কর্ণফুলির গল্প বলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুজিত চট্টোপাধ্যায় (পর্ব – ৫)
by
·
Published
· Updated
নীলচে সুখ
মিনিট দশেক এভাবেই কেটে গেল। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসছে। গাড়িতে এভাবে কতক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকা যায়। ড্রাইভারটা গেল কোথায় ? একেবারে নিপাত্তা। কিছু বলেওনি। নাকি বলবার প্রয়োজন বোধ করেনি ? সে বিচার পরে করা যাবে।
আপাতত এই অবস্থা থেকে রেহাই পেলে হয়। ভাগ্যিস ছেলে গুলো সঙ্গে আছে। তবু খানিকটা ভরসা। খানিকটা কেন ? এই মুহূর্তে ওরাই একমাত্র ভরসা।
ড্রাইভার সিটের দরজাটা খুলে গেল। একটা মুখ উঁকি দিলো। এটা ড্রাইভারের সঙ্গীটা। হিন্দি ভাষায় যা বললো , তার তর্জমা করলে যা দাঁড়ায় , সে খবর নতুন কিছু নয়। তবে একটা স্বস্তির কথা শোনালো। ওরা একটা লজে রাতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে।
যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। মিসেস রায় , স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন , ওফ্ফ। বাঁচালে বাবা। কিন্তু সেটা কতদূরে ?
সামনেই , নেমে আসুন। ব্যাগপত্র সব আমরা নিয়ে আসছি। আপনারা ওই লোকটার সঙ্গে যান। এটা তন্ময়ের গলা। বাকি ছেলেগুলোর গলাও পাওয়া যাচ্ছে।
বোঝাগেল ছেলে গুলো সবকিছু দেখেশুনেই এসেছে।
একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি। রাস্তা থেকেই সরু খাড়াই সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। পরপর পাশাপাশি দুটো ঘর। ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বেলে ঘরে ঢুকলেন প্রফেসর। আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন।
ঘরে একটা চওড়া চৌকি , তারওপর একটা অতি নোংরা বিছানা পাতা। একটা কাঠের টেবিলের মাঝখানে বিয়ারের খালি বোতল। বোতলের মুখে একটা লম্বা মোমবাতি গোঁজা। বিদ্যুৎ নেই। রাত্রি যাপনের নিরুপায় আশ্রয়।
প্রফেসর , পকেট থেকে লাইটার বের করে মোমবাতি টা জ্বালিয়ে দিলেন। আলোছায়ার ভূতুড়ে পরিবেশ।
ঘরের মধ্যে একটা বিশ্রী ভ্যাপসা গন্ধ। একটা জানালা আছে, কিন্তু সেটা বন্ধ। বেশ বোঝা যাচ্ছে , এঘরে অনেকদিন কেউ প্রবেশ করেনি। ঘরের মেঝেতে ধুলো ভর্তি। নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়াও হয়না।
মানালি জানালাটা হাট করে খুলে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ বৃষ্টি ভেজা বিশুদ্ধ বাতাস , সরলবর্গীয় বৃক্ষের মনমাতানো গন্ধ নিয়ে হুহু করে ঘরে ঢুকে, সমস্ত মলিনতা ধুইয়ে দিলো।
প্রফেসর দেওয়ালের গায়ে আরও একটা দরজা দেখতে পেলেন। হাতল ধরে টান দিতেই খুলে গেল। প্রফেসরের ঠোঁটে হালকা খুশির ঝিলিক। ওটা বাথরুম।
যাক নিশ্চিন্ত। রাতেরবেলা বাথরুম সারতে অন্তত বাইরে যেতে হবে না। সত্যি বলতে কী ওরা এতকিছু আশাই করেনি। এই অচেনা অজানা অন্ধকার পাহাড়ের রাস্তায় রাত্রিবাস করতে হচ্ছেনা , এটাই সবচাইতে বড় পাওয়া। আর ওদের দৃঢ় বিশ্বাস , এইসব কিছুই পাওয়া সম্ভব হতোনা , যদি এই ছেলেগুলো না থাকতো।
ছেলেগুলো ব্যাগ গুলো নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে পরেছে। সম্মিলিত গলার আওয়াজ বুঝিয়ে দিচ্ছে , ওরা এই আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনায় বেশ মজা পেয়েছে। নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরে , বাড়তি পাওয়া রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এটা বয়সের ধর্ম। অথচ , একই ঘটনায় , রায় দম্পতি দিশাহারা।
ড্রাইভারের সঙ্গী আবার এসে জানিয়ে গেল ।
কাল সকালে রাস্তা ঠিকঠাক হলে , আবারও রওনা দেওয়া হবে। ততক্ষণ এখানেই থাকতে হবে।
বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে। আকাশ একেবারে পরিস্কার। আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারেই নেই। আকাশ ময় ঝলমলে তারা দের ভীড়। আর এই সদ্য স্নান সেরে ওঠা পাহাড় সুন্দরী , আরও রূপবতী রাজকন্যা হয়ে সেজে উঠেছে , চাঁদের রুপোলী আলোর ঝর্ণা ধারায়।
দূর থেকে একটা গান ভেসে আসছিল। মেয়েদের গলা।
নীল ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছিলো।
মানালি দেখতে পেয়ে পিছন থেকে ডাক দিলো,,
নীল, কোথায় যাচ্ছো ?
নীল, মানালির দিকে তাকিয়ে বললো ,,, কোথাও না,, এমনিই এই সামনে একটু,,,
কেজানে কেন , মানালি বললো,,, আমিও যাবো।
ওর এই বলার ভঙ্গিতে কেমন যেন একটা আবদার লুকিয়ে ছিল।
কিছু না ভেবেই নীল বললো ,,, এসো।
মানালি সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চিৎকার করে তার মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,,,,,, মা আমি এক্ষুনি আসছি।
মিসেস রায় , ঘর থেকে সেই আওয়াজ পেয়ে বললেন,,, কোথায় যাচ্ছিস ?
মানালি সে কথার কোনও উত্তর দিলো না। সিঁড়ি বেয়ে একেবারে রাস্তায় চলে এলো। ভিজে রাস্তার ওপর চাঁদের আলো। চারিদিক জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। উঁচু নিচু পাকদণ্ডী পথে দুটি তরুণ তরুণী। এগিয়ে চলেছে সেই দূর থেকে ভেসে আসা গান অনুসরণ করে।
সঙ্গে আছে ঝিঁঝি পোকার তান আর একরাশ উচ্ছ্বাস ভাললাগা।