কর্ণফুলির গল্প বলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুজিত চট্টোপাধ্যায় (পর্ব – ১০)
by
·
Published
· Updated
নীলচে সুখ
পাহাড়ি পথে গাড়ি চাপলেই সমতলের মানুষ কিঞ্চিৎ ভীতু হয়ে যান। পাকদণ্ডী পথে পাক খেতে খেতে গাড়ি যতই ওপর দিকে উঠতে থাকে। নিচের দিকে তাকালে, বুক কেঁপে ওঠে।
মৃত্যু ভয় , প্রতি মুহূর্তে জানান দেয় , জীবন কত মধুর , কত সুন্দর।
একে হারাতে চাই না। থাকো, থাকো, ওগো প্রাণ । শরীরের খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকো দীর্ঘ সময়। আনন্দময় সুখী হয়ে।
যান্ত্রিক বিপর্যয়ের ভয় তো আছেই। বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা দুরন্ত গাড়ি গুলো , যতক্ষণ না পাশ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে , আতঙ্ক কাটে না। বিশেষ করে গাড়ি যদি , খাদের দিকে থাকে।
আর, স্টিয়ারিং হাতে লোকটির প্রতি আস্থা যদি তলানিতে গিয়ে থাকে । তবে আতঙ্কের মাত্রা কোথায় পৌঁছাতে পারে , তা ভুক্তভোগী মাত্রই নির্ঘাত ভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।
এদের ক্ষেত্রেও সেই একই অনুভূতি। তাই , পথে যেতে যেতে প্রকৃতির আশ্চর্য সুন্দর রূপ-সুধা তেমন করে আকন্ঠ মুগ্ধতায় পান করা হয়ে উঠলো না। একটা ভয়ার্ত , দমবন্ধ ভাবনা থেকে কিছুতেই নিস্তার পাওয়া গেল না।
ড্রাইভার হঠাৎ হিন্দিতে বললো। যার বাংলা তর্জমা করলে যা হবে,, ,,, ডান দিকের জানালার কাঁচগুলো বন্ধ করে দিন। নইলে, ঝর্ণার জলে ভিজে যাবেন। এখনই আমরা ঝর্ণার ভেতর দিয়ে যাবো। ভীষণ ঠান্ডা জল। বরফের মতো। এই ঠান্ডায় ভিজে গেলে, খুবই কষ্ট পাবেন।
এর পরের কথাটি সত্যিই আতঙ্কিত হবার মতো।
ঝর্ণার জলে ওখানকার রাস্তায় হাল খুবই খারাপ। গাড়ি দুলবে। ভয় পাবেন না। সবাই শক্তকরে ধরে চুপচাপ বসে থাকবেন। নড়াচড়া করবেন না । কারণ রাস্তা শুধু ভাঙাই নয় , পিচ্ছিলও বটে।
সকলেই বাক্যহারা। সকলেই সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিলো।
কিছুক্ষণ আগেই ঘটে যাওয়া সেই ভয়ানক ঘটনা এখনো মনের মধ্যে দগদগে হয়ে আছে। এরপর আবারও যদি ,,,
মিসেস রায় , মনেমনে এই অনাবশ্যক ঝুঁকি পূর্ণ ভ্রমণে আসার জন্য আক্ষেপ করছেন। আনমনে হাত ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা ছোট্ট রুমাল বের করে আনলেন। পুটুলির মতো করে বাঁধা ।
সেটি চোখ বুঁজিয়ে কপালে ছোঁয়ালেন। ওটা মানালির দেওয়া সেই প্রসাদী ফুল।
দুর্গামাঈ কী জয়। বিপদ আপদে তার কথাই বড্ড বেশি মনে পড়ে।
প্রফেসর বিস্ফোরিত চোখে বললেন,,,, একেবারে ঝর্ণার মাঝখান দিয়ে ?
