T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সাধন চন্দ্র সৎপথী

অচিন পথের যাত্রী

শেষ আশ্বিনের ভোরবেলা।

মা দুর্গা সপরিবারে কয়েকদিনের জন্য এসে আবার ফিরে গেছেন কৈলাসে।

আবছা অন্ধকারে আলপথ ধরে শান্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলেছে দুটি ছায়ামূর্তি। ডাইনে বাঁয়ে বাঁক নিতে নিতে এগিয়ে চলেছে।

এবার পুব আকাশটা ফিকে লাল রঙ গায়ে মাখতে শুরু করেছে।

ছায়ামূর্তি দুটিকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যেই হবে হয়তো। দুজনেরই পরণে সাধারণ প্যান্ট-শার্ট।

পিঠে ঝোলানো ব্যাগ।

একজন বলে উঠল-” সুজন,একটু জোরে পা চালা, ছ’টা চল্লিশের ট্রেনটা ধরতেই হবে।তারপর খড়্গপুর গিয়ে আবার ট্রেন বদল করতে হবে।”

সুজন বলল-“এত তাড়ার কিছু নেই রে ,জয়দেব-এখনও অনেক সময় আছে, ট্রেনটা ঠিক পেয়ে যাব।”

জয়দেব বলল -” এখনও অনেকটা পথ বাকি। তাড়াতাড়ি হাঁট ভাই।”

জয়দেব হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সুজন একই গতিতে হাঁটছে। প্রতি পদক্ষেপে যেন ক্লান্তি ঝরে পড়ছে।

পুব আকাশটা যত বেশি লাল হচ্ছে পাখির ঝাঁকের সংখ্যা ততই বেড়ে চলেছে।

একটু দূরেই ইলেকট্রিক খুঁটিগুলি সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু এইভাবে হাঁটলে পৌছাতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে। অর্থাৎ পথটা নির্দিষ্ট হলেও সময় অনির্দিষ্ট।

সময় কখন ,কাকে ,কোথায় পৌঁছে দেয় আগে থেকে বোঝা যায় না।

এই তো মাত্র ক’দিন আগে ফোন করে সন্তুকে বলেছিল-“তোর ওখানে গেলে কোনো কাজ পাওয়া যাবে, রে ?”

সন্তু প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি,বিস্ময় ঝরে পড়েছিল ওর কথায়-” তোরা এখানে আসবি কাজ করতে ! ইয়ার্কি মারছিস না তো ! ”

সুজন একটু ভারী গলায় বলেছিল -“না রে, ইয়ার্কি করছি না। কোনো কাজ পেলে আমি আর জয়দেব চলে যাব।”

জয়দেব অনুরোধের সুরে বলেছিল- “দে ,না রে কাজ জোগাড় করে।তুই তো অনেক বছর বাইরে আছিস- পারবি না আমাদের জন্য কাজ জোগাড় করে দিতে?”

সন্তু বলেছিল-” আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না,তোরা কাজ করতে এখানে আসবি !”

খানিকটা তর্কের সুরেই সুজন বলেছিল-” তুই যেতে পেরেছিস আমরা পারব না কেন?আমরাও পারব।”

সন্তু বলেছিল-“আমি এসেছি অনেক দুঃখে ,মানে আসতে বাধ্য হয়েছি।একটু বড়ো হওয়ার পরই দেখেছি সংসারে খুব অভাব।কোনো রকমে মাধ্যমিক পাস করি। তারপর আর পড়া হল না। কী কাজ করব খুঁজে পাইনি। কাজের খোঁজে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতাম- চায়ের দোকান, কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে নানান জায়গায় কাজ করেছি। তারপর এক পরিচিত জনের সঙ্গে এখানে চলে আসি। এখন মোটামুটি ভালো একটা কাজ পেয়েছি।”

সন্তু থামতেই জয়দেব বলেছিল-“আমাদের জন্য যা হোক কাজ জোগাড় করে দে।”

সন্তু তবু বলেছিল-” আমার জমি জায়গা নেই বলেই চলে আসতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু তোদের তো জমির অভাব নেই!”

