সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৬)

কেদার

“যদবধি মম চেতঃ কৃষ্ণপদারবিন্দে/ নবনবরসধামন্যুদ্যতং রন্তুমাসীৎ //তদবধি বত নারীসঙ্গমে স্মর্যমানে/ ভবতি মুখবিকারঃ সুষ্ঠু নিষ্ঠীবনং চ //” (শ্রী যমুনাচার্য গীতি)
(যবে থেকে মন কৃষ্ণ প্রেমে আপ্লুত, তবে থেকে মনের ভিতর নবনব রসসঞ্চার ।সেখানে যৌনচিন্তা দুঃসহ, বিষদৃশ্য, অসহনীয়)

কোনও কোনও দিন এমন হয়। শরীর গরম হয়ে ওঠে অলোকানন্দার। সেইদিন মনে হয় নদীর ভিতর ডুব দিয়ে আসি। নদী বলতে গোকুলিয়া নদী। এককালের নদী আজ মরা সোঁতা। সে সোঁতার ওই পারে নতুনগ্রামের শ্মশান। সেই শ্মশান থেকে চিতার ধোঁয়া ভেসে আসে। স্নানের সময় স্বল্প জলে বড়জোর কোমর ডোবানো যায়। সেখানে ধুনোর গন্ধে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য এলেও আর জলকেলির জো থাকে না। অলোকানন্দা তাই আজকাল আর নদীতে স্নান করতে যায় না। ঘরের ভিতরেই টিউবকল। পাম্প করলে জল উঠে আসে। একসময় গোকুলিয়া নদীর পাশে পসরা বসত। বসত গাজনের মেলা। দাদুর কাছে শুনেছে অলোকানন্দা। বড় বড় বজরা করে বড় মানুষের বাণিজ্যসামগ্রী ঢুকত গোকুলঘরিয়ায়।তখন এ নদীতে বান ডাকত।জোয়ারভাঁটা হতো। তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে অলোকানন্দার। তার ঘর থেকে গোকুলিয়া না দেখা গেলেও ঘরের দেওয়ালে কান পাতলে নদীর জলের আওয়াজ শোনা যেত। চারপাশে এতো যানবাহন ছিল না তখন। নদীর বানের মতো তখন অলোকানন্দার শরীরেও বান আসত। সেই বানের আকুতির মতো অলোকানন্দার শরীরের সেই ছটফটানি শুষে নিত অরিন্দমের শরীর। অরিন্দম আজ নেই কতো বছর!নেই নেই করে প্রায় সাড়ে তিন চার বছর। শেষ দিকের বছর গুলো নিজের শরীরে গোকুলিয়ার বানের উথলিপাথলি অলোকানন্দা একলা সয়েছে। উপায় ছিল না। অরিন্দম তখন বিদেশে। তারপর ধীরে ধীরে গোকুলিয়ার বুকেও জলের উথালপাথাল স্তব্ধ হয়ে গেল। কে জানে কেন! হাটের মানুষ নানান কথা বলে। অলোকানন্দা মাঝেমাঝে মুরগীর খাবার কেমিক্যাল কিনতে গিয়ে শুনতে পায়। শুনতে শুনতে সে জানতে পেরেছে গোকুলিয়া শুকিয়ে যাবার রহস্য।গোকুলিয়া অমরাবতীর শাখানদী। অমরাবতী ভাগীরথীর অববাহিকা। অমরাবতীর মুখের কাছে নবাবগঞ্জ। সেখানে সড়ক তৈরীর সময় নদীর উপর জঞ্জাল ফেলে সেই যে উপনদীর মুখ প্রায় আশি শতাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শুকিয়ে গেছে অমরাবতী। জলশূন্য সোঁতা বনে গেছে গোকুলিয়া। সেখানে পা ভিজানোটুকুই রয়ে গেছে।
গোকুলিয়াতে বান না এলেও অলোকানন্দার শরীরে আজও মাঝেমাঝে বান আসে। তখন সে অসহায় হয়ে পড়ে। শরীরের ভিতর আগুন জ্বলে ওঠে। সে আগুন কিছুতেই নিভতে চায় না। আজ তেমনই এক দিন। কৃষ্ণেন্দু কলেজ চলে যেতেই তাই সে স্নানঘরে ঢুকে টিউবকলে চাপ দিচ্ছিল। আজকাল আর তেমন জল আসছে না কলে। অনেক চাপলে এতোটুকু। কৃষ্ণেন্দু একদিন তাকে বুঝিয়েছিল। মাটি থেকে জল নেবে যাচ্ছে ক্রমশ। একদিন এমন আসবে যখন জল মিলবে না কুথাও। জল শুকিয়ে