জৈব বিবর্তনবাদ দেড়শ’ বছরের দ্বন্দ্ব বিরোধ” কতগুলো যুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
পৃথিবীতে জীব, জীবের অস্তিত্ব ও জৈববিবর্তনবাদের ইতিহাস বহু পুরোনো হলেও এর রহস্য উদঘাটন হয়েছে মাত্র দেড়শ বছর আগে। চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অরিজিন অফ স্পেসিস’ প্রকামিত হবার পর জৈববিবর্তনবাদ তথা জীববিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এ গ্রন্থ প্রকাশিত হবার পর সমগ্র বিশ্বে বিজ্ঞানের মৌলবাদি গোষ্ঠি, পুরোনো ধারণায় বিশ্বাসী বিজ্ঞানী বহুমুখী ও সুদীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে তা ইতিহাসে বিরল।
সাধারণত জৈব বিবর্তনের যেসব বিরোধিতা ও দ্বন্ধ বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে তারমধ্যে একদিকে যেম রয়েছে ধর্ম-ধর্মীয় গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান এবং মৌলবাদী বিরোধিতা, অন্যদিকে এ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতাকে উপস্থাপন করার মাধ্যমে যৌক্তিক বিরোধিতারাও একটি ধারা রয়েছে। এই দুই বিরোধিতার মাঝামাঝি রয়েছেন সমন্বয়বাদীরা। যারা জৈববিবর্তনবাদকে গ্রহণ করেছেন ধর্মীয় ধারণার সাথে মিলিয়ে। অনেকে একে বর্জন করেছেন কিছুটা ভুল বুঝে এবং কিছুটা আবেগে। এদের মতে বিবর্তনবাদ ‘হৃদয়’ বা মনকে অস্বীকার করে। অন্য এক ধরণের প্রবণতা হচ্ছে এর সুবিধাবাদী ও বিকৃত ব্যাখ্যা করা যা সমন্বয়বাদীদের মধ্যেও কিছুটা রয়েছে। কিন্তু সুবিধাবাদী ব্যাখ্যাকারীরা ইতিহাসে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে কারণ, এরা তাদের জৈব নির্ধারণবাদী ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিষ্ঠুরতম বর্ণাবাদের জন্ম দিয়েছিল। অপর এক ধরণের বিতর্ক হচ্ছে ‘পদ্ধতিগত বিতর্ক’। এখানে জৈব বিবর্তনের বিরোধিতা নেই, কিন্তু কিভাবে ঘটেছে তা নিয়েই রয়েছে বিভিন্ন মতবাদের জোর দ্বন্দ্ব বিরোধ।
উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের মত একটি অনুন্নত ও ধর্মীয় মৌলবাদ বিশ্বাসী দেশে জৈববিবর্তনবাদ ও তদসংক্রান্ত নতুন তত্ত্বগুলো খুবই বিতর্কিত। মৌলবাদী গোষ্ঠী বহু আগে থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ ও বিজ্ঞানমনস্ক জনগোষ্ঠিকে এ তত্ত্বের প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ধর্মীয় মূল্যবোধর অজুহাত দেখিয়ে তারা জনমনে জৈববিবর্তনবাদ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, অনীহা ও ভীতির সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান অন্ধ নয়, বিজ্ঞান চায় তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তি। ধর্মীয় আবেগ দিয়ে যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা মূর্খতারই নামান্তর। এই যখন আমাদেও প্রেক্ষাপট, তখন লেখক মনিরুল ইসলাম তাঁর “জৈব বিবর্তনবাদ ও দেড়শ বছরের দ্বন্দ্ব বিরোধ” নামক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে পাঠকদের সামনে একটি দ্বান্দ্বিক সত্য উপস্থাপনের অসীম সাহাসিকতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
পাঠকদের উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ বইটিতে কেবল মাত্র জৈববিবর্তনবাদ নিয়ে আজ অবধি যে সকল দ্বান্দ্বিক সমস্যা বা বিরোধের প্রতিপাত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। বইটির মর্মার্থ উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে প্রথমে জৈববিবর্তনবাদ কি এবং কিভাবে- এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।
লেখক মনিরুল ইসলাম তার এই বইটিতে পর্যায়ক্রমিক কাল ও প্রেক্ষাপটকে খন্ড খন্ড বিষয়বস্তুতে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন। তাঁর জৈববিবর্তনবাদের সূচনা: আলোড়ন, আবেগ ও উৎকণ্ঠা বিবর্তনবাদের বিরোধী ছিলেন জীববিজ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ন অজ্ঞ অক্সফোর্ডের বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স এবং ডারউইনের পক্ষে দাঁড়ান বিখ্যাত প্রকৃতিবিজ্ঞানী এবং ডারউইনের সুহৃদ থমাস হেনরি হ্যাক্সলি। উইলবারফোর্সের আক্রমনাত্মক কথার ফলেই উত্তপ্ত বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বলাবাহুল্য তার বিতর্কে আবেগ ও উপহাসের প্রাচুর্য থাকলেও কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছিলনা। তিনি হাক্সলিকে উপহাস করে জিজ্ঞাসা করেন-“ তার মাতৃকুল না পিতৃকুল নরবানর (Ape) ছিল”। এতে হাক্সলি নিজের বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিল- “ বিজ্ঞানের স্বার্থেই তিনি বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিশপের উপহাসের জবাবে বলেন- “আমি বানরের বংশধর হতে লজ্জাবোধ করিনা। কিন্তু একজন সত্যের অপলাপকারীর সাথে সম্পর্কিত হতে লজ্জাবোধ করি।”
এ বইটিতে আরো যেসব দ্বান্দ্বিক বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- আদমের নাভী ও নূহের প্লাবণ এবং সৃষ্টিতত্ত্বের পক্ষে দুই প্রকৃতি বিজ্ঞানীল দ্বন্দ্ব [ ফিলিপ গোস-১৮৫৭ সালে গোস ও মফেলাস(গ্রিক ভাষায় নাভী) নামের সৃষ্টি তত্ত্বের পক্ষে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি দাবি করেন আদমের নাভীর মত এই ফসিলগুলো হচ্ছে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক জন্মের নিদর্শন যা কখনো ঘটেনি; গোসের এই মতামত সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসী এবং ধর্মযাজক সহ সকল যৌক্তিক মানুষকে বিস্মিত ও বিহবল করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চার্লস কিংসলি (Reverend Charles Kingsley) তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন- “ধর্মগ্রন্থকে রক্ষা করার জন্য যদি এভাবে সত্য ও কান্ডজ্ঞানকে পদদলিত করা হয় তাহলে আমি অবশ্যই ধর্মগ্রন্থকে ত্যাগ করে কান্ডজ্ঞানের পাশেই দাঁড়াতে চাই।
অন্যান্য আলোচ্য বিষয় শিরোনামগুলো হচ্ছে সাহিত্যিক বিদ্রুপ ও বিবর্তনবাদী মহীরুহ পিতামহ ও পৌত্র [ এখানে মূলত উপনাস্যিক চার্লস কিংসলি ও টি এইচ হাক্সলি পৌত্র জুলিয়ান হাক্সরি। (যিনি বিংশ শতাব্দির শ্রেষ্ঠতম বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানী ছিলেন) এর দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করা হয়। মজার বিষয় হচ্ছে জুলিয়ান হাক্সলির বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।], কাঠগড়ায় বিজ্ঞানের শিক্ষক এবং জৈববিবর্তন বিরোধী আইন (১৯২৫ সালের ১০ জুলাই, ‘মাং কি ট্রায়াল’ বা ‘ বানর বিচার’ নামের পরিচিত), বিশ্বাস রক্ষার সংগ্রাম এর নানান ‘বৈজ্ঞানিক কৌশল- [ সৃষ্টিতত্ত্বে প্রকাশিত ধারণা, * ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি, * হেনরি মরিস ১৯৬৩ সালে ‘সৃষ্টিতত্ত গবেষণা সংঘ (Creation Research Society) ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সৃষ্টিতত্ত্ব গবেষণা ইনস্টিটিউট (Creation Research Institute)
মাংকি ট্রায়াল ২য় পর্ব এবং এদেশের পাঠক্রম: এ পর্বে আলোচিত হয়- সৃষ্টিতত্ত¡কে সৃষ্টিবিজ্ঞান নাম দিয়ে এর পক্ষে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞানের একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা। বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্টসহ সমগ্র বিশ্বে যৌক্তিক মানুষদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই প্রতিক্রিয়ার দুটি দিক ছিল। প্রথমত , ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’ একটি ধর্মীয় বিশ্বাস , বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান কোন স্থির বিশ্বাস ও ঐশীবাণী থেকে উদ্ভব হয়নি। মানুষের গবেষণা ও প্রয়োগের ভিত্তিতে যে জ্ঞান উদ্ভূত হয় তাই বিজ্ঞান; বিজ্ঞান স্থির সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকেনা, বরং জ্ঞানের বিস্তার বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটায়। সৃষ্টিতত্ত্ব ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ঘটনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। বিশ্বাসই যার মূল ভিত্তি। এহেনও একটি বিষয়কে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত করার ব্যাপারটিকে সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও যৌক্তিক মানুষের কাছে বিস্ময়কর বলে প্রতীয়মান হয়।
“জৈববিবর্তনবাদ ও দেড়শ বছরের দ্বন্দ্ব বিরোধ” বইয়ে আরো একজন উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যিনি ডারউইনের সাথে যৌথভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে জৈববিবর্তনবাদ তত্ত্বের আবিষ্কারক আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, তিনি কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের আবিষ্কারকই ছিলেন না। তিনি উনিবিংশ শতাব্দি এবং পৃথিবীর ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ প্রকৃতিবিদ। বিবর্তনবাদ ছাড়াও তাকে (Zoo-geography) ভূ-প্রাণীবিদ্যার জনক বলা হয়। কিন্তু তার সাথে ডারউইনের মতপার্থক্য ছিল একটুকুই তিনি আত্মবাদ (Spiritualism) এ একনিষ্ঠি বিশ্বাসী ছিলেন।
মনিরুল ইসলাম তার এই বইতে সহজ বর্ণনাকুশল বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে জৈব বিবর্তনবাদের মত একটি দ্বান্দ্বিক বিষয়কে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তার এ বইতে আরো অন্যান্য যে বিষয়গুলো প্রতীয়মান হয় তা হচ্ছে-“জৈববিবর্তনবাদের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার; সামাজিক ডারউইনবাদ, বর্ণবাদের পক্ষে বিবর্তনবাদের ব্যবহার ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা এবং জৈববিবর্তনবাদ, জৈবিক বিবর্তন নিয়ে যৌক্তিক বিতর্ক। এছাড়াও যেসব সার্বজনীন চিন্তার উপস্থিতি ঘটেছে সেগুলো হচ্ছে- জীবনের উৎপত্তি, যৌনতার উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, পর্বেও উৎপত্তি, ব্যাপক হারে প্রজাতির বিলুপ্তি (Mass estinction), Phenotype, এর সম্পর্ক। পরিশেষে তিনি জৈববিবর্তনবাদ তত্ত্ব সার্বিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জৈববিবর্তনবাদের মত একটি বিষয়ের দ্বন্দ্ব ও এর সত্যতা, যুক্তি ও প্রামণের পক্ষে এরকম একটি গ্রন্থ রচনা করে লেখক নি:সন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।