সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ২৮)

জন্ম কলকাতায়(২৭ নভেম্বর ১৯৮০)।কিন্তু তার কলকাতায় বসবাস প্রায় নেই।কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়ান গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।সেখান থেকেই হয়তো ইন্ধন পেয়ে বেড়ে ওঠে তার লেখালিখির জগত।প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আকাশপালক "(পাঠক)।এর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হলো শিকারতত্ত্ব(আদম), আড়বাঁশির ডাক(দাঁড়াবার জায়গা), জনিসোকোর ব্রহ্মবিহার(পাঠক), কানাই নাটশালা(পাঠক),বহিরাগত(আকাশ) ।কবিতাথেরাপি নিয়ে কাজ করে চলেছেন।এই বিষয়ে তার নিজস্ব প্রবন্ধসংকলন "ষষ্ঠাংশবৃত্তি"(আদম)।কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্য ও গল্প লিখতে ভালোবাসেন।প্রথম উপন্যাস "কাকতাড়ুয়া"।আশুদা সিরিজের প্রথম বই প্রকাশিত "নৈর্ব্যক্তিক"(অভিযান)।'মরণকূপ' গোয়েন্দা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অভিযান,যদিও তার বিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে সে একেবারেই স্বতন্ত্র।এই সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস 'সাহেববাঁধ রহস্য '(চিন্তা)।সম্পাদিত পত্রিকা "শামিয়ানা "। নেশা মনোরোগ গবেষণা,সঙ্গীত,অঙ্কন ও ভ্রমণ ।

বিন্দু ডট কম

অখিলেশের সঙ্গে তরুলতার সম্পর্ক না থাকলেও তার প্রজাপতির বইটির সঙ্গে তরুলতার এক অমোঘ বন্ধন তৈরি হয়েছে।হয়তো সাদা কাগজে সেঁটে থাকা প্রজাপতিদের নিথর দেহগুলো দেখতে দেখতে তরুলতার নিজের কথা মনে হয়।দিন কাটে।পিয়ালি সেন কাজ করে চলে ব্যাঙ্কের অফিসে।আর তরুলতা অখিলেশের প্রজাপতি খাতায়।সেই প্রথম দিনের মানুষটা কেমন ছেলেমানুষের মতো প্রজাপতি দেখলেই দৌড়ে যেত।সেই মানুষটা এই কদিনে অনেক বদলে গেছে।এখন আর তার মধ্যে ছটফটানি নেই।তরুলতার কাছেও আর আসে না তেমন।হয়তো জেনেবুঝেই তরুলতার কাছে ওই খাতাটা ফেলে গেছে সে।ছুটির দিনগুলো তরুলতা মাঝেমাঝেই পরশুরামকে ডেকে নেয়।পরশুরাম তাকে শালবনির ভিতর ভিতর জয়ফুলির মতো কতো অজানা গ্রাম,নদী পথ আর ফুলের কথা বলে।তরুলতা তমাল নদী চিনতে পারে,পারাং নদী,কর্ণগড়,গনগনিডাঙা।অফিসের দিনগুলোয় পিয়ালি গোপন ফাইলে অচেনা ট্রানস্যাকশান মিলিয়ে চলে।আর তরুলতার মন পড়ে থাকে ঘরে।কখনো তিরাপ,কখনো দারচিন।ফিতেপলাশের দীর্ঘ পুচ্ছ আর তিলকমাটি অনুসরণ করতে করতে অজান্তেই তরুলতার হাত চলে যায় তার তলপেটে।নাহ।যে মূককীট ফিকে সবুজের মতো তার দেহে বেড়ে উঠছে,সে অখিলেশের কেউ নয়।সে একান্ত তরুলতার।আর?আর শুভব্রতর।