গেলে মানুষে মানুষে জল নিয়ে কলহ বাঁধবে। মহা কলহ সেইসব। জল থাকবে না! ভাবতে ভাবতে শিউরে ওঠে অলোকানন্দা। আজ অবশ্য খানিক পাম্প করতেই জল উঠে এল হাতে। বালতি ভর্তি করতে করতে তার সুলোচনার কথা মনে পড়ে গেল। আহা। এই গ্রামের সুকুমারী, সুলোচনা, সব যেন এক একটি গোকুলিয়া নদী। জল নেই, মরা সোঁতা। তবু বেঁচে আছে কোনওমতে। তার নিজের মতো। একে একে পরণের শাড়ি ব্লাউজ খুলে রেখে নিজের তপ্ত শরীরে জল ঢালতে থাকে সে। শরীর ফুটিফাটা মাটির মতোই সে জল নিমেষের ভিতর আকণ্ঠ শুষে নেয়। জল তার আলুলায়িত কেশ ভিজিয়ে দেয়। নিজেকে এক জলকন্যা মনে হয় তার। কৃষ্ণেন্দুর ক্যানভাসে নগ্ন শরীরগুলো ঠিক যেমন হাঁটু মুড়ে উপুড় হয়ে হুটোপুটি খায়, অলোকানন্দা ঠিক তেমনই জলে ভিজতে ভিজতে স্নানঘরে হুটোপুটি খেতে থাকে। ঠিক যেন সেইখানে সময়ক্ষণ দ্রাঘিমাঅক্ষরেখা ঋতুবৈচিত্র তার এই অপরূপ জলস্নান দেখতে স্তব্ধ হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ দরজার দিকে যেতেই শিউরে উঠল অলোকানন্দা। তার এই উত্তুঙ্গ মুহূর্ত একনিমেষে সে দৃশ্য দেখা মাত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
অরিন্দমের বাড়ির বাথরুম বাইরের বাগানে। সে বাথরুমের দরজার কাঠের পাটাতন আলগা হয়ে আসছে বেশ কিছুদিন। আলগা হতে হতে তার ভিতর দিয়ে বাইরের আলো ঢুকে আসে মাঝেমাঝে ।করাব করাব করেও সারানো হয়নি। অসুবিধাও তেমন হয়নি কখনও। সদরদরজা বন্ধ থাকলে এখানে তেমন কেউ আসেনি কখনও। কিন্তু অলোকানন্দার আজ মনে হল, দরজার ঠিক বাইরে একজোড়া লোলুপ চোখ তাকে আপাদমস্তক গিলে খাচ্ছে যেন। দেখামাত্র আড়ষ্ট হয়ে পড়ল সে। তড়িঘড়ি গামছা দিয়ে সে তার দেহ ঢেকে ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল,”কে? কে ওখানে?”কিন্তু বাইরে খানিক শুকনো পাতার মষমষ ছাড়া তেমন কিছু শোনা গেল না। আলুথালু শরীর থেকে জল মুছে অলোকানন্দা কোনও মতে আবার কাপড় জড়িয়ে নিল গায়ে। তারপর আধভেজা চুলেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখল খানিক দূরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে রণজয় সেন। দেখামাত্র তার সমস্ত শরীর যেন বিষের জ্বালায় রিরি করে উঠল।
-আপনি? কখন এলেন? এভাবে হঠাৎ। না জানিয়ে…
রণজয় কিছু না বলে লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে অলোকানন্দাকে অভুক্ত শেয়ালের মতো দেখছিল। অলোকানন্দার অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই সে কাটকাট বলল।
-বসুন। আমি আসছি।

আয়নার সামনে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল অলোকানন্দা। দরজার আড়ালে সত্যিই কি কোনও চোখ ছিল! নাকি সে তার মতিভ্রম! কিন্তু ওই রণজয় সেনের চাহনি আজ ভালো লাগছিল না তার। শাড়ি আটোসাঁটো বেঁধে চুলে গার্ডার দিয়ে অলোকানন্দা বেরিয়ে এসে দেখল রণজয় মুরগীর ফার্মের দিকে তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
-বলুন কী বলবেন?
