সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৪)

ক্ষণিক বসন্ত

বাহার

-পেলেন?
-না স্যার।
ফায়ার ব্রিগেডের অফিসারটিকে ভাঙা দুর্গের দরজার মতো লাগল বাহারের। সকাল থেকে ডুবুরি নেমেছে গঙ্গার জলে। কিন্তু সোহিনীর বডি পাওয়া যায়নি। একরাশ শূন্যতা নিয়ে খানিকটা অপরাধীর চোখেই বাহারের দিকে তাকালেন অনডিউটি ফায়ার ব্রিগেড অফিসার নটরাজ শ্রীবাস্তব। কিন্তু বাহারের চোখেমুখে তার বিনিময়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তার চোখের শূন্যতা অমাবস্যারাতের আকাশের মতো। সন্ধ্যা হতেই ঘাট শুনশান হয়ে ওঠে ক্রমশ। সেই নিঃসঙ্গ ঘাটে একা জলমুখী হয়ে বসে থাকে বাহার আর বিলু মাতাল। বিলু এখনও বুঝতে পারেনি ওটা সত্যিই কে ছিল। তার স্বপ্নর জিনপরি নাকি সোহিনী! যতোবার সে ওই ঘটনার কথা ভাবতে যায়, আতঙ্কে শিউরে ওঠে। মনে মনে নিজেকেই দোষ দেয় সে। সব শালা ওই পঞ্চুদার ভাঁটির বাংলা মদের দোষ। মেথরপাড়ায় ন’জন একরাতে ওই এক দোকানের মদ খেয়ে অন্ধ হয়েছে। বিলুর বাপের ভাগ্যি সে এখনও চোখে দেখতে পাচ্ছে। মনে মনে নিজেকে লাথ মারে সে। আর মদ খাবে না জীবনে। হাঁত কাঁপবে, জিভ সেঁধিয়ে যাবে ভিতরদিকে। তাও খাবে না। বাপ মা নেই। আছে তার একমাত্র মা মরা বছর আটেকের মেয়ে। মনে মনে তার দিব্বি কাটে বিলু। তারপর আড়চোখে বাহারকে দেখে। ছেলেটা ওই মেয়েটার আশিক। বিয়ে হবার কথা ছিল দু’জনের। ছেলেটা নাকি মুসলমান। ঘাটে লোকজন আলোচনা করছিল। মেয়েটা নাকি সোসাইড করেছে। এই এক শক্ত শব্দ হয়েছে আজকাল। উচ্চারণ করতে গেলেই জিভ জরিয়ে যায় বিলুর। লোকে বলে ছেলেটা বিধর্মী। সেই জন্যই কি মেয়েটা ‘সোসাইড’ করল? ভাবতে চেষ্টা করে বিলু। এই আজকালকার মেয়েমানুষগুলো কেমন টপাটপ সোসাইড করে ফেলছে। তার বৌ সরস্বতীও যে অমন ফস করে ঘাসমারা বিষ কেন খেল আজও কী জানে বিলু? কথা নেই বার্তা নেই। কাজ থেকে রাতে ফিরে বিলু দেখে তার বৌয়ের মুখে ফেনা উঠেছে। পাশেই ঘাসমারা বিষের প্যাকেট। হাসপাতালে এক রাত্তির থেকেই বডি হয়ে গেল সরস্বতী। কেন? কল্যাণের সঙ্গে লটরঘটরটা তো সে মেনেই নিয়েছিল। মদ খেয়ে খেয়ে তার নিজের সব পৌরুষ গেছে। মেয়েমানুষের বেঁচে থাকার জন্য আগুন লাগে। বিলু মেনে নিয়েছিল তো। তবু বিষ খেল মাগীটা। বাচ্চাডার কথা ভাবলি না একবার? সে হোক না হয়। কিন্তু এই ছোকরাটাকে দেখে তো ভালোই লাগে বেশ। মন বলে ছেলেটা ভালো। ওর দ্বারা কোনও খারাপ কাজ হওয়া অসম্ভব। তবু মেয়েটা বিষ খেল। কেন? এ প্রশ্ন ঘোরপাক খেতেই থাকে বিলুর মাথায়।
