গারো পাহাড়ের গদ্যে স্বপঞ্জয় চৌধুরী

প্রতীচ্যের বিউগল: পাশ্চাত্যের সুরে দেশীয় উত্তরাধুনিকতার স্বার্থক নিরীক্ষা


বিশ্বব্যাপী কাব্যসাহিত্যের এক অবিনাশী জোয়ার ধাবমান। সে জোয়ারে কবিতা তার সহজ সরল বঁধূরূপকে পরিবর্তন করে হাজির হয়েছেন শহুরে চালচিত্র মুখোরিত পড়ন্ত বিকেলে। তার বুকের করুণ সুর গুলো বাঁশের বাশির ফুৎকারকে গলিয়ে ধাবিত হচ্ছে প্রাচ্যের অর্কেষ্টার দিকে। কবির মনবেদন কিংবা কাব্যভাষা চরিতের স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ভিন্ন হলেও এর আবেদন রয়ে গেছে নিরেট সবুজ কুসুমিত পত্রপল্লবের মতো। গল্পের আড়ালে লেখা হচ্ছে মহাগল্প, কাব্যের আড়ালে লেখা হচ্ছে মহাকাব্য। কবিতা আজ কেবল তাল, ছন্দ, লয় কিংবা ঘটনা, গল্প, প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয় বরং তা আজ হয়ে উঠেছে শক্তিমান শব্দের খেলায়। এমন শব্দ যাতে রয়েছে বিস্ফোরিত হবার ক্ষমতা। শব্দের পিঠে শব্দের বুননে তা হয়ে উঠেছে এক আধো আলো , আধো ছায়া বিশিষ্ট চিন্তার চলচ্চিত্র। যাতে চোখ বন্ধ করেই ভেবে নেয়া যায় জাদু বাস্তবতার মতো পার্থিব কিংবা অপার্থিব পালিলিক অনুভব। নন্দনতত্তে¡র বর্ধিষ্ণু বিবর্তনের ফাঁক গলিয়ে কবে যে কবিতা এত মহিরুহ হয়ে উঠেছে তা নিয়ে কাব্যসমালোচকদের গবেষণার শেষ নেই। কাব্যের এ বিবর্তন , ভাষা বিবর্তনেরই ফসল। শব্দকে ভেঙে নতুন শব্দের জন্ম হচ্ছে। চিন্তাকে ভেঙে নতুন চিন্তার জন্ম হচ্ছে। ফর্মকে ভেঙে নতুন ফর্মের জন্ম হচ্ছে। এ ফর্ম কিছুটা প্রাকৃতিক কিংবা অতিপ্রাকৃতিক। কিছুটা মৌলিক আবার কিছুটা প্রভাবিত। বাংলা শিল্পসাহিত্যে পাশ্চাত্যের প্রভাব বিগত দুই শতাব্দি থেকেই বিদ্যমান। এর বিবর্তনটি অত্যন্ত ধীরে, নিটল ও নিবিড় ভাবে আমাদের সাহিত্যে প্রবেশ করেছে।

কবি মাহফুজ আল-হোসেনের কাব্যগ্রন্থ প্রতীচ্যের বিউগলে ঘটেছে এমনই কিছু বিবর্তন যা নতুন কাব্যভাষার সাথে সাথে উদোয় ঘটিয়েছে নতুন কাব্যচিন্তার, যাতে রয়েছে অনুভব জ্ঞানে ক্রিয়াশীল হওয়ার তাড়না সংগ্রামী ভাষা সবসময় কেতাবী ভাষায় লিপ্ত না হলেও। কেতাবী ভাষায় গড়ে ওঠে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা। যা একটি দেশ ও জাতিকে চরম উৎকর্ষতা ও মুক্তির পথের দিকে ধাবিত করে। কাব্যগ্রন্থটিতে মৌলিক কবিতার পাশাপাশি রয়েছে কাব্যানুবাদ। কাব্যানুবাদগুলো বিন্যাস করা হয়েছে মৃত্যুভাবনা বিষয়ক কবিতা এবং যুদ্ধ ও সন্ত্রাস বিষয়ক কবিতা দিয়ে।

ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদা ও মিশেল ফুকোর দর্শন প্রভাবিত করেছে পাশ্চাত্যের শিল্প ও সাহিত্যকে। ফরাসি কবি মার্লামের ভাষায় -“ কবিতা আইডিয়া বা ধারণার ফসল নয় বরং তা হচ্ছে যুৎসই শব্দের খেলা”। এই তিন মনীষীর দর্শনচিন্তা ও কাব্যভাবনার নিবিড় পাঠের ফসল হচ্ছে পাশ্চাত্যের জানালা নামক কবিতাটি। পাশ্চাত্যের জানালা দিয়ে যে আলোর রেখা আমাদের চিন্তা ও মননে প্রবেশ করেছে তার চিরায়ত সুরটি যেন একান্ত আমাদেরই। প্রাচাত্য শিল্পসাহিত্যের অমায়িক সৌন্দর্যটি যেন আমাদের নিটোল গ্রাম বাংলার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
তার পশ্চিমের জানালার বিবর্তিত শব্দগুচ্ছ ছিল এরকম
“ পশ্চিমের চলে আসা রোদ্দুরে জানালায় ছায়ামুখেরা ভিড় করে;
দেরিদা কেন যে দেরিতে এসে বলে গেল ভানেরও অভিমান থাকতে পারে…..
….অপারগ আমি ও আমরা প্রাচ্যের সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায়।”

সমগ্র পৃথিবীতে প্রধানত দু’টি দার্শনিক মতবাদ বিদ্যমান- ভাববাদ ও বস্তুবাদ। ভাববাদী দর্শনতত্ত¡কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে আত্মা, ঈশ^র- “একাশ্বরবাদ, বহুঈশ্বরবাদসহ” নানাদেশে নানা লোকগাঁথায় লেখা হয়েছে বিবিধ মিথ কাহিনী। কবির চতুর্দশপদী চিঠি: মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট কবিতায় উঠে এসেছে এমনই কিছু মিথগাঁথা। ফাউস্ট জার্মান সাহিত্যিক গ্যাটে বিরচিত একটি নাটক যা ট্র্যাজেডি হিসাবে গণ্য। এটি দুই পর্বে লিখিত। এটি গ্যোথের সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত সৃষ্টি; একই সঙ্গে এটি জর্মন সাহিত্যেরও সর্বাধিক আলোচিত সাহিত্যকর্ম। মধ্যযুগে “ফাউস্ট” চরিত্রটি কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়ে গিয়েছিল ইউরোপে বিভিন্ন দেশে। গল্পে-কাহিনীতে“ফাউস্ট” অথবা“ ফস্টাস” নামের একাধিক কল্পিত অথবা লোকগল্পের চরিত্রের দেখা যাওয়া যায়, তবে এদের আদি উৎস বাইবেলে বর্ণিত জাদুকর সাইমন ম্যাগাস। বাইবেলে বর্ণিত সাইমন ম্যাগাস নিষিদ্ধ জ্ঞানের চর্চা করে। সে নানা অপকর্মে শয়তানের সমর্থন লাভ করে। তবে শেষ পর্যন্ত সে খ্রিস্টধর্মে প্রত্যাবর্তন করে এবং ঈশ্বরের নিকট আত্মসমর্পণ করে। তবে ঈশ্বরের অনুগ্রহ পাওয়াটা শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে সম্ভব হয় না। আদিতে ফাউস্ট বা ফস্টাস চরিত্রের উত্থান ও পতনের সঙ্গে একদিকে ব্ল্যাক ম্যাজিক, অতিমাত্রার উচ্চাশা এবং ঈশ্বরের প্রতিদ›দ্বী হওয়ার ধৃষ্টতা ইত্যাদি এবং এসবের অনিবার্য শাস্তি এবং অন্যদিকে গির্জার অনুশাসন, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং ব্যক্তির দায়-দায়িত্বেও বিবিধ প্রসঙ্গ জড়েত ছিল।
স্বর্গে ঈশ্বরের সঙ্গে মেফিস্টোর বাজি ধরে। মেফিস্টো বলে, ঈশ্বরের অনুগত পন্ডিত ফাউস্টকে সে পথভ্রষ্ট করতে পারবে। কাহিনীর ঘটনাচক্রে প্রতীয়মান হয় বাজিতে আপাতদৃষ্টিতে তার জয় হয়েছে। ছদ্মবেশী কুকুর মেফিস্টোফিলিস ফাউস্টকে প্রলোভিত করে এক ডাকিনীর কাছে নিয়ে যায় তাকে এক সঞ্জিবনী পানে তার বয়স ত্রিশ বছরের যুবকে নিয়ে আসে। তার ভেতরে যৌন কামনা জাগ্রত হয় সে মার্গারিটা নামক এক মেয়ের প্রেমে পড়ে যায়। তাদের প্রেমে বাঁধা দেয় মার্গারিটার মা। মার্গারিটা তার মাকে হত্যা করেন । তার ভাই ভ্যালেন্টাইন প্রেমে বাঁধা দিতে আসলে তার সাথে ফাউস্টের লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে, শেষাবধি তাঁরও মৃত্যু ঘটে। ফাউস্ট ও মার্গারিটার কোলজুড়ে আসে এক সন্তান। মার্গারিটা ঘটনাক্রমে সেই সন্তানকেও পানিতে নিক্ষেপ করে হত্যা করেন। সবশেষে মার্গারিটা(গ্রেনেচ) বন্দি হয়ে কারাগারে যান। তাকে মুক্ত করানোর চেষ্টা করা হলেও, সে মুক্ত হতে চান না। কারাগারকে তিনি পাপ মোচনের সুযোগ বলে মনে করেন। ফাউস্ট পালিয়ে যান।