ড্রাইভার বললো,,, ইয়েস স্যার । বো ঝোরা পাহাড় কে উপর সে সিধা রাস্তে পে গিড়তা। তেজ জাদা নেহি , লেকিন পানি কে কারণ দিক্কত হোতি হ্যায়।
ডড় নেহি ।
আর একটু এগিয়েই ড্রাইভার বললো,,,,
বো দেখিয়ে , দূর সে বহৎ আচ্ছি লাগতি। ম্যায় ইঁহা গাড়ি রোক দেতা হুঁ। ফোটো খিঁচ লিজিয়ে।
নীল বসে ছিল সেই জানালার ধারেই। দরজা খুলে সেই প্রথম নেমে গেল । অস্ফুটস্বরে বললো ,,,
রিয়েলি ওয়ান্ডারফুল । নাইস।
একে একে সবাই নেমে এলো গাড়ি থেকে। সেই আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্যের মনোহরণ রুপে, মোহিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে সহস্রবার জীবনের ঝুঁকি নেওয়া যায়। এ-ই তো জীবন। এখানেই তো জীবন আর মরণের তফাৎ।
দূর থেকে যে নৃত্যরতা কিশোরী ঝর্ণা টি দেখা যাচ্ছিলো এতক্ষণ । এ-ই সেই স্বর্গীয় নর্তকী। পাহাড়ের কোল থেকে নেমে এলোমেলো অশান্ত দুরন্ত পায়ে সে ছুটে যেতে যায় কোন অজানার দেশে। অজস্র অজস্র জলকণা ধোঁয়ার মতো ছেয়ে ফেলেছে চারদিক। সাদা ফ্যানার স্রোত হু হু করে নেমে যাচ্ছে পাশের খাদে জলতরঙ্গ বাজাতে বাজাতে।
মুভি মুডে ছবি ধরা রইলো সকলের ক্যামেরায়। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। কিন্তু ছবি তো শুধুই ছবি। প্রাণসঞ্চার হলো কী তাতে ? না। তাকে ধরা যায় না। সে থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মনের অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার পেয়েছে যে , তাকে বন্দী করবে , এমন সাধ্য কার ?
গাড়ি এগিয়ে চললো। চিরকিশোরী রৌপ্যবর্ণা মাধুরি কে প্রেম চুম্বন দিয়ে , দূরে , আরও অনেকটা পথ বাকি। পৌঁছাতে হবে সন্ধ্যার আঁধার নামার আগেই। এইপথে পাহাড়ি ভাল্লুকের উপদ্রব আছে।
এখন পাহাড় যেন চারপাশ থেকে জাপটে ধরতে আসছে। কালচে পাহাড় গুলো এক-একটা বিশালাকার দৈত্যের মতন খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
এতো রুপ এরা পেলো কোথায় । কোন সে রুপকার , কেমন করে এমন হৃদয় হরণ সাজে সাজালো এদের ?
হে প্রকৃতি । হে প্রকৃত দেবতা । তুমি তোমার অনির্বচনীয় সুখানুভূতি রংতুলির প্রলেপ বুলিয়ে দাও প্রতিটি মানুষের অন্তরে। ঘুচে যাক অমানিশার করাল ছায়া। প্রতিষ্ঠিত হোক প্রেমময় আলোকবর্তিকা। হয়ে উঠুক বিশাল আর সুন্দর।
গাড়ি আরও কিছুদূর গিয়ে , আচমকাই তার গতি কমিয়ে দিলো। ওরা সবাই গাড়ির সামনের কাঁচ দিয়ে দেখতে পেল,,, একটা পাহাড়ি ভাল্লুক দুলকি চালে রাস্তার একপাশ দিয়ে চলছে ।
ড্রাইভার বললো ,,, দেখিয়ে , ভালু আ গিয়া।
তন্ময় অস্থির হয়ে বললো ,,,, আরে ভাই , পাশকাটিয়ে চলো না,,, ভাল্লুক আবার দেখার কী হলো ?
ব্রজেশ বললো ,,,, এই,, শোন , তুই কখনো দেখেছিস,,, রাস্তা দিয়ে ভাল্লুক দুলকি চালে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে ?
তন্ময় চুপসে গেল। তবুও বললো ,,, না মানে,, দেরি হয়ে যাচ্ছে , তাই,,,,
প্রফেসর বললেন ,,,, আরে , যদি পাশকাটিয়ে যাওয়া উচিৎ হতো , তাহলে ড্রাইভার তাই করতো।
রাইট স্যার । বো কভী ভি এট্যাক কর সকতা হ্যায়। বো আবভী জঙ্গল কা রাস্তা পরড় লেগা। সামনে যানা খতরনাক হো সকতী হ্যায়। ইয়ে বহৎ ডেঞ্জারাস জানবার সাব।
সত্যিই তাই। ভাল্লুকটা বাঁদিকের পাহাড়ের বাঁকে জঙ্গলে ঢুকে গেল। এইসময়ের অপেক্ষাতেই ছিল ড্রাইভার। জোরে গাড়ি চালিয়ে দিলো।
এখন আর কোথাও কালক্ষয় নয়। গাড়ি ছুটে চললো লাচেনের উদ্দেশ্যে ।