সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ১৯)

ক্ষণিক বসন্ত
দরবার
মুম্বইয়ের এনকাউন্টারে মুলতানভাই চলে যাবার পর দরবারের সামনে আর নতুন করে কোনও তেমন পথের কাঁটা রইল না। এতোদিন সে দূর থেকে ভাইকে রাজ করতে দেখত। একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গুলি চালিয়েছে কতো। তবু ভিতর ভিতর দরবার জানত একদিন এমনটা ঘটবেই। তার ভিতর একজন নয়। দুইজন মানুষ আছে। দ্বিতীয় জন প্রথম জনের মতো সহনশীল নয়। সে বাদশা হতে চায়। নিমতা থেকে রাণাঘাট জুড়ে ছড়ানো সাট্টাদের বেতাজ বাদশা। দ্বিতীয়জন তার মনের ভিতর থেকে কথা বলে উঠেছিল সেইদিন। তাই দুর্গারেশমি উন্নিথানকে মুলতানভাইয়ের চলনচালনের খবর সে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু তখ্ত পাবার পর দরবার বুঝল তার মনের ভিতরে বাসা করে থাকা দ্বিতীয় ব্যক্তিটিকে বেশি তোল্লাই দিলে সে তার সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়বে। অথচ প্রথম জন যে কথাই বলে না কোনও। এদিকে সদর রাস্তা জুড়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ছে। সতর্কতার প্রয়োজন। দরবার তাই মুলতানের বার আর মেয়েমানুষের ব্যবসাকে ধীরে ধীরে মকড়ানা মার্বেলের ব্যবসায় বদলে ফেলল। রাজস্থান থেকে দিল্লি ঘুরে লরি করে মাল চলে আসে দরবারের ডেরায়। সেখান থেকে এই অঞ্চলের সমস্ত নির্মীয়মান বহুতলের প্রোমোটারদের কাছে পৌছে যায় সেইসব মাল। মার্বেলের কাজকামে মুনাফা হচ্ছিল কম বেশি। তবে বারের মতো তেমন মার্জিন পাচ্ছিল না দরবার। এদিকে মুলতানভাইয়ের ইন্তেকালের পর এক বছর কেটে যাবার পরেও দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছাড়াও দরবারের ভিতর আরও একজন কথা বলে চলছিল অনর্গল। সে আর কেউ নয়। মুলতানভাই স্বয়ং। মাঝেমাঝেই দরবার দেখল কাজের ভিতর ডুবে থাকার ফাঁকেই হঠাৎ তার ভিতরে হুবহু মুলতানভাইয়ের মতো কোনও কন্ঠস্বর বলে উঠছে,”দরবার। কেমন আছিস? এখন একা রাজ করতে কেমন লাগছে?”দরবার সেই শব্দ শোনামাত্র এদিকওদিক তাকিয়ে দেখে। কেউ তেমন নেই। তাহলে কোথা থেকে এই শব্দ আসছে? কাজের কথায় ভুল হয়ে যায় তার। এই লাইনের ছেলেগুলোকে দলের কাজে টিকিয়ে রাখাটা একটা চ্যালেঞ্জ। দরবার বুঝতে পারে তার দলের উপর এই উৎকণ্ঠার কারণেই ক্রমশ বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা করতেই হবে তাকে।
খুশরভি গাজি আপাতত দরবারের ডান হাত। গেল একবছর সে দরবারের সঙ্গে আছে। এই লাইনে সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতা খুব জরুরি দুটি বিষয়। খুশরভি এই দুটিতেই দরবারের নেওয়া প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোয় উৎরে যাওয়ায় সেই এখন দিল্লি থেকে মার্বেল সাপ্লাইয়ের কাজটা দেখাশোনা করে। তবে গেল তিন চারমাস ধরে সে বুঝতে পারে তার মালিক ভালো নেই। কিছু একটা যেন ভিতর থেকে তাঁকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। লোকে বলে নিজের জিগরি দোস্তকে খুন করেছে মালিক। খুশরভি জানে না সে কথা সত্যি না