সুজন বলেছিল-” জমি থাকা আর না থাকা সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। চাষ থেকে আর লাভ হচ্ছে না।”

জয়দেব বলেছিল-” একটার পর একটা চাষে কেবলই ক্ষতি হচ্ছে রে,চাষের খরচ বেড়েছে অনেক গুণ কিন্তু ফসলের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। তাই চাষ করে সংসার চলছে না।”

সন্তু বলেছিল-“কাজের জোগাড় হয়তো হয়ে যাবে, তবে প্রথমে তো বেশি বেতনের কাজ পাবি না। এই ধর্ মাসে দশ-বারো হাজার টাকা হতে পারে। ওই টাকার মধ্যেই খাওয়া খরচ সব।”

জয়দেব উৎসাহিত হয়ে বলেছিল-” ওতেই হবে।সব খরচ বাদে কয়েক হাজার টাকা তো হাতে থাকবে।”

সন্তু তবু বলেছিল-” কিন্তু তোরা একটু ভেবে দেখ। এখানে ভাষা, খাবার সব -কিছুরই সমস্যা হবে। মানিয়ে নিতে পারবি কী?”

সুজন গলায় জোর দিয়ে বলেছিল-” হ্যাঁ, হ্যাঁ পারব। পারতেই হবে। তাছাড়া তুই তো আছিস।”

সন্তুর কথা ভেসে এসেছিল-” সে তো আছি। তবু আর একবার ভেবে দেখ- কারণ, ঘরের টান বড়ো সাংঘাতিক! সেই টান কাটানো সহজ নয়। বরং ওখানে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা-”

বাধা দিয়ে সুজন বলেছিল-” যদি তুই কাজ জোগাড় করে দিতে পারিস ভালো, না হলে অন্য কোথাও চলে যেতেই হবে।” সুজনের কথা শুনে সন্তুর হয়তোঅভিমান হয়েছিল, নির্লিপ্ত কন্ঠে বলেছিল-” দু তিন দিন পরে আমাকে ফোন করবি। দেখি কি করতে পারি।”

বলেই লাইনটা কেটে দিয়েছিল।

সদ্য অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে রেললাইনের কাছে এসে পৌঁছে গেছে সুজন বুঝতে পারেনি। কাছেই রেললাইনের ক্রসিংটা।

জয়দেবের কথা কানে এল -“গেট পড়ে গেছে রে, মানে ট্রেনটা আসছে। হাঁটতে হাঁটতে দেরি করে দিলি এটাকে আর ধরা গেল না। এরপর চল্লিশ মিনিট বসে থাকতে হবে স্টেশনে।”

সুজন উদাস চোখে দেখল রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ এবং বিভিন্ন রকমের যানবাহনের ভিড় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

জয়দেব তখনও বিড়বিড় করে বলেই চলেছে-” তোর যে কি ইচ্ছা বুঝতে পারছি না ,যেতে যদি মন নেই তাহলে তো ঘর থেকে বেরিয়ে এলি কেন? ইচ্ছে করে ট্রেনটা ফেল করার কি যে মানে হয়?”

সুজন দেখলো সিগন্যালের লাল আলোগুলো নিভে গেল- দুপাশের পাইপ দুটো ধীরে ধীরে আকাশে উঠে গেল। আটকে থাকা মানুষ যানবাহনগুলি হঠাৎ সচল হয়ে উঠল।

সুজন ধীরপায়ে রেললাইন পেরিয়ে গেল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল জয়দেব পাশে পাশে হাঁটছে- মুখখানা বেশ গম্ভীর। ট্রেনটা ধরতে পারল না বলে নিশ্চয়ই মনে মনে রেগে গেছে।

রাস্তার গায়ে একটা চা দোকানের বাঁশের বেঞ্চে বসে বসলো সুজন। আরও কয়েকজন লোক বসে আছে অন্য বেঞ্চে। গ্যাসের ওভেনে চা সবেমাত্র ফুটতে শুরু করেছে। অনেকক্ষণ হেঁটে আসায় নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল সুজনের। বেঞ্চে বসে এবার একটু আরাম বোধ করল। জয়দেব পাশে বসে পড়ল। চা দিতে বলল দোকানদারকে।

চায়ের কাপ হাতে ধরে সুজনে মনে পড়ে গেল- বেরিয়ে আসার আগে এইরকম ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল তন্বি।তন্বির করা চায়ের কী স্বাদ!আবার কবে তন্নীর হাতের চা পাওয়া যাবে কে জানে? চোখের সামনে ভেসে উঠল তন্বির জলে ভেজা চোখ দুটো।

ঘুম থেকে উঠে তন্বী তাকিয়েই ছিল তাঁর মুখের দিকে। জানতে চেয়েছিল -“এমন ভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী দেখছ?”

তন্বি উত্তর দিয়েছিল-” আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না- তুমি ঘর-সংসার ,চাষ-বাস ছেড়ে বাইরে কাজ করতে যাচ্ছো!”

সুজন নিজেও এখনও ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছে না- যা ঘটছে তা কী সত্যি? সে কী সত্যি সত্যিই কাজ করতে ভিন রাজ্যে যাচ্ছে, নাকি ঘুমের মধ্যে খারাপ স্বপ্ন দেখছে?