শুভব্রত আর মেসেজ করে না।কিন্তু তরুলতা বুঝতে পারে সে এখন পত্রিকা নিয়ে আনন্দে আছে।তরুলতা বোঝে,শুভব্রতর দোয়াব ওই প্রজাপতিখাতার মতো শবাধার নয়।শুভব্রত লেপিডপটেরিস্ট হতে পারবে না কখনো।তরুলতা জানে একটা পিঁপড়ে আঙুলে পিষতে গেলেই তার হাত কাঁপে।আজকাল অফিসে ঋতবানকেও দেখা যায় না তেমন?কোথায় থাকে ছেলেটা কে জানে?করম সিংও আর গ্রাম থেকে ফেরেনি।কে জানে তার মেয়ে লছমি,স্টেশনমাস্টার দামাদ আর জোড়া নাতিনাতনিকে নিয়ে হয়তো সে চিরকালের জন্য দেশেই রয়ে যাবে।ঝোড়ো হাওয়ার মতো মাঝেমাঝে অবন্তিকার কথোপকথন তার অলোক ছুঁয়ে দেয়।অবন্তিকার কাছ থেকে সে জানতে পারে লকডাউনে কতো মানুষ কাজ হারাচ্ছে রোজ।আবার ভাইরাস ধীরে ধীরে কেমন দুর্বল হয়ে পড়ছে।অবন্তিকার জীবনীশক্তি খানিকক্ষণের জন্য তরুলতাকে জীবন্ত করে দেয়।এরই মধ্যে একদিন ব্যাঙ্কের কর্মীদের ভ্যাকসিনের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ।অখিলেশ আজকাল তরুলতাকে এড়িয়ে চলে।তরুলতা মুক্তি চেয়েছিল বলে কি সে সত্যিই তাকে মুক্তি দিল?সে জানে,তার নাগপাশ থেকে তরুলতা মুক্তি পেলেও পিয়ালি সেন কোনও দিন মুক্তি পাবে না।গতকাল বড় রকমের টাকা ঢুকেছে অ্যাকাউন্টটায়। শালবনিতে রিসর্টের প্রোজেক্টটায় কাজ শুরু হয়ে গেছে।মোট সাড়ে তিনশো গাছ কাটা পড়বে এই প্রোজেক্টে।বনবিভাগ,সরকারি নির্দেশ পেরিয়ে কী ভাবে এই প্রোজেক্ট স্যাংশান হলো তরুলতা জানে না।সে এটুকুই জানে,সমরজিত দলুই আর অখিলেশ চৌধুরীর হাত অনেক লম্বা।কিন্তু তরুলতা আর সেসব নিয়ে ভাবে না।এমনকি অখিলেশের মোবাইলবন্দি তার ওই ভিডিওগুলোও তাকে ভয় দেখাতে পারে না আর।
ভ্যাকসিনের দিন এক এক করে সকলের সুযোগ এল।কিন্তু তরুলতা ভ্যাকসিন নিল না।কেন নিল না?তার কী মৃত্যুভয় নেই?নাকি তার মনে ক্রমশ জায়গা করে নিয়েছে সংশয়।এই ভ্যাকসিন নিয়ে চারপাশে কতো গুজব।যদি তার ভিতরের ছোট্ট পিউপাটার কোনও ক্ষতি করে ভ্যাকসিনটা।অথচ কারোকে সেকথা বলতেও পারছে না তরুলতা।কী বলবে?তার স্বামী কলকাতাবাসী,একথা সবাই জানে।অখিলেশ চৌধুরীর সঙ্গে তার সম্পর্কর কথা কতোজন জানে,একথা অবশ্য তার অজানা।মনে মনে বোঝায় নিজেকে।থাক নাহয়।ওই যে সাড়ে তিনশো শাল পিয়াল।ওদের তো ভ্যাকসিন নিতে দিল না কেউ।শহরের আর্বান বাউলদের জন্য তৈরি রিসর্টের জন্য ওদে শহীদ হওয়া কী কেউ আটকাতে পারলো?মরলে মরবে সে।দরকার হলে দ্বিগুণ সাবধান হবে।তার এই অবুঝ সিদ্ধান্তর বৈজ্ঞানিক দায় তরুলতার নেই।
সারাটা দিন জ্বর বলে কাটিয়ে দিল ঘরে।একজোড়া ইন্ডিয়ান রেড লেসউইং দেখছিল তরুলতা।তাদের মতো তরুলতারও রোদ্দুর পছন্দ।তাদের মতো তরুলতারও আজ পাহাড় যেতে ইচ্ছে করছে।সেই পাহাড়ের কথা ভাবতে ভাবতেই যেন চোখ লেগে গিয়েছিল তার।ঠিক তখনই সদরদরজার বেলটা বেজে উঠল সজোরে।তবে কি অখিলেশ!নাকি ব্যাঙ্কের কেউ?তার জ্বরের অজুহাত ধরা পড়ে গেল নাকি?ভাবতে ভাবতেই পেটিকোটের উপর সালোয়ারের ওড়না চাপিয়ে তরুলতা দরজার দিকে এগোয়।দরজা খুলতেই তার কৌতূহল বদলে যায় বিস্ময়ে।দরজার ওপারে রাজেশ কানোরিয়া।অথচ ও যে আজ এখানে আসবে তার কথা তো অখিলেশ তাকে জানায়নি।
-গুড ইভিনিং ম্যাডাম।
-হ্যাঁ। কিন্তু আমি তো ফাইলটা ওনাকে দিয়ে দিয়েছি।
-আমি কিন্তু ফাইলের ব্যাপারে আসিনি।আমি এসেছি অন্য একটা কাজে।
তরুলতা নিজের অজান্তেই সচেতন হয়ে ওঠে।ওড়না তুলে নেয় গলার কাছে।
-কী কাজ?
