T3 || বাণী অর্চনা || বিশেষ সংখ্যায় সুধাংশু চক্রবর্তী

ছোটকা ঠিকই বলেছেন
সকলেই মেতে উঠেছে বাণী বন্দনায় । দোকানিরাও বাজারে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে বিভিন্ন আকারের অগুনতি মা সরস্বতীর মাটির মুর্তি । এবছর পুটুসদের বাড়িতেও সরস্বতী পুজোর আয়োজন করা হয়েছে । কেন না এবছর এই বাড়িরই পুটুস নামের পাঁচ বছরের কচি ছেলেটির হাতেখড়ি দেওয়া হবে ।
ছোটকা নিজের হাতে বাইরের ঘরটা সাজাবেন রঙ্গিন কাগজের সেঁকল দিয়ে । এই ঘরে দুটো দরজা রয়েছে । একটা সম্মুখ দিকে এবং অপরটা পিছন দিকে । খুব প্রয়োজন ছাড়া পিছন দিকের দরজা সচরাচর ব্যবহার করা হয় না । তবু দিনরাত খোলাই থাকে ওই দরজা ।
আজ বিকেল থেকে আগামী তিন দিন ওই দরজা আর খোলা হবে না । কারণ ওই দরজার সম্মুখেই মা সরস্বতীর মূর্তি বসানোর কথা ভাবছেন ছোটকা । সেকারণেই সাদা একটা পরদা ঝুলিয়ে দিয়েছেন ওই দরজা এবং সংলগ্ন দেয়াল জুড়ে । এরপর টুনিবাল্বের ঝালরে সেজে উঠবে ওই পরদা । পুটুস চোখ পিটপিট করে দেখে চলেছে ছোটকার কাণ্ডকারখানা ।
বাড়িতে সরস্বতী পুজো হতে চলেছে বলে পুটুসের আনন্দ দেখে কে । পাঁচ বছরের কচি ছেলেটা যেন এক দিনেই পঞ্চাশ ছুঁয়ে ফেলেছে ! কোমরে হাত দিয়ে কখনো একে ধমকাচ্ছে তো পরমুহূর্তেই তার ওপর বেজায় হম্বিতম্বি করছে । ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখে মা মুখ টিপে হাসছেন । বাবা বারকতক এসে কড়া চোখের ঝলকানি দিয়ে ছেলের আনন্দের পায়ে বেড়ি দিতে চেষ্টা করলেও ওই বেড়ি ভাঙতে কতক্ষণ ? অতএব খানিকক্ষণ বাগে থাকার পরই পুটুস আবার যে কে সেই আগের পুটুস । অগত্যা বাবাকেই একসময়ে হাল ছেড়ে দিয়ে গিয়ে ঢুকতে হলো চানঘরে । অফিসের তাড়ার যে বড় বালাই ।
ঘর সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছেন ছোটকা । এই ঘরে সেই কাজেরই সরঞ্জাম এক এক করে এনে জড়ো করছেন তিনি । পুটুস কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে ছোটকার কাজ । মাঝেমধ্যে কচি তর্জনি তুলে নির্দেশও দিচ্ছে ছোটোকাকে । ছোটকা হাসতে হাসতে ‘জী হুজুর, হ্যাঁ হুজুর…’ ইত্যাদি করে চলেছেন হাতের কাজ না থামিয়ে । কিন্তু অতিব্যস্ত পুটুসের অত সময় কোথায় শুধু একটা কাজ নিয়ে পড়ে থাকবে ? অতএব ওকে আবার দেখা গেল এর-তার ওপর ছড়ি ঘোরাতে ।
ছড়ি ঘোরাচ্ছে কাদের ওপর ? না, বাড়ির দুটি পোষ্য প্রাণীর ওপর । একটা, বড় বড় লোমে ঢাকা বাবার সাধের পোষ্য ভালুয়া । নামেই ভালুয়া । আসলে মাস ছয়েকের একটা পাহাড়ি কুকুর । বাবা এনেছেন কার্শিয়াং থেকে । দ্বিতীয়টা, মায়েরই পোষ্য বিড়াল মিনু । সে নিজেই এসে জুটেছে এই বাড়িতে ।
পুটুসের হম্বিতম্বির ঠ্যালায় বেচারা ভুলুয়াকে দুর্দারিয়ে সেঁধিয়ে যেতে হচ্ছে বাবার খাটের তলায় । মিনু পালানোর পথ খুঁজে না পেয়ে এক লাফে উঠে বসছে পাঁচিলের ওপর । ওখানে বসেই মুখে ‘মিঁয়াও-মিঁয়াও’ আওয়াজ তুলে অভিযোগ জানাচ্ছে মাকে । মা পড়েছেন মহা সমস্যায় । ভেবে পাচ্ছেন না কাকে সামলাবেন । ছেলেকে, নাকি মিনুকে ?