মিথ্যে। সত্যি হতেই পারে। এই লাইনে এই কদিনে সে বুঝতে পেরেছে একজনকেই লোকে মেনে চলে। আর সেটা হল ক্ষমতা। আর ক্ষমতা আসে টাকা দিয়ে। দরবারের ব্যবসা মার্বেলের কারবারে ঝাড় খাচ্ছে। অন্য কারবারগুলোও পয়সার অভাবে দাঁড়িয়ে পড়ছে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই একদিন দিল্লি থেকে আসা একটি বছর কুড়ির ছোকরা ছেলে তার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে গেল। প্যাকেটের ভিতর সাদা গুঁড়ো পাউডার। বয়সে কুড়ি বছর হলেও প্রতি মাসে চোদ্দ পনেরো বার ছেলেটা এঘর ওঘর যাবার মতো বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশ, নেপাল আর পাকিস্তান যায়। এই পাউডার সুদূর আফগানিস্তান থেকে হাত বদল হয়ে এসেছে তার কাছে। খুশরভি গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারে, মালিকের বার গুলোতে কৌশল করে এই পাউডার চালান করলে ব্যবসায় মুনাফার জোয়ার আবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে মালিকের সম্মতির প্রয়োজন। মালিক তখন ইলাহাবাদে। খুশরভি ছেলেটিকে দুদিন কল্যাণীর হোটেলে থেকে যেতে বলল।
-নাম ক্যায় হ্যায় তেরা?
-বিলাস খান।
-বাপ রে। ইতনা বড়িয়া নাম।
ছেলেটির বাড়ি দিল্লির যমুনানদীর বস্তিতে। তার আব্বার অসুখ। টাকা দরকার। ছেলেটার চোখের ভিতর একটা অসম্ভব তেজী প্রত্যয় রয়েছে। খুশরভি মনেমনে বুঝতে পারছিল, এই ছেলের আল্লার বান্দা হয়ে তাদের ধান্দায় এসেছে। যা হোক। মালিক আসুক।
দরবার কলকাতা ফিরেই বুঝতে পারল সে ফুরিয়ে আসছে। মনের ভিতর বলতে থাকা ওই তৃতীয় স্বরটা তাকে তিলতিল করে মেরে ফেলছে। কিছুতেই তাকে থামানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে খুশরভি তাকে দিল্লি থেকে আসা একটি ছেলের কথা জানাল। ছেলেটার কাছে ভালো চিজ আছে। আপাতত কল্যাণীতে রেখেছে খুশরভি। দরবার ঠিক করল একবার মুখোমুখি কথা বলে দেখবে।
-আমাকে এইভাবে মেরে দিলি দরবার? তোকে নিজের জিগর দিয়ে আগলে রেখেছিলাম।
-মাফ করে দাও ভাই। আমার কসুর মাফ করে দাও।
-মাফ করতেই তো চাইছি। কিন্তু দেখ না দরবার। পুলিশ আমার হাত দুটো কেটে নিয়েছে। আমি বন্দুক ধরতে পারছি না। দরবার। হেল্প কর আমাকে।
কানের ভির ‘কুঁ কুঁ’ করে কাঁদতে থাকে মুলতান। দরবার বিড়বিড় করে বলে।
-আমাকে ছেড়ে দে মুলতান। ছেড়ে দে বলছি।আল্লা কসম।
‘হো হো’ করে হাসতে লাগল সেই স্বরটা। যন্ত্রণায় দুই কান দুহাত দিয়ে চাপা দিতেই হঠাৎ দরবার বুঝতে পারল তার সামনে খুশরভি হতবাক হয়ে জলের গেলাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছে না তার এখন কী করা উচিত। পাশেই একটি অল্পবয়সী ছেলে। এর কথাই তবে খুশরভি বলেছিল ফোনে।
-লা। ইধার আ। মুঝে শুকনে দে।
রাঙতার ওপর সরু লাইন করে সাদা পাউডারটা মেলে রেখে লাইটারের ওপর থেকে নাকের ভিতর নিয়ে নিল দরবার। আর তার পরমুহূর্তেই ম্যাজিক ঘটে গেল। কানের ভিতরের আওয়াজগুলো হঠাৎ চুপ করে গেল ‘দপ’ করে।
-কামাল হ্যায়? দিল্লি মে নারকোটিক ডিপার্টমেন্ট বহুত স্ট্রং হ্যায়। লায়েগা ক্যায়সে?