মাহফুজ আল-হোসেন এর চতুর্দশপদী চিঠিতে ঠিক তেমনই এক ঘটনার অনুশোচনাপ্রসূত প্রেমাখ্যান রচিত হয়েছে। চিঠির প্রথম অষ্টকে প্রকাশ পেয়েছে ফাউস্টের অনুশোচনা ও প্রিয় বিয়োগের মর্মকথা। উঠে এসেছে মার্গারিটা(গ্রেনেচ) এর প্রতি তার ভালোবাসা ও তাকে চিরন্তনভাবে উপলব্ধি করার নিগূঢ় বচন। পরবর্তী ষষ্ঠকে উঠে এসেছে তাঁর পথভ্রষ্ট জীবন ও পাপ পঙ্কিলতা থেকে সে মুক্তিলাভের বাসনা। আর তাই খানিকটা মনের স্বান্ত¡না ও পাপ মোচনের জন্যই মার্গারিটার উদ্দেশ্যে কবির এই কাব্যাপোখ্যান।
“ আমায় তুমি ক্ষমা করোনা গ্রেনেচ, আর করবেই- বা কেন বলো
সবকিছুর জন্য ওই নেড়িকুত্তা মেফিস্টোফেলিস আর ওর প্রলুব্ধকর
শয়তানি জাদুর ওপর দায় চাপিয়ে তোমার ডাগোর কালো ছলোছলো…….
অথচ প্রাচ্যজন মানে : দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য।

