সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৫)

ক্ষণিক বসন্ত

ভৈরব

মঙ্গলবার হাট বসে যমুনাঘাটায়। হাটের এক কোণায় মালকোদার চায়ের দোকান। আবালবৃদ্ধবনিতা ‘দাদা’ বললেও মালকোদার আসল বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। এমন অদ্ভুত নাম তার কীভাবে লোকমুখে প্রচারিত হয়ে গেল কে জানে। দোকানে সকাল সকাল আড্ডা জমে উঠেছে। গ্রামের প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান মনোহর তরফদারকে ঘিরে চা পানরত বেশ জনা সাতেক গ্রামবাসী ভীড় করেছে। রাজনীতি করলেও মনোহর অন্যদের মতো দুর্নীতির গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দেননি। গেল পনেরো বছর হাতে ক্ষমতা থাকলেও নিজের জন্য পাকা বাড়ি গাড়ি কিছুই করতে পারেননি। বরং সমস্ত যৌবন ও আশু বার্ধক্যর শক্তি এই কয়েকদিনে তিনি উজার করে দিয়েছেন যমুনানদীতীর সংস্কারের জন্য। গ্রামের মানুষ তাকে বেশ সম্মান করে। ইদানিং তার চুলের রঙ ধুসর হয়েছে। লোকে তাঁকে আজকাল ‘মনোহরজ্যেঠু’ বলেই ডাকে। প্রবীণ বৃদ্ধ গরান মণ্ডল চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল।
-যাই বলো বাপু মনোহর। গেল ইলেকশনটায় তুমি না দাঁড়িয়ে ঠিক করোনি।
মনোহর হেসে বললে,”একটু তো বেরেক দিবেন আমাকে না কী? মেয়েটা বড় হয়েছে। বারো ক্লাস দিল। শহরে পড়তে চায়। রাজনীতি করতে করতে ওর দিকে নজর দিতেই পারিনি এতোদিন। কেন? ভূপেশ্বর তো ভালো ছেলে ছিল। ও কাজ করছে না?”
মনোহর তরফদারের প্রশ্নে গরান মণ্ডলের কপালে ভাঁজ পড়ল। ঠোঁটের কোণায় সামান্য হতাশা ফুটে উঠল।
-কে ভালো কে মন্দ, এই জেনারেশনটায় ঠিক মতো ঠাহর করতে পারিনে মনোহর। তোমাদের ছিল এক জমানা। এই যমুনাঘাটা গেরামের জন্যি কতো করেছ। নিজের কথা ভাবোনি। কিন্তু আজকাল হল কেতাবাজির যুগ। ছোকরাটার গায়ে কলকাতার হাওয়া লেগিছে। সেদিন আমার পাড়ার রাস্তাডা ঠিক করি দিতে বলতি গেলাম। কেমন টেঁড়া বেঁকা কথা শুনায় দিল। বলি দিল টাকা নেই। সেন্টার থেকে টাকা দেয় নাই। গেরাম থেকে লাখ খানেক তুলি দিলে করি দিবে। কই বাপু। তুমি তো এমনটা করোনি কোনও দিন?

মনোহর ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে গম্ভীর হয়ে যায়। এই ক’বছর সে রাজনীতিতে মাথা ঘামাবে না ঠিক করেছে। মা মরা মেয়েটা কলকাতার আর্ট কলেজে পড়বে জেদ ধরেছে। আঁকার হাত নেহাত খারাপ না। ওর মা অবশ্য চেয়েছিল মেয়েটা গান করুক। নাম রেখেছিল অনেক সাধ করে। ‘চারুকেশী’। কলকাতায় ঠিকঠাক থাকবার ঘর দেখাশোনা করা, যাতায়াত দেখভাল, এতো দূর থেকে করা সহজ কথা কী? চারুর গলায় সুর না থাক, তুলিতে মূর্চ্ছনা আছে। যমুনাঘাটার পথঘাট মানুষজন তার ছোঁয়ায় ক্যানভাসের ভিতর কথা বলে ওঠে। ওকে এই সময়ে সময় না দিলে অবিচার করা হবে। এতোসব রাজনীতি করলে করতে পারত না মনোহর। কিন্তু গরানকাকা যা বলছে তা মিথ্যে নয়। এমন কথা সে অন্য লোকের মুখেও শুনেছে। ভূপেশ্বরের সঙ্গে পরে কোনও একসময় কথা বলা যাবে। কিন্তু আপাতত এ বিষয়ে সে কিছুই বলল না। বরং দক্ষ রাজনীতির মানুষের মতো মনোহর আলোচনার ধারাস্রোত ঘুরিয়ে দিল অন্য দিকে।
-ভৈরববাবার গান শুনলে কিন্তু মনটা কেমন বৈরাগী হয়ে ওঠে। তাই না?
