সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ২১)

ক্ষণিক বসন্ত
সাহানা
বান্দেশ্বর শিবমন্দির থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কলিঙ্গরা মেহেতা তার রিহ্যাব সেন্টার তৈরি করেছেন। সাধারণত ‘রিহ্যাব’ বলতে ঠিক যা বোঝায়, কলিঙ্গরার এই রিহ্যাব সেইরকম নয়। কয়েক একর বন জঙ্গলঘেরা এই জমিটা কলিঙ্গরাদের পূর্বপুরুষের। স্পোর্টস মেডিসিন নিয়ে লণ্ডন থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পর ডঃ কলিঙ্গরা মেহেতা ঠিক করলেন মুম্বাই শহরে তাঁর অন্যান্য বন্ধুদের মতো টাকা রোজগারের ইঁদুরদৌড়ে তিনি নামবেন না। বরং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বান্দার এই জমিকেই নিজের সাধনস্থল তৈরি করতে চেয়েছিলেন কলিঙ্গরা। বিদেশ থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের আলো আর দেশজ সংস্কৃতির লালন তাঁর এই স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করল। শাল পিপুল মেহেগনির মতো অজস্র গাছগাছালিতে ঢাকা এই রিহ্যাবের নাম তিনি রেখেছেন তার মায়ের নামে।গৌরীমনোহরী রিহ্যাব সেন্টার। গাছের সুমেধ কাণ্ডের আড়ালে ছোট ছোট কুটির। সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিযুক্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে কলিঙ্গরা মেহেতা সেইসব মানুষকে আবার মূলস্রোতে ফেরাচ্ছেন, যারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু মাদকাসক্তই নয়, এই গৌরীমনোহরী রিহ্যাব সেন্টারে এসে বহু দুর্ঘটনাগ্রস্ত শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষ, চোটের জন্য কেরিয়ার বিপদের মুখে পড়ে যাওয়া খেলোয়ার সুস্থ হয়েছেন। কলিঙ্গরা এই সুশ্রুষার পাশাপাশি প্রকৃতি আর সঙ্গীতকে প্রাধান্য দেন। বিদেশে গিয়ে তিনি দেখেছেন, সুর কেমন সেখানে চিকিৎসার অঙ্গ হয়ে উঠতে পেরেছে। তবে তার নিজের মাতৃভূমিতে নয় কেন। গাছের শাখার আড়ালে ছোট ছোট স্পিকারে মৃদুস্বরে সারাদিন বেজে চলে সুর। কখনও রাগ পিলু, কখনও কোঙ্কানি লোকগীত। কখনও বা পর্তুগিজ ক্যারল। বিকেলে কিছু রোগীকে নিয়ে কলিঙ্গরা নিজেও হাঁটতে বের হোন। গৌরীমনোহারী রিহ্যাবের জমির কোল ঘেষে তেরেখোল নদী। তার শীর্ণ পার ধরে পাথরের বিথি তৈরি করিয়েছেন তিনি। এইসব নিয়ে দিনযাপন। বেশ লাগে তার।
রিহ্যাবের বেশির ভাগ রোগীই ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সকলেই যে তাদের চিকিৎসার অর্থ দিয়ে এখানে রয়েছেন তি নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা করছেন কলিঙ্গরা। গৌরীমনোহরী সেই অর্থে কোনও রিহ্যাব নয়। আশ্রম। কলিঙ্গরা এই অসাধ্যসাধনকে তাঁর মায়ের প্রতি অপূর্ণ কর্তব্যর প্রায়শ্চিত্ত মনে করে। নিজের মাকে তিনি পক্ষাঘাত থেকে সারিয়ে তুলতে পারেননি। অর্থাভাবের জনায নয়। সঠিক চিকিৎসানির্দেশের অভাবে।