বিগত দশকের শেষভাগে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীতেই নেমে এসেছিল এক অর্থনৈতিক মন্দা। পুঁজি বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা বেহাত হয়েছে পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর কাছে। সর্বশান্ত হয়েছে কোটি কোটি মানুষ। পূর্বাপেক্ষা দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হয়েছে, ধনীরা আরো ধনী হয়েছে। পুঁজিবাদের এ দুষ্টচক্রের ফাঁদ থেকে হয়তো মুক্তি মিলবেনা। কিন্তু কবি তার কবিতায় পুঁজিবাদী গোষ্ঠির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বন্ধ রাখেননি। তার শানিত শব্দচয়নে কিছুটা হলেও পুঁজিবাদি গোষ্টির প্রতি ঘৃণাবৃষ্টি বর্ষিত করেছেন। কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকজন ধনকুবের ও কিছু বিশ^খ্যাত কোম্পানির নাম। কবিতাটিতে বিশেদগার সাথে তাদের ফেলা টোপে ধরা দেওয়া মানুষগুলোকেও খানিকটা রম্যের ছলেই বিষেদাগার করেছেন হিসেব নিকেষ নামক কবিতাটিতে-
“ জানি তুই হয়ত স্টকের এন্তার বেসাতি কিংবা/ বেশুমার ফটকাবাজি করে অনেক টাকাকড়ি করেছিস/বাফেট , আম্বানি কিংবা মিত্তালিদের ছাড়িয়ে গেছিস বিত্তে/ আর তাই ভাবছিস আমার মগজের দাম ধরে কিনে নিবি…….
আসলে তুই কেন, তোর বাপ-দাদা, পরদাদারা আর/ পরের জেনারেশনের /তোর পোলাপান নাতিপুতি আর তোদের চৌদ্দগুষ্ঠি যা চেয়েছিল কিংবা চাচ্ছে/ তাই করতে যে ওরা বড় বেশি বাধ্য আর নিরুপায়/ বড়শি গেলা ফিসের টোপে আটকে ফেলা দাসত্ব চুক্তির সারমেয় শৃঙ্খলে।”

মী-টু আন্দোলনের অগ্নীশিখা জ্বলে উঠেছিল এই প্রাচ্য থেকেই। ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারী ও শিশুরা সোচ্চার হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন তথাকথিত সুশীল, সেলিব্রেটি ও মুখোশ পরিহিত নীতিবান মানুষদের। সেই আন্দোলনকে সমর্থন ও একাত্মতা জানাতেই মাহফুজ আল-হোসেন এর কবিতা মি-টু। কবিতার কিছু চরণ উল্লেখ না করলেই নয় “ হায় আফসোস, কী কুক্ষণেই না আমার এ কৌলিনিক খায়েশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো/ যখন সমুদ্র ও সূর্যের মধ্যেকার/ চিরকালীন অসঙ্গত সম্পর্কের অনুচ্চারিত হ্যাসট্যাগ মী-টু’র/ রগ রগে কেচ্ছাকাহিনী জনসমক্ষে ফাঁস করে দিয়ে/ মুখচোরা সবুজ কমলাটে আলোর খোলা প্রান্তরে/শ্বাস নিতে প্রণোদিত হয়েছে প্রবোধের আরোপিত অশ্রæকে/ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা একবিন্দু শিশিরকণার প্রবল প্রশ্রয়ে।

দর্পন নামক কবিতাটি আমরা সক্রেটিসীয় দর্শনের একটা প্রভাব দেখতে পাই। এবার আমাদের জানতে হবে সক্রেটিসীয় দর্শনের মূল ভাবটি কী। নিজেকে জানার যে অসীম চাহিদা মানুষের ভেতরে বিদ্যমান তা কী কেবলি কল্পজ্ঞানপ্রসূত কোন ধারনা নাকি তা প্রত্যয় নির্ভর, জ্ঞান আরোহযুক্তি সঞ্জাত, বিচার বুদ্ধি বিবেচনায় অর্জিত কোন বাস্তবিক ক্রিয়ার ফল। মাহফুজ আল-হোসেন দর্পন নাম কবিতায় শব্দের নান্দনিক বিন্যাসে এমনই কিছু কথা তুলে এনেছেন ঠিক কবে দর্পনে নিজের মুখ দেখেছি মনে আসছে না……..
ঠাহর করতে পারি অ্যাদ্দিনে নিজের চেহারা অনেকটা
বয়েসি বটগাছের রূপ পরিগ্রহ করেছে;
প্রাজ্ঞতার মাটি ছুঁই ছুঁই ঝুরি দুপাশে ঝুলছে কিনা
সেটা নিয়ে তর্ক চলতে পারে।