-দেখতে এলাম।
-কী?
-ভয় নেই বৌদিদি। তোমাকে নয়। সিঙহানিয়ার মুরগিদের। আগামীমাসে সাহেবদের একটা বড় দল কলকাতা ঢুকছে। অনেক মুরগির জোগান দরকার। সিঙহানিয়া তাই হিসেব চেয়েছে। সামনের মাসে ওদের চালান করতে হবে।
-কিন্তু ওরা তো এখনও কচি। বড় হতে আরও কয়েকমাস লাগবে।
রণজয় সেন রোদ্দুর থেকে বাঁচতে আশির সময়ের হিন্দিসিনেমার ভিলেন প্রেম চোপড়ার মতো একটা সোনালী ফ্রেমের গগলস পরে নিল চোখে। তারপর দাঁত বের করে মুখের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে আগুন নেভাতে নেভাতে বলল,”সাহেবদের কচি মাংস বেশি পছন্দ। বুঝলে বৌদিদি? চলো। দেখাবে!”
অলোকানন্দা থতমত খেয়ে মাথা নামিয়ে নিজেরই অজান্তে ঘোমটা মাথায় দিয়ে মুরগির খাঁচাগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। খাঁচার উপর সরাসরি রোদ যাতে না পড়ে, সেই কারণে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিল অলোকানন্দা। সেই কাপড় সরাতে সরাতে তার মনে হল রণজয় সেনের চোখ যেন চঞ্চল চড়ুইয়ের মতো ঘোরাঘুরি করছে। কী চায় লোকটা? এর আগে তো কখনও এমন করেনি। যদিও ওর বদনাম শুনেছে সে অনেক। তবু।
-ভিটামিন বড়িগুলো রোজ গুঁড়ো করে দাও তো বৌদিদি?
ঘাড় নেড়ে অলোকানন্দা দেখলো ক্ষুদে ক্ষুদে মুরগীগুলো যেন অনায়াসে তার উপস্থিতি টের পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে। ওদের ভাষা অলোকানন্দা বুঝতে পারে না ঠিকই, কিন্তু ওদের চাহনি পড়তে পারে সে। তার মনের ভিতর মায়ের চোখ দিয়ে পড়তে পারে। ওরা তাকে আশ্রয় ভাবে। তার কাছে যেন আবদার করতে দৌড়ে আসছে অজস্র খোকাখুকু। অথচ আগামী সপ্তাহেই ওরা সাহেবদের প্লেটে কিমা হয়ে যাবে।
-কী ভাবছ বৌদিদি?
-কিছু না। বলুন। আর কী দেখবেন?
-দেখেছি তো আজ। পরাণ ভরি গেল দেখে। কী বাঁধন বৌদিদি। কষ্ট হয় না?
কানের ভিতরটা ঝাঁঝা করছে এবার তার। এর অর্থ তার অনুমান সত্যি। রণজয় তাকে স্নান করতে দেখেছে! ছিঃ।
-কী বলছেন যা তা। সরুন পথ থেকে। নাহলে লোক ডাকব।
রণজয় নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,”কী বললাম আর? আমি তো মুরগিছানাদের কথা বলছিলাম। ওদের রোজ ভিটামিন দিও বৌদি। আমি আবার আসব। সিঙহানিয়া বলেছে রোজ একবার করে দেখে যেতে।
রণজয় চটুল হেসে চলে গেলেও সেই হাসির রেশ অলোকানন্দার সারা শরীরে সে যেতে যেতে ছড়িয়ে দিয়ে গেল। লোকটা চলে যেতেই সে আবার বাথরুমের দিকে ছুটল। তার সমস্ত গা ঘিনঘিন করছে। অরিন্দমের ঘর থেকে তার মা ‘বৌমা বৌমা’ ডাক দিচ্ছে। ডাকুক। সদর দরজা কোনও মতে আটকে সে স্নানঘরের দরজায় শিকল তুলে জল ঢালতে শুরু করল। গোকুলঘরিয়া গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, তাঁদের কোনও পূর্বপুরুষ গোকুলে শ্রীকৃষ্ণের সহচর সহচরী ছিলেন। এই গোকুলিয়া নদীর জল আসলে পতিতপাবন যমুনার জল। এতোদিন সেকথা বিশ্বাস না করলেও আজ যেন সে প্রাণপণে সেই কথা বিশ্বাস করতে চাইছিল। সাবান দিয়ে নিজের নগ্ন শরীর থেকে রণজয় সেনের বিষ নজরের আঠা তুলছিল যেন। সেই শব্দে যেন সকালের উষ্ণ স্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেল।
-কীরে? উঠবি না হতভাগী? কী হয়েছে তোর?
