সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৩৩)

বিন্দু ডট কম

পরদিন ঠিক একই সময়ে আবার আরুণি প্রকাশনার অফিসে পৌছে গেল শুভব্রত।আজ কী প্রদ্যুত সরকারের সঙ্গে তার দেখা হবে?কে জানে সে কথা।ডেস্কে বসা রিসেপশনিস্ট মেয়েটি আজ নেই।তার বদলে অন্য একটি ছেলে বসে।শুভব্রত ইতস্তত করে।কী বলে শুরু করবে সে?ভাবতে ভাবতেই শুভব্রত অনুভব করলো তার পিঠে কারও একটা হাত এসে পড়েছে।মাথা ঘোরাতেই সে দেখলো,সেই হাত প্রদ্যুত সরকারের!
-আরে।শুভদা না?কী ব্যাপার।এখানে দাঁড়িয়ে কেন?চলো আমার চেম্বারে।তোমার লেখা চিরকুটটা গতকালই আমাকে শ্রীময়ী দিয়েছে।
-কিছু কথা ছিল আসলে…
-হ্যাঁ।চলো না।ওখানে বসেই কথা বলি।কথা বলতে বলতে আমাদের চা খাওয়াটাও হয়ে যাবে।
প্রদ্যুতকে এতোবছর পরে সামান্য মেদযুক্ত মনে হলো শুভব্রতর।মুখের চামড়ার রঙ উজ্জ্বলতর হয়েছে।এ কী স্বীকৃতির সাফল্যে না ফাউণ্ডেশনের জাদুতে,অনেক চেষ্টা করেও শুভব্রত সে কথা বুঝতে পারলো না।একটা প্রকাণ্ড কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল তারা।ঠিক যেন মনজ্ঞ অক্ষরের ভার ত্যাগ করে প্যামফ্লেট রচয়িতা জনগণের স্লোগানে চেপে বসছেন।ক্রমশ তার হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে।অচিন্ত্যবাবুর বাংলোবাড়িতে দাবাখেলার ঘুঁটির মতোই।
উপরের চাতালে উঠেই একপাশে কাচের দেওয়াল।তার ওইপাশে প্রদ্যুত সরকারের আলাদা কিউবিকল।সেই কিউবিকলে বসতে বলে ইশারায় ফুটবলের কোচের মতো উল্টো দিকের কিউবিকলে আসা চাদোকানের ছেলেটিকে চা দিতে বলল প্রদ্যুত।তারপর চেয়ারের অপরপারে বসে শুভব্রতর দিকে বেনিয়ার মতো তাকিয়ে বলল।
-তারপর শুমদা।তোমার পত্রিকার কী খবর?
শুভব্রত দায়সারাভাবে বলল,”বের হবে।অনলাইন”
-ভালোই করেছো।যুগ পাল্টাচ্ছে।এই ভাইরাস আসলে আমাদের কাছে একটা আয়না।গা ঝাড়া দিয়ে সত্যিটা দেখিয়ে দিচ্ছে।
-কীরকম?
-এই যেমন।বলো তো।এতো লিটল ম্যাগাজিন।শনিবারের কফিহাউজে এতো গিজগিজ করছে সব সম্পাদক।কী হয় এইসব ম্যাগাজিন বের করে?কেউ পড়ে?অনলাইন হলে অন্তত বেশ কিছু কাগজ ভাঁচবে,আরকাইভেও থেকে যাবে।মুদ্রিত সংস্করণের ক্ষেত্রে কিছু মনে করো না শুভদা,লিটল ম্যাগাজিন অনেকটাই প্রফেশনালিজম ‘ল্যাক’ করে।আধুনিক যুগে তাই যারা পেশাদার,তাদের হাতেই পত্রিকা থাকা উচিত।
প্রদ্যুতের কথাগুলো শুনতে শুনতে শুভব্রতর হঠাৎ বিমলেন্দুবাবুর মুখ মনে পড়ে।একদলা তেতো রস উঠে আসে মুখে।
-তুমি তাহলে কোন পত্রিকার হাত ধরে পরিচিতি পেয়েছিলে প্রদ্যুত?
শুভব্রত এবার শিতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রদ্যুতের দিকে।সেই শীতলতার সামনে প্রদ্যুতের যৌবনোচ্ছ্বল হিরণ্যশিখা মুহূর্তে নির্বাপিত হয়ে গেল।সে যেন আবার একটা সংকটের মুখোমুখি হয়ে দিশেহারা হচ্ছে প্রতি পদে।অক্ষরহীন যে বেলুন চড়ে সে ছনসমুদ্রে চেপে বলেছিল একমুহূর্ত আগে,তা যেন মুহূর্তে তার হৃদয়ের প্রাণবায়ু হারিয়ে হুহু করে নেমে আসছে মাটির দিকে।
-আমার ওপর রেগে আছো শুভদা?কেন রেগে আছো আমি জানি।বিশ্বাস করো।বিমলেন্দুবাবুকে আমি আজও শ্রদ্ধা করি।তাঁকে অপমান করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না।
-ও কথা ছাড়ো।যে কাজে এসেছি সে বিষয়ে বলি।তোমার সম্পাদিত বইটি দেখলাম।সুসংকলন নিঃসন্দেহে।ভূমিকাটিও বলিষ্ঠ।কিন্তু যার আধারে এই জল তুমি পান করলে,সে ‘কর্ণ’ পত্রিকার প্রতি তোমার কোনও লিখিত কৃতজ্ঞতা দেখলাম না কোথাও!
