মুখোমুখি নিস্তব্ধ রাজদরবারের অন্দরমহলে বসে আছে দুটি নিঃসঙ্গ মানুষ।যেন একে অপরের প্রতিচ্ছায়া।তরুলতার তোয়াকে কতো যুগ ধরে চেনা মনে হয়।তোয়ার তরুলতাকে।যেন জলঙ্গি প্রজাপতির দুই ডানার প্রান্ত ঘেঁষা সমান্তরাল একসারি সবুজ ছোঁয়া আকাশি বিন্দু।তারা একে অপরকে স্পর্শ না করেও দিব্বি বসত করতে পারে দিনের পর দিন,মাসের পর মাস,জনমের পর জনম।তোয়া ‘দোয়াব’এর পাতা উল্টে চলে।হারিয়ে যাওয়া কবিতা আঁকড়ে ধরে।ট্যাবলয়েড থেকে উঁকি দেয় ‘আদর’।ও কিছু না।ও এক কবিতার নাম।তোয়া তরুলতাকে কবিতার শব্দ দিয়ে ছুঁতে চায়।সত্যিকারের স্পর্শ করবার শক্তি তার শরীরে নেই।তার শরীর জুড়ে অ্যামায়ট্রপিক ল্যাটারাল স্লেরোসিস।সে তাই দ্বিগুণ আবেগঘন উচ্চারণে পড়ে চলে,”শরীর করেনি এই শরীরকে আগ্রাসী আদর।জলন্ত চুল্লী দুটি পরস্পর দেয়নি উত্তাপ…”।তরুলতা চোখ বন্ধ করে।তার দুই ঠোঁট স্পর্শ করছে কেউ।সে ঠোঁট দুর্বল।কিন্তু তার আদরের শক্তি প্রবল।সিড়সিড় করে তার ভিতরটুকু।তরুলতা চোখ বন্ধ করে দেখে তরুলতার কবিতার শব্দগুলি তাকে আদর করছে।এই কবিতা সে আগে শুনেছে।এ কবিতা শুভব্রতর বড় প্রিয় কবিতা।নিজের অজান্তেই সমস্ত ক্লান্তি অবসাদ মায়াজাল ঝরে পড়ে তার শরীর থেকে।এক ক্ষুদ্র দ্বীপজুড়ে এককণা ব্রাহ্মণী হাঁস তার তিনরঙা শরীর নিয়ে খিলখিলিয়ে উঠছে যেন।সে অজান্তেই অকালে চলে যাওয়া কবির চিরন্তন লাইনগুলি তোয়ার সূত্র ধরেই বলতে থাকে।
-মেশেনি তো উষ্ণ শ্বাসে শ্বাস
বত্রিশটি ফুল…হিমযুগ থেকে যাবে এখনো তি-ন-মা-স।”
-কী অপূর্ব বললে দিদি।কতো আদর লুকিয়ে আছে ওই উচ্চারণে।
তরুলতা চোখ খুলে দেখে কিচিমিচি আওয়াজ হচ্ছে বাইরে।ভোর হবোহবো।এতো তাড়াতাড়ি কেটে গেল অন্ধকার!এতো সহজে!
-যাবে?তরুলতা প্রশ্ন করে তোয়াকে।
-কোথায় বলো?
-আমার শুভব্রতর কাছে?তোমার শুভব্রতর কাছে?
-চাই তো যেতে।কিন্তু পারি কই?আমার যে দুটো পা-ই অকেজো।
-আমি আছি তো।পারবে তুমি।পারবে না?
-কি দিদি?