বাবা অফিসে যাবার আগে ছোটকাকে ডেকে বললেন – আমার একদম সময় হবে না বাবলা । আজ বিকেলে তুই বরং দেখেশুনে একটা সরস্বতীর মুর্তি নিয়ে আসবি বাজার থেকে । সঙ্গে পুজোর সামগ্রী কিনে আনতে ভুলিস না যেন । কিরে, পারবি তো ? নাকি আমাকেই অফিস থেকে ফিরে এসে…
বাবার কথার মাঝেই পুটুস আচমকা আবদার ধরে বসলো – আমিও ছোটকার সঙ্গে বাজারে যাবো ।
পুটুসের কথা কানে না তুলে ছোটকাকে আর যা যা নির্দেশ দেবার সেসব দিয়েথুয়ে বাবা চলে গেলেন অফিসে । বাবা বাজারে যাবার অনুমতি না দেওয়ায় এক দলা কান্না এসে ভিড় করে পুটুসের গলার কাছে ।
ও যখন কান্নাগুলো উগড়ে দেবো দেবো করছে, মা তখনই এসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বললেন – আমার সোনা যখন বাজারে যাবে বলেছে তখন নিশ্চয়ই যাবে । তবে সোনা, তোমাকে কিন্তু ছোটকার হাত ধরে থাকতে হবে । কখনো ছাড়া চলবে না । কি মনে থাকবে ?
বাজারে যেতে পারবে সেই আনন্দে মায়ের গালে ‘চকাস্’ করে একটা হামি দিলো পুটুস । বিকেলে ছোটকার হাত ধরে বাজারে চললো পুটুস । ছোটকার বাইকে চেপে যেতে চাইছিলো । কিন্তু বাজারটা যে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথের দূরত্বে । অতএব অনিচ্ছাতেও ছোটকার হাত ধরে যেতে হচ্ছে ওকে । বলা ভালো ছোটকাই বরং ওকে ধরে আছেন শক্ত হাতে ।
বাজারে যাবার পথেই দেখা হয়ে গেল মানদামাসির ছেলে গুড্ডুর সঙ্গে । গুড্ডু ওর খেলার সঙ্গী । মানদামাসি যখন কাজে আসে গুড্ডু তখন মায়ের সঙ্গে এসে পুটুসের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকে । পুটুসের আবদারে কখনো ঘোড়া কিম্বা হাতী, কখনো বা হাসির খোরাক হতে চেয়ে জোকার কিম্বা বেত খাওয়া ছাত্র সাজতে হয় গুড্ডুকে ।কখনো বা বল কুড়িয়ে এনে পুটুসের পায়ের কাছে রেখে দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য রাখতে হয় পরের বলটা কোনদিকে যাবে । সেদিকে ছুটে গিয়ে কুড়িয়ে এনে আবার রাখবে পুটুসের পায়ের কাছে ।
গুড্ডুকে মন