ক্যাফে গল্পে সুজাতা দাস

মাতৃত্ব
লেকের ভিতরের রাস্তার ধারে ফুটপাতের এক কোনায় বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে তাকাল অত্রি,
মেয়েটির মুখের দিকে
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করলো মনে মনে,
এই ভোরে কোথা থেকে এলো মেয়েটি!!
ভাবতে থাকলো অত্রি,
প্রথমবার যখন হাঁটা শুরু করেছিল, তখন তো ছিল না মেয়েটি এখানে—-
লেকে ঢুকেও দেখতে পায়নি মেয়েটিকে, এক পাক ঘুরে এসে যখন ক্রশ করছে এই জায়গাটা,
তখন ফুটপাতের কোনায় জড়সড় হয়ে বসে থাকা চার/পাঁচ বছরের মেয়েটিকে দেখতে পেলো অত্রি—–
প্রথমে পাত্তা না দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেও একটু গিয়ে আবার ফিরে এলো মেয়েটির কাছে অত্রি।
ভালো করে লক্ষ্য করল মেয়েটিকে, আর বুঝতেও চেষ্টা করলো নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে
লাগিয়ে,
ঠিক তখনই একটা অন্য অনুভূতি অত্রিকে মেয়েটির কাছে এনে ফেলল—-
হঠাৎ বসে পড়লো ফুটপাতে অত্রি মেয়েটির পাশে,
মেয়েটিও একটু জড়সড় হয়ে বসলো অত্রিকে পাশে বসতে দেখে,
কিছু থেকে ভয় পেয়েছে বোঝা গেল, ওর সাথে কথা বলতে গেলে হয়তো বিপত্তি ঘটতে পারে,
তাই নিজের তর্জনিটা এগিয়ে দিল আস্তে-আস্তে মেয়েটির দিকে অত্রি———–
তারপর একটু একটু করে এগোতে থাকলো ওর দিকে, এবার বা হাতের পাতাটা মাথার উপর রাখলো অত্রি আর একটু একটু হাত বোলাতে থাকলো মাথায়——-
এরই ফাঁকে ভালো করে দেখতে থাকলো বাচ্চাটিকে, অবাক হলো বাচ্চাটির সারা শরীরে মলেষ্টের চিহ্ন বর্তমান দেখে।
হঠাৎ মেয়েটির পায়ের দিকে একটা রক্তের ধারা দেখে অত্রিকে বাকরুদ্ধ করে দিল কিছুক্ষণের জন্য,
ছোট্ট একটা পাঁচ বছরের মেয়েকেও এরা ছাড়ে না মানুষ এতটা অদ্ভুত আর অমানুষ!!
এতক্ষণ মাথায় হাত বোলানোর কারণে একটা ভরসা হয়তো করতে পেরেছিল অত্রির উপরে মেয়েটি,
হঠাৎই তাই বাচ্চাটি মা বলে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো—–
একটু সময়ের জন্য অত্রির মাতৃহৃদয় কী কেঁদে উঠেছিলো সেই মুহূর্তে, নিজেও জানে না অত্রি,
তবে নিজেও সন্তান স্নেহে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটিকে হঠাৎ করেই।
একটা ভালোলাগা অত্রিকে ঘিরে রাখলো খানিকটা সময়ের জন্য, যা অনেক চেষ্টাতেও অর্জন করতে পারেনি অত্রি,
মা ডাকটা অত্রিকে একজন দুঁদে অফিসার থেকে মা’য়ে পরিণত করলো অনেক তাড়াতাড়ি।
এভাবে ফেলে রাখা যাবে না ওর চিকিৎসাও দরকার পড়বে, মৌলিককে সব বলে সল্টলেকের একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করে দিল অত্রি মেয়েটিকে,
প্রথমে একটু কাইকুই করলেও ওর ভবানী ভবনের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কার্ড দেখে চুপ করে গেল নার্সিংহোমের সকলে,
আর চিকিৎসাও শুরু হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়িই যেটা বাচ্চাটির জন্য খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল।
সুরঙ্গমা মজুমদার চট্টোপাধ্যায়, একজন দুঁদে অফিসার কিন্তু চারিত্রিক দৃঢ়তার সাথে কোমলতাও বর্তমান;
নার্সিংহোমের একটা চেয়ারে বসে ভাবছিল অত্রি কোথা থেকে এলো মেয়েটি?