সুকুমারীর ডাকে চোখ খুলে দেখল সে তক্তপোশে শুয়ে। বেলা গড়িয়ে গেছে। কখন সে স্নানঘর থেকে এল। কখনই বা ঘরে এল। কিছুই যেন হুঁশ নেই। মাথা তুলতে গিয়ে সামান্য টলে যাওয়ায় অলোকানন্দা বুঝতে পারল তার সারাদিন খাওয়া হয়নি। আর শাশুড়িমা? সর্বনাশ।
-ভাবিস না। আমি ওনাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।
-কখন এলে তুমি?
-মেলাক্ষণ। তুই অঘোরে ঘুমোস। তাই তোকে ডাকিনি। তোর শাশুড়ি ‘বৌমাবৌমা’ করছিল। ওকে হাগামোতা খাইয়ে তবে তোকে ডাকতে এলাম। এখন বল। কী হয়েছে তোর?
-কিছু না।
-বলবি নে আমায়?
সুকুমারীর দুই চোখের সামনে অলোকানন্দা কেমন অসহায় হয়ে যায়। মনে হয় যা কিছু তার বলার ছিল, সে সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছে ,এই সুকুমারী যেন আগে থেকেই সেসব জেনে বসে আছে।
-বল।
-কেন এমন হয় মাসি। মনে হয় শরীরের ভিতর গরম ভাতের ফ্যান বয়ে যাচ্ছে?
সুকুমারী ম্লান হাসে।
-হবেই তো সোনা। তুই যে আমার বাছা। কতোই বা বয়স!
-আজ রণজয় সেন এসেছিল।
-কী বলেছে লোকটা?
-কিছু সরাসরি বলেনি। কিন্তু মন বলছে লোকটা আড়ি পেতে আমাকে নাইতে দেখেছে।
-হুম।
সুকুমারী গম্ভীর হয়ে গেল। এই লোকটাকে সে সহ্য করতে পারে না। ও লোকটা সব পারে। অলোকানন্দা মেয়েটা বড় নিরীহ। সরল,গোবেচারা। কিছু একটা করতেই হবে। ভাবতে ভাবতেই সামান্য সহজ হবার চেষ্টা করে সুকুমারী বলল, “চল। অদ্বৈত গোঁসাইয়ের ঘরে চল। কীর্তন শুনলে তোর মন ঠাণ্ডা হবে। চল”।
অলোকানন্দা তৈরি হয়ে নিল দ্রুত। তারপর গোঁসাইবাড়ির দিকে রওনা দিল। সুকুমারীর কথা সে ফেলতে পারে না কিছুতেই। হয়তো ও ঠিক বলেছে। গোঁসাই আর শচীমাতার কীর্তন হয়তো তার ভিতরের আগুনকে নেভাতে পারবে।
গোঁসাইবাড়িতে আজ ভীড় সামান্য কম। মাঠে তিল বুনতে গিয়ে সারাদিন খেটে মাবৌরা অনেকে ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তবু কিছু চেনামুখ আশপাশে দেখতে পেল অলোকানন্দা।তবে সেই মুখের ভিতর সুলোচনা নেই। দাওয়ায় হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন শচীমাতা। আর অদ্বৈত গোঁসাই চোখ বুজে গাইছেন,”মম নিবেদন শুনো গোপীনাথ, মম নিবেদন শুনো। বিষয় দুর্জন সদা কাম রত, কিছু নাই মোর গুণ। মম নিবেদন শুনো।” কী এমন আছে ওই সুরে? অলোকানন্দা দেখল তার দেহভার হাল্কা হয়ে আসছে। সে যেন বাতাসে ভেসে যাবে পালকের মতো তনু নিয়ে। গোঁসাই গান শেষে বলেন, “দেহ আমাদের নৌকা। তার ভিতর কখনও জোয়ার।কখনও ভাঁটা। কখনও গ্রীষ্ম কখনও বরষা। তবু গোপীনাথের কাছে তার সবটুকুই এক ছোট্ট পালকের মতো।”
