সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (অন্তিম পর্ব)

ক্ষণিক বসন্ত

একুশ
আদি

নাটাগড় পোস্ট অফিসে সামান্য চাঞ্চল্য দেখা গেল। দারোয়ান দুজন চোখে চোখে ইশারা করে নিল।নির্ঘাত পোস্টমাস্টারির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে আবার।এসেছে যখন লোকটা সহজে যাবে না। দেখা না হওয়া অবধি গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবে। আজ সোমবার। মাসের প্রথম সপ্তাহ। কাউন্টারে ভীড় আছে বেশ। মনে হয় না বেলা তিনটের আগে মাস্টারমশাই ফাঁকা হতে পারবেন। সেটি আন্দাজ করেই প্রথম দারোয়ানটি লোকটিকে বললেন,”আজ দেরী হবে অনেক। আপনি ঘুরে আসুন না।”
অপরিচ্ছন্ন দাড়ি গোঁফ আর জট পড়ে যাওয়া চুল আর দুচোখ ভরা শূন্যতা নিয়ে লোকটা তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,”থাক। বসে আছি তবে। কোথায় আর যাব। কৌশিকবাবুকে বলবেন আমি এসেছি।”
বেলা গড়িয়ে যায়। কাজ আর ফুরোতে চায় না। শেষ মেশ সাড়ে তিনটের সময় কাউন্টারের ওপারের ভীড় কমে আসতে থাকে। তখনই হঠাৎ কৌশিক দেখতে পেল বাইরের বেঞ্চের এক কোণে সেই লোকটি বসে আছে। ঈশ। কেউ জানালোও না কেন তাকে! ভাবতে ভাবতে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল সে। লোহার গ্রিলের দরজা খুলে নিঝুম হয়ে থাকা মানুষটির কাছে যেতেই লোকটি অস্থির চোখে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কৌশিক এনাকে চেনে। বিগত চার পাঁচ বছর ধরে মাঝেমাঝেই লোকটা আসে তার কাছে।
-কী? চিঠিটা আবার এসেছে?
-হ্যাঁ বাবা। একটু দেখ না। সেণ্ডারের নামটা যদি একটু খুঁজে পাওয়া যায়।
খয়েরি খামটা উল্টেপাল্টে দেখে কৌশিক। প্রেরকের নাম সেখানে নেই। তবে প্রেরক পোস্টঅফিসের স্ট্যাম্পচিহ্ন দেখে বোঝা যায় এ চিঠি ঝাড়গ্রাম থেকে এসেছে। খামটা খোলা।
-চিঠিটা পড়ে দেখেছেন জ্যেঠু?
লোকটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে তার দিকে। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে,”কী যে পড়ি। পড়ার আর কীই বা আছে। আপনি খুলে দেখুন না খামটা।

খয়েরি খাম খুলে কৌশিক দেখল একটিই মাত্র সাদা কাগজ। কোনও সাধারণ খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া কাগজ। সেখানে একজোড়া হাতের ছাপ। ছাপ দেখে মনে হয় লাল জলরঙ বা আলতা ব্যবহার করা হয়েছে। কাগজের নীচের ডানদিকের কোণায় পেনসিল দিয়ে কাঁচা হাতের লেখায় লেখা ‘আদি’।
-আদি নামে কারোকে চেনেন আপনি?
লোকটি মাথা নাড়ে। এর আগেও সে একইরকম চিঠি নিয়ে তার কাছে এসেছিল। অবশ্য সেখানে ‘আদি’ লেখাটা ছিল না।
-একটু দেখ না বাবা। প্রেরক কে জানতে পারো কিনা।
-আগের চিঠিগুলো আছে আপনার কাছে?