রিহ্যাবের ভিতর সকলেই যে খুব ভালো আছে, এমন নয়। কলিঙ্গরা মেহতা যেমন আজকাল চোদ্দ নম্বর রোগীকে নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে থাকেন। এই রোগীটি নিজে থেকে আসেনি তার কাছে। বরং বলা ভালো কোনও অলৌকিক উপায়ে নিয়তিই তাকে তাঁর কাছে এনে ফেলেছে। প্রতিদিনের দৈনিখ প্রাতঃভ্রমণের সময় সেদিন কলিঙ্গরা মেহতা দেখতে পেয়েছিলেন তেরেখোল নদীর পাশে একটা তালগোল পাকানো শরীর পড়ে আছে। জোয়ারের সময় লাশটা ভেসে এসেছে হয়তো। তড়িঘড়ি দেহটির কাছে গিয়ে ডাঃ কলিঙ্গরা মেহতা দেখলেন, তখনও সেই বডির ভিতর প্রাণ আছে। ঠিকঠিক সেবাযত্ন করলে হয়তো ফিরেও আসবে। কিন্তু সেদিন আশপাশে আর কারোকে দেখতেও পেলেন না তিনি। অবশেষে ছেলেটিকে তার রিহ্যাবেরই চোদ্দ নম্বর ঘরে এনে রাখবেন ঠিক করেছিলেন তিনি।ছেলেটিকে অকথ্য মারধর করা হয়েছে। বান্দিপুর পুলিশ থানায় একটা বার্তা দিয়ে সেবাযত্ন চলছিল ধীরে ধীরে। সারা শরীরে অজস্র ভাঙা হাড়। মাথায় আঘাত। সংজ্ঞা আসতেই কেটে গেল মাস দেড়েক। কিন্তু হার মেনে নিল না কেউ। তিন মাসের মাথায় এক সকালবেলায় কলিঙ্গরা মেহতা দেখল তার সেই চোদ্দ নম্বর ঘরের রোগীটি নিজে নিজে উঠে বসেছে। চলাচল সামান্য ফিরে এলেও ছেলেটিকে নিয়ে কলিঙ্গরার দুশ্চিন্তার প্রধানত দুটি বিষয় ছিল। প্রথম। ছেলেটির দুটি হাত আর সচল করবার উপায় তাঁর ছিল না। ক্রমাগত আঘাত আর অত্যাচারের পর যখন ছেলেটিকে তিনি পেলেন, তখন তার দুটি হাতের হাড়গোড় শিরাউপশিরা তালগোল পাকিয়ে গেছে। চিন্তার দ্বিতীয় কারণ। ছেলেটি সমস্ত কথা শুনতে পায়। নির্দেশ দিলে সেইমতো তা করতেও চেষ্টা করে। কিন্তু জিজ্ঞাসা করলে নিজের সম্পর্কে নাম ধাম কিছুই বলে না। চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
ধীরে ধীরে বান্দেশ্বর মন্দিরে উৎসব শুরু হয়। মুম্বাই থেকে শিল্পীরা এসে গান গেয়ে যায় বান্দি গ্রামে। কলিঙ্গরা সেখানে প্রধান অতিথি হবার ডাক পেলেন। রিহ্যাবের আবাসিকরা সেখানে বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে যাবার সুযোগ পেল। কলিঙ্গরার ভাষণের পরেই ছিল ভজন। ডাক্তার মেহেতা দেখলেন ছেলেটি চোখ বন্ধ করে পা দিয়ে তাল দিচ্ছে আর তার অবশ হয়ে থাকা দুটো হাতের আঙুলগুলো অল্প অল্প নড়ছে। রাতে ফেরির পথে চোদ্দ নম্বর কটেজে ফিরে যাবার আগে ছেলেটি কলিঙ্গরাকে অদ্ভুত স্বরে ডাকল। কলিঙ্গরা দেখলেন ভজন শোনার পর তার আবাসিকের মন ভালো হয়ে গেছে। ছেলেটি তাকে শুধু বলল,”সাহানা। সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ।”
সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ! সারারাত আন্তর্জালে খোঁজ চালিয়ে কলিঙ্গরা অবশেষে দুটি বড় ও বেশ কয়েকটি ছোট ‘সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ’ খুঁজে পেল। তবে তাদের সবকটিই পাশের রাজ্য গোয়াতে। রিহ্যাবে কিচেনের দায়িত্ব সামলায় ফ্রাঙ্ক। ওর দেশের বাড়ি গোয়াতে। ওকে একবার জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? কলিঙ্গরা ঠিক করলেন পরদিন সকালে ফ্রাঙ্ককে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন তিনি।
পরদিন ফ্রাঙ্ককে জিজ্ঞেস করতে সে খানিকটা ভেবে বলল,”দেয়ার ইজ আ বিগ ওয়ান এট ভাস্কো দা গামা। এণ্ড আ ফিউ স্মল ওয়ানস। আই উইল চেক।”