-মেরা সোর্স হ্যায়। লা দুঙ্গা।
-লা দে।
-কিমত।
-মিলেগা। মুঝে অউর চাহিয়ে। আমার জন্য। খুশরভি একে বলে দে। এ জিনিস আমার নিজের জন্য চাই। কামাল করে দিল। এখন মনে হচ্ছে যেন হাল্কা হয়ে গেছি।
-ও দিতে পারবে বলছে মালিক। তবে ওর সঙ্গে আপনাকে একটু দিল্লি যেতে হবে।
-কেন?
-দিল্লির নারকোটিক বিভাগের অফিসার গুর্জর সিং। বিলাসখান ওকে চেনে। এক বছরের চুক্তি করতে ও রাজি। কাঠি করবে না। শুধু টাকাটা ও সরাসরি আপনার কাছ থেকে নিতে চায় মালিক।
একটু ভাবল দরবার। তার আশপাশে এমন অনেক অদৃশ্য জাল বেছানো আছে। সেখানে পা দিলেই সর্বনাশ। কিন্তু বিলাসখানের চোখের দিকে তাকিয়ে দরবার বুঝতে পারে এই জালের সর্বত্র আঠা নেই। শুধু তাকে মাকড়শার মতোই সেই জায়গাগুলো চিনে ফেলতে হবে। আর এই রাজত্ব সামলাতে হলে এই রিস্কটা তাকে নিতেই হবে।
-যাবো আমি। পড়শুই যাবো। কতো লাগবে বল?
-তিন কোটি।
-বেশ। হবে। আর একটু দে তো ওটা। আজ এতোগুলো মাস পরে একটু ঘুমোতে পারব বলে মনে হচ্ছে। খাসা জিনিস এনেছিস বিলাস। সাবাশ।
দিল্লিতে গুর্জর সিং এর অফিসটা একদম যমুনার পার ঘেসে। দরবার একটু হাতে সময় নিয়ে এসেছিল। এইসব কাজ করতে গেলে তড়বড় করা চলে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। তিন ‘খোকা’ চেয়েছে গুর্জর। দরবার এক এনেছে। বাকি দুই একমাস বাদে। গুর্জরের অফিসের বাইরে একটা ছোট বারান্দা। সেখান থেকে যমুনানদী সরাসরি দেখা যায়। নদীর জল দূষণের পর কালো পঙ্কিল প্রদীপের পলতেজ্বলা পোড়া তেলের চেহারা নিয়েছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিলাসের আনা পাউডার নাকে টেনে নিল দরবার। সেই দ্রব্য তার নাসার পর্দা অতিক্রম করে মুহূর্তে রক্তে মিশে গেল হয়তো। কারণ দরবারের ভিতরের দোলাচল হঠাৎ থেমে গেল।
আরদালি জানিয়ে গেল গুর্জর সিংএর আসতে দেরি হবে। অপেক্ষা করতে বলেছে। উপায় নেই। বারান্দায় বসে বসে দরবার শুনতে পেল দূর থেকে হারমোনিয়ামের আওয়াজ ভেসে আসছে। তার সাথে বাঙা ভাঙা সুর আর কথা।
-ও কী রে খুশরভি?