-আছে তো। যত্নে রেখে দিয়েছি। কিন্তু কে এই বুড়ো মানুষটার সঙ্গে এমন মশকরা করছে বলো তো।
কৌশিকের কষ্ট হয় লোকটার জন্য। লোকটার নাম মনোহর তরফদার। তার খাতায় লেখা আছে। সেণ্ডার ট্র্যাক করে প্রতিবার ওই ঝাড়গ্রামের পোসাটাপিসে আটকে যায়। পুলিশে খবর দিলে বাকি কাজটি পুলিশ করে ফেলতে পারে। কিন্তু লোকটি সেটি করতে দেবে না। বললে বলবে,” কী হবে বাবা ওসব করে? পুলিশের কাছে তো আগেও গিয়েছি। লাভ কি হয়েছে? মনে হয় ভুল করে পাঠাচ্ছে কেউ। কোনও ছেলেমানুষের হাতের ছাপ। সন্ধান পেলে ফিরিয়ে দেব।” লোকটার কাহিনী পোস্ট অফিসের দারোয়ান নন্দদুলালের কাছে শুনেছে সে। বৌমরা লোক। মেয়ে ছিল একটা। শহরে আর্ট কলেজে আঁকা শিখত। নিখোঁজ হয়ে গেছে বহুদিন। কেউ বলে পাচার হয়ে গেছে। কেউ বলে মার্ডার করে বডি গুম করে দিয়েছে তার। একটা দত্তক ছেলে ছিল। আলাভোলা। সে ছেলেও নিখোঁজ। খেপলির বিলের পাশে ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িতে ভুতের মতো পড়ে থাকেন। পিওন এসে জানায়। বেশির ভাগ দিনই সদর দরজায় তালা লাগানো থাকে। আহা। সবহারানো একজন মানুষ। কৌশিকের নিজের বাবার কথা মনে পড়ে যায়। তিনিও তো ঠিক এমনই ছিলেন।
-আমার নম্বরটা দিয়েছিলাম তো জ্যেঠু। আছে তো?
-আছে বাবা।
-আচ্ছা। তাহলে এর পরে এই চিঠি এলে আমি এই পোস্ট অফিস থেকেই ট্র্যাক করার চেষ্টা করে নিজে আপনার কাছে জানিয়ে আসব। ঠিক আছে?
-অনেক ধন্যবাদ বাবা। ভালো থেকো বাবা।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মনোহর ফিরে যায়। তার আশপাশ দুলছে। খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই। আকাশে গনগনে রোদ। এতগুলো বছর মনোহর নিজেকে প্রশ্ন করেছে বহুবার। কোন সে মহাপাপ যার শাস্তি সে এইভাবে পেয়ে চলেছে! কেন? চারুকেশি চলে গেল। কেদার চলে গেল। বিভাস রাউত কথা দিয়েছিল কেদারকে ফিরিয়ে দেবে। সেও তো মার্ডার হয়ে গেল। এই সাত বছর অন্ধকার ঘরে চারুকেশির ফেলে যাওয়া অসম্পূর্ণ ক্যানভাসগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মনোহর দিন কাটায়। খেপলির জলের দিকে আনমনে তাকিয়ে মাকে প্রশ্ন করে। “মা আমার। ভবতারিনী। কেন এমন করলি মা? সব কেড়ে নিলি। আমাকে কেন রেখে গেলি।” ঘরে ফিরে আগের চিঠিগুলো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে খাটের উপর বিছিয়ে রাখল মনোহর। প্রতি চিঠিতেই এক জোড়া হাতের ছাপ। এর আগে শুধুই ছাপ থাকত। এই প্রথম কোনও লেখা পাওয়া গেল। কখনও হলুদ, কখনও বা গোলাপি, কখনও বা নীল। প্রথম চিঠিতে পাঠানো হাত জোড়ার তুলনায় এই হাতজোড়ার আয়তন বেশ খানিকটা বড়। মনে হয় যেন শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। আর মনোহরকে যেন তার সাক্ষী রেখে চলেছে।
বাড়ির আশপাশে তেমন বসত নেই কারো। জায়গাটা দিনদিন কেমন বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠছে। অসামাজিক কাজের ভয় ভদ্র মানুষেরা একে একে পাড়া ছেড়ে চলে গেছেন। মনোহর রাতের বেলা বারান্দায় বসে অন্ধকার ভুতের মতো বসে থাকা সেইসব পোড়ো বাড়ি দেখতে থাকে। এক পড়ন্ত সভ্যতার নথিকার করে রাখার জন্যই যেন তাকে অদৃষ্ট তাকে জীবিত রেখে দিয়েছে। বাগানে মাধবীলতার ঝাড়ের পাশেই এক বড় জবা গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সকাল হলেই মনোহর দেখে সেই গাছ লাল ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে। কখনও কখনও তার ইচ্ছে হলে হাত বাড়িয়ে তার দু একটি জবা তুলে এনে ঘরের ভবতারিণীর ফটোর সামনে সাজিয়ে রাখে মনোহর। এভাবেই দিন কাটে। তারপর একদিন বিকেলবেলা কৌশিক সামন্ত এসে উপস্থিত হয়। তার হাতে আবার একটা খাম।
-আবার পেলে চিঠি?