মনোহর তরফদারের কথায় সবাই হঠাৎ অন্য বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠল। যমুনাঘাটায় এক নতুন সন্ন্যাসীবাবার আগমণ ঘটেছে। নামটা গ্রামবাসীরই দেওয়া। আসলে এই সন্ন্যাসীর নিজের নাম বলেন না কখনও। এদিকে যমুনাঘাটার মহাশ্মশানে তিনি আসতেই সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলেছে। এই যেমন সেদিন। বিকেল বিকেল এক হতভাগ্য দম্পতি গাড়ি করে শ্মশানে তাদের একমাত্র সন্তানের বডি নিয়ে এলেন দাহ করার জন্য। রোড অ্যাকসিডেন্ট। গাড়ির সঙ্গে ডাম্পারের মুখোমুখি ধাক্কা। গাড়ির আর কিছু ছিল না। ছেলেটি ছাড়াও গাড়ির ভিতর আরও চারজন ছিল। সকলেই স্পট। যদিও দুর্ঘটনার পর তাদের সকলের দেহ একে অপরের সঙ্গে এমন তালগোল পাকিয়ে গেছে,যে আলাদা করে তাদের চিনে নেবার জো নেই। দম্পতির আনা মরদেহটির হাত পা মাথা কিছুই ছিল না। মরদেহ না বললে খানিকটা মাংসপিণ্ড বলাই ভালো। তাই আর স্নানঘরে না ঢুকিয়ে সরাসরি দাহ করতে ঢুকিয়ে দিল পুরোহিত মশাই। ছেলেটির মা বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন। অচেনা সন্ন্যাসীর পা ধরে ফেললেন আবেগের বসে। সন্ন্যাসীটি গোলাটে চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,”কোথায় হলো দুর্ঘটনা?”মায়ের বলবার মতো অবস্থা নেই তখন। পাশ থেকে এক প্রতিবেশী বলে উঠল কালোপুর জঙ্গলে। সন্ন্যাসীটি একটু ভেবে বলল,”আশপাশ ভালো করে দেখেছেন?”মা টি খানিক সামলে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। তারপর হাতজোড় করে বলল,”আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিন বাবা। ও ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই।” সন্ন্যাসী তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “চিন্তা করবেন না। আপনার ছেলে বেঁচে আছে।” সন্ন্যাসীর কথায় শুধু মা টিই নয়, আশপাশের লোকজনও চমকে ওঠে। লোকটা বলে কী? পুলিশ খাতাতেও তো নথি হয়ে গেছে। কিন্তু হাজার হোক সন্তানের মা তো। তার পিদিমের সলতের শেষ আগুনের বিন্দুটির মতোই জ্বলে ওঠে আশা।সন্ন্যাসী বলেছিল।
-আপনার ছেলে বেঁচে আছে। রাস্তার পাশে ঘন জঙ্গলের ভিতর যে নয়ানজুলি, সেখানে পদ্মবনের ভিতর পরে আছে ও। ওর হাতে সময় বেশি নেই। এখুনি যান। বাঁচাতে পারবেন।
বাবার কথা শুনে ওই শববাহী গাড়ি নিয়েই তখুনি দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেন সেই দম্পতি। সন্ন্যাসীর কথা মিথ্যা হয়নি। সত্যিই পদ্মপাতার আড়ালে পড়েছিল ছেলেটি। কে জানে কোন দৈববলে অমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরেও ছেলেটি অক্ষত থেকে গেল! এই ঘটনার বাস্তবতা বা পরাবাস্তবতা যেটাই হোক না কেন, এর পর থেকে সমস্ত যমুনাঘাটায় রটে গেল ওই সন্ন্যাসীর কথা। রটনার জন্য তো নাম লাগে একটা। সন্ন্যাসী তার নাম বলেন না কখনও। এদিকে যমুনাঘাটা মহাশ্মশানে মা মহামায়া থাকলেও কোনও ভৈরব মূর্তি ছিল না এতোদিন। এক ক্রোশ দূরে ধবলেশ্বর শিবকেই এলাকার মানুষ ভৈরব মানতেন। এই ঘটনার পর সেই অজানা সন্ন্যাসীর নাম হল ‘ভৈরববাবা’।ভৈরববাবার অপরিসীম ক্ষমতা। তিনি মৃতমানুষকেও ফিরিয়ে আনতে পারেন তাঁর যোগবলে। এখন যমুনাঘাটার মানুষের এমনই বিশ্বাস।
