সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সীমন্তি চ্যাটার্জি (পর্ব – ২৬)

স্রোতের কথা

পর্ব – ২৬

[ ওরা আর আমরা ]

“প্যাম….প্যাম… কি হল তোর প্যাম?? প্লিজ কিছু বল্…স্রোত…মিট্টি তোরা একটু দ্যাখ্ না রে…প্যাম সাড়া দিচ্ছে না..”…সুজীর গলায় ভয় আর কান্না…
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে ,কি করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না….প্যামের দিকে যাবো না রুকসানার দিকে যাবো…না কি‌ ডাইকো…সমীর…রিজ্‌‌ কে সাহায্য করতে যাবো…ভাবতে ভাবতেই দেখলাম আমার পাশ দিয়ে মিট্টি প্যামের দিকে ছুটে গেল… আর প্যামের পাশে বসে পড়ে প্যামের রিস্ট‌টা ধরে পালস্ শোনার চেষ্টা করলো…তারপর সুজীর দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো…
“পালস্ রেট ঠিক আছে রে…শক্ লেগে জ্ঞান হারিয়েছে… একটু জল পেলে…চোখে মুখে দিতে পারলে ভালো হতো… কিন্তু এখানে জল কোথায় পাবো…”
ওদের কথা শুনতে শুনতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম… হঠাৎ একটা আর্তনাদ শুনে চমকে উঠে পিছন ফিরে , অন্যদের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে আমার হাড় হিম হয়ে গেল…
রিজ্ রুকসানার শরীর টাকে আড়াল করে ঐ ছেলে মেয়ে গুলোর হাত থেকে ওকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে…আর সেই ফাঁকে যে মেয়েটা রুকসানার পা টা চাটছিল…সে বোধহয় বাধা পেয়ে রিজের পা টাই কামড়ে ধরেছে…
“স্রোত …বাঁচা বাঁচা…”
আমি রিজের দিকে এগোতে যাবো…ডাইকোর চিৎকার শুনে থেমে গিয়ে তাকালাম…
ডাইকো মাটিতে পড়ে গেছে আর একটা ছেলে ডাইকোর উপর চেপে বসে দুহাতে ওর হাত দুটো চেপে রেখে, কুকুরের মত দাঁতগুলো দিয়ে ওর গলার কাছ টা কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে…আর ডাইকো শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে প্রাণপনে ছেলেটাকে ঠেকাতে চেষ্টা করতে করতে আমাদের নাম ধরে চিৎকার করছে…. আতঙ্কে আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল…
“স্রোত …স্রোত হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন…ডাইকো কে বাঁচা শিগগির….ডাইকো মরে যাবে তো…হে মহাকালী… আমি রিজের কাছে যাচ্ছি… রিজ্ রিজ্ “…বলতে বলতেই মিট্টি আমাকে এক ধাক্কা মেরেই… রিজের দিকে ছুট লাগাতে আমিও সম্বিত ফিরে পেলাম…সুজীকে বললাম,…”প্যামকে ছেড়ে কোথাও নড়বিনা…” বলেই আমি ডাইকোর দিকে দৌড় লাগালাম…যেতে যেতেই সমীরের গলা শুনলাম…
“তবে রে শয়তান..পেত্নী মেয়ে….মেয়ে হয়ে ছেলেদের সঙ্গে গায়ের জোর দেখানো…দ্যাখ্ কি করি তোর…” সমীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম…সমীর ওদের দলের একটা মেয়ের হাত মুচড়ে ধরেছে…আর মেয়েটার মুখ থেকে জান্তব আর্তনাদ বেরোচ্ছে
কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ও দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে আমি দৌড়ের গতি বাড়িয়ে ডাইকোর কাছে পৌঁছে গেলাম…
“এই শয়তান…ডাইকোকে ছাড় বলছি…” বলেই ওর উপরে চেপে বসে থাকা ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে টান লাগালাম… আমাকে অবাক করে ছেলেটার মাথা থেকে একমুঠো মাংস সমেত চুল উপড়ে এল… কিন্তু ছেলেটা যেন কিছুই বুঝলো না আর এতটুকু নড়লোও না… আমি হাতে উঠে আসা রক্তে চটচটে চুল গুলো ফেলে দিয়ে ওর কাঁধ ধরে টেনে সরাতে চাইলাম…ওর পুরোনো পচে যাওয়া নোংরা জামাটা ছিঁড়ে হাতে উঠে এল শুধু… কিন্তু ছেলেটাকে একচুলও নড়াতে পারলাম না…আর এটুকুও বুঝলাম…এই অস্বাভাবিক ছেলে মেয়ে গুলোর গায়ে অসম্ভব জোর।
“স্রোওওওত….পা…ও…য়া..র” ডাইকো কোনোরকমে গলা দিয়ে শব্দ কটা বার করতে পারলো… কারণ ততক্ষণে ডাইকোর প্রাণপন প্রতিরোধ সত্বেও ছেলেটার মুখ ওর গলার অনেকটাই কাছে চলে এসেছে… আর একচুল হলেই ওর ধারালো দাঁতগুলো ডাইকোর গলা স্পর্শ করবে… আমি বুঝলাম ডাইকো আমাকে আমার স্পেশাল পাওয়ার ব্যবহার করতে বলছে…. কিন্তু কিভাবে!! আমি তো জানি না কি করে নিজের পাওয়ার এসব ক্ষেত্রে ইউজ্ করতে হয়… আর আরো একটা জিনিসও বুঝলাম না… তাহলে ডাইকো নিজের পাওয়ার ইউজ্ করছেনা কেন!!
আমি চিৎকার করে উঠলাম
“কি ভাবে ডাইকো??প্লিজ একটু বলে দে…”
” স্রোত গডেস কে স্মরণ কঅঅঅর্”
মিট্টির গলার চিৎকার শুনে আমি ঘুরে তাকালাম…আর দেখলাম…মিট্টি একটা চোখ ধাঁধানো সাদা আলোর বিশাল বলয়ের মধ্যে হাওয়ায় ভাসছে…আর ওর লম্বা লম্বা সাদা নখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে…যে মেয়েটা রিজের পায়ে কামড় দিয়েছিল…সে একপাশে পড়ে বাম দিকের কাঁধটা চেপে ধরে কাতরাচ্ছে … আর তার একটু দূরে পড়ে আছে একটা ছেঁড়া হাত… রিজের পা থেকে নাকি মেয়েটার ছেঁড়া হাত বা কাঁধ থেকে সেটা ঠিক বুঝলাম না, …তবে দেখলাম…রক্তে ভিজে গিয়ে সবুজ ঘাসে মোড়া অনেকটা জায়গা লালচে দেখাচ্ছে…”
তার একটু পাশেই সমীর দেখলাম মেয়েটা কে কব্জা করে ,ওকে ধরে পিছন দিকে ঘুরিয়ে ওর কাঁধে নিজের ধারালো বাঘের মতো ভ্যাম্পায়ারের দাঁত গুলো বসিয়ে দিতে পেরেছে….আর মেয়েটা আহত জন্তুর মতো চাপা গলায় গর্জন করছে…
“স্রোওওওত”
ডাইকোর ক্ষীণ গলা কানে আসতেই আমি বুঝলাম, আমি অনেক দেরি করে ফেলছি… কারণ ডাইকোর দুর্বল প্রতিরোধ ভেদ করে ছেলেটা ডাইকোর গলা টিপে ধরে ওর গলার কাছে মুখ টা প্রায় নিয়েই এসেছে…
আমি চোখ বন্ধ করে তিনবার নিঃশ্বাস নিলাম…মনে মনে চারজন গডেস্ কেই সম্বোধন করে বললাম…”তোমরাই আমাকে স্পেশাল বানিয়েছ…আর আমি এটাও জানি… আমার পাওয়ার যদি কিছু থাকে বা যেটুকু তোমরা আমায় দিয়েছ…তা তোমরা আমাকে ইউনিভার্সের মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করতেই দিয়েছ… আমি কি করে কি করতে হয় কিচ্ছু জানি না…তোমরা আমাকে পথ দেখাও…আমার বন্ধুদের এই বিপদে যেন আমি ওদের সাহায্য করতে পারি..দয়া করো ”