-হ্যাঁ।
খাম খুলে মনোহর দেখল এবার আর হাতের ছাপ নয়। সাদা পাতার উপর পেনসিল দিয়ে লেখা।’ভালো আছি’। মনোহরের দু চোখে জল নেমে আসে। সেই জলের স্রোত কোথাও যেন কৌশিকের মন ছুঁয়ে যায়।মনোহর বলে।
-জীবন আমার সঙ্গে এমন রসিকতা কেন করছে বলতে পারো? মা ভবতারিণী কী চান কে জানে?
কৌশিক উত্তর দিতে পারে না।

কৌশিক ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবছিল। তার বাবা ঠিক এমনটাই একলা হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বাবা কাকা ঘর দোর ভিটে পড়েছিল কাঁটাতারের ওইপারে। বিবা আপোশ করতে পারল না। ঠিক এই মনোহর তরফদারের মতোই ‘মা মা’ করতে করতে একদিন সন্ন্যাসী বনে গেলেন। এখন কোথায় আছেন কে জানে? সাধকের নিয়তিই যেন এই একাকিত্ব আর হারিয়ে যাবার ভিতর। পিতৃহারা কৌশিককে একলা মানুষ করেছে তার মা। তবে তার মায়ের আশ্রয় ছাড়াও তাদের ভগ্নসংসারে মা ভবতারিণীর সিদ্ধেশ্বরীর আশীর্বাদ কখনও অবিন্নস্ত হতে দেননি যিনি তিনি রাগেশ্বরী মা। কাছেই প্রসাদতীরাথ কুমারহট্টর হালিশহর তার সাধনক্ষেত্র। কৌশিক নিজে ভিতর ভিতর কতোটা শক্তি উপাসক জানে না। তবে সে এটুকু বুঝতে পারে যে এই মা রাগেশ্বরী যতো বড় না বীরাচারী তান্ত্রিক, তার থেকে অনেক বেশি একজন মনোবৈজ্ঞানিক। তিনি তার শ্যামাবন্দনার সুর দিয়ে মাকে সঠিক সময়ে রক্ষা না করলে তাকে আজ তার মাকেও অকালে হারাতে হত। ভাবতে ভাবতেই তার মনের ভিতর সুপ্ত এক ইচ্ছা জেগে উঠল। মনোহরকে মা রাগেশ্বরীর কাছে একবার নিয়ে গেলে কেমন হয়? শোনা যায় এই মা কোনও সাধারণ মা নয়। স্ত্রীলোক হয়ে বীরাচারী তন্ত্রসাধনা সম্পন্ন করা সহজ কথা তো নয়। সেই তন্ত্রসাধনার শক্তিতে মাকে নিয়ে নানান লৌকিক কথোপকথন ঘুরে চলেছে এই ডিজিটাল যুগেও। কলকাতার সুরের জগতে বিখ্যাত বালক প্রতিভা সাগর ও তার বাবা মাও মায়ের কাছে নিয়মিত আসেন। আশ্রমে গান গেয়ে যায় সাগর।সে গান শুনতে মন্দিরচাতালে ভীড় জমে যায় । সকলেই বিশ্বাস করেন এই মা অসাধ্য সাধন করতে পারেন। তাহলে মনোহরের এই কঠিন যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে কি মা রাগেশ্বরী পারবেন না?