মনোহরের তেমন ঠাকুর দেবতায় ভক্তি নেই। কিন্তু আজকাল তারও ওই ভৈরববাবার প্রতি এক গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। এই আকর্ষণের কারণ দৈব নয়। ভৈরববাবার গলায় অপরূপ সঙ্গীতের সুরমূর্চ্ছনা। ভৈরববাবার গলায় যখন সে কীর্তন শোনে, তার মনে হয়, সত্যিই এই মানুষ জন্ম বৃথা। এ যেন এক মায়ার জগৎ। মাঝেমাঝে ভাবে মনোহর। এতো সুর এই ভৈরববাবা তার কণ্ঠে পেলেন কী করে! যমুনাঘাটার হাট ভাঙতে ভাঙতে বেলা গড়িয়ে যায়। মনোহরের আজ শহরে যাবার নেই। মেয়ে গেছে তার মাসির বাড়ি। পড়ন্ত বিকেল হতেই মন তার ধেয়ে চলে মহাশ্মশানের দিকে। বিকেল বিকেল ভৈরববাবাকে ঘিরে লোক সমাগম হয়। এদের অনেকে তাদের জীবনে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা জানতে চান। বাবা বলে দেন কখনও কখনও। কথা মিলে গেলে মন্দিরে ভোগ চড়ে। ধবলেশ্বর মন্দির পূজাকমিটি তাই এতে আপত্তি করে না। সন্ধ্যা হলে ভৈরববাবা গান ধরেন। ঠিক ওই সময়ে মনোহর তরফদারের মন কেমন চুম্বকের মতো ধেয়ে যায় মন্দিরের দিকে। মগ্ন সন্ন্যাসীর মতো সে বসে থাকে। ভৈরববাবা গেয়ে যান। “মুঁতি প্রেমের চকোর তুমে প্রেমী সুধাকর। প্রেমাস্পদ মো প্রেমর মহাভাব মো ভাবর। যুগে যুগে থীবা নাথ একক হোই। মন মাতিলারে কলা চন্দ্রমা চাহিঁ।” চোখে জল টলমল করে মনোহরের। ভিতর ভিতর সে যেন বলে ওঠে। ‘আহা। এমন গানটি তোমাকে কে শেখালো গোঁসাই!’ ভৈরববাবার গানের সুরে মোহিত মনোহরের সামনে এরই মধ্যে কলাইয়ের রেকাবি নিয়ে হাত পাতে লুলো ছেলেটা। ছেলেটাকে লোকে ঘেন্না করে মুখ দিয়ে লালা পড়ে বলে। তার হাত থেকে প্রসাদ খায় না কেউ। কিন্তু মনোহর তাদের মতো নয়। ঢোলা ঢোলা চোখে ছেলেটি হাসতেই থাকে। মনোহরও আসে। রেকাবিতে যত্ন করে দশ টাকার কয়েন রাখে। এমন করে রাখে যেন শব্দ না হয়। তার জন্য ভৈরববাবার গানে ব্যাঘাত ঘটুক সে চায় না একদম।
রাত বাড়ে। যমুনাঘাটা মহাশ্মশানে লোকসমাগম কমে আসে। চারুকেশী আজ ঘরে ফিরবে না জানিয়েছে। মাসির বাড়ি থেকে যাবে। মনোহরেরও তাই আর ঘরে ফেরবার তাড়া নেই যেন। যমুনার ঘাটে বসে ইমারতের তৈরি শেষের খেয়ার দিকে চেয়ে থাকে সে। এই যমুনা নদী দিয়ে এককালে নাকি কতো বড় বড় নৌকো বজরা বিদ্যাধরী নদীতে গিয়ে উঠত। দুইধারে মালা ফুল আর পশরা সাজিয়ে সেজে উঠত যমুনার মেলা। মনোহর সেইসব দেখেনি কখনও। শুধুই শুনেছে। ঠাকুরমার কাছে। ঘাটের পাশেই শব ধোবার স্নানঘর। নিঃশব্দে কখন তার পাশে বসেছে ভৈরববাবার লুলো শাগরেদটি, খেয়াল করেনি সে। লুলো হাসে।
-নাম কি তোর?
