সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ২৯)

জন্ম কলকাতায়(২৭ নভেম্বর ১৯৮০)।কিন্তু তার কলকাতায় বসবাস প্রায় নেই।কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়ান গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।সেখান থেকেই হয়তো ইন্ধন পেয়ে বেড়ে ওঠে তার লেখালিখির জগত।প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আকাশপালক "(পাঠক)।এর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হলো শিকারতত্ত্ব(আদম), আড়বাঁশির ডাক(দাঁড়াবার জায়গা), জনিসোকোর ব্রহ্মবিহার(পাঠক), কানাই নাটশালা(পাঠক),বহিরাগত(আকাশ) ।কবিতাথেরাপি নিয়ে কাজ করে চলেছেন।এই বিষয়ে তার নিজস্ব প্রবন্ধসংকলন "ষষ্ঠাংশবৃত্তি"(আদম)।কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্য ও গল্প লিখতে ভালোবাসেন।প্রথম উপন্যাস "কাকতাড়ুয়া"।আশুদা সিরিজের প্রথম বই প্রকাশিত "নৈর্ব্যক্তিক"(অভিযান)।'মরণকূপ' গোয়েন্দা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অভিযান,যদিও তার বিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে সে একেবারেই স্বতন্ত্র।এই সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস 'সাহেববাঁধ রহস্য '(চিন্তা)।সম্পাদিত পত্রিকা "শামিয়ানা "। নেশা মনোরোগ গবেষণা,সঙ্গীত,অঙ্কন ও ভ্রমণ ।

বিন্দু ডট কম

একটা ছোটো মনিটরের ওপর উদগ্রীব হয়ে রয়েছে দুইজোড়া চোখ।এক জোড়া পশুপতিনাথ প্রেসের বর্তমান উত্তরাধিকারী কর্ণধার রোহিত মিত্রর।দ্বিতীয় জোড়া ‘দোয়াব’ পত্রিকার সম্পাদক শুভব্রত সেনগুপ্তর।মনিটরে ফুটে উঠছে ‘দোয়াব’।যেন সংক্রমণের পর নতুন অক্সিজেন পেয়ে আবার বেঁচে উঠছে কোনও তরুণ যুবা।শুভব্রত স্রোতস্বীনির দেওয়া টাকায় দুটো ট্যাব কিনেছে।একটি তার জন্য। আর একটি তোয়ার জন্য।তার পত্রিকার সম্ভবত একমাত্র একনিষ্ঠ পাঠিকা।রোহিত পাতা উল্টোচ্ছে এক এক করে।নাহ।তেমন ভুল নেই।মূদ্রণত্রুটিও তেমন চোখে পড়ছে না।ঈশ।যদি এমনই ঝলমলে একটা রক্তমাংসের পত্রিকা ডিমাইন কাগজে ছাপতে পারতো শুভব্রত!যদি পারতো?মলাটের সেই তেলা মসৃণ পিঠ।যেন প্রেয়সীর দুধসাদা অনাভরিত পিঠ।সুমিষ্ট শিরিশ আঠার গন্ধ।নতুন ম্যাপলিথো রিমকাগজের সুবাস।সেইসব রোহিতের কম্পিউটার স্ক্রিনে কোথায়!রোহিত বলেছে তো।কম্পিউটার বিশ্বে এই সাইট আসলে একটা বিন্দু।সেই বিন্দুর কোনও পরিধি হয় না,বর্গক্ষেত্র হয় না।সে যেন একবিন্দু উজ্জ্বল তারার মতোই।রোহিত কি বোর্ডে ঠাস করে একটা সুইচ টিপে বলে,”ব্যাস।কমপ্লিট।বিন্দু ডট কমে আপনার ‘দোয়াব’ ম্যাগাজিন তৈরি।এবার প্রকাশ অনুষ্ঠান হবে।