ধর্ম নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই বাহারের। সে জানে তার পীরপয়গম্বর সর্বশক্তিমান। তাঁকে কে কী নামে ডাকল, তা নিয়ে তাঁর কিছু আসে যায় না। বাহার জানে সোহিনী তাকে ছেড়ে চলে গেছে ধর্মের জন্য নয়। সুরের জন্য। তার যে গলায় সুর দেননি বিধাতা। সকলকে কী এক সপ্তকে বাঁধা যায়? কিন্তু সোহিনী যে সুর খুঁজছিল। ভাবতে ভাবতে দু চোখে নদীর ভরা উজান দেখা দেয় বাহারের। তার মন বলে ওঠে।’ হা আল্লা। হা কৃষ্ণ। হা সর্বশক্তিমান। কেন তুমি আমার কণ্ঠে সোহিনীকে শোনাবার জন্য একটুকু সুর ঢেলে দিলে না?’ ভাবতে ভাবতেই বাহার এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরিয়ে আনে বিলু।
-কী ভাবো? মেয়েটা মরল কেন। সেই কথা?
-তুই তো দেখেছিলি। মেয়েটা মরতে যাচ্ছে। আটকাতে পারলি না?
একটু দম নিয়ে নেয় বিলু। ঘটনাটার পর প্রায় কুড়ি ঘন্টা হয়ে গেল। এক বিন্দু মদ পড়েনি তার জিভে। জিভের সাথে সাথে ভয় টানছে তার মনের ভিতর। সেই জিনপরির ভয়টা…
-কী রে বল?
-তুমি মুসলমান। ও হিন্দু। তাই মেয়েটা মরেছে।
আগুণ জ্বলে ওঠে বাহারের চোখে। অপেক্ষা অপেক্ষায় রাত বেড়ে গেছে অনেক। বিলুকে মেরে ফেলতে মন করছিল বাহারের।
-তুই সব জানিস? শালা মাতাল। জানিস তো বল বডি গেল কোথায়?
-উজান জোয়ারে বডি সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। ও আর মিলবে না।
-তবে রে হারামি। সব জানিস তুই? জানিস না সব।
মাথা চুলকায় বিলু। জিনপরির হাত উঁকি দিচ্ছে জলের রেখার উপর। বিলু একদম চুপ মেরে যায়। বাহারের চোখের আগুন নিভে আসে ভিতরের কান্না জলের উজান প্লাবনে। গলা কেঁপে উঠল তার।
-তুই কিছুই জানিস না। মেয়েটা ভালোবাসত আমাকে। মন থেকে। ধর্ম নয়। সুর। আমার গলায় সুর নেই বিলু। কে এনে দেবে আমার গলায় সুর? এই প্রশ্নর উত্তর আমি কোথায় গেলে পাবো? তুই তো সব প্রশ্নর উত্তর জানিস। বলে দে আমাকে।