হঠাৎই দেখলো হন্তদন্ত হয়ে মৌলিক ঢুকছে;
অত্রির সামনে এসে মৌলিক বলল, কী ব্যাপার?
সব বলার পর মৌলিককে অত্রি বলল, মানুষ এত নিচে নামে কীভাবে, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না———-
এত ভেব না সব ঠিক হয়ে যাবে বলল মৌলিক,
কিন্তু যে ঝড় বাচ্চাটির উপর দিয়ে গেছে সেখান থেকে বেরতে পারলেই ভালো, বলল অত্রি।
টানা চার ঘন্টা বাদে বাচ্চাটিকে দেখতে পেল হসপিটালের বেডে অত্রি আর মৌলিক,
তাকিয়ে থাকতে থাকতে অত্রির মাতৃহৃদয় কী একটু কেঁদে উঠলো—–
আট বছরের বিবাহিত জীবনে আজও মা ডাক শোনার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি অত্রি,
সব চিকিৎসাও বিফলে গেছে, ফুটফুটে বাচ্চাটিকে দেখে ভেতরের মাতৃসত্বা যেন ডুকরে কেঁদে উঠছিলো বারে বারে——-
কিন্তু এর বাবা মাকে খুঁজে বার করা দরকার, সেই মতো ডিপার্টমেন্টে ফোন করে ছবি পাঠানো হলো মেয়েটির,
সাথে সব থানায় ইনফরমেশন দেওয়া হলো খোঁজ করার জন্য।
কিন্তু দিন দুয়েক কেটে গেলেও থানা বা নার্সিংহোমে খোঁজ করলো না মেয়েটির কেউ,
প্রথমে অবাক হলেও মনে মনে খুশিই হলো অত্রি, তবে এটাও ভাবলো বাচ্চাটি কী আকাশ থেকে পড়লো, নাকি লোকসমাজের ভয়——
হায়রে সমাজ আজও মেয়েরাই সমস্ত অবমাননার স্বীকার হতে বাধ্য হয়।
এদিকে নার্সিংহোম ছুটি দিলো মেয়েটির, এই দুটো দিনে একটু একটু করে ভাবও জমিয়ে ফেলেছিল অত্রি এই সময় মেয়েটির সাথে,
যদিও মেয়েটি বাংলা বোঝে না তাই হিন্দিতেই চলল কথাবার্তা দুজনের——
বাচ্চাটিকে বাড়ি আনার দিন ঠিক করে রিসেপশনে সমস্ত ফরমালিটিস্ পূরণ করার সময় একটুও ভাবলো না অত্রি।
পেরেন্টস্ এর জায়গায় তার আর মৌলিকের নামটা লিখে দিল, কারণ এই দু’দিনে দুজনেই ঠিক করে ফেলেছিল তারাই এডপ্ট করে নেবে বাচ্চাটিকে,
এডাপ্টসনের সব ফরমালিটিস্ পরে পূরণ করে নেবে ভাবলো মনে মনে অত্রি—
এখনও ঘোরের মধ্যেই আছে বাচ্চাটি; প্রয়োজনীয় কথা সেরে বেড়িয়ে এলো নার্সিং হোম থেকে অত্রি আর মৌলিক,
একটা স্বস্তি কী কাজ করছে অত্রির মনে?
মাতৃত্ব কী, আজ বোধহয় বুঝতে পেরেছে অত্রি—-
বাড়ি ফিরে স্টাডি রুমে চলে এলো অত্রি,
প্রয়োজনীয় সব কাজ সেরে নিল আগে, তারপর মেল চেক্ করতে বসলো অত্রি—-
অফিসে কয়েক দিনের ছুটি চেয়ে একটা মেল করে দেয়ার পর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল।
ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল অত্রি, দশ মিনিট একটু গড়িয়ে নেবার সময় আছে,
বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দিয়ে চোখটা বুজতেই সেদিন সকালের দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পেল অত্রি!!
মনে মনে ভাবতে লাগলো কোথা থেকে এলো মেয়েটি?এখনো কেউ খোঁজ করলো না কেন?