-দরগা। নিজামুদ্দিন দরগা। সকাল থেকে কাওয়ালী চলে ওখানে।
-তাই। ওহ। জানতাম না। তুই জানলি কী করে।
-বিলাস বলেছে।
সুরের ভিতর কথাগুলো একে একে দরবারের কাছে এসে যেন মায়ের আঁচল পেতে দিল। যেন তারা বলতে চাইছিল দরবারকে।’বোস না। আর কতো দৌড়বি?’নিজের আম্মির মুখটা মনে করার চেষ্টা করল দরবার। মনে এল না কিছুতেই। বরং ধীরে ধীরে তার চোখের পাতাদুটো নেমে এল। বিলাসের মালটা আফিম টাফিম নাকি? তাহলে তো সর্বনাশ। নেশা ধরে যাবে। ভাবতে ভাবতে গুর্জর সিং এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে দরবার অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল।
গুর্জর সিং লোকটাকে ঠিক শয়তান বলা চলে না। দরবারের মনে হয়, মহৎ আর শয়তান, দুজনের থেকেই ভয়ানক হল তৃতীয় দলটা। যারা একই সঙ্গে দুটোই। গুর্জর সিং দিল্লিতে প্রচুর সমাজসেবা করে। টাকা ছড়ায় এখানে ওখানে। আবার মাদক পাচারও করে। দরবারের প্রস্তাবে তার বরাদ্দ সময় সীমা এক মাসের বদলে হল পনেরো দিন। পনেরো দিনের মধ্যে বাকি দুই খোকা। নয়তো বেওসা বন্ধ। দরবারের হাতে উপায় ছিল না। সুতরাং সে রাজি হয়ে গেল। অফিস থেকে বেরিয়ে খুশরভিকে বলল,”একবার যাবি ওদিকটায়?”
-কোথায়? দরগায়?
-হ্যাঁ।
দরবারকে এই এক বছরে বারবার রূপ পাল্টাতে দেখেছে সে।দরবারের পরের চাল কী হবে আন্দাজ করতে পারে না কেউ।সেখানে হৃদয় নয়, মস্তিষ্কের আনাগোণাই সিংহভাগ। কিন্তু দরবারের চোখ দেখে খুশরভি বুঝতে পারল, মালিকের এই দরগা যাবার খোয়াইশে কোথাও বেওসা নেই। মালিক খুঁজছে। মুলতানভাইয়ের শব্দগুলোর পাঞ্জা থেকে মুক্তি। সে মুক্তি বিলাসের পাউডারও ঠিকঠাক দিতে পারছে না।
দুপুরের দিকে দরগায় লোক কম ছিল সেদিন। নদীর পারে বাহারি দেয়ালের নিচে সমাধীর দিকে মুখ করে এক বৃদ্ধ দরবেশ গান গাইছিলেন। দরবার আর খুশরভি পিছনে পেতে রাখা চাদরের উপর বসল। দরবার দেখল গান চলাকালীন মাঝেমাঝে সেই দরবেশের আশপাশে বসে থাকা অপেক্ষাকৃত তরুণ দু তিনজন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ছে। তারপর গানের তালে তালে তারা ঘুরে চলেছে নিজেদের ভরকেন্দ্রকেই কেন্দ্র করে। দরবারের মনে হল এ যেন পৃথিবীর আহ্নিক গতির মতো ঘূর্ণায়মান এক মহাজাগতিক চক্র। যে চক্রে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড ঘুরছে কোনও ভরকেন্দ্রর মতোই। অবিরাম। বিশ্রাম নেই। স্থবিরতা নেই। অথচ সেই ঘূর্ণিতে অস্থিরতা নেই। আছে শান্ত স্নিগ্ধ এক আশ্রয়। দরবেশ গাইছিলেন,”নয়নো সে নয়নো মিলা তো দো অউর দো চার হুয়ে। চারো নয়না দরিয়া পার আল্লা হাফিজ জুলফিকারকা চাঁদ হুয়ে।”