অথবা এই চরণগুলোতে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র বাসনার কথা ব্যক্ত হয়েছে
আর আমিও না জানি কী ভেবে নীরব অনুসমর্থনের
ঋানধরা ভাবগাম্ভীর্যেও মুখমণ্ডল সজ্ঞানে সরিয়ে
রেখেছি সত্যদর্শী আয়নার আছর থেকে।

পাশ্চাত্যের সাহিত্য ও দর্শনের ডামাডোলে কবি হৃদয় সাহিত্যের কোনরুপটি গ্রহণ করবে কোনটি বর্জন করবে তা নিয়ে দ্বিধান্¦িত ও সংশিত। কবির এই সংশয়বাদিতা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আমি যে কোথায় ছিলাম এ কবিতাটি। কবিতার শুরুটি চটুল স্বাভাবিক কথোপকথন দিয়ে শুরু হলেও বাকী স্তবকগুলোতে বিস্তার ঘটেছে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কথা। কবিতার প্রথম চার চরনের কথা উল্লেখ না করলেই নয়Ñ তুমি নাকি আজ সকালে আমায় দেখেছো আমার অর্ধেক বয়েসি / উদ্ভিন্নযৌবনা অচেনা তরুণীর সাথে রিকশায় ঘনিষ্ঠ যাত্রায়; / অথচ সেসময় লেখার টেবিলেই থাকার কথা ছিল কিংবা / পাশ্চাত্য সাহিত্য দর্শন অথবা উত্তরাধুনিক কবিতার নতুন মাত্রায়।

কবিতা কী শুধুই শব্দের খেলা? নাকি তাতে কখনো কখনো শব্দের আড়ালে থাকে জীবনবোধের পরম বাণী।
মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ে যাচ্ছে আমৃত্যু। কখনো মানবসৃষ্ট যুদ্ধ আবার কখনোবা প্রাকৃতিক যুদ্ধের সাথে লড়তে লড়তে ক্লান্ত নিথর দেহটাকে লুটিয়ে দেই কোন একঘরে। সে ঘরের সীমা পরিসীমা কখনো পরিমাপ করে দেখা হয়নি। মানুষ আসলে কতটুকু জায়গা নিয়ে ঘর বানিয়ে তুষ্ট থাকতে চায়। এই বিশ^গৃহে সে কতটুকু জায়গায় নিজের অস্তিত্বকে জানান দিবে। ঘরের খোঁজে ঘর হারা হয়ে মানুষের এক অনন্ত যুদ্ধ। নিজের প্রয়োজনে এই বিশ^ চরাচরকে একটা ঘরে রুপান্তর করেছে। ঘরলোভী মানুষগুলো বেঘর করছে অন্য মানুষদের, লিপ্ত হচ্ছে মরনযুদ্ধে। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনে পৃথিবীর ছোট ছোট জাতি ও দেশগুলো হচ্ছে গৃহহীন ভাসমান। কবির ঘর নামক কবিতায় এমনই কিছু ইঙ্গিত প্রকাশ এসেছে “ শামুকেরা খুঁজে পেয়েছে আবদ্ধ ঘর ঘেরাটোপে;/ অনেকে হয়েছে নির্ঘর যুদ্ধবাজের ছোঁড়া তোপে। মৎসলোভে ঘর ছেড়ে কারো বাড়ি মাঝ-দরিয়া; /অপরকে করতে বেঘর কেউ কেউ ভীষণ মরিয়া।