রিপোর্ট লেখানোর প্রয়োজন আছে মনে হয় কাছাকাছি পুলিশ স্টেশানে——
যদিও পুরো ব্যাপারটাই লালবাজারের আন্ডারে আছে তাই মিডিয়াও ব্যাপারটা জানতে পারেনি এখনও,
কিন্তু লোকাল থানায় জানানো দরকার পুরোটা,
তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো আর নিজেকে তৈরি করে যখন ঘর
থেকে বেরিয়ে এলো তখন কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটা—-
কাছের পুলিশ স্টেশানে যখন ঢুকলো অত্রি তখনও সেকেন্ড অফিসার বিপ্লব বাবু বসে আছেন থানায়।
সুরঙ্গমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন ভদ্রলোক, মুখে বললেন ম্যাম আপনি এখানে!!
আরে আপনি এখানে বিপ্লব বাবু, আপনার এখানে পোস্টিং হয়েছে? তাহলে তো অনেক সুবিধা হবে।
কী ব্যাপার ম্যাম? জিজ্ঞাসা বিপ্লববাবুর
সেদিন সকালের সমস্ত ঘটনা বলে রিপোর্ট করে সোজা নার্সিংহোম পৌছে গেল অত্রি—-
অত্রিকে দেখে মেয়েটি তার ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল, অত্রি দুহাত দিয়ে হাতটা ধরে চুমু দিল একটা,
কষ্ট হচ্ছে? জিজ্ঞাসা করলো অত্রি
মাথা নেড়ে না করলো মেয়েটি।
মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে জিজ্ঞাসা করল নাম কী তোমার?
আমার নাম তিথি বলল মেয়েটি অন্য একটা ভাষায়,
তবে হিন্দির মিশেল আছে,
বাহ্ সুন্দর নাম তিথি বলল অত্রি হিন্দিতে—-
ডাক্তারের সাথে কথা বলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নটা বাজলো।
তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো কারণ ভোরে অফিসের কাজে দিল্লি যাচ্ছে মৌলিক,
ওকেও লেকে পৌঁছাতে হবে কারণ বিপ্লব বাবুও আসবেন—-
তিনটের সময় উঠে সব গুছিয়ে দিল মৌলিককে অত্রি, মৌলিক বেড়িয়ে যাবার পর ফ্রেস্ হয়ে বেড়িয়ে পড়ল অত্রিও,
গাড়ি একটা ফাঁকা জায়গায় রেখে পার্কে ঢুকে গেল, আর জগিং এর স্টাইলে দৌরাতে থাকলো অত্রি যেখানে তিথিকে পেয়েছিল।
হঠাৎই দূর থেকে চোখে পড়লো কালো চাদর মুড়ি দিয়ে কেউ হামাগুড়ি দিচ্ছে, যেন কিছু খোঁজার চেষ্টা,
দৌঁড়ে এসে জাপটে ধরলো অত্রি মানুষটির হাতটা,
মানুষটিও এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে অত্রিকে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে দৌড় লাগলো,
অত্রি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েও ধরতে পারলো না
লোকটিকে।
কপূরের মতো উবে গেল নাকি!! যখন ভাবছিলো অত্রি, হঠাৎই ম্যাম ডাকে সম্বিত ফিরলে, ঘুরে তাকিয়ে দেখলো বিপ্লব বাবু দাঁড়িয়ে আছেন সামনে।
আপনি কতক্ষণ বিপ্লববাবু?জিজ্ঞাসা অত্রির
আপনার জামার সাথে ওটা কী ঝুলছে ম্যাডাম? বলল বিপ্লববাবু।
জামার দিকে তাকিয়ে অবাক হল অত্রি, রিসলেট!
এটা কোথা থেকে এলো ভাবতে গিয়ে মনে পড়লো ঝটকার সময় ঐ’লোকটির
হাত থেকে খুলে তার জামার বোতামে এসে আটকে গেছে হয়তো—–
জিনিসটাকে হাতে নিয়ে অবাক হলো অত্রি, বিপ্লববাবুর সাথে কথা বলতে বলতে পকেটে চালান করে দিল জিনিসটা অত্রি;
এরই মধ্যে যেতে যেতে দু’চার জন জিজ্ঞাসা করলেন কী ব্যাপার ম্যাম? আপনার লাগেনি তো—
কী যে চলছে আজকাল এখানে!!