মনস্থির করে ফেলল কৌশিক। পরদিন প্রজাতন্ত্র দিবস। পোস্ট অফিস ছুটি। সকাল সকাল কৌশিক চলে গেল মনোহর তরফদারের বাড়ি। মনোহর বাগানের ভিতর খেপলির বিলের দিকে তাকিয়ে একমনে বসেছিল। কৌশিককে এই অসময়ে আসতে দেখে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।
-আবার কি চিঠি এল?
-না। তবে ও চিঠি কে বা কারা পাঠাচ্ছে, সবকিছুর উত্তর যিনি দিতে পারবেন, তাঁর কাছে একটিবার আপনাকে নিয়ে যেতে চাই। আপনি রাজি হলে নিয়ে যেতাম।
-বেশ তো।
খানিক ভেবে মনোহর তৈরি হয়ে নিল।

রাগেশ্বরী মায়ের বয়স যে আসলে কতো কেউ জানে না। কেউ কেউ বলে তার বয়স শতাধিক। তবে কৌশিকের দেখে মনে হয়, মায়ের বয়স ষাট থেকে সত্তরের মাঝামাঝিই হবে। হালিশহরে তখন মন্দিরে বেশ ভীড়। তার ভিতরেই মা কৌশিককে দেখে চিনতে পেরে কাছে আসতে বললেন। কৌশিক মনোহরকে নিয়ে মায়ের কাছাকাছি বসল। মা রাগেশ্বরী কালীতত্ত্ব বোঝাচ্ছিলেন। মাঝেমাঝে ভাবের ঘোরে রামপ্রসাদী গেয়ে উঠছিলেন। মা বলছিলেন।
-সদাশিব মহানির্বাণ তন্ত্র বলে “অরূপায়া কালিকায়াঃ কালমাতুর্মহাদ্যুতেঃ। গুরুক্রিয়ানুসারেন ক্রিয়তে রূপ কল্পনা।” কালী যে নিরাকার। অরূপা। তাই তো সে কালো। তমোগুণে তার প্রকাশ। তাই যে তার পূজা অমাবস্যায়। অন্ধকারকে আলোর পথ দেখাতেই তার আবির্ভাব।
কথার ভিতর মা কিছুক্ষণ চুপ করে যান। সেই সময়টা মানুষের বিশ্বাস মা ‘ভর’ হন। ভর হলে মা সকলের ভ্যবিষ্যত অতীত ও বর্তমানের ত্রিকাল দর্শন করতে পারেন। কৌশিক ঠিক করল , রাগেশ্বরী মা ভর হলেই সে মনোহরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে। কে চিঠি পাঠাচ্ছে তাকে? ভাবতে ভাবতেই সেই মুহূর্ত চলে এল হঠাৎ। সাধিকা ভর হয়েছেন।ঠিক সেই সময় কৌশিক উঠে দাঁড়িয়ে মাকে প্রশ্ন করল।
-মা। ওনাকে কে চিঠি পাঠাচ্ছে একটু বলুন।
প্রশ্ন শোনামাত্র মা রাগেশ্বরী তার ঘোরের ভিতর হতে থাকা নিজের মনেই বিড়বিড় বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে থাকলেন খানিক। তারপর বললেন।
-ওরে। মায়ের পুজো যদি করবি, তো রামপ্রসাদের মতো ভক্তি আর সুর দিয়ে করবি। সাধনসঙ্গীত আর ভক্তি এক হয়ে গেলে কোনও কাজ অসম্ভব থাকে না রে। তুই পুজো কর। নিজে খড় মাটি দিয়ে মূর্তি গড়ে গান গেয়ে গেয়ে মায়ের পুজো করবি।দৈববিঘ্ন আসুক। হরিনাথের মতো ভক্তিভরে পূজা করবি। মা তোর সব প্রশ্নর উত্তর দেবে রে।