ভাবতে ভাবতেই অনুভব করলাম আমার চারপাশ জুড়ে একটা গরম হাওয়া , ঘূর্ণিঝড়ের মত পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে…আর সেই হাওয়া এক নিমেষে আমাকে মাটি থেকে অনেক উপরে হাওয়ায় তুলে নিল… আমি আমার ভিতরেও একটা গরম শিরশিরে অনুভূতি টের পেলাম..যেন সেই অনূভূতি টা আমার ভিতর থেকে বাইরে আসার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে…আর আমার সমস্ত রোমকূপ এমন কি আমার চোখ,নাক,মুখ থেকেও বেরোনোর পথ খুঁজছে… আমি সমস্ত অনুভূতি টাকে আমার ডান হাতের তালুতে সংহত করার চেষ্টা করলাম…
আর সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম আমার ডান হাতের চেটো থেকে তীরের মতো এক তীব্র আলোর শিখা, ডাইকোর উপর চেপে বসে থাকা ছেলেটার পিঠ স্পর্শ করলো… মূহুর্তের মধ্যে ওর পিঠে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো… ছেলেটা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠে ডাইকোর উপর থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে মাটিতে পিঠ ঘষতে ঘষতে করুন আর্তনাদ করতে লাগলো… কিন্তু আগুন এতটুকুও নিভলো না…উল্টে ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো… আমি বুঝলাম আর একটু পরে ছেলেটার সমস্ত অস্তিত্বই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে…আর আমাকে এটা থামাতে হবে…যে যেমনই হোক…যা ই হয়ে যাক্…নিজের পাওয়ার আছে বলে…তাই দিয়ে কাউকে মেরে ফেলা দিম্মার সার্সীর ইচ্ছে হতে পারেনা… আমি নিজেই নিজেকে বললাম… “অনেক হয়েছে…ও যেন না মরে যায়…প্লিজ দেখো…”
কে শুনলো …কেন বললাম…তা জানি না… কিন্তু দেখলাম…আগুন‌ প্রায় নিভে এল… আর চামড়া পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠলো…ছেলেটা তখনও করুন দুর্বোধ্য ভাষায় অস্ফুট আর্তনাদ করছিল…
ডাইকো উঠে বসে গলায় হাত বুলোতে বুলোতে হাঁফাতে হাঁফাতেই আমার দিকে তাকিয়ে একটু বিস্মিত হাসি হেসে হাত তুলে থাম্বস্ আপ দেখানোর চেষ্টা করলো… আমি তখনও হাওয়ায় ভাসছি…আর বুঝতে পারলাম… আমার চারপাশে সেই গরম হাওয়া একই ভাবে পাক খাচ্ছে…
“স্রোত…..মি…. ট….টি!!!!” আওয়াজ শুনে দেখলাম…সমীর যে মেয়েটির ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে ছিল…সে কোনো ভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সমীর কে মাটিতে ফেলে দিয়েছে….সমীর বেকায়দায় পড়ে গিয়ে পিছন ঘষে‌ ঘষে সরার চেষ্টা করছে…আর মেয়েটা‌ বীভৎস ভাবে‌ পাগল কুকুরের মতো দাঁতগুলো খিঁচিয়ে সমীরের দিকে তেড়ে যাচ্ছে…ওর কুচকুচে কালো চোখ দুটো থেকে যেন ঘৃণার আগুন বর্ষিত হচ্ছে… আমি একটা জিনিস বুঝলাম…এই ছেলেমেয়ে গুলোর সব কটা দাঁতই কুকুরের ক্যানাইন দাঁতের মতো ছূঁচলো ও ধারালো..