শুভব্রত যেন আকাশ থেকে পড়ে।প্রকাশ অনুষ্ঠান?চারপাশে এতো কড়াকড়ি।এমনকি রাণাঘাট থেকে ট্রেনে করে শুভব্রত ফিরে আসার ঠিক পরের দিনই সংক্রমণের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন।বিধিনির্দেশের বিধানে সমস্ত জনসমাগম বন্ধ। সেখানে প্রকাশ অনুষ্ঠান হবে কী করে?সে তো এক মহোৎসবের মতো!বিমলেন্দুবাবুর ত্রিবন্ধ পত্রিকার কথা আবার মনে পড়ে যায় তার।মহাবোধির ঘরে লেখক সমাবেশ হয়েছে।এক বিদগ্ধ আশি ঊর্ধ্ব কবি উঠে দাঁড়ালেন ডায়সে।তাঁর কম্পমান হাতকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা এক তরুণ কবির সচেষ্ট হাত সরিয়ে দিলেন তিনি।খুব গম্ভীর স্বরে বললেন,”চিন্তা করো না।আমি পারবো।তুমি সামনে বসো।”কথা হলো না কোনও।সারা ঘরে পিনপড়া নিঃশব্দতা।তার চকমকে রাঙতা থেকে মুক্ত হলো “ত্রিবন্ধ”।বিমলেন্দুবাবুর মুখচোখের সে পরিতৃপ্তি এক কন্যার পিতার চেয়ে কম কিছু না।হল ফেটে পড়ল করতালিতে।সেই সব এই সময়,এতো কম সময়ে করা সম্ভব!শুভব্রতর কুন্ঠা আন্দাজ করে প্রায় হেসেই কুটিপাটি রোহিত।
-আপনি ভাবলেন আমি হল বুক করছি পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানের জন্য?
-হ্যাঁ। মানে সেটা কি এখন সম্ভব?
-শুভব্রতবাবু।আপনি ঠিক আমার বাবার মতো।গালার রেকর্ডের দিনেই পড়ে রয়েছেন এখনও। আপনার পত্রিকা এখন কতো এগিয়ে গেছে দেখুন।সে যদি কম্পিউটার স্ক্রিনে আত্মপ্রকাশ করতে পারে,তাহলে তার প্রকাশ অনুষ্ঠানও কম্পিউটার স্ক্রিনে হতে পারবে না কেন?আপনি তো ট্যাব কিনেছেন।তার ব্যবহার শিখতে হবে তো?কী?
শুভব্রত মাথা নাড়ে।রোহিত ট্যাব খুলে কীসব করতে থাকে।মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করে শুভব্রতর জন্মসাল তারিখ ঠিকানা।খানিক পর বলে,”নিন।যে সিমটা কিনেছিলেন এই ট্যাবের সঙ্গে সেই সিম দিয়ে আপনি ফোন করতেন এতোদিন এইবার সেই নম্বর আপনার ট্যাবে যুক্ত হলো।আমি আপনার ইমেইল,ফেসবুক অ্যাকাউন্ট,ইনস্টাগ্রাম,টেলিগ্রাম,সব খুলে দিলাম।”রোহিতের কথা শুনে শুভব্রতর মাথা ঘুরছিল।এতোদিন ধরে সে নিষ্ঠাভরে শুধুই একটা পত্রিকা সম্পাদনা করেছে।পত্রিকা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কতোদিন।নিজে একজন সম্ভাবনাময় কবি হওয়া সত্ত্বেও কখনও নিজের লেখার দিকে মন দেয়নি।কিন্তু আজ রোহিত যাসব বলল,তার সঙ্গে পত্রিকা সম্পাদনার কী সম্পর্ক সে বুঝতেই পারছিল না।
-নিজের ভিতরের দরজাগুলো না খুললে বাইরের সকলের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হবে কী করে শুভব্রতবাবু?