মধ্যযুগের কাব্যে ঈশ^র বন্দনার বিলুপ্তি ঘটিয়ে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের সূচনা করেছিলেন কবি আবদুল হাকিম, বড়ু চণ্ডীদাস, কায়কোবাদ প্রমুখ। এরপর থেকে বাংলা কবিতার বিশাল একটা অংশ জুড়ে ঠাই পেয়েছে। দেশপ্রেম, সংগ্রাম, প্রকৃতি সর্বোপরি দেশমাতার অপরূপ সৌন্দর্যের বাণী। মাহফুজ আল-হেসোন এর সমুদ্রের যাত্রী কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে পরম মমতার আবরণে শব্দের বিন্যাসে লেখা দেশপ্রেমের বাণী। মানুষের সাথে মানুষের মিতালী। যেন আমরা সবাই এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে একই পথের যাত্রী। বাংলার মুক্তাকাশে আমরা সবাই একই নোঙরের সমুদ্র যাত্রী।
যে কথাগুলো আপনাকে অবশ্যই আবেগতাড়িত করবেÑ“ অনেক দূরের স্টেশনের যাত্রী আমি আমরা;/ভালোবাসার ট্রেনের কনফার্ম টিকিট কেটেছি / তোমার তোমাদের সকলের মহার্ঘ্য বিশ্বাস জিতে; / যাতে নতুন সকালে দোয়েলের সাথে খালি গলায় / একাত্তরের মতো একত্রে আবার গেয়ে উঠতে পারি;/ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

এছাড়া তার দুঃখের জয়গান, একটু পরেই প্রভাত, তারামন, বোনের কালশিটে পড়া শাড়িটি এই চারটি কবিতায় তিনি আলোকপাত করেছেন মুক্তিযুদ্ধ, বিপ্লব ও নতুন দিনের আগমনী বার্তা। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তারামন বিবি ও ভাস্কর প্রিয়ভাসিনীর প্রতি সম্মান জানাতে লিখেছেন তারামন ও বোনের কালশিটে পড়া শাড়িটি এ কবিতাদুটো। অনেক দুঃখ, ত্যাগ ও তিতীক্ষার পরে আমাদের এ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। তার গৌরবগাঁথা প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতাগুলোতে। এছাড়াও মৌলিক কবিতাগুলোতে লিখেছেন কিছু গুচ্ছ কবিতা।

প্রতীচ্যের বিউগল এর কাব্যানুবাদ অংশের কবিতাগুলো কাব্যগ্রন্থের একটি স্বকীয় সতন্ত্রতার সৃষ্টি করেছে। মৌলিক কবিতার পাশাপাশি পাশ্চাত্যের মৃত্যু ভাবনা বিষয়ক কবিতাগুলো দান করেছে আলাদা মাত্রা ও সৌন্দর্য। মৃত্যু কেবল জীববিদ্যা কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণা নয়। এই মৃত্যু চিন্তাকে উপলক্ষ করেই প্রাচীন কাল থেকেই উদ্ভব হয়েছে নানা ঐশ^রিক মতবাদ, দর্শন ও সাহিত্য। প্রাচ্যের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রাচ্যের কবিতায় প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যাথা, জন্মান্তরবাদ, পরমাত্মা কিংবা স্রষ্টার সাথে মিলিত হবার উদগ্র বাসনা , অদৃষ্টবাদ, অনিশ্চয়তা মৃত্যুভয়, পরলৌকিক জীবন , বিচার ও মুক্তি প্রধান উপজীব্য। পর্তুগীজ,স্পেনীয়, ইতালীয়, সুইডিশ এবং পোলিশ ভাষায় রচিত পাঁচটি কবিতার অনুবাদ রয়েছে এই অংশে।