ভ্যাম্পায়ারদের মতো শুধুমাত্র দুটো দাঁত নয়…. কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই
আমি মুহূর্তের মধ্যে সমীরের দিকে যেন একটা উল্কার মতো এগিয়ে গেলাম…আর মেয়েটার মুখোমুখি দাঁড়ালাম… আমার গাট্ ফিলিং বলছিল এই মেয়েটাই এদের তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী…
“স্রোত আমিও এসে গেছি…চল্ দুজনে মিলে এটাকে মজা দেখাই….কি সমীর স্যার?? তাহলে ছেলেদের মেয়েরাই মারছে আর মেয়েরাই বাঁচাচ্ছে আজকাল!! ” মিট্টির হাসিমাখা কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বর আমার কানের পাশেই…ও ও কখন আমার পাশে চলে এসেছে… আর আমার মতই হাওয়ায় ভেসে আছে…
” মিট্টি এদের একেবারে মেরে ফেলবি না কিন্তু…”
বলতে বলতেই আমি টের পেলাম… একটা ভোরের পাখি ডেকে উঠলো… আর ঠান্ডা ভোরাই বাতাসের অনুভবের সাথে সাথেই দেখলাম পূব দিকটা হালকা হতে শুরু করেছে… সঙ্গে সঙ্গে আরো অবাক হয়ে দেখলাম ঐ‌ অদ্ভুত ছেলেমেয়ে গুলোও পূর্বদিকে তাকিয়ে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গোঙানির মতো গর্জন করে উঠলো আর পিঠ পুড়ে যাওয়া ছেলেটা,হাত ছিঁড়ে যাওয়া মেয়েটা আর আমাদের সামনে থাকা মেয়েটাও ঠিক বিদ্যুতের মতো একজায়গায় এসে সবাই সবার মুখের দিকে তাকালো….
আমি বুঝলাম…এরাও ইসপ্যামার বাকীদের মতো বা আমাদের মতোই সূর্যের রশ্মি বা দিনের আলো সহ্য করতে পারে না।ভাবতে ভাবতেই দেখলাম ছেঁড়া হাত টা কোনোরকমে কুড়িয়ে নিয়ে ওরা ঠিক চিতাবাঘের মতো ঘাসের মধ্যে গুঁড়ি মেরে বসে পড়লো…তারপর অদ্ভুত ভাবে বুকে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে যেন মাটির তলায় অদৃশ্য হয়ে গেল….
“স্রোত…মিট্টি…ভোর হয়ে আসছে…তোরা তোদের পাওয়ার রিলিজ কর…”আমাদের এক্ষুনি ফিরতে হবে…”
নীচ থেকে ডাইকোর চিৎকার ভেসে এল
“কি করে করতে হয় রে?? একটু বলে দে…” আমি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই ওর দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম
“তোদের পাওয়ার কে ফিরে যেতে রিকোয়েস্ট কর”
অদ্ভুত লাগলেও…ডাইকোর কথা মেনে নিয়ে আমি আর মিট্টি দুজনেই হাত জোড় করে তাই করলাম…
আর টের পেলাম…আমরা দুজনেই মাটির উপর এসে দাঁড়িয়েছি…আর আমার চারপাশ জুড়ে বইতে থাকা গরম হাওয়া আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে…
আহত,পা টেনে টেনে কোনোরকমে হাঁটতে থাকা রিজ্….জ্ঞান ফিরে আসা প্যাম…দুর্বল ডাইকো…আর অজ্ঞান রুকসানা কে কোলে নিয়ে আমরা যখন নিজেদের যতটা সম্ভব লুকিয়ে ,আর যত তাড়াতাড়ি ফেরা সম্ভব…ততটাই তাড়াতাড়ি….শুনশান ইসপ্যামার রাস্তা ধরে ফ্লেজলিং‌ হাউসে ফিরে এলাম…তখন চারিদিক ভোরের আলোয় সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত….
কিছু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঘোরে নিজেরা এতটাই ক্লান্ত ও মশগুল ছিলাম….যে হাউসে ঢোকার সময়,খেয়ালও করিনি…
হাউসের দোতলার একটা ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে একজোড়া তীক্ষ্ম চোখ আমাদের ফিরে আসার দিকে তাকিয়ে সব কিছু দেখছে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।