T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সাধন চন্দ্র সৎপথী

আমার উমা
-দিদি,আজ আমি কোন শাড়িটা পরবো বলুন না।
– ওই যে লাল পাড়, ঘিয়ে জমিনের শাড়িটা..
– কিন্তু ..
– কিন্তু কী?
– ম্যাচিং ব্লাউজ নেই যে।
– তোমাকে যে বলেছিলাম কিনতে
– বলেছিলেন , কিন্তু..
– আবার কিন্তু! সমস্যাটা কী?
– মাকে বলেছিলাম । কিন্তু মা বললো -‘ তোর বাবার হাতে এখন টাকা নেই।প্রত্যেকটা চাষে লস হচ্ছে।’
– ঠিক আছে। তুমি সময় মতো চলে এসো
সাজার সব ব্যবস্থা আমি করবো।
-থ্যাঙ্ক ইউ, দিদি। দিদি ,আপনি খুব ভালো।
-ভালো না হয়ে উপায় কি বলো! এই অনুষ্ঠানে তুমিই আমার উমা যে। আমার উমাকে তো আমাকেই সাজাতে হবে।
– দিদি,ওই সাজেই কি দুর্গা হবে?
-বললাম তো তোমাকে অতশত ভাবতে হবে না। শুধু মনে রাখবে – সপ্তমীর সন্ধ্যায় আমাদের অনুষ্ঠান।সময় মতো চলে আসবে।
– আচ্ছা দিদি।
২
-তোমরা সকলে এসে পৌঁছেছো দেখছি। কিন্তু টিমের উমা কোথায়? উমা দেরি করছে কেন ? এদিকে যে ছ’টা বেজে গেলো।আসবেই কখন আর সাজবেই কখন?
– দিদি,সকালে ফোন করেছিলাম- ওর মা ধরেছিলেন।বললেন – উমা ওর বাবার সঙ্গে বাজার গেছে।আমি বললাম- ফিরলে ফোন করতে বললবেন।
– করেছিল ফোন।
– ওর মা বলেছিলেন – ফোনে ফোন করার মতো টাকা নেই।ভাবতে হবে না চলে যাবে সময় মতো।
– ভাবতে হবে না বললেই কী না ভেবে থাকা যায়? উমার কত সাজ – সময় মতো না এলে নৃত্যানুষ্ঠান সময়ে শুরু করা যাবে না।কী যে করি…
– দিদি,দিদি- ওই তো আসছে আমাদের উমা।
-আসছে! বাঁচা গেল।এসো এসো সাজঘরে চলে এসো সবাই।
৩
-দেখো দেখো, কী সুন্দর লাগছে উমাকে! যেন সত্যিই উমা নেমে এসেছে স্টেজে। একরাশ কালো চুলে ঘেরা মুখটা কী মিষ্টি লাগছে!কাশের গুচ্ছ হাতে নিয়ে কী তন্ময় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে!
-দিদি, মিউজিক দিতে বলুন।
-মিউজিক! ও হ্যাঁ,হ্যাঁ এই যে দিচ্ছি। তোমরা রেডি তো?
– হ্যাঁ,দিদি এই নাচটার সবাই রেডি।
– বেশ তাহলে শুরু করো।
৪
-শুনছো সকলে কী বলছে-উমার নাচে একেবারে মুগ্ধ!
-কিন্তু দিদি,উমা যেন আজ একটু বেশি ঘামছে! ওই দেখুন না মুখটাতে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম জমছে।
– এত পরিশ্রম করছে- ঘামবে না?বেশ গরমও তো আছে। স্টেজে দুটো স্ট্যান্ড ফ্যান থাকলে ভালো হতো।
– রিহার্সেলের সময় তো এত ঘামতো না! একটানা নেচেও কোনোদিন ওকে ক্লান্ত হতে দেখিনি।তাহলে কি আজ শরীর ঠিক নেই।
– না না, শরীর ঠিক আছে।অনেকক্ষণধরে নাচছে তো। প্রায় পুরোটা সময়ই স্টেজে আছে। মেয়েটার বেশ পরিশ্রম হচ্ছে।
-অনুষ্ঠানটা কিন্তু বেশ জমেছে, দিদি।
– আর একটা নাচ বাকি। হয়ে গেলে সাজটাজ মুছে চলো ,আজ সবাই মিলে একসঙ্গে খাবো।
– বেশ হবে দিদি।
– বলছি যে ,উমার মা এসেছেন তো?