-আমার শুভব্রতকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে।
-সে তো চিরদিন তোমার কাছেই ছিল দিদি।
-হ্যাঁ।হয়তো।
আঁচল খসে পড়ে দুজনেরই।দুটি মানুষের আত্মিক কথোপকথনে বসনের প্রাচীর গড়তে নেই।তোয়াকে খাটে শুইয়ে দেয় তরুলতা।বিলি কেটে দেয় মাথায়।তোয়া গুণগুণ করে গান গেয়ে ওঠে।”তাঁহারে কোথায় খুঁজিছ…”।চুমো খায় তরুলতার চিবুকে।কতোদিন পর যেন তার রোমকূপ জাগ্রত হয়ে ওঠে।সে তার রোগের কথা ভুলে যায়।গুণগুণ করে,”দেখো দেখো হে চিত্তকমলে …”।ভোর হয়।
সীতারাম ভোর ভোর চলে আসে দরবার ঘরে।ভগ্নপ্রায় এই প্রকান্ড অট্টালিকার প্রতি তার মায়ার শেষ নেই।সকালে এসেই তার প্রথম কাজ বাগানের আগাছার ভিতরেও সামান্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নয়নতারা গাছগুলিকে জল দেওয়া।তারপরেই তোয়া দিদিমণির জলখাবার তৈরি,চান,পড়ার টেবিলে বসানো।সীতারামের সব মায়া ওই চারাগাছগুলির উপরেই।আহা।তোয়াদিদিমণিও তো ওই চারাগাছগুলোর মতোই চাতক হয়ে থাকে।
আজ অবশ্য সে দরজায় পা দেওয়া মাত্রই পরিবর্তন লক্ষ করতে পারলো।গাড়িদালানের ঘাসে গাড়ির চাকার দাগটা টাটকা।তবে কি দাদাবাবু এসেছিল রাত করে?ঈশ।রাতে ঋতবান দাদাবাবু আসবে জানলে সে কিছুতেই বাড়ি ফিরে যেত না।অথচ কীভাবেই বা জানতো সে।অন্যদিন তো আগাম খবর দিয়েই আসে দাদাবাবু।দরবারে ঢুকে জলের ঝোরাটা নিতে গিয়ে আবার থমকে গেল সীতারাম।দিদিমণির ঘরে দাদাবাবু নয়,কোনও এক মেয়েমানুষ হরলিক্স গুলে দিচ্ছে।কে ইনি?ইতস্তত করে সে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।তার উপস্থিতি তোয়ার নজর এড়িয়ে গেল না।
তরুলতা চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে করজোরে প্রণাম করলো।সীতারাম বুঝতে পারছিল না তার এখন কীই করা উচিত।সেটা বুঝতে পেরে খিলখিল করে হেসে উঠে তোয়া বলল,”তুমি ঘাবড়ে গেলে নাকি সীতারাম?রামরাম!”
আবার খিলখিল হাসি।কিন্তু সীতারাম এতে এতোটুকু রেগে গেল না।বরং তার প্রাণ মন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে যেন কানায় কানায় মুহূর্তে পূর্ণ হয়ে উঠল।আহা।কতো দিন ধরে তোয়াদিদিমণির মুখে শুধু এই খিলখিল হাসির সন্ধান করেছে সে।দিদিমণির জন্য উলুবেড়িয়া স্টেশনের পুরনো বই দোকান থেকে বই এনে দিয়েছে কতো।সে তো পড়তে পারে না নিজে।ছোটবয়স থেকে গতর খাটতে খাটতে অক্ষরের সঙ্গে দোস্তি তার করা হয়নি।সে থাকলে দিদিমণিকে সে এভাবে মনমরা থাকতে দিত না।কিন্তু আজ সেই দিদিমণি খিলখিল করে যেন তার মনের ভিতরটা ভিজিয়ে দিচ্ছে এক নিমেষে।
-দাদাবাবু কোথায়?রাতে এসেছিল বুঝি?
-দাদাবাবু কোথায় আমি কী জানি।তবে সীতারামদা।তোমাকে আমার একটা উপকার করে দিতে হবে।
-কী দিদিমণি?বলুন?