দরবার দেখল তার উপরের মুক্ত আকাশে মেঘের আনাচেকানাচে রোদ খেলা করছে। সেই রোদকণা আসলে কোনও মস্ত চোখের মণিতে গেঁথে থাকা আলোর ঝিলিক। সেই দুই চোখ আর তার দুই চোখ মিলে গিয়ে যেন সেই মহাজাগতিক ঘূর্ণি একটা মাদকের পর্দা তৈরি করছে তার মনে। সেই পর্দা তার ভিতর থেকে শুষে নিচ্ছে সমস্ত অনাহুত স্বর। ‘সেমা’ আর ‘ধিকা’ ঘিরে শুধুই ‘ওয়াজদ’ আর সুর। দরবেশজির কাওয়ালির সুর। মন্ত্রমুগ্ধর মতো দরবারও সব ভুলে উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করে দেয়।
দরবেশটির নাম হামির-আলি-বেগ। গুর্জর সিংএর জন্য বাকি টাকাটা জোগাড় করতে কয়েকটা দিন দিল্লিতেই থেকে যাবে ঠিক করল দরবার। আর থেকে যাওয়া দিনগুলোর রোজনামচায় নিজামুদ্দিন দরগা তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠল তার জীবনে। সে লক্ষ্য করল, সেই ভৌতিক আওয়াজগুলো আর তাকে বিরক্ত করছে না। অথচ আজকাল আর তাকে বিলাসের পাউডারটাও নিতে হচ্ছে না তেমন। দরগায় গিয়ে হামির দরবেশের সুফি গান শুনলেই যেন আজকাল নেশা ধরে যাচ্ছিল তার। খুশরভি গুর্জরের সঙ্গে দেনাপাওনা সামলাচ্ছিল। আর দরবার শিখে নিচ্ছিল জীবনের কতো অজানা সূত্র। দরবেশ তাকে বলেছেন, জীবন আর মৃত্যু বাড়ির এই ঘর থেকে ওই ঘরে যাওয়ার মতো। মাঝে রয়েছে কালের অদৃশ্য পর্দা। ওইপার থেকে যখন কেউ এইপারে কথা বলে, তখন সেই শব্দ শোনা গেলেও বক্তাকে আর দেখা যায় না। জালালুদ্দিন রুমি সেই শব্দের ভিতরেই নিজেদের লবজ সমর্পণ করে রেখেছিলেন। বিকেল হলে দরগায় ভীড় বাড়ে সামান্য। তখনকার জমায়েতকে দরবেশ হামির ‘হাদ্রা’য় পরিণত করেন। মাথা দুলিয়ে ‘আল্লা হুঁ আল্লা হুঁ’ বলতে থাকে সকলে। দরবারও চোখ বন্ধ করে ধিকা পড়তে থাকে।
শেষমেশ ঘরে ফেরার দিন এসে পড়ে। গুর্জরের টাকা জোগাড় করে ফেলেছে খুশরভি। দশ দিনের ভিতরেই। এইবার ধান্দা চালু হয়ে যাবে। বিদায় নেবার আগে দরবেশের সঙ্গে দেখা করা জরুরি দরবারের।একটা প্রশ্ন তাকে প্রতিদিন কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো একমাত্র এই হামির দরবেশই দিতে পারবে। সে উত্তর তাকে পেতেই হবে। সেই কারণেই সে রাতে হাদ্রা ভেঙে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করে থাকে। অবশেষে ভীড় পাতলা হয়ে আসে। দরবেশ হাতছানি দিয়ে তাকে কাছে ডাকে।
-আ বেটা ক্যায়া বাত হ্যায় বোল? ক্যায়া পুছনা চাতা হ্যায়?