-অলসো প্লিস ডু চেক অন সাম ওয়ান নেমিং সাহানা দেয়ার।
ফ্রাঙ্ক কথা দিল সে খুঁজে দেখবে। দুদিন কেটে গেল। ছেলেটি উৎসব শেষ হতেই আবার আগের মতো নিশ্চুপ হয়ে পড়ল। তৃতীয় দিন ফ্রাঙ্ক এসে কলিঙ্গরাকে জানালো ভাস্কো দা গামার থেকে এগারো কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের পাশে একটি ছোট চার্চ ওই বিখ্যাত ‘সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ’ নাম নিয়ে রয়েছে। সেই চার্চটি ফ্রাঙ্কের মামাবাড়ির কাছে। ফ্রাঙ্কের বড়মামা যখন বেঁচে ছিলেন তখন নিয়মিত যেতেন ওখানে। তাঁর সঙ্গে ওই চার্চের ফাদারের বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। ফাদারটির নাম ফাদার লুডহুইগ। এখন তিনি প্রয়াত। চার্চ সামলাচ্ছেন এক দম্পতি এলিস আর সাহানা। শোনামাত্র তাদের যোগাযোগ করতে বললেন কলিঙ্গরা। এতোদিন পর হয়তো ছেলেটি তার আত্মপরিচয় মনে করতে পেরেছে।এই এক ও একমাত্র সূত্রটি তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই। এই সূত্র ছাড়লে চলবে কেন?
ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল সাহানা। তারই মধ্যে দু একবার উঁকি মেরে গেল এলিস। এলিসের কোলে নয় মাসের প্রভাত। সাহানা সেসব দেখল না।তার দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডাক্তার কলিঙ্গরা মেহেতার পাঠানো মেইল। এই মুখ যতোই শত ছিন্ন হোক, যতোই ফুটিফাটা হোক, এ যে তার বড় চেনা। মুম্বাইতে কতোবার একসঙ্গে শো করেছে তারা। এই মুখ নিঃসন্দেহে দেশকারের। সে বান্দা গ্রামে মেহেতার রিহ্যাবে আছে এখন। ঝুমরোকোঠির খবর যখন তার কানে ভেসে আসত, সে মনে মনে গুটিয়ে নিত নিজেকে। এই দেশকার তার অজানা। তারপর একদিন খবরের কাগজের পাঁচের পাতায় খবরটা বের হল। দেশকার নিখোঁজ। নিখোঁজ না নিহত। এলিসের কিছু পরিচিত লোক বাসে করে এখান থেকে আন্ধেরি যায়। তারা খবর নিয়ে জানালো মিশ্রাজির লোকেরা নাকি তার ভাইকে খুন করে দেহটাকে গুম করে দিয়েছে। সাহানা বিশ্বাস না করতে চাইলেও বিশ্বাস তাকে করতেই হল। তারপর এতোগুলো মাসের পর।
এলিস একটা ছোট স্টুডিও খুলেছে এখানে। পাশাপাশি তার একটা টিয়াট্রোর দল আছে। যা উপার্জন হয় তাতে তিনজনের চলে যায়। আর চার্চের রক্ষণাবেক্ষণ হয় নরওয়ে থেকে আসা একটা অনুদানের পয়সায়। গেল মাসে এলিস একটা ছোট গাড়ি কিনেছে। সাহানা ঠিক করল সে এখনই বান্দা যাবে। এখন বের হলে সন্ধ্যার ভিতর কলিঙ্গরা মেহেতার দেওয়া লোকেশনে পৌছনো যাবে। এলিস এর মধ্যেই বেশ দক্ষ চালক হয়ে উঠেছে। সূর্য নামবার আগেই তারা গৌরীমনোহরী পৌছে গেল। দেশকার তাদের দেখা মাত্র চিনতে পারল। মিশ্রাজির লোকেদের আঘাতে তার বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সাহানাকে চিনে নেবার জন্য তার এক বিন্দু উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। ডাঃ কলিঙ্গরা মেহেতাকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে সাহানা আর এলিস দেশকারকে নিয়ে তাদের চার্চে ফিরে চলল।