-আপনাকে একটু যেতে হবে আমার সঙ্গে।তেমন কিছু নয়।
-ওহ।না।মানে আমার শরীরটা…
-ব্যাপারটা আর্জেন্ট।বেশিক্ষণ লাগবে না।আপনি চেঞ্জ করে আসুন।
রাজেশ কানোরিয়ার কথায় একটা সুপ্ত আদেশ ছিল যা লঙ্ঘন করতে পারলো না তরুলতা।তড়িঘড়ি সালোয়ার চাপিয়ে সে বেরিয়ে এল।ঘর থেকে বের হতেই সে দেখতে পেল তার মেইন গেটে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
-রাজেশ কানোরিয়া আমার ছদ্মনাম ম্যাডাম।আমার আসল নাম রাজেশ কুমার।এএসপি পশ্চিম মেদিনীপুর।সিভিল ড্রেসে আছি।এটা আমার আই কার্ড। গাড়িতে উঠুন।
তরুলতা ঝাপ্টা খাওয়া প্রজাপতির মতোই কালো গাড়িটিতে উঠতে গিয়ে দ্বিতীয়বার চমকে ওঠে।চালকের আসনে যে বসে আছে,তাকে সে চেনে।প্রতি সপ্তাহান্তে সেইই তো তাকে গ্রামের সফর করায়।পরশুরাম মাহাত অরফে পিন্টু।এই পরশুরাম তাহলে পুলিশের লোক!
গাড়ি সদ্য সন্ধ্যানামা অন্ধকারে চলতে থাকে।তরুলতা আর রাজেশ কুমার মাঝের সিটে বসে।রাজেশ কুমার গলা নামিয়ে বলে,”ঘোমটাটা নামিয়ে নিন ম্যাডাম।আপনার ওপর নজরদারি আছে।ওরা জানতে পারলে আপনাকে ছাড়বে না।”
ঘোমটা নামাতে নামাতে তরুলতা অবাক হয়।তার মধ্যে ভয় বা উত্তেজনা হচ্ছে না কেন?সে এতো নির্লিপ্ত কী করে হতে পারলো।প্রায় ভাবলেশহীনভাবেই সে এএসপি রাজেশ কুমারকে জিজ্ঞেস করে।
-আমাকে কি আপনারা তাহলে অ্যারেস্ট করলেন?
-না।জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আপাতত আমাদের অফিসে নিয়ে যাচ্ছি।যদি আপনি কোঅপারেট করেন তাহলে অ্যারেস্ট আমরা করবো না।
-আপনাদের অফিস বেলদা থানা?
-না।আমরা কভারে যাবো শালবনি।
-আমাকে ওরা জিজ্ঞেস করলে কী বলবো?
-বলবেন পরশুরামের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন।পরশুরামের কভার ওদের কাছে এখনও সিকিওর্ড।
-আমাকে কবে ছাড়বেন?
-আজ রাতেই।আমি জানি আপনাকে ওরা ব্যবহার করছে।আপনি শুধু আমাদের সূত্রগুলো ধরিয়ে দিন।তাহলেই আপনার ছুটি।
জয়ফুলির পরশুরামের সঙ্গে এই পরশুরামের আকাশপাতাল তফাত।তরুলতাদের গাড়ি জাতীয় সড়ক ধরে তীব্রবেগে চলতে থাকে।তার মাথাটা এবার সামান্য দপদপ করছে।কিন্তু ভয় নয়।এটা দুর্বলতা।কারাগারের গরাদের আড়াল তার এখনকার মলাটবন্দি অবস্থা থেকে কী কোনও অংশে বেশি যন্ত্রণার?তরুলতার মনে হয় তার আশপাশের মানুষগুলোর মনের ভিতর অজস্র পিউপা।পিউপার ভিতর পিউপা।তার ভিতর আরও।সেই পিউপার ভীড়ে সে যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে অতলে।এই হারিয়ে যাওয়ার বুঝি কোনও শেষ নেই।
যেতেযেতেই হঠাৎ পাকারাস্তা ছেড়ে তরুলতাদের গাড়ি ঢুকে পড়ে মেঠো রাস্তায়।রাস্তার খানাখন্দে দুলতে থাকে গাড়ি।তরুলতার মাথা ঘুরতে থাকে।ঘন শালগাছের ভিতর দিয়ে তরুলতাদের গাড়ি এগোতে থাকে।হঠাৎ এক বিকট শব্দে গাড়িটা ত্যারচা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ে।চারপাশে যেন মেঘের গর্জন।অথচ আকাশে তো ছিঁটেফোটা বৃষ্টিও নেই!তাহলে কি তরুলতা স্বপ্ন দেখছে।খানিক পর তার ভুল ভাঙে।মেঘের গর্জন নয়।চারপাশ থেকে তাদের গাড়ি লক্ষ করে ধেয়ে আসছে অজস্র গুলি।রাজেশ কুমার আর পরশুরাম তাদের সার্ভিস পিস্তল বের করে সেই গুলির জবাব দিতে থাকে।রাজেশ কুমার তারই মধ্যে তরুলতাকে বলে,”বেন্ড ডাউন ম্যাডাম।অর ইউ উইল বি হিট”।
মাথা নামাতে নামাতে তরুলতা দেখলো ঘন রাতের অন্ধকারে অজস্র জোনাকির মতো তরুলতাদের গাড়ি ঘিরে ফেলেছে অজস্র টর্চের আলো।দেখতে দেখতে সেই আলোগুলো এক একটা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে তরুলতার সামনে।সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।