মাথা খামচে বসে পড়ে বাহার। রাত বাড়ছে। কিন্তু বাহারের ক্ষিদে নেই। ঘুম নেই। তার সাধের প্রকাশনা জগতের সাম্রাজ্য অবহেলায় পড়ে রয়েছে। পাতা আছে অনেক। রিমের পর রিম। কিন্তু সেই পাতায় অক্ষরগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছে সোহিনী।এখন বাহার একা। তার আকাশ পাতাল জুড়ে শুধুই নিষাদ নিষাদ আর নিষাদ। বিলু ভাবছিল। তার বাপ যখন বেঁচে ছিল তখন একটা কথা খুব বলত। জীবনের সব প্রশ্নর উত্তর নাকি বারাণসী গেলে পাওয়া যায়। কিন্তু বাহারকে সে এই কথা বলবে?
-কী রে? বল?
-আমাদের ধর্মে একটা বিশ্বাস আছে জানো। সব প্রশ্নর উত্তর দেন বাবা বিশ্বনাথ।
-বেশ। আমি যাবো সেখানে। যাবোই।
-কিন্তু …

কিন্তু পলক পড়তেই বিলু মাতাল দেখল তার চারপাশ শুনশান। কেউ নেই! কোথায় গেল বাহার? সর্বনাশ। জিভ টানছে তার পেটের ভিতরের দিকে। জলের জন্য আগুন জ্বলছে ভিতরে। নাহ। এতক্ষণ তবে এ সবকিছুই জিনপরির মায়া ছিল! মাথায় চাঁটি মেরে উঠে পড়ল বিলু মাতাল। নাহ। আজ ধেনো খেতেই হবে তাকে।

ট্রেনে উঠেই বাহার বুঝতে পারল তার চোখ ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে। কোথায় যাচ্ছে সে? কোন সে কাবা? কোন মদিনা? কোন গঙ্গার কিনারে চলেছে বাহার আলম? ভাবতে ভাবতে ট্রেনের জানলার ধারে বসে ঘুমিয়ে পড়ল বাহার। স্নিগ্ধ আলোর ওড়নার আড়ালে কোনও এলোকেশি দিঘির দিকে দৌড়ে ছুটে যাচ্ছে। খিলখিল করে হাসছে। ‘আয়। আয় নুড়ি কুড়োই। আয় না।’ ডাকছে তাকে। কী নাম আপনার? কোনও নাম তো আছে আপনার? কোথায় যাচ্ছেন আপনি? বলবেন না?
ধড়মড় করে উঠে পড়ল বাহার। ট্রেন থেমে গেছে। কিন্তু বাহার মনে করতে পারছিল না স্টেশনটার নাম। তার মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে টিকিট কালেকটর। কিন্তু এ কী হল? বাহারের যে কিচ্ছু মনে পড়ছে না! তার নাম, ঠিকানা, গন্তব্য,কিছুই মনে পড়ছে না। এ কী হল তার!

এই স্টেশনে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। প্রান্তিক এই শহরে মাঝেমাঝেই এক দেশের মানুষ আরেক দেশের দোরগোড়ায় আশ্রয় খুঁজে চলে। টিকিট কালেকটর বুঝতে পারে না ছেলেটিকে নিয়ে কী করবে। পোশাক আশাক দেখে মনে হচ্ছে সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে। অথচ মুখে কিছুই বলতে পারছে না। সে এই স্টেশনে নতুন। ভবঘুরেদের সঙ্গে ঠিক কী প্রোটোকল ফলো করতে হয়, এখনও সড়গড় হয়নি তার। অগত্যা জিআরপি কে চালান করে দিল সে ছেলেটিকে। হাজতঘরে বসেও বাহার বুঝতে পারছিল না সে কোথায়। তার ভিতর থেকে যেন শুধুই কয়েকটা শব্দ ভেসে আসছিল। “কাহারে কহিব মনের মরম। কেবা যাবে পরতীত। হিয়ার মাঝারে মরম বেদনা। সদাই চমকে চিত।” স্টেশনের ভিতর একটি বকুলগাছ আছে। সাঁঝের বেলায় পাখিরা কিচমিচ করে ফিরে আসছে সেই বকুলগাছের ছায়ায়। বাহারের কিচ্ছু মনে পড়ছে না কেন? কে সে? শুধুই ভিতর থেকে কেউ যেন সুরেলা গলায় গান গেয়ে উঠছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাহার গাইতে থাকে। জিআরপির শূন্য গারদঘরে একলা বাহার গান গাইছে। হঠাৎ সে দেখল গভীর রাতে আপনাআপনি গারদির