এক বোষ্টমী গুণগুণ করে হরিনাম গাইতে গাইতে অলোকানন্দার কপালে চন্দন তিলকের শ্রীচরণ এঁকে দিয়ে গেল। গোঁসাই বলে চলেন।
-এই দেহ এক শকট। সে শকটে মনের বাস। পঞ্চ উপাচার সেখানে আবশ্যক। সেই দেহের আভরণ আভূষণ কৃষ্ণর সামনে তুচ্ছ। কিন্তু পথ বড়ো পিছেল গো দিদিভাই। লোভে পড়লেই দেহের জ্বালা কুড়ে কুড়ে খাবে তোমাকে। কৃষ্ণের কথা ভাবতেই দেবে না। বিদ্যাপতি কি বলেছেন শুনবে দিদিভাইরা? “সহজ ভজন সহজাচরণ এ বড় বিষম দায়। স্বকাম লাগিয়া লোভেতে পড়িয়া মিছা সুখ ভুঞ্জে তায়।”
গোঁসাই গান ধরেন আবার। “কেমনে শোধিবে মোরে গোপীনাথ। কেমনে শোধিবে মোরে।” শচীমাতা বাদ্যযন্ত্র বাজান। শ্রীখোলে বসেন আশ্রমের এক গুরুভাই। অল্প বয়স। কৃষ্ণেন্দুর বয়সী। নাম সুদাম। অলোকানন্দার ওকে দেখে ছেলের কথা মনে পড়ে যায়।
-এই সুকুমারী। ঘরে ফিরি চলো।
-যাবি? চল।
আমবাগানের ভিতর দিয়ে আসতে আসতে একপলক যেন অলোকানন্দার মনে হল রণজয় সেনের চোখদুটোর কথা। কিন্তু সে ভয় মুহূর্তে কেটে গেল। মনের ভিতর সুর ভেসে আসছে। “মম নিবেদন…” ।গোঁসাই আজ বলেছেন।গোরাচাঁদের দর্শন হলে পৃথিবীকে মনে হবে ধূলিকণার মতো।সমুদ্রের জলরাশি হয়ে উঠবে বিন্দুর মতো। সূর্য একটুকু স্ফুলিঙ্গ। বায়ু সামান্য শ্বাস। এমনভাবে ভাবলে রণজয় সেনের লালসা আর তাকে ভয় দেখাতে পারে না।
-আমি জানি মেয়ে। তোর কী চাই?
-বল না সুকুমারী?
আমবাগানের ভিতর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে দুজনেই।
-আয়।
অলোকানন্দা সুকুমারীকে জড়িয়ে ডুকড়ে কেঁদে ওঠে। সুকুমারী বোঝে অলোকানন্দার শরীরে জ্বর।নির্জন পথে আর কেউ নেই। গভীর পাতার আড়ালে দোদুল্যমান অপঘাতে মরা নারীমূর্তির অতৃপ্ত আত্মার ভয় বা হন্তারকের শ্বাপদসূলভ রসনা দুজনকে বিচলিত করতে পারল না। আকাশে মঘা নক্ষত্র ছেড়ে অনুসূয়া জেগে উঠেছে। সুকুমারী বলে।
-আয়।
চোখ মুছিয়ে অলোকানন্দার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে দুজনেরই। অলোকানন্দা শুনতে পায় দূর থেকে ভেসে আসছে অদ্বৈত গোঁসাইয়ের গানের সুর। “ক্ষুদ্রা রুদ্রপিতামহপ্রভৃতয়ঃ কীটাঃ সমস্তাঃ সুরা। দৃষ্টে যত্র স তারকা বিজয়তে শ্রীপাদধূলীকণা…”।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।