সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩২)

তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন 

৪৫
রতন বলল,পিসেমশাই রাগ করবেন না। কিছু নকল তান্ত্রিক মানুষকে ঠকায়।পিসেমশাই বললেন, তাদের তান্ত্রিক বলিস না। প্রকৃত তন্ত্রসাধককে চিনতেই পারবি না শালা। লোক ঠকানো তো দূরের কথা, ধরা দেয় না তারা। আজীবন অধরা থেকে যায়।আমি জানি কথাটা ঠিক। পিসেমশাইকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না উনি এতবড় একজন তান্ত্রি। যিনি অদৃশ্য হতে পারেন যখন তখন। ভাবা যায়। আমরা হলে তো ঢাক পিটিয়ে বেড়াতাম। উনি আমাদের সকলকে নিষেধ করেন গোপন কথা বলতে। এটা হল গুহ্যশাস্ত্র। তার্কিক যারা এসবের ধারেকাছে আসতে পারবে না কোনদিন তারা।রতন বলল, মাফ করবেন পিসেমশাই। অপরাধ নেবেন না। আমরা যদি চেষ্টা করি পারব না তন্ত্রপথে যেতে। পিসেমশাই বললেন, অনেকে যৌন সংসর্গ ও ভোগের মাধ্যমে সফল হতে চান। তবে আগে ভোগ। ভোগ করার শেষে দেখবি একটা সময় আসবে তোর সবকিছুই আসক্তি কেটে যাবে। অসীম শক্তির একটা তেজ তোর অন্তরে ছেয়ে যাবে মাখনকাটা ছুরির মত। তোদের বয়স কম। এখন ভোগের সময়। ভোগশেষে ত্যাগ।রতন বলল,তাহলে আপনি সবকিছু ভোগ করেছেন?পিসেমশাই বললেন, সেটা সময় হলে বলে দেব। এখন এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। পিসেমশাই বললেন তাহলে নকল সাধক হয়ে যাবি। শোন এক নকল লোভি দাড়িওয়ালা সাধুর কথা বলি। নকল যারা তারা  লোক ঠকায়। তারা বলে মায়ের কাছে মানসিক করো। জোড়া পাঁঠা দাও, জোড়া ঢাক দাও, ষোলটা কাপড় আর দুমণ আতপ দাও। বিধবা মহিলা বলেন, বাবা আমি খুব গরীব। একটাই ছেলে, হাসপাতালে পড়ে আছে। মা কে বলে রোগ ভালো করে দাও।নকল লোক লাল  চেলি পড়ে বলে, মা রাগ করবেন। পারব না বলতে নেই। যেমন করে হোক দিতেই হবে। তারপর তার সাথে জবরদস্তি সব কেড়ে নেয়। লজ্জার কথা।কিন্তু প্রকৃত তান্ত্রিককে বোঝা যায় না। মানুষের মাঝে মিশে থাকেন তারা। তারা লাল  তিলক কেটে মানুষকে ভড়কে দেবার জন্য থাকেন না। প্রয়োজনে তারা দেহরূপ পাল্টাতে পারেন, শূণ্যে ভাসতে পারেন, আবার গঙ্গার জলে ভাসতে পারেন দিনের পর দিন। বেদের শুরু হল আগম শেষটা হল নিগম। পিসেমশাই বলেন তন্ত্রশাস্ত্রকে উত্তর-বৈদিক যুগের রচনা বলে মনে করা হয়, যার বিকাশলাভ প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগের কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল।রতন বলে  সাহিত্যরূপে যেভাবে গ্রন্থকে মধ্যযুগীয় দার্শনিক-ধার্মিক রচনা হিসাবে মান্য করা হয়ে থাকে, সেভাবেই তন্ত্রশাস্ত্রে প্রাচীন আখ্যান, কাহিনি ইত্যাদির সমাবেশ রয়েছে।
৪৬
পিসেমশাই বলেন ধর্ম দৃষ্টিতে একে প্রাচীন বিজ্ঞান ইত্যাদির বলা যেতে পারে। ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা তাঁদের ঔপনিবেশিকতাবাদী উদ্দেশ্যসাধনে তন্ত্রকে ‘গুহ্য  ‘সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ’ আখ্যা দিয়ে দিগভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। বস্তুত তন্ত্রগ্রন্থের সংখ্যা সহস্রাধিক, কিন্তু প্রধান-প্রধান তন্ত্র ৬৪টি বলা হয়ে থাকে। তন্ত্রের প্রভাব যে বিশ্বস্তরীয়, তার প্রমাণ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, তিব্বতি ইত্যাদি ধর্মের তন্ত্র-সাধনার গ্রন্থসমূহ।  প্রাচীনকাল থেকেই তন্ত্রের মুখ্যপীঠ ছিল বাংলা, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ। এখন তার ব্যাপকতা কমেছে। তবে এ ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই। পিসেমশাই বললেন, তন্ত্রসাধক বামাক্ষ্যাপা চুয়াত্তর বছর বয়সে গঙ্গায় চান সেরে এসে মা তারার আরতি করেন। তারপর সকলকে প্রসাদ খাইয়ে নিজে খেলেন। জয় তারা ধ্বনি দিতে দিতে শরীরের নয় দ্বার রুদ্ধ করে দশম দ্বার দিয়ে আত্মা বাহির করেন। ব্রম্ভতালু ফেটে তার আত্মা দেবলোকে যাত্রা করে। শ্মশানে মায়ের মন্দিরের পাশে আজন্ম সংযমী পুরুষ এক কুটীরে বাস করতেন। নিমেষে কঠিন রোগ ভালো করতেন মানুষের। এ তো বাবা গল্প নয়, একদম সত্যকথা।
রতন আর আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম, জয় বামাক্ষ্যাপা মহাসাধকের জয়। পিসেমশাই বললেন, জয় মা তারা।

সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।