দরবার ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। দরবেশ তো অন্তর্যামী সুফিসন্ত। তিনি কী জানেন না মনের কথা? তার পাপের কথা? মুলতানভাইয়ের কথা? সেইদিন যখন প্রথম সে এই দরগায় এসেছিল, কেন শিউরে উঠেছিল আকাশের দিকে চেয়ে? তারপল সে ভয় মিলিয়ে গিয়েছিল রোদের আলোয়। সেই চারটি নজরের এক জোড়া চোখ তার ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু বাকি জোড়া? সে চোখ কার ছিল জানেন না হামির আলম?
দরবারের চোখের অস্থিরতা হামির আলমের নজর এড়িয়ে গেল না। ভক্তর চোখে এমন অস্থির আকুল চাহনি তিনি এর আগেও বহুবার দেখেছেন। দরবারের কাঁধে হাত রেখে তিনি বোঝান। দুই চোখের মিলনের চেয়ে পবিত্রতর মিলন এই জগতে আর কিছু নেই। যে দরিয়াতে এই মিলন ঘটবে, সেই দরিয়াতেই পরবরদিগার থাকেন। সে মিলন জন্নতের। দরবার সজল চোখে হাত পেতে জিজ্ঞেস করে দরবেশকে। মুলতানভাই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে তো? দরবেশ হাসেন। তারপর বলেন।
-জরুর। লেকিন তুমকো ইয়াকিন বনানে কেলিয়ে আপনে আপ কো সঁপনা হোগা।
দরবার প্রস্তুত। এই মুহূর্তে আর তার কোনও বাসনা নেই। সে সমস্ত কিছু সঁপে দিতে পারে। কিন্তু কাকে সঁপতে হবে তাকে?
-সুফি কো। ইস কা নাশা যো জো লাগ গয়া, তো সমঝো সব নাশা ছুট গয়া।
সকালে রেলস্টেশনে খুশরভি দেখল দরবার তার বাক্স আনেনি সঙ্গে। তবে কি মালিক দিল্লিতে থেকে যাবে আরও কয়েকদিন। গুর্জর সিং আর বিলাস খানের কাজ কী এখনও অসম্পূর্ণ?
-তুমি যাবে না মালিক?
-না রে খুশরভি।
-তাহলে কবে আসবে? চিকিটির ইন্তেজাম করি।
-লাগবে না।
-কী লাগবে না?
-টিকিট।
-সে কী। তাহলে?
খুশরভি বুঝতে পারে না তার মালিকের মতিগতি। দরবারের মনের ভিতরের অলিগলি চিরকাল তার নাগালের বাইরে থেকেছে।
-তাহলে তুমি কবে ফিরবে মালিক?
-আমি আর ফিরব না রে খুশরভি। কাল সারা রাত ধরে ভেবেছি। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি থেকে যাব। নিজামুদ্দিন দরগায়। দরবেশ হামির আলম বেগের কাছে।
-আর ধান্দা? মালিক না থাকলে ওরা মানবে না।
-মানবে। মালিক থাকবে তো।
-কীভাবে?
-তুই খুশরভি আজ থেকে মালিক। আমি এইলান করছি। এই খামটা রাখ। এখানে আমার জবানী আছে। তুই সামহাল।
খুশরভির চোখে জল চলে আসে। কিন্তু সে মনেমনে বুঝতে পারে তার মালিক এতোদিন বাদে যেন শান্তির পথ খুঁজে পেয়েছে।
-ঠিক আছে। আমি বিলাসকে বলে দেব। ও ঠিক তোমাকে সময় মতো পাউডারটা পাঠিয়ে দেবে।
-ওটারও আর প্রয়োজন নেই রে। আমি আরও বড় নেশার পাউডার পেয়ে গেছি। আরও স্ট্রং। আরও কিক।
-সে কী! কী সেটা?
-সুফি।
খুশরভি দেখল দরবারের চোখের ভিতরে কাবার ছবি এক ঝলক উঁকি দিয়েই মিলিয়ে গেল। ওয়াজদের মতোই সে তাকে হঠাৎ ভীষণ আকুল হয়ে জরিয়ে ধরল। তারপর ট্রেনে উঠে পড়ল। অনেক কাজ বাকি।