শুভব্রত ঘাড় নাড়ে।রোহিত আরও কয়েকটা “কি” টিপে বলে ,”নিন।এইবার বন্ধুত্বর চিঠি পাঠান আপনার চেনাজানা লোকদের।আমিও আমার আর আমার বাবার পরিচিত কিছু লেখককে চিঠি পাঠিয়ে দিলাম।তারপর ওদের নিয়ে আমরা একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান করে নেব।
-সব হবে এই স্ক্রিনে।
-হ্যাঁ কাকু।সব এখানেই হবে।
শুভব্রতর বিস্ময় কাটতে চায় না।প্রথমেই সে মৈনাককে আর তোয়াকে খোঁজে।কী মনে হয় তার,’তরুলতা’ টাইপ করে ‘সার্চ’ বোতামে।কারোর সন্ধান মেলে না।হতাশ হয়ে খুঁজতে খুঁজতে সে পেয়ে যায় প্রদ্যুত সরকারকে।তার প্রোফাইলে আরুণি প্রকাশনীর বিজ্ঞাপন।অনেক পরিচিত মহারথি লেখকদের নাম সেখানে দেখতে পায় শুভব্রত।তাদের কেউ কেউ একসময় ‘দোয়াব’এর পাতাতেও লিখেছে।বন্ধুত্বর আমন্ত্রণ পাঠিয়ে দেয় সে তাদের।কিন্তু প্রদ্যুত সরকারকে কিছুতেই বন্ধু করতে মন চায় না তার।হঠাৎ সে দেখে পরিচিতদের তালিকায় ‘অচিন্ত্য মিত্র’র নাম।কিন্তু সে কীকরে সম্ভব!তিনি তো দীর্ঘদিন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়!রোহিতের দিকে তাকাতেই সে আশ্বস্ত করে।
-ঘাবড়ে যাবেন না।বাবার প্রোফাইলটা আসলে আমিই অপারেট করি।
এও তাহলে সম্ভব।একজনের হয়ে আরেকজন যাপন করছে জীবন।সবই এক বিন্দুতে!তরুলতা,মৈনাক বা তোয়াকে না পেলেও শুভাশীষ,অমিতব্রত,সায়নীর মতো বহু চেনা নাম তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করে নিল শুভব্রতর নিমন্ত্রণ।তাদের কেউকেউ প্রশ্ন করলো,”দোয়াব এখনও বের হয়?আমি তো ভেবেছিলাম বন্ধ হয়ে গেছে পত্রিকাটি।”কেউ বা লিখলো “খুব নিশ্চিন্ত হলাম দোয়াবকে দেখে।এই সময় এইরকম একটা পত্রিকারই আমাদের প্রয়োজন।”নেশাগ্রস্থর মতো শুভব্রত খুঁজতে থাকে সেইসব মতামত।তাকে দেখে রোহিত হাসতে থাকে মিটিমিটি।
-সারা দিন পড়ে আছে কাকু।আপনি যতো খুশি চ্যাট করবেন।কিন্তু আগে অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ফিক্স করি দাঁড়ান।
রোহিত আবার কম্পিউটার খুটখুট করতে থাকে।আর তার পাশে বসে শুভব্রত ভাবতে থাকে।’দোয়াব’ যে আর বেরোবেই না একথা তাহলে লেখকমহলের একাংশ ধরেই নিয়েছিল তার অজান্তে!তার মনে হলো সে পৌছে গেছে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে।’সবুজ পত্র’ পত্রিকার ষষ্ঠ বছরের প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর লেখা সেই শব্দ গুলি।দীর্ঘ কয়েক বছর পর ‘সবুজ পত্র’ বের হচ্ছে তখন।দেশের মানুষ বলতে শুরু করেছেন পত্রিকা আর বের হবে না।উত্তরে সম্পাদক তাঁর সম্পাদকীয়তে লিখলেন।”