লুলো হাসতে থাকে। লালা গড়িয়ে পড়ে।
-ওখানে কি লেখা আছে বল দিকি?
লুলো তাকায় মনোহরের অঙ্গুলি অনুসরণ করে। স্নানঘরের উপর কী যেন সব লেখা আছে। সেই সব অক্ষর তালগোল পাকিয়ে যায় তার মাথার ভিতরে। সে বুঝতে পারে না। মনোহর আপনমনে বলে চলে। গ্রামে তার আশ্চর্য মেধা নিয়ে আলোচনা করে সবাই। সংস্কৃত পড়তে ভালোবাসত মনোহর। শবদেহের স্নানঘরের উপরে লেখা ।
-“সর্বধর্মায় পরিত্যজ্য মামেকং শরনংব্রজ। অহংত্বা সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামিমা শুভং।” এর অর্থ জানিস লুলো?
লুলো ঘাড় নাড়ে । লালা ঝরে পড়ে। কিন্তু মুখ থেকে তার হাসি মুছে যায় না।
-এর অর্থ সব ধর্ম অর্থ কর্তব্য সব কিছু ছেড়ে তুমি আমার শরণ নাও। আমি কে বুঝলি লুলো। সকলে বলে সেই আমি ঈশ্বর। আমি বলি সেই সর্বশক্তিমান ‘আমি’ হলো সুর, লয়, রাগ আর সঙ্গীত। যা তোর ওই ভৈরববাবার গলায় আছে। আর কোথাও নেই। বুঝলি?
লুলো ছেলেটি কী বুঝলো কে জানে। কিন্তু ঘাড় নেড়ে বোঝালো সে সব বুঝেছে। সে দেখে মনোহর তরফদার না হেসে পারল না।

এভাবেই দিন কেটে যায়। যমুনাঘাটা মহাশ্মশানে বছর ঘুরলে গাজনের ভীড় হয়। শ্মশানে নতুন পুরোহিত এসেছে। তার নাম দীপক। দীপক ভট্টাচার্য।অল্পবয়সী। কিন্তু যজমানির কাজে সে খুশি নয়। সে গ্র্যাজুয়েট। আরও অনেক পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সংসারের চাপে তাকে বাবার যজমানির কাজ বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হয়েছে। দীপক আসলে যজমানি করলেও ভিতরভিতর ঘোরতর নাস্তিক। তার স্নাতকস্তরে বিষয় ছিল বিজ্ঞান। শ্মশানমন্দিরে ভৈরববাবাকে নিয়ে এই বাড়াবাড়িটা তার একেবারেই পছন্দর নয়। মনে মনে সে বলে। ‘সুযোগ পাই। তোর আসল রূপ আমি খুলে দেব সবার সামনে।’ কে জানে নাস্তিকের কথা ঈশ্বর শোনেন কিনা। কিন্তু দীপকের মনোর্বাঞ্ছা পূরণ হবার সুযোগ তিনিই করে দিলেন হঠাৎ একদিন।
প্রতিদিন বিকেলে যেমন ভৈরববাবার চারপিশে ভক্তদের ভীড় জমে, এই দিন্ও সেইমতোই ছিল। মনোহরও অন্য দিনের মতোই ছিল মন্দিরে। এক বৃদ্ধা দম্পতি এগিয়ে এলেন। তাদের একমাত্র মেয়েকে তারা হারিয়েছেন। আজও তারা জানেন না সে মেয়ে জীবিত কিনা। লোকমুখে শুনে এসেছেন। ভৈরববাবার বিধান নাকি অব্যর্থ। অনেক আশা নিয়ে তারা ধ্যানে নিমগ্ন ভৈরববাবার সামনে বসলেন। শংকর কানুনগো কাঁপতে কাঁপতে মধুবন্তীর হাত ধরলেন নিজেরই অজান্তে। ভৈরববাবার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই তাদের। একমাত্র মেয়ের জন্য কতোটুকুই বা করতে পারলেন তারা।
