সম্পাদকীয়

টেক আ চান্স
বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলছে, বাবার সাথে দেখতে বসেছি ভারত বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচ। ভারতের একের পর এক উইকেট পড়ছে, বাবা অধৈর্য্য হয়ে বললো এদের এরকম কেন অবস্থা? আমি বললাম এটা হওয়ারই ছিল। আমি এটাই আশঙ্কা করছিলাম। এটাকে ল’ অব অ্যাভারেজ বলে। বাবা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে বললাম, “ল’ অব অ্যাভারেজ বা গড় আইনে বলা হয় যে যখন কোন একটি ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে, তখন অব্যবহিত পরেই সেই ঘটনাটির বিপরীত ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ কোন একটি ক্রিকেট দল যখন একের পর এক ভালো পারফরমেন্স করে চলেছে তখন হঠাৎ করেই একটা ভয়াবহ খারাপ পারফরম্যান্সের সম্ভাবনা থেকে যায়। পৃথিবীর সেরা ব্যাটিং গড় রাখা ডন ব্র্যাডম্যানও এর বাইরে ছিলেন না। তাই যদি হতো, তাহলে তিনি তাঁর শেষ ইনিংসে শূন্য রানে আউট হতেন না, এবং গড়টিকে সেঞ্চুরিতে রাখতে পারতেন অনায়াসেই। পৃথিবীর প্রতিটি ক্রিকেটার এই ল’ অব অ্যাভারেজের কবলে পড়ে।” কিন্তু ততক্ষণে রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল ও সূর্য কুমার যাদব পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ায় তখনকার মতো কথা চাপা পড়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে যখন বুমরাহ ও শামি তাঁদের আগুনে বোলিং এ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ানদের উইকেট ছিন্নভিন্ন করছে, তখন আবার কথাটা উত্থাপন করলো বাবা, “তুই যে বলেছিলি ল’ অব অ্যাভারেজ, কই বোলাররা তো সেই নিয়মে খারাপ খেলছে না? ওরা তো আগেও ভালো বোলিং করেছে, এই ম্যাচেও করছে। ওহ, ব্যাটসম্যানদের বাঁচানোর জন্য এসব নিয়ম তৈরি করলে তো হবে না। ওরা টাকা পায় ওদের পারফর্ম করা উচিত। কই শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বা অন্য পেশায় জড়িতরা তো বলে না যে আজ আমার কাজ খারাপ হবে কারণ আমি বেশ কয়েকদিন ধরে ভালো কাজ করছি, ল’ অব অ্যাভারেজে তা মেনে নিতেই হবে…” আমি তখন একটা পুরনো কথা টেনে আনলাম। মনে আছে একবার যখন সৌরভ গাঙ্গুলী প্রথম প্রথম জি বাংলায় দাদাগিরি করছিলেন তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় যে কোনটি বেশি কঠিন? শ্যুটিং না ব্যাটিং? উত্তরে সৌরভ বলেছিলেন যে শ্যুটিংএ ভুল হলে রিটেক করা যায়… কিন্তু ব্যাটিং ওয়ান টেক চান্স। সত্যিই তাই, একজন ব্যাটসম্যানের কিন্তু কোন রিটেক এর সুবিধা নেই। তবে একজন বোলারের কিন্তু রয়েছে। যেখানে একজন ব্যাটসম্যানের আউট হতে একটি বলই যথেষ্ট, সেখানে টি টোয়েন্টি ও একদিনের ম্যাচে যথাক্রমে একজন বোলারের হাতে থাকে ২৪ টি ও ৬০ টি বল। আর টেস্টে তো আরও অনেক বেশি চান্স। একদিনের ম্যাচে এমনটা হতেই পারে যে একজন বোলার প্রথম আট ওভারে পুরোপুরি ব্যর্থ, প্রচুর রান বিলিয়ে দিলেন, কিন্তু শেষ দুই স্পেলে চারটি উইকেট নিয়ে সকলকে স্পেলবাউন্ড করে দিলেন। তেমনই অন্য পেশায় নিযুক্ত মানুষদেরও একটা ভুলকে রেক্টিফাই করার সুযোগ আছে। কিন্তু ব্যাটসম্যান আর সীমান্তে যুদ্ধরত দেশরক্ষীর হাতে একটাই সুযোগ… তাই তাদের আগলে রাখতে হয় বিশেষ ভাবে। ফুটবল খেলায় একইভাবে ব্যাটসম্যানদের পরিস্থিতিতে থাকে গোলকিপার। একটা ভুল তাকে ভিলেন বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু স্ট্রাইকার চারটি সুযোগ মিস করে পঞ্চম সুযোগে গোল করে দিতে পারলেই সে হিরো… তাই আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের উচিত একটি সুযোগকেই কাজে লাগানো, কে বলতে পারে আমরা হয়তো বোলার এর ভাগ্য নিয়ে জন্মাইনি, হয়তো আমাদের ব্যাটসম্যানের ভাগ্য… তাই “টেক আ চান্স…”
সায়ন্তন ধর