংখ্য এমন সেতুর মাঝে বিখ্যাতরা হলো: পাইনুরস্লা নামক খাশি জনজাতির ছোট্ট শহরের ৫০ মিটার দীর্ঘ রাংথিলিয়াং সেতু। নংগ্রিয়াট এর ডাবল ডেকার ব্রীজ। রাংথিলিয়াং এ একটা ট্রিপল ডেকার সেতুও তৈরি হচ্ছে। মাওলিননং এর সেতুটি ডাউকি নদীর ওপর অবস্থিত। এই দুই সম্প্রদায় কর্তৃক উদ্ভাবিত ও সংরক্ষিত এই অভিনব ও পরিবেশ বান্ধব সেতু নির্মাণ পদ্ধতি ২০১৭ সালে ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের নবম জাতীয় গ্রাসরুটস ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত হয়েছে, আর এর গঠন পদ্ধতি পেটেন্ট করা হয়েছে ওই দুই সম্প্রদায়ের নামে।
প্রতি বর্ষা আসুক খরস্রোতায় ভেসে যেতে
কাঠের সেতু ভেঙে যাক, ভেসে যাক বানে
দু’পাড়ের রবার গাছের দূর হোক একাকীত্ব
আলিঙ্গন হোক শেকড়ে শেকড়ে, হোক সেতুবন্ধন
জীবনীশক্তি ছড়িয়ে দাও প্রতি মানবের প্রাণে।
সায়ন্তন ধর