দেশময় যখন সবুজপত্রর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে গিয়েছে তখনো পত্রের আবার সাক্ষাৎ পেলে লোকের মনে সহজেই এ সন্দেহ হতে পারে যে আমি কোনো মতলবে ঐরূপ কৌশল অবলম্বন করেছি।সবুজপত্র বন্ধ করার প্রস্তাবনার ভিতর অবশ্য কোনো রূপ চাপা উদ্দেশ্য ছিল না।আমি একজন সাহিত্যিক,পলিটিশিয়ান নই।সুতরাং আমার কথার ভিতর কোনোরূপ গুঢ় মতলব থাকার কথা নয়,কেননা তা থাকলে কথাসাহিত্য হয় না।আর আমি পারি না পারি,সাহিত্যই রচনা করতে চেষ্টা করি।…যখন দেশের অন্তত জনকতক লেখকও চান যে ‘সবুজপত্র’ বেঁচে থাক চিরজীবী হয়ে,তখন যতোদিন পারি-এ পত্রকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা হওয়াটা আমার পক্সে নিতান্তই স্বাভাবিক।”এই সম্পাদকীয়র প্রতিটি শব্দ টেমার লেনের লিটল ম্যাগাজিনের লাইব্রেরিতে বসে শুভব্রত সেদিন মুখস্থ করেছিল।আজও তার সে বিশ্বাস অটুট।অন্তত তোয়ার জন্য তাকে এই পত্রিকা বের করতেই হবে।সারা পৃথিবী বিপক্ষে থাকুক।ঠিক সেই সময় রোহিত “ডান” বলে বসে পড়ে।শুভব্রত চেয়ে থাকে।
-কাল বিকেলে পত্রিকার উদ্বোধন।বিকেল পাঁচটা।আপনাকে লিঙ্ক পাঠালাম।খুললেই দেখবেন মিটিংরুম।আমি থাকবো।চাপ নেবেন না।তবে একটা ইয়ার ফোন কিনে নেবেন আগে।অনেক সময় ট্যাবে সরাসরি বললে শব্দগুলো বোঝা যায় না।কী?খুশি?
শুভব্রত ঘাড় নাড়াতে গিয়ে থমকে যায় হঠাৎ।রোহিত মিটিং সেট করতে গিয়ে ‘আরুণি’ প্রকাশনার পাতা খুলেছিল।সেখানকার একটি ঘোষিকা শুভব্রতকে টলিয়ে দেয় যেন।’আরুণি’ থেকে নির্বাচিত প্রবন্ধ সংখ্যা বের হয়েছে প্রদ্যুত সরকারের সম্পাদনায়।শুভব্রতর মনে পড়ে যায় মৈনাক এমনই একটা সংকলনের কথা সেইদিন বলছিল।তবে কি তার সঙ্গে আজ মৈনাকেরও ‘কর্ণ’রও আত্মপ্রকাশের দিন।মুহূর্তে আনন্দে ভরে যায় তার মন।কম্পিউটারে সে রোহিতকে ব্রাউস করতে বলে।প্রবন্ধ সংকলনের প্রতিটি প্রবন্ধ শুভব্রতর পড়া।বিশেষত ‘অন্তজ সাহিত্য’ নিয়ে অধ্যাপক অলোকবিহারী গাঙ্গুলির লেখাটি তো রাতারাতি মৈনাক মন্ডলের “কর্ণ” কে বিখ্যাত করে তুলেছিল।প্রতিটি প্রবন্ধ ক্রমানুক্রমে সাজিয়েছে প্রদ্যুত।কিন্তু শুভব্রতর জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আরও।সূচিপত্র বা ঋণস্বীকার, কোথাও “কর্ণ” বা “মৈনাক মন্ডল”এর নামোল্লেখ নেই!তবে কি এটা বিজ্ঞাপনের ভুল?হতেই পারে।”আরুণি” প্রখাশনা দপ্তর তো পশুপতিনাথ প্রেসের পাশেই।একবার গেলেই তো হয়।শুভব্রত ঠিক করলো সে এখনই একবার সেই দপ্তরে গিয়ে ব্যাপারটা দেখবে।অবশ্য এই ব্যাপারটা সে রোহিতকে কিছুই বলল না।কি জানি।সব কেমন অনিশ্চয়তায় ভরে যাচ্ছে যেন।মুখোশের আড়ালে মুখোশের মতো।সে হোক।শুভব্রত ট্যাব হাতে বেরিয়ে আসে প্রেস থেকে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।