শিউলি হঠাৎ থমকে দাঁড়াল তার ভেজা চোখে, উথালপাথাল মনে অন্ধকার গন্তব্যের দিকে দ্রুত পায়ে চলার ফাঁকে। “দিদি চলে যাচ্ছ? তোমার আর ছুটি নেই?” ধরা গলায় কষ্টের মৃদু হাসি ছড়িয়ে শিউলি বলে,”হ্যাঁ আমার ছুটি যে ফুরিয়ে গেছে। যেতে তো হবেই। তুই ভালো থাকিস। “নির্মল মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে সদ্য কিশোরী মিনু বলে, “তুমিও ভালো থেকো দিদি। আবার এসো। “শিউলি কোনোরকমে “হুঁ”বলেই পা চালায় যাতে তার বাঁধ ভাঙা চোখের জল মিনু দেখে না ফেলে। ঠিক তখনই প্রায় আদুল গায়ে দুটো বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসে , “পিসি, পিসি”। কিন্তু তাদের বাবা মা যথারীতি তাদের থেকে আরো বেশী ক্ষিপ্রতায় ধরে ফেলে তাদের।” ঐ সারাদিনএকটু শান্তি দিবি না?দিনরাত খাটতে হয়, আর দুকুরেও একটু ঘুমাতে দিবে না মাইরি শয়তানরা। চল বাড়ি চল। পিসি পিসি, যত আদিখ্যেতা। ঘরকে চল। দুদণ্ড শান্তি নেই মাইরি।” শিউলি কিছু বলার ভাষা বা অবসর কোনোটাই পায় না। বাচ্চাদুটোকে প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে যায় তাদের বাবা মা, শিউলির ভাই ভাইয়ের বৌ, মন্দ পিসির ছায়ার কবল থেকে বাঁচানোর তাগিদে। আজ দশমী। ঠাকুর এখনো ভাসান যায় নি। তবে শিউলির ভাসান হয়ে গেছে বহুকাল আগেই, যবে সবে তার কুঁড়ি থেকে ফুল ধরেছিল। তবেই ঘরের ছোটো ছোটো ভাইদের বাঁচানোর তাগিদে একটাই পথ সামনে খোলা দেখেছিল। বাবার ছেড়ে চলে যাওয়া ভরা সংসার একা হাতে সামলাবার গুরুদায়িত্ব তুলে নিয়েছিল একমাত্র অভিভাবক হিসাবে। খাওয়া না জোটা সংসারে বিদ্যা তো বিলাসিতা। তাই সবাই যখন বলল, সত্যিই সদ্য ফোটা শিউলি যেনো, তখনই সে তার রূপকেই হাতিয়ার করলো জীবনযুদ্ধে লড়ার জন্য। আশপাশের শিয়ালরূপী দাদা কাকা তথা দালালরা তৈরীই ছিল। তাই অন্ধকূপে যেতে সময় লাগেনি মোটেই। দেরী হয়নি শিউলি থেকে শেলী হয়ে উঠতেও। সেই থেকে তার এই পথচলা। চিন্তার জাল কাটে আবারও মিনুর মিষ্টি কথার সুরে, “দিদি তুমি কেঁদো না। আবার তো আসবে।” শিউলি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ধরা গলায় বলে,”হ্যাঁরে, আসব” “কবে?” উদাস দৃষ্টিতে কোথায় হারিয়ে যেতে যেতে যেন অনেক দূর থেকে শিউলি বলে,” তাতো জানি না। যবে আবার দরকার পড়বে।” “দরকার? কার?” একটানে মনকে বর্তমানে এনে সজাগ হয়ে বলে, “হ্যাঁ , ঐ বাড়ির লোকজনের দরকার পড়লে তো ছুটি নিয়ে আসতেই হবে না? তাই বললাম।” “ও। কিন্তু দিদি আজ তো দশমী। সবার ছুটি। তবে আজ কেন চলে যাচ্ছো? আজই কি তোমার কাজ আছে?” শিউলির চোখের সামনে এই সমাজের হায়নাদের লালায়িত ছবি ভেসে ওঠে। বলে, “হ্যাঁরে আজই আমার কাজ আছে। আর ছুটি নেই। তুই ঘরে যা। আমার সাথে আর কথা বলিস না। কেউ দেখলে তোকেও বকবে।” “কেন? কথা বললে বকবে কেন? তুমি তো আমার দিদি হও।” মলিন হাসি হেসে সজল চোখে শিউলি বলে,”দিদি? হুঁ। তবু….. ঘরে যা। আমি তোর খারাপ দিদি। তাই আমার সাথে কথা বললে সবাই বকবে। তোকেও লোকে খারাপ ভাববে।” “মোটেই না। সেদিন ঐ বাজে ছেলেগুলো যখন আমায় আজেবাজে কথা বলছিল তখন আরো তো সবাই ছিল, কিন্তু কেউ তো কিছু বলেনি। কিন্তু তুমি চুপ থাকোনি, খুব বকেছিলে। খারাপ হলে কি বকতে? ভালো বলেই তো, ভালোবাসো বলেই তো।” শিউলি আর দাঁড়াতে পারে না। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাওয়া রাস্তায় টলমল পায়ে দ্রুত হেঁটে চলে। মনে ভাবে সমাজের সব স্তরেই হায়নারা ওৎ পেতে আছে। তাই তো ছোট্ট মিনুকে বাঁচাতে সে ঝাঁপিয়েছিল তার পূর্বের অভিজ্ঞতার তাগিদে। কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে সে অপারগ। মিনুর নিষ্পাপ মনের ভালোবাসার পরশ বড় বেশী বুকে বাজে তার। যেখানে নকল ভলোবাসার পসরা সাজাতে তাকে ঝলমলে শাড়ি আর নানা সস্তা প্রসাধনীর রঙে সাজিয়ে নিজের নারীসত্তাকে চরম সস্তা দরে রোজ বিকোতে হয়। মা দূর্গা ভাসান যান বছরে একবার ,সবার চোখের জলে। আর তার ভাসান হয় প্রতিনিয়ত, নিজের চোখের জলে!!