সুজনের মা-বাবাও ভাবতে পারেননি এমন দিন আসবে! চাষের আয়ে সংসার চলবে না, একমাত্র ছেলেকে বাইরে যেতে হবে কাজের সন্ধানে! জমিজমা খুব বেশী না হলেও একেবারে কম তো নয়!

মাধ্যমিক পাস করার পর সুজন আর পড়েনি। ছেলেবেলা থেকে বাবার সঙ্গে মাঠে যেতো, গরু বাছুরের পরিচর্যা করতো- চাষের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল তখন থেকেই। বাবার কাছেই হাতে কলমে শিখেছিল চাষের কাজ। বাবার সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতে করতে একসময় পুরোপুরি চাষী হয়ে উঠেছিল। চাষ আর চাষ নিয়ে মেতে থাকতো। ধান, আলু, সবজি চাষ নিয়ে ব্যস্ততার শেষ ছিল না। একসময় বাবাকে সহকারিতে পরিণত করে নিজেই প্রধান চাষী হয়ে উঠেছিল। তখন কতই বা বয়স হবে সুজনের বড়োজোর বাইশ বা তেইশ বছর।

সুজনের বিয়ের কথা উঠতে শুরু করেছিল। কথা প্রসঙ্গে সুজন লাজুক মুখে মাকে জানিয়েছিল- ‘আগে বোনের বিয়েটা হয়ে যাক।তারপর..”

সুজনের বিয়ের প্রায় এক বছর পরে জয়দেবের বিয়ে হল। দুই বন্ধুর গল্প যেন আর শেষ হতে চাইতো না। হাসি ঠাট্টা করতে করতে কখন যে সময় পেরিয়ে যেতো বুঝতেই পারত না।

আর আজ! সুজন দেখল- কাপটা হাতে ধরে রেখেই জয়দেব উদাস ভাবে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে নিল, বলল-“সুজন, চল।”

বলেই হনহন করে হাঁটতে লাগল।

সুজন এতক্ষণ যেন ভুলেই গিয়েছিল কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে?

 

সন্তুর কথা মতো তিন দিন পরে ফোন করেছিল জয়দেব। প্রথমবারটা রিং হতে হতে কেটে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বারে সন্তু ফোনটা ধরেছিল। বলেছিল-” ব্যবস্থা করেছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে তোরা চলে আয়।”

তারপর সবিস্তারে বলে দিয়েছিল- কীভাবে যেতে হবে। কথায় কথায় ঠিক হয়েছিল যাবার তারিখ।

আজ সেই তারিখ।

প্ল্যাটফর্মে নেমে গেল। প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে তখন সাতটা দশ।

একেবারেই ভিড় নেই। একজন হকার মৃদু কন্ঠে “চা গরম” বলে থেমে গেল।

সুজনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ছেলে মেয়ের মুখ বার বার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে -কাজ নেই গিয়ে,খেতে পাই আর না পাই ঘর ছেড়ে যাবো না। কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই যে! এবার তেমন বৃষ্টি হয়নি, তাই বেশির ভাগ জমিতে চাষ হয়নি।সারা বছর সংসার চালানোর মতো ধান হবে না। বৃষ্টির খামখেয়ালীপনার জন্য সবজি চাষ মার খেলো।তাহলে সংসার চলবে কেমন করে?

সুজনের ভাবনা থেমে গেল। মাইকে ট্রেন আসার খবর ঘোষিত হল। জয়দেব উঠে দাঁড়াল, ঘোর লাগা মানুষের মতো ব্যাগটাকে পিঠে ঝুলিয়ে নিল।

মিনিট কয়েক পরেই তীব্র শব্দে বাঁশি বাজাতে বাজাতে সাতটা কুড়ির ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

সুজন উঠে দাঁড়াল।

পুব আকাশে গাছগাছালির আড়ালে সূর্য হাসি হাসি মুখে উঠে এল। ইলেকট্রিক লাইনের তারে পাখির দল লাইন দিয়ে বসে আছে।

হঠাৎ কানে এল জয়দেবের ব্যস্ত কন্ঠের ডাক-” সুজন, এই সুজন…”

কামরার দরজার হাতল ধরে জয়দেব ডাকছে! সুজন এগিয়ে গেল। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।

সুজনের দীর্ঘনিঃশ্বাসকে চাপা দিতেই যেন ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠল। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা ছুটতে শুরু করল। স্টেশন, বাজার,ঘর- বাড়ি, মাঠ, গাছ-গাছালি পিছনে পড়ে রইল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।