-আমাদের দুজনকে আজ একটু কলকাতা নিয়ে যাবে?একজনকে খুঁজে বের করতে হবে।করতেই হবে।খুব জরুরি।
-কিন্তু দিদিমণি…
সীতারাম আবার বুঝতে পারে না তার কী বলা উচিত।তোয়াদিদিমণির দুই পায়ে হাতে কোনও শক্তি নেই।সীতারাম জানে সেটা।হুইলচেয়ার করে তো বাসে যাওয়া যাবে না।সংক্রমণের পর নিয়মিত ট্রেন চড়বার দিন শেষ।এখন শুধু স্পেশাল ট্রেন।সে ট্রেনে বেজায় ভীড়।সেখানে দিদিমণিকে তোলা অসম্ভব।
-এদিকে এসো সীতারাম।দিদি।ওকে দেরাজের চাবিটা দাও না।
মাথার বালিশের নীচ থেকে চাবির গোছা বের করে দিল তরুলতা।আজকাল সারাদিনের শক্তিটুকু তোয়া বাঁচিয়ে রাখে শুধু দু ছত্র কবিতা লেখার জন্য।ওটুকু লিখতেই তার আঙুলের পেশিগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করে।অথচ মন অশান্ত হয়ে থাকে।তার কতোকিছু বলবার থাকে।পারে না।তিলতিল করে বরফগোলা এক দুই ফোঁটা জলবিন্দুতে তার তৃষ্ণা নিবারিত হয় যেন।তরুলতা দেরাজের চাবি সীতারামের হাতে দিতেই তোয়া বলে,”দেরাজের ভিতর টাকা আছে দেখো।তার থেকে হাজার পাঁচেক টাকা বের করে তুমি দিদিকে দিয়ে দাও।আমাদের যাতায়াতে লাগবে।আমরা কলকাতা যাবো।”
তরুলতার দুই চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।এই একরাতে যেন সে তার আত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে।একটি রাতের মধ্যেই সে তোয়াকে কতোটা গভীরভাবে চিনে ফেলেছে!এই কলকাতা যাবার ভয়ানক সিদ্ধান্ত তোয়া তার জন্যই হয়তো নিতে চলেছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।এই ঋণ সে মেটাবে কী করে!
অবশ্য সীতারামের দোলাচল কাটতেই চায় না।সে ইতস্তত করে বলে,”একবার দাদাবাবুকে জানিয়ে গেলে হতো না?”উত্তরে তোয়া গম্ভীর হয়ে বলল,”এই বাড়িতে দাভাইই বুঝি সব?আমি কেউ নই!”
-তা কেন দিদিমণি।কিন্তু আপনার শরীর।ওনাকে একটা ফোন করে…
-তুমি চিন্তা করো না।আমি তো একা যাচ্ছি না।দিদিভাই থাকবে আমার সঙ্গে।তুমি শুধু দাভাই এলে বলে দিও আমরা কোথায় যাচ্ছি।আর বলো রাতের আগেই ফিরবো।
সীতারাম মাথা নেড়ে চলে যায়।তার তো পরিধি এটুকুই।তবু এতোটুকুই বা কতোজন পায়?তার মন বলছে, এই নতুন দিদিমণি থাকলে তোয়াদিদিমণির কোনও ক্ষতি হবে না।
বেলা গড়াতে ভাড়া করা একটি সাদা গাড়ি এসে দাঁড়ালো গাড়িদালানে।তোয়াকে পিছনের সিটে তুলে দেয় সীতারাম।তাকে ধরে উঠে বসে তরুলতা।গাড়ি ছেড়ে দেবার ঠিক আগের মুহূর্তে সীতারাম যেন কী বলতে যায়।তরুলতা সেই অস্ফূট কথা বুঝতে পারে।মৃদু হেসে বলে,”তুমি চিন্তা করো না সীতারাম।তোমার তোয়াদিদিমণির কিচ্ছু হবে না।আমি ওর খেয়াল রাখবো।কথা দিলাম।”তরুলতার সে কথায় নিশ্চিন্ত হয় সীতারাম।গাড়ি কলকাতার দিকে ছুটে চলে।