ফিরতে ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গেল। দেশকারের দুটি হাত অচল। সাহানা সেকথা জেনেছে ডাক্তারবাবুর কাছে। মনের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছে তার। আর কখনও বাস গিটার বাজাতে পারবে না সে। না বাজাক।মৃত্যুর মুখ থেকে এই যে ফিরে আসা। এটুকুও কি কম? সাহানা দেখল অন্ধকার রাতের আকাশে দূর থেকে তাদের চার্চের উপরে ক্রসটা যেন অলৌকিক ঈশ্বরপুত্রর ক্যারিশমার মতো জ্বলছে। চার্চের পাশেই সাহানার বান্ধবী মালবী সুব্রমণ্যমের বাড়ি। প্রভাতকে সেখানেই রেখে গিয়েছিল দুইজনে। ঘরে ফেরার পথে মালবীর ঘর হয়ে ফিরল সকলে।
দিন বয়ে যায়। অনেকটা মাণ্ডৌবি নদীর জলের ধারার মতোই। দেশকার সমুদ্রপারের সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ চার্চে সাহিনা, এলিস ও তাদের নয় মিসের পুত্র প্রভাতের সঙ্গে থাকতে থাকতে অনুভব করে, তির চারপাশির পৃথিবীতে জীবন নামাঙ্কিত সংগারামে দুটি হাতের বড় প্রয়োজন। চার্চে রবিবারের প্রার্থনা জানাতে স্থানীয় বাগদীরা আসে। মাঝেমধ্যে ট্যুরিস্ট আছে দু একজন। যদিও তারি মূল চার্চের দিকেই যেতে পছন্দ করে বেশি। ফাদার লুডহুইগ তাকে সিদ্দিক থেকে গোমস করেছিল। কিন্তু আজকাল সকালে পিশের একটি ছোট মসজিদের আঝানের শব্দ ভেসে এলে সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে। অচল হাতদুটোর আঙুলগুলো আপ্রাণ নাড়াবার চেষ্টা করে। সাজদা দেয়। আর এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করে।
ঘটনা হল প্রতি রবিবার চার্চে সাপ্তাহিক জমায়েত হবার দিন। সেই দিন কখনও কখনও ভাসকো দাগামা থেকে বিশপ আসেন প্রিচ করতে। সেই কথোপকথনের পর ক্যারল হয়। সাহানার গলাটা আজও ঠিক আগের মতোই মিষ্টি আছে। তার সঙ্গে যোগ দেয় মালবী। সেও মন্দ গায় না। এই ক্যারলের সময় যখন পাশের মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে, এলিস তার কী বোর্ডে এমন একটা কর্ড ধরে যে মনে হয়, কোনও নির্দিষ্ট আজান বা প্রার্থনা নয়। যেন একটা সমবেত সুরমূর্চ্ছনা পরবরদিগারের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। এই অদ্ভুত সমাপতনের পিছনে গোপন সূত্রটা দেশকারের কাছে অজানা নয়। একসময় বাস গিটার বাজাত সে। এলিস আজানের সুর ধরে ঠিক তার ক্রোমাটিক নোটসগুলো বাজাচ্ছে। দেশকারের গিটার ধরার উপায় নেই। কিন্তু সে দুই পায়ে ট্যাপ করে তাল দিতে থাকে। তার মনে হয় ঈশ্বর বা আল্লাতালা, যেই হোন না কেন, তার আরাধ্য লবজ হোল সুর। সেই সুরের ভিতর প্রেম না থাকলে সেই সমাবর্তন মিথ্যা। প্রেমের আউটলাইন কর্ড দেশকার দেখেছে। সে আরপেজ্জিও কখনও সামানার চোখে, আবার কখনও বা চারুকেশীর কণ্ঠে তার কাছে ধরা দিয়েছে। কী হল ওদের দুজনের? কে জানে!দেশকারের বুক ঢিবঢিব করে। আবার যেন তার চোখের সামনে সিদ্ধি বিনায়কের মন্দিরচত্বর ভেসে আসছে। নেপথ্যে মিশ্রাজির লোকেদের আওয়াজ।’পাকড়ো পাকড়ো’। কান ঢাকার উপায় নেই তার। তার যে দুই হাত অচল। সে শুধু প্রার্থনা করতে পারে। বিশ্বাস রাখতে পারে সুরাতিসুর কিন্নরদের উপর।