সন্ধ্যা হব হব। ভৈরববাবা চোখ খুলে শংকর আর মধুবন্তীকে দেখলেন। মুহূর্তে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। থরথর করে কাঁপছিলেন শংকর কানুনগো ও তার স্ত্রী। এই দুই চোখ তারা চেনেন। ও যে ভৈরববাবা নন। ও যে বাহার। মন আকুলিবিকুলি করে ওঠে তিনজনের। এতো দিন এতো মাস এতো বছর পর হঠাৎ আবার বাহারের সব কিছু মনে পড়ে যায়। স্মৃতি ফিরে আসতেই তার চঞ্চল দুই চোখ সোহিনীকে খুঁজতে থাকে। সে এতো লোককে সত্যর পথ দেখিয়ে এসেছে ভৈরববাবা হয়ে। তাহলে সে কি জানতে পারবে না তার সোহিনী, এই বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র কন্যা সোহিনী জীবিত আছেন কিনা?
-বলো বাবা। আমার মেয়ে কোথায়? ফিরিয়ে দাও।
বাহার শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কাল বলবে সে। আজ সে গান শোনাবে। আজকের ভজন সোহিনীর জন্য অর্পিত। বাহারের কণ্ঠ নৈঋত থেকে কোমল গান্ধার ছুঁয়ে গেল অনায়াসে। সুরের প্লাবণে যমুনাঘাটা ভাসছে, শংকর কানুনগো আর মধুবন্তী ভাসছেন, মনোহর তরফদার ভাসছেন। সকলের মনে হল, এই শবদাহঘাট যেন বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাট। সেখানে এসে পূণ্যারতি দেখলে মনের সব প্রশ্নর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।
রাতে শংকরকে বাহার বলল,”জ্যেঠু। আজ রাত আমাকে দিন। কাল আমি আপনার প্রশ্নর উত্তর দেব।”
শংকর আর মধুবন্তী ফিরে যান। মনোহর ভাবে এনারা বুঝি ভৈরববাবার কোনও নিকটাত্মীয়।
রাতে ঘাটে লুলো কেদারকে নিয়ে একলা বসল বাহার।
-আমার সব মনে পড়ে গেছে রে কেদার।
কেদার হাসে। তার মুখ দিয়ে লালা ঝরে পড়ে।
-ওরা যার কথা জিজ্ঞেস করছে, কে জানে সে কোথায় আছে। শুনেছি তো বারাণসীতে সব প্রশ্নর উত্তর পাওয়া যায়। সেখানেই তো যেতে চেয়েছিলাম। কী যে হল। এখানে চলে এলাম। আমার সঙ্গে যাবি বারাণসী।
কেদার উৎসাহে মাথা নাড়ে। সে যাবে যাবে যাবে। তার মুখ দিয়ে উত্তেজনায় লালা গড়িয়ে ডান হাত বেয়ে নেমে আসে।বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠল বাহারের। এক ঝলক ভেসে উঠল উত্তরপাড়ার গঙ্গাঘাটের স্মৃতি। তারপর বাহারের দুচোখ বেয়ে ঘুম নেমে এল। কতোদিন নিশ্চিন্তে ঘুমায়নি সে। আজ রাতে সে নিশ্চিন্তে ঘুমোবে। চাতালে ফিরতে গিয়ে বাহার দেখল কেদারের দুই চোখে জল। সে যে তার সঙ্গে বারাণসী যাবে।
-তোকে কাল নিয়ে যাব। চিন্তা করিস না।
বলে বাহার চাতালে শুয়ে পড়ল।

সারারাত খুব এলো না শংকরের। তবে কী বাহার জেনেবুঝে তার মেয়েটাকে গুম করে এখানে লুকিয়ে আছে? কিন্তু তা কী করে হয়! যার কণ্ঠে অতো আর্তি, সে কী করে কারোকে হত্যা করবে? নিজেকে সংশোধন করে নিল শংকর। ভৈরববাবার বেশে বাহারের চাহনি পরখ করেছে শংকর। সেই চাহনিতে বেদনা আছে, শূন্যতা আছে, অসহায়তা আছে, কিন্তু হন্তারকের ক্রূঢ়তা সেখানে নেই। নাহ । ছেলেটা সত্যিই ভালোবাসত তার মেয়েকে। ও চলে যেতে উত্তরপাড়ার প্রেস বেদখল হয়ে গেছে। কাল বাহারকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ঠিক করল শংকর। কিন্তু সব গান যে তেহাইয়ে শেষ হয় না, শংকর কানুনগো কি তা জানতেন?