হরিনাথ কে? কৌশিক জানে। বাবা চলে যাবার পর মাকে নিয়ে যখন প্রথম মা রাগেশ্বরীর কাছে সে এসেছিল, সেদিনই শুনেছিল এই হরিনাথ ভট্টাচার্যের কথা। রামপ্রসাদের সাধনস্থলে তিনিই তো আবার পূজা সম্পন্ন করেন। ঝড় ঝঞ্ঝার ভিতরেও তাকে কেউ টলাতে পারেনি।অচেনা ঘোমটাবৃতা রমণীর রূপ নিয়ে তাঁকে পূজার উপকরণ তুলে দিয়েছিলেন মাতা সিদ্ধেশ্বরী ভবতারিনী স্বয়ং। মনোহর কী বুঝল কে জানে! ঘরে ফেরার পথে পটুয়াপাড়া থেকে খানিকটা নদীপারের মাটি নিয়ে এল। কৌশিক তার অনেক উপকার করেছে। আজকাল এটুকুও কেউ করে। কিন্তু আশীর্বাদ দেবার সক্ষমতা তার যে নেই। সর্বহারা বাতাসে ভাসমান খড়কুটোর মতোই সে আজ সহায়সম্বলহীন। নিজেকে পাপিষ্ঠ মনে হয় মনোহরের। অথচ কোন সে পাপ, বুঝতেই পারে না সে। তাই মায়ের মন্দির থেকে ঘরে ফেরার পর দিনরাত মনোহর তরফদার মূর্তি বানাতে থাকল। তার যে প্রশিক্ষণ নেই এই বিষয়ে। সে না থাকুক। তার মনে হচ্ছিল হাতগুলি তার নিজস্ব নয়, চোখ দুটিও অন্য কারও, তবু কোনও অমোঘ অদৃশ্য শক্তি যেন তাকে দিনের কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছে। কখনও কাঠামোর উপর মাটি ফেটে যাচ্ছে। মনোহর আবার লেপে দিচ্ছে মাটি। কখনও রঙ ধরছে না গায়ে। কিন্তু দমে যাচ্ছে না মনোহর। কাজের ফাঁকে কৌশিক মাঝেমাঝে খোঁজ নিতে আসে। মনোহরের অসম্ভব ভাবতন্ময়তা। আর তার মাঝেই মনোহরের স্বগঠিত মা যোগমায়া প্রাণ পেয়ে জেগে উঠছেন।
অবশেষে এক অমাবস্যার দিন মনোহর ঠিক করল কালী পুজো করবে। সেই অর্চনার মন্ত্র হবে গান। শ্যামাসঙ্গীত। কে গায় কে গায়? অলৌকিক সমাপতনে সাগর বলে ছেলেটি রাজি হয়ে গেল গাইতে। তা বেশ তো! কিন্তু বেশি লোক সমাগমের ইচ্ছে যে মনোহরের নেই। সাগর যে সেলেব্রিটি। আন্দাজ করে খুঁদে সাগর বলে উঠল।
-তুমি চিন্তা করো না জ্যেঠু। আমি আর বাবা চুপি চুপি চলে আসব।
সাগরের বাবা বলল।
-রাগেশ্বরী মা বিশেষ করে আমাদেরকে আপনার সঙ্গে থাকতে বলেছে। মায়ের কাছে আমরা চিরঋণী। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। মন দিয়ে পুজো করেন। বাকিটা আমরা ম্যানেজ করে নেব।

কিন্তু পুজো বিঘ্নহীন হলো না। যেদিন পুজো, সেইদিন সন্ধ্যা থেকেই ছিটেছিটে বৃষ্টি নামল। এই সময় বৃষ্টি! কালবৈশাখীর সময় আসতে তো এখনও দুই মাস। কে বলবে সে কথা। এদিকে মনোহরের বুকের ভিতর উৎকণ্ঠা বাড়ে। ওই রাগেশ্বরী মা বলেছেন তাকে হরিনাথের মতো পুজো করতে বলেছেন। এই অকালফর্ষণের ভিতর সে পুজো করবে কীকরে।
বৃষ্টি ধরে এলে মাঝরাতে মনোহর পুজো শুরু করে। লোকজন গুটিকয়েক। সাগর আর তার বাবা। ওদিকে কৌশিক সামন্ত ও তার মা। ও আশপাশের তিন চারজন।
-বল মা। বল কে? দোহাই বল।
পাশে থেকে সাগর তার বাবা গেয়ে ওঠে।”মন রে কৃষিকাজ জানো না। এমন মানবজমিন রইল পতিত। আবাদ করলে ফলত সোনা।”মনোহর তার নিজের বানানো কালী মূর্তির একড়োখেবড়ো চোখের দিকে তাকিয়ে বলে।
-বল মা। বল। বলবি নে?