এলিস দমে যাবার মানুষ নয়। তার গান সুর পেয়ে ডানা মেলে ধরে আকাশে।”গুলাব দিলে, কান্ট দিলে, কান্ট সোঁসপী দিব্যা দিলে, পুনর্বেজে স্বপন দিলে।” গোলাপ আর কাঁটা একসঙ্গে বহন ঈরতে পারা লৌহহৃদয়ের অলিন্দেই চাঁদ তার স্বপ্ন সমর্পন করে। রেকর্ডিং হয়ে গেল ঝড়ের বেগে। এলিসের থিয়েট্রোর সদস্যরা সবাই সেই ভিডিওতে অংশ নিল। এমন কি দেশকারও। তার ইউটিউবে বের হতেই বারতে থাকল ভিউ আর লাইক। সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছিল জ্বর। এলিসদের ভিডিও ‘ভাইরাল’ হয়ে গেছে। তবু সাহানার চোখমুখ থেকে দুশ্চিন্তা কাটে না কেন? সে কি তবে তার দেশের মানুষকে বিশ্বাস করে না? কী করে করবে? যে দেশ শুধু কবিতা লেখবার অপরাধে একজন কবিকে গুলি করে হত্যা করতে পারে, গান গাইবার অপরাধে শিল্পীকে একঘরে করে অনাহারে হত্যা করতে ইতস্তত করে না, সেই দেশের মানুষকে কীভাবে বিশ্বাস করবে সাহানা?
সাহানার আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ মিলল কিছুদিনের ভিতরেই। স্থানীয় সংবাদপত্র ‘আম জনতা বার্তা’ এলিসদের গান নিয়ে একটা রিভিউ করল। সেই রিভিউ পেয়ে এলিস খুব উচ্ছ্বসিত হলেও সাহানা হল না। শব্দের জাদুকাঠি সে নাড়াতে জানে। তাই সে বুঝে গেল এই রিভিউ আসলে গোলাপের কাঁটার মতোই। সিঁদকাঠি। খবরটায় বেশ কিছু উস্কানি আছে। পাঠকদের ভিতরে সেই উস্কানি স্ফুলিঙ্গ পেতে দেরি করল না। এক রবিবার রাতে দেশকার শিউরে উঠল আবার। প্রভাতকে নিয়ে এলিস ঘুমোচ্ছে ভিতরের ঘরে। সাহানা দেখল চার্চের দেয়ালের বাইরে অজস্র মশাল জ্বলছে। কারা যেন চিৎকার করতে করতে ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। দেশকারের হাতের আঙুলগুলো নড়ে উঠল শুধু। তার দুই হাত যে অচল। তারপর সে অবাক চোখে দেখল। চার্চের পর্তুগিজ জানালার কবাট খুলে তার বোন সাহানা একটা সাদা গাউন পরে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক ওই দঙ্গলটার সামনে আকাশের মধ্যিখানে সাহানা স্বর্গীয় দূত জিব্রায়েলের মতো স্থির হয়ে পড়ল। তারপর তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত গান। সেই গানের সুর বড় করুণ। সেখানে চতুশ্রুতি ঋষভ থেকে অন্তরা গান্ধার। কৌশিকী নিষাদ থেকে শুদ্ধ মধ্যম। সমবেত দাঙ্গাবাজ মানুষগুলো সমুদ্রতীরের সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ চার্চের সামনে সেই উজ্জল আলোকবর্তিকা দেখে সাময়িক স্তম্ভিত হয়ে গেল যেন।দেশকার দেখল সাহানা ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত আলোকণার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে চারপাশে। তার সদ্যোজাত সন্তান, তার স্বামী, তারা কেউ তার এই নিঃশব্দচারণার কথা জানতে পারছে না। সরগম পম ধনস ন ধপম গরগরসা। করুণ অথচ মোহময় এক সুরসাম্রাজ্যে মিশে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী সাগরের তরঙ্গলহরী। অনন্ত ও অপার এই সমাগমে উদ্ধত জনরোশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। এটুকুই যেন পরম ভবিতব্য ছিল।