পরদিন সকালবেলা যমুনাঘাটার মহাশ্মশানে লোকে লোকারণ্য। গতকাল গভীর রাতে ঘুমের ভিতরেই ভৈরববাবা দেহ রেখেছেন। শ্মশানে এসেই এই সংবাদ শংকরকে স্তম্ভিত করে দিল। কী করে এমন হল? ঘটনার আকস্মিকতায় সেই অন্বেষণ ভুলে গেল সে। স্ত্রীকে মথুরনগরে আত্মীয়বাড়ি রেখে এসেছিল শংকর। চিতা সাজানো হয়েছে। মনোহর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। পাশে কেদার নিস্পলক চেয়ে আছে শবদেহ স্নান করাবার ঘরটির দিকে। এরই মধ্যে শংকরের ঘোর ভাঙল। না। আরও একটা অনর্থ সে কিছুতেই হতে দেবে না। বাহার যে মুসলমান। তাকে দাহ করলে যে তার প্রতি অন্যায় হবে। তবে কি সে সত্যিটা বলে দেবে আজ। মানুষের এতো মাসের সাধের ঠাকুর, ভৈরববাবা বিধর্মী। মানুষ বিশ্বাস করবে কি তার কথা? করলেও কেমন হবে বাহারের শবের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া! কেমন যেন তার ভিতর সোনা মা ডুকরে কেঁদে উঠল। সোনা মা বেঁচে থাকলেও তো এই কাজটাই করত। ভাবতে ভাবতে শংকর মনোহরের দিকে এগিয়ে গেল।

মনোহর ব্যস্ত ছিল শব স্নানে। শংকর ধীরে ধীরে ইতস্তত তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে কৌতূহলী হয়ে ঘুরে দাঁড়ালো।
-কিছু বলবেন আমায়?
-হ্যাঁ। মানে একটু তফাতে আসবেন। একটা অত্যন্ত জরুরি কথা বলতে হতো আপনাকে।
-বেশ।
সামান্য কিছু উপদেশ সহযোগীদের দিয়ে মনোহর সরে এল মহাশ্মশানের পিছনে দীঘির দিকে। শংকর বলল।
-আপনাদের ভৈরববাবাকে আমি চিনতাম। উনি একসময় হুগলিতে থাকতেন। ওনাদের গুরুধর্মে মৃত্যুর পর দাহপ্রথা নেই।
-তবে?
-ঠিক যেমন বীরভূমে মৃত্যুর পর গোঁসাইদের সমাধিস্থ করা হয় মাটিতে, ওঁদের ক্ষেত্রেও ঠিক এক নিয়ম। বাস্তুর পশ্চিম প্রান্তে মাটির ভিতর সমাধিস্থ করতে হবে ওঁকে।

মনোহর ভাবল খানিক। তারপর রাজি হয়ে গেল। পশ্চিম দিকে দীঘির পারে বাহারকে সমাধি দেওয়া হল। চোখ মুছতে মুছতে ভীড়ের আড়ালে বেরিয়ে এলেন শংকর। এতো গুলো বছর পর তার মনের ভিতরঘর থেকে কেউ যেন একটা বড় পাথরের স্ল্যাব সরিয়ে তাকে হাল্কা করে দিল অনেকটা। মনে মনে সে নিজেকেই নিজে বলল,”ভালো থাকিস। আমার সোনা মা।”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।