এদিকে পূজাচার সেরে নেবার জন্য শ্যামনগর থেকে এক পুরোহিত আনিয়েছে কৌশিক। তিনি হঠাৎ বললেন,”তিরকাঠির রজ্জু কৈ? ঘটস্থাপন করতে পারব না যে!”
মনোহর বাস্তবে ফিরে আসে। হঠাৎ বৃষ্টির পর পূজা সামগ্রী এলেলো হয়ে গেছে। মায়ের নির্দেশ ছিল পুজো হবে খোলা আকাশের নীচে। ঘরের ভিতর নয়। এখন এই বিপত্তি। কী করা যায়? এমন সময় কৌশিক দেখল ছোট প্রতিবেশীদের জটলার ভিতর থেকে একটি সধবা লাল সাদা ঘোমটায় মুখ ঢেকে এগিয়ে এসে মনোহরের হাতে তিরকাঠি বাঁধার সুতো দিয়ে বলল,”এই নিন রজ্জু। ক্ষমা করবেন। ভুল করে আমার কাছে চলে এসেছিল।”
ধন্যবাদ জানিয়ে পুরোহিতের হাতে সুতোটি দিয়ে আবার পুজো শুরু করে মনোহর। সাগর ছেলেটি সত্যিই বিস্ময় বালক। কী অপূর্ব গেয়ে চলেছে নেপথ্যে! মনোহরের মনে হল সে যেন এক ঘোরের ভিতর প্রবিষ্ট হয়েছে। সেই ঘোরে কেদার নেই, চারুকেশী নেই। কেউ নেই। শুধু সে আছে। এরই ভিতর পুরোহিত তার ঘোর ভাঙিয়ে দিয়ে আবার বললেন।
-বরণডালা দিন। দেখতে পাচ্ছি না যে।
বরণডালা খুঁজতে খুঁজতে কৌশিক আবার শিউরে উঠল। জটধার ভিতর থেকে আবার সেই ঘোমটাপরিহিত মেয়েটি বরণডালা নিয়ে আসছে।
-এই নিন পুরুতঠাকুর। ডালা আমিই সাজিয়ে রেখেছিলাম।
এর তাৎপর্য কৌশিক জানে। ঠিক এমনটিই বহু বছর আগে ঘটেছিল হরিনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গে। সেইদিন অপূর্ণ পুজোর উপকরণ এইভাবেই অচেনা এক মহিলার বেশে মা মহামায়া এনে দিয়েছিলেন। তবে কি…। ভাবতে ভাবতেই সে আর বসে থাকতে পারল না। প্রস্থানোদ্যত মহিলাটির হঠাৎ পথরোধ করে দাঁড়িয়ে সে সটান জিজ্ঞেস করল।
-কে আপনি?