– এসেছেন।ওই যে ওখানে।
– হ্যাঁ,ওই তো ওর মা মুগ্ধ বিস্ময়ে মেয়ের নাচ দেখছেন।
– দিদি,দিদি-ওদিকে দেখুন স্টেজে, উমা ওভাবে কাঁপছে কেন? মনে হচ্ছে যেন পড়ে যাবে! ওই তো- ওই-
– কী সর্বনাশ উমা যে পড়ে গলো! উমা …উমা-! বন্ধ করো ,মিউজিক বন্ধ করো
৫
-দিদি,দিদি,ডাক্তারবাবু কী বললেন? জ্ঞান ফিরেছে উমার?
– হ্যাঁ,জ্ঞান ফিরেছে।ডাক্তারবাবু বললেন..
– দিদি,আমরা উমার কাছে যাবো একবার? ওকে দেখতে আমাদের খুব মন কেমন করছে।
– ডাক্তারবাবু বললেন-জ্ঞান ফিরলেও ও এখন বেশ দুর্বল; বেশি কথা বললে পরিশ্রমে হয়তো আবার..
– আমরা বেশি কথা বলবো না।শুধু বলবো যে- সবাই ওর নাচের খুব প্রশংসা করেছে। দিদি, যাবো একবার?
– ডাক্তারবাবু যখন নিষেধ করছেন তখন..
-দিদি, আমাদের খুব মন খারাপ।
-মন খারাপ করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। দু’চারদিন বিশ্রাম নিলেই সেরে যাবে। ও আমার খুব পরিশ্রমী মেয়ে তো – সহজে হার মানতে জানে না। আচ্ছা ওর মা কোথায় বলোতো?
– ওই তো ওখানে, একা একা দাঁড়িয়ে আছেন- কাঁদছেন।
– আপনি কাঁদছেন? না, না -কাঁদবেন না।আর ওখানে একা দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে আসুন। ভাববেন না- আমরা সকলেই তো আছি- ডাক্তারবাবু আছেন..
-কাকিমা আমাদের কাছে আসুন।এই বেঞ্চে বসুন।হ্যাঁ,বসুন।আর কাঁদবেন না।আপনি কাঁদলে আমরাও কিন্তু গোল করে কেঁদে ফেলবো।
– মেয়েরা, তোমাদের বাড়ির লোকজন কি এসেছেন?
-হ্যাঁ,দিদি।
– তাহলে তোমরা বাড়ি চলে যাও- বেশ রাত হয়ে গেছে।
– দিদি ,আমরাও আজ এখানে থাকবো- উমা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি যাবো না।
– অবুঝ হোয়ো না,এটা হসপিটাল – এতজন থাকা চলবে না।আমি তো আছি,উমার মা আছেন- ওর বাবাও চলে আসবেন।আচ্ছা,উমার বাবা কোথায়?
– দিদি,কাকিমা বলছেন পাঁচ-সাতদিন ধরে উমার অল্প অল্প জ্বর আসছিল।তাই আজ সকালে রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়েছিল। সেই রিপোর্টটা আনতেই গেছেন কাকু।
– কই,উমা তো আমাকে কিছু বলেনি।
– আপনি চিন্তা করবেন বলে বলেনি।
– ওমা,সেকি কথা!
– ওই তো কাকু আসছেন। রিপোর্ট পেয়েছেন?
– আমাকে দিন- ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে আনি। মেয়েরা,তোমরা আর দেরি করো না বাড়ি চলে যাও।
৬
-না,না- আপনারা এত ভাববেন না।ডাক্তারবাবু বলেছেন এই রিপোর্টটা পজেটিভ হলেও উনারা আর একবার ডেঙ্গু টেস্ট করবেন। তারপর রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা করবেন।আর প্রাথমিক চিকিৎসা তো শুরু করেই দিয়েছেন।না,না মন খারাপ করবেন না, আমি তো আছিই আপনাদের সঙ্গে।
৭
(এক সপ্তাহ পর)
-না,না ,আপনাদের কোনো কথাই শুনবো না। সুস্থ হয়ে গেলেও উমার এখন বিশ্রাম,শুশ্রুষা প্রয়োজন। তাই ওকে আমার বাড়ি নিয়ে যাবো। না,না- কোনো অসুবিধা হবে না। ও শুধু আপনাদেরই মেয়ে নয় আমারও মেয়ে । কেন বুঝছেন না – ওকে কাছে না রাখলে আমি শান্তি পাবো না। আমি চিন্তা করবো বলে যে মেয়ে শরীর খারাপের কথা বলেনি, তাকে ছেড়ে কি আমি থাকতে পারি? ও শুধু আপনাদের নয়,আমার উমা যে।