আমি মৃতদের অনুভব করি কবিতায় পর্তুগীজ কবি সোফিয়া ডি মেলো ব্রেইনার এন্ডারসন মৃত্যুকে দেখেছেন এক অনন্ত যাত্রার প্রাথমিক স্তর রূপে। মৃত্যুর পরে তার দেহ আত্মায় রুপান্তরিত হয়ে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে বিচরণ করবে। দার্শনিক হিরাক্লিটাসের মতবাদের সাথে তার কাব্যচিন্তার কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। হিরাক্লিটাস এর মতে- বিরুদ্ধভাবাপন্ন শক্তির প্রভাবে আত্মা তার আদিম অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশ জীবদেহে প্রবেশ করে। প্রথমে উদ্ভিদ, এরপর ইতর প্রাণি এবং সবশেষে মানুষ। তিনটি স্তরের মাধ্যমে আত্মার পর্যায়ক্রমিক উন্নতি ঘটে। এন্ডারসনের কবিতায় মৃত্যুনুভূতির ব্যাখ্যা অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যাখ্যায়িত হয়েছে মাহফুজ আল-হোসেন এর কাব্যগ্রন্থে। কবিতার যে স্তবকগুলো কথা উল্লেখ করা আবশ্যক।
“ আমি মৃতদের অনুভব করি বেগুনি ঠান্ডায়/ এবং চাঁদের প্রগাঢ় আবছায়ায়/ পৃথিবী পরিনত পরিণত হয়েছে এক প্রেতাত্মায়/ সে নিজেই দোলাবে সকল মৃত্যুকে নিজের মধ্যে ………আমি জানি আমি প্রদক্ষিণ করতে থাকি মুক মৃতদের চারদিকে এবং নিজের মধ্যে ধরে রাখি নিজের মৃত্যুকে/ কিন্তু আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে অসংখ্য অস্তিত্বের মধ্যে / এ জীবনে মরেছি আমি অনেকবার / চুম্বন করেছি নিজের প্রেতাত্মাকে বহুবার।

স্প্যানিশ কবি এঞ্জেল গনজালেজ মুনিজ এর কবিতা মৃতদের বিরুদ্ধে বিষেদাগার কবিতাটিতে মূলত মৃতদের বিষেদগারের জন্য নিক্ষেপিত ভাষার অন্তরালে তাদের প্রতি নিবিড় ভালোবাসাই প্রকাশ পেয়েছে।
“মৃতেরা সব স্বার্থপর:/ তারা আমাদেরকে কাঁদায় এবং কোনো পরোয়া করে না/ তারা চুপচাপ পড়ে থাকে একেবারে বেকায়দা জায়গায়…….. সংবেদনহীনতা , দূরবর্তী থাকা, একগুঁয়েমিপূর্ণ আচরণ, শীতলতা/ঔদ্ধত্য ও নীরবতা দিয়ে/
এরা উপলব্ধি করতে পারেনা কী সর্বনাশই না তারা করে থাকে।

বিশ^খ্যাত পোলিশ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মারিয়া ভি¯øাভা আনা শিম্বোর্স্কা এর যুদ্ধ ও সন্ত্রাস বিষয়ক পাঁচটি কবিতার অনুবাদ স্থান পেয়েছে কাব্যানুবাদ অংশটিতে। তার শেষ এবং শুরু কবিতাটির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী একটি দেশকে বিনির্মানের জন্য যে শ্রম ব্যয় করতে হয় জীবিত থাকা জাতিকে। দেশকে যুদ্ধমুক্ত করার চেয়েও যেন তা আরো কষ্ট সাধ্য হয়ে ওঠে। অনেকটা ভাঙা সহজ, গড়া কঠিন এই প্রবাদ বাক্যের মতো। যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেশকে লÐভÐ করে দেয়া যতটা সহজ কিন্তু ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজের স্বজনের লাশ, স্বদেশী, স্বভাষী মানুষের লাশ সরানো ততটাই কঠিন।
“ প্রতিটি যুদ্ধের শেষে কাউকে না কাউকে
পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ভার নিতে হয়
কেননা পরে থাকা জিনিসগুলো তো আর
নিজ থেকে উঠে আসে না। ……
কাউকে না কাউকে হাতঝাড়– দিতে দিতে
স্মরণ করতে দেখা যায়
এ শহরটা কেমন ছিল আগে।”

মাহফুজ আল-হোসেন এর প্রতীচ্যের বিউগল কাব্যগ্রন্থের তিনটি অংশতেই প্রকাশ পেয়েছে ভিন্ন স্বাদের ও ভিন্ন মাত্রার কিছু কবিতা। যা প্রাচ্যের কাব্য ভাবনার সাথে আমাদের দেশীয় কাব্যধারার এক মেলবন্ধন তৈরি করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। যা একই সাথে পাশ্চাত্যের সুরে দেশীয় উত্তরাধুনিকতার স্বার্থক নিরীক্ষা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।