কৌশিক সামন্তকে সবাই স্থিতধী হিসেবেই চেনে। তার এই অস্বাভাবিক আচরণে অবাক হয়ে উঠল অনেকেই। মনোহর তরফদারও খানিকটা হতচকিত হয়ে গেল বটে। কিন্তু তার উত্তরে মেয়েটি কিছু বলল না। বরং তিরতির কাঁপতে লাগল। কৌশিকের মনে হল মেয়েটি কাঁদছে। কৌশিক ফের বলল।
-বলুন। কে আপনি?
মেয়েটি ধীরে ধীরে তার ঘোমটা নামিয়ে দিতেই মনোহর তার দুই চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তার সামনে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে রহস্যময়ীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে তার হারিয়ে যাওয়া একমাত্র মেয়ে চারুকেশী।তার অস্ফূট ওষ্ঠাধরে কোনওমতে শুধু উচ্চারিত হল,” মা। চারু। তুই…”
চারুকেশী ততক্ষণে মনোহরের পায়ে প্রণাম করেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।”আমাকে ক্ষমা করো বাবা। আমার সাহস হয়নি বাবা। তোমাকে মুখ দেখাব কী করে। আমি যে অপবিত্রা…”
-কে বলে মা?
-ঝুমরোকোঠি। বাবা। তুমি জানো না।
-জানি না। আবার ধরে নে। সব জানি। মা রাগেশ্বরী যে ভারি অদ্ভুত দৈবধারী আজ বুঝলাম। তিনি কী বলেন ছানিস? বলেন কালী নিরাকার। অরূপা। তুইও যে সেই কালীর অংশ মা। আজ তার ইচ্ছাতেই তুই ফিরে এসেছিস। এবার আমি শান্তিতে মরতে পারব।
চোখ মুছে চারুকেশী এইবার বলে।
-মরো তুমি পরে বাবা। এখন তোমার অনেক কাজ। আলাপ করিয়ে দিই।
ভীড়ের অন্ধকার থেকে আলোয় একে একে এগিয়ে আসে চারুকেশীর স্বামী দীপক আর তাদের সাড়ে চার বছরের ফুটফুটে পুত্রটি।
-ওর নাম কী দিয়েছিস মা?
-ওর নাম দিয়েছি ‘আদি’।
-কী বললি!
-হ্যাঁ বাবা। আদিই তোমাকে চিঠি লিখেছে। তোমার ঠিকানা দীপক আগেই জোগাড় করেছিল। কিন্তু আমার যে সরাসরি তোমাকে লিখতে সাহস হচ্ছিল না। তাই ভয়ে সেণ্ডার্স নেম পাঠাইনি। আদির বেড়ে ওঠার হাতের ছাপ আমিই তোমাকে পাঠাতাম।

জলছবির মতো যেন কানায়কানায় মিলে যাচ্ছিল সব। কৌশিক সামন্ত এইসব দেখে চোখ মুছে সোচ্চারে বলে উঠল ‘জয় মা রাগেশ্বরীর জয়’। সাগর আর তার বিবা খোল নিয়ে নতুন একটি গান ধরল। আর মনোহর তরফদার তার কাঁচা হাতে বানানো এবড়োখেবড়ো কালী মূর্তির দিকে চেয়ে থাকলেন। হঠাৎ একঝলক তার ভৈরব বাবার কথা মনে পড়ে গেল। জগৎ বড় বিচিত্র। বাবা বলতেন। সঙ্গীত আর জীবন। মূলত সমান্তরাল। অজস্র তানকারি হড়কত আর বিস্তার সত্ত্বেও তার পরিণতি সেই সোমে ফিরে আসা। এই চলাচলের বিনাশ নেই, বিচ্যুতি নেই, ক্ষয় নেই। আছে শুধুই ঘরে ফেরার নিরাপদ এক প্রশস্তি। ভাবতে ভাবতে অনেকগুলো বছর পর মনোহরও সাগরের সঙ্গে আবার গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে। সেই গান সোমে ফিরে আসার গান।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।