চা দিয়ে গেল ছেলেটি।প্রদ্যুতের জন্য আলাদা পরসিলিন কাপ।সেই কাপে আরুণির প্রকাশনা লোগো।শুভব্রতর জন্য মাটির ভাঁড়।চায়ে চুমুক দিতেদিতে প্রদ্যুত বলল,”উপায় ছিল না শুভদা।সব কিছু আমার হাতে থাকে না।আমাদের চিফ এডিটর মিস্টার বানশাল আপনার মৈনাকবাবুকে একদম পছন্দ করেন না।কিন্তু ওই তুচ্ছ কারণের জন্য সমগ্র বাঙালি পাঠককে কি ওই অসামান্য প্রবন্ধগুলি থেকে বঞ্চিত করা ঠিক?আর তাছাড়া কিছুদিন বাদে আমাকেই কী আর মনে রাখবে পাঠক?একজন সম্পাদক আর সংকলক,দুজনেই আসলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান।তার আলাদা করে কোনও প্রত্যাশা রাখা অনুচিত।”
শুভব্রত মিটিমিটি হাসে।মনে মনে বলে প্রয়োজন বা প্রত্যাশাটা কার ছিল প্রদ্যুত?বাংলার প্রবন্ধপিপাসু পাঠকের?নাকি তোমার?প্রকাশনা দপ্তরে নিজের অস্তিত্ব আর ক্রেডেনশিয়াল রক্ষা করতেই কি তবে প্রদ্যুত ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’তে সরে এল?প্রদ্যুত একটা ফাইল বের করে ড্রয়ার থেকে।তারপর সেলোফেনে মোড়া একটা জেরক্স কাগজ বের করে পড়তে থাকে।
-“কাগজ চলে ডায়ালেকটিক্সের নিয়মানুযায়ী-যতোটা সহযোগিতা,ততোটাই অসহযোগিতা।সম্পাদকের বানানো দু হাত বা কবির সৌজন্যমগ্ন চোখ দেখে প্রথমটা বোঝা যায় না এরা কি সাঙ্ঘাতিক প্রতিপক্ষ….”
শুভব্রত ইশারা করে প্রদ্যুতকে থামিয়ে দেয় এবার।তারপর চোখ বন্ধ করে বলতে থাকে।”…সম্পাদকের বাড়ানো দুহাত আসলে বন্ধুর নয় রত্নান্বেষী রোবটের।কবির সৌজন্যমগ্ন চোখ আসলে উদ্দেশ্যময় পরভৃত পাখির,নষ্ট ডিমেও তা না দিলে যা মুহূর্তে ড্রাগনের মতো হয়ে যায়
দুদলই সব সময় চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষকে হঠিয়ে দিয়ে কাগজটাকে দখলে আনতে।”
এতোটুকু বলেই শুভব্রত চোখ খুলে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ প্রদ্যুতের দিকে তাকিয়ে প্রশান্তমুখে হাসলো।”কি ঠিক বললাম তো?”প্রদ্যুত মুহূর্তে আবার “তুমি”তে ফিরে এল।
-তুমি ‘পরমা’র সম্পাদকীয় মুখস্থ বললে প্রদ্যুতদা?
