।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সুধাংশু চক্রবর্তী

শরতকালের আবহে

সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠোনে পা রেখে, আকাশে পেজা তুলোর মতো টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে থাকতে দেখেই গোমস দৌড়ুলো টগরী নদীর দিকে । ওই নদীর ধারেই যে মাঠ জুড়ে ফুটে থাকে সাদা সাদা কাশফুল । এখুনি ছুটে গিয়ে সেখান থেকে কাশফুল তুলে এনে, খেলার সাথীদের হাতে গুঁজে দিতে দিতে বলবে…
সাতসকালে হাতে ফুলের সাজি নিয়ে হাসিরানী গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছিলো প্রতিবেশী করিমচাচার বাড়ির দিকে । ওদের বাগানের শিউলিগাছটা এই শরতেই ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে । এবং মৌমাছিদের আনাগোনার ধূম লেগে যায় । গাছের গোড়ায় ঝরে থাকা ফুল কুড়োনোর মজাই আলাদা । সেই মজা লুটবে বলেই না গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছে সেদিকে । গিয়ে দেখে, গাছতলায় ঝরে থাকা শিউলি ফুল কুড়িয়ে নিজের ওড়নায় জড়ো করছে করিম চাচার মেয়ে নাজিয়া ! দেখে অবাক হয়ে বান্ধবীকে শুধোয়, শিউলিফুল কুড়োচ্ছিস !
কেন, মানা আছে নাকি ?
না-না, তা কেন হবে । ফুলগুলো নিয়ে গিয়ে নিশ্চয়ই ঘরে সাজিয়ে রাখবি ? এই ফুল যে তোদের আরাধনায় লাগে না নাজিয়া ।
আমাদের না লাগুক, তোদের আরাধনায় তো লাগে হাসিরানী । আমি নাহয়, কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসবো পাড়ারই শিব মন্দিরে । নাজিয়া হাসতে হাসতে জবাব দেয় ।
মন্দিরে দিবি ! বামুনদাদু গ্রহণ করবেন তোর ছোঁয়া ফুল ?
তাহলে অঞ্জলি দিয়ে আসবো মন্দিরেরই গায়ে । ভাববো, আল্লাহ’কে নিবেদন করলাম । জানিস, আপা না খুব দামী একটা কথা বলেছেন আমাকে ।
কি বলেছেন চাচী ?
তোদেরই পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ নাকি বলে গেছেন, ঈশ্বর-আল্লাহ-গড, যারই আরাধনা করি না আমরা, সবারই আরাধনা গিয়ে পৌঁছোয় সেই একই জায়গায় । কথাটা খুবই দামী, তাই না হাসিরানী ?
হাসিরানী অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, নাজিয়ার মুখটা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে মাদুর্গার মুখে ! সহসা গোমস এসে ওদের হাতে একটা করে কাশফুলের গোছা ধরিয়ে দিয়ে বলে, শরৎকাল এসেছে রে, শরৎকাল । তাই তো কাশফুল নিয়ে এলাম তোদের জন্য ।
কাশফুল পেয়ে নাজিয়া আনন্দে নৃত্য জুড়ে দেয় । গোমস নাচতে নাচতেই বলে, কি মজা-কি মজা । এবার আমিও বাবার সঙ্গে ঢাক বাজাবো পূজো মণ্ডপে ।
দু’চোখ ভরে ওদের নৃত্য দেখতে দেখতে হাসিরানী ভাবে, কি অদ্ভুত এই শরতকাল ! কেমন অবলীলায় ভুলিয়ে দেয় ধর্মান্ধ মানুষদের চিরকালীন ভেদাভেদ !
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।