প্রত্যেকেই হাত তুলে ইশারাতেই “কিছু না” বলে কাজ সেরেছে অত্রি—
তারপর কথা বলতে বলতে লেক থেকে বেড়িয়ে এসেছে দুজনে।
তারপর দুজনে যখন নার্সিংহোম পৌছালো তখন সবে সাতটা বাজে,
নিচে অত্রির আইডি দেখাতেই বিরাট স্যালুট দিয়ে খুলে দিল দরজা—–
ম্যাম এযে খুব ছোট্ট, পরির মতো, মানুষ কী করে পারে জানি না–
আমারও জানা নেই বলল অত্রি, ততক্ষণে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে নিয়েছে দুজনেই।
এখনও ঘোর কাটেনি তিথির; একটা কষ্ট বুকে মোচার দিতে থাকলো অত্রির–
মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবলো, এটাই কী সন্তানের জন্য মায়ের মমত্ববোধ আর ভালোবাসা?
বাড়ি ফিরে রিসলেটটা বার করে আতসকাচ দিয়ে দেখতে থাকলো অত্রি,
অনেকখন দেখার পরে দেখতে পেল দোকানের সংক্ষিপ্ত নাম আর( 916) এর স্ট্যাম্পটা—-
একটা হালকা হাসি খেলে গেল অত্রির চোখে মুখে,
সুরমাকে এক কাপ কালো কফি দিতে বলে স্নানে ঢুকে গেল অত্রি।
তৈরি হয়ে যখন বেড়িয়ে এলো, টেবিলে খাবার রেডি করে দাড়িয়ে আছে সুরমা,
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি টোস্টে কামর বসালো অত্রি;
তাই দেখে, দিদি গলায় বাঁধবে যে আস্তে আস্তে খাও, বলল সুরমা
হাতে বেশি সময় নেইরে, বলতে বলতে খাওয়া শেষ করে নিজের পিস্তলটা একবার দেখে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো গাড়ি নিয়ে।
শহরের নাম করা জুয়েলারি শপ, ভেতরে ঢুকেই কার্ডটা দেখালো অত্রি আর সাথে সাথেই মালিক বেড়িয়ে এলেন ভেতর থেকে,
হাত কচলাতে কচলাতে বললেন ম্যাম কোনও অসুবিধা হয়েছে কী?
অত্রি পকেট থেকে রিসলেটটা বার করে কাউন্টারে ফেলল,
মালিক ভদ্রলোক হাতে নিয়ে একজনকে দেখতে বললেন——
চা কফি নেবেন ম্যাম?
হাত তুলে না বলল অত্রি, মুখে বলল একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়,
ততক্ষণে কাউন্টারের ছেলেটি যে বিলকপি নিয়ে ফিরলো তা দেখে অত্রির মাথা খারাপ হয়ে গেল—–
রিসলেটটা নিয়ে সোজা অফিসে এলো ততক্ষণে কমিশনারের ফোন চলে এসেছে অত্রির কাছে।
ফোন ধরে অত্রি উল্টো দিকে বলা কথাগুলো শুনে অবাক হলো,
শুধু বলতে পারলো এটা যদি আপনার মেয়ের সাথে হতো স্যার, তাহলেও এটাই করতেন?
তুমি কী চাকরির চিন্তা করছো না অত্রি? বললেন কমিশনার আদিত্য চৌধুরী—–
তাই বলে আপস করবো অন্যায়ের সাথে? এটাতো শিখিনি স্যার,
ট্রেনিং শেষে তাহলে কী প্রতিজ্ঞা করলাম স্যার?
কমিশনারকে আর কোনও কথা বলতে না দিয়ে ফোন রেখে দিল অত্রি—-
মনে মনে বলল এদের হাত কত লম্বা, অত্রির অফিস পৌঁছানোর আগেই উপর মহলে পৌছে গেছে খবর।
সর্ষের মধ্যেই ভুত-
হয়তো কালই ট্রান্সফার অর্ডার হাতে চলে আসবে অত্রির,
না এতবড় অপমান অত্রি সহ্য করতে পারবে না—-
এবার মেয়েকে মানুষ করার দিকেই মন দেবে সে,
হাত বাড়িয়ে প্যাডটা নিল আর লিখে ফেলল চাকরি ছাড়ার ছাড়পত্র।
যখন সব কাগজ জমা দিয়ে কমিশনারের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো অত্রি,
তখন তার ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি, নিজেকে একজন খুব ভালো মানুষ হবার প্রতিজ্ঞা করলো মনে মনে—-
এবার শুধু তারা তিনজন সে মৌলিক আর তাদের সন্তান।।