-হ্যাঁ।আমি মনে করি একটা পত্রিকায় সম্পাদকের অতোটুকুই স্পেস।নিজের প্রতিবাদ,প্রতিভা ও জীবনীশক্তির জন্য ওই এক দু’পাতা।আমি ওগুলো রোজ পড়তাম।আমার তোমার মতো বাহারি ফাইল ছিল না তো।তাই মনে রাখতাম।আত্মস্থ করতাম।খানিকটা মতৈক্য হতো।খানিকটা মতানৈক্য।কিন্তু ভিতর থেকে ভেসে আসতো নিজস্ব স্বর।সেই স্বর আমার নিজস্ব সম্পাদকীয়।কারো ধার করা নয়।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছিল শুভব্রত।প্রদ্যুত তার পিছনে পিছনে আসছিল।সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রদ্যুত বলল,”আমাকে ক্ষমা করে দিও শুভদা।”
শুভব্রত সামান্য হেসে বলে,”একথা তোমার ‘কর্ণ’ পত্রিকার সম্পাদক মৈনাককে বলা উচিত।সে ভুল করেছিল।স্বপ্ন দেখেছিল তোমার চোখে।ভুল করেছিল।”

বাইরের চলমান রাস্তার ব্যস্ততায় উঁকি দিচ্ছে পুরনো রাজস্তম্ভ।শুভব্রত বলে,”একজন সম্পাদকের কাছে তার পত্রিকা একটা দেউলের মতো।মনে রেখো।”
-এক মিনিট দাঁড়াবে দাদা।আমি এখুনি আসছি।
শুভব্রত অসম্মত হয় না।প্রদ্যুত যেন তার সামনে কাফকার গদ্যের মানুষটির মতোই আবার রূপান্তরিত হয়ে গেছে।হোক সে আরুণির তারকা সম্পাদক।মৈনাকের কর্মযজ্ঞর সামনে সে এখনও তরুণ,অপরিণত,শিশু।আরুণি প্রকাশনার উল্টোদিকের ফুটপাথে চাদোকানে অপেক্ষা করতে করতে শুভব্রত দেখে প্রদ্যুত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে।হাতে তার একটা সাদা রঙের খাম।শুভব্রতর হাতে সেই খামটা দিয়ে প্রদ্যুত কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
-দাদা।একটা অনুরোধ রাখবে আমার?
-বলো?
-একবার যাবে মৈনাকদার কাছে?আমার হয়ে?আমিও যাবো।আসলে অফিসে এই সংক্রমণের সময় অনেক কর্মী ছাঁটাই হয়ে গেছে।অনেকগুলো শাখাপত্রিকা হয়তো বন্ধ করে দেবে ‘আরুণি’।এই অবস্থায় ওদের সঙ্গে মতবিরোধে গেলে আমার চাকরিটা চলে যাবে শুভদা।বিয়ে করবো আসছে মাসে।আমার প্রেমিকা সম্পূর্ণা আর সময় দেবে না আমাকে।বাড়িতে বৃদ্ধ মা আর বাবা।তাঁদের চিকিৎসার খরচ।এখন অফিসে ‘লিভ’ নিলে সকলের বিষনজরে পড়ে যাবো।তাই এই কাজ তোমাকেই করতে হবে শুভদা।
-বুঝলাম।আমাকে কী করতে হবে?
-একবার মৈনাকদাকে এই খামটা পৌছে দিও।
-কী আছে এই খামে?
-একটা চিঠি।আমি মৈনাকদার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি।আমি কথা দিচ্ছি দ্বিতীয় সংস্করণ বের হবার সময় চিফএডিটরকে বলে ‘কর্ণ’ পত্রিকা ও তার সম্পাদক মৈনাক মণ্ডলের প্রতি লিখিত কৃতজ্ঞতাস্বীকার বের করবার জন্য আমি রাজি করাবোই।
-বেশ।আর?
-আর কিছু টাকা আছে।রেগে যেও না।এ টাকা পারিশ্রমিক নয়।’কর্ণ’ পত্রিকা ঘিরে মৈনাকদার সাধনার দামও এ নয়।
-তাহলে?
-মৈনাকদার শরীরটা ভালো নেই।চিকিৎসা করাচ্ছে না অর্থাভাবে।আমি তোমার মারফত আপাতত সেই চিকিৎসার ব্যায়ভারটা তুলে নিতে চাই।তুমি ‘না’ বলো না প্লিজ।এটা ধরে নাও আমার প্রায়শ্চিত্ত।

একটি মহাকাব্যে বুদবুদের মতো সঞ্চরমান চরিত্ররা কী শুধুই সাদা আর কালো রঙে আঁকা হয়?এই যেমন প্রথম পাণ্ডব ‘কর্ণ’।মহাভারতীয় দর্পণে সে কি শুধুই একজন প্রতিনায়ক?তবে কেন একমাত্র তার মৃত্যুক্ষণেই পাঠক আনমনা হয়ে যায়।একই বেদনায় রোদন করতে থাকে দুর্যোধন ও অর্জুন?শুভব্রতর মনে হয় তার আশপাশ সমুদ্রতট বদলে যেন কোনও মহাকাব্যিক রণভূমি হয়ে উঠেছে।সেখানে এক মুহূর্তের নায়ক পরমুহূর্তেই প্রতিনায়ক আর প্রতিনায়ক নায়ক।এই দোলাচলের সন্ধিক্ষণে নির্বিকল্প কালের মতো সে মনে মনে প্রদ্যুত সরকারকে ক্ষমা করে দেয়।তাকে এখুনি যেতে হবে কাঁকিনাড়ায়।মৈনাকের কাছে যেতে হবে।সেখানে তার জন্য কোন যুগসন্ধিক্ষণ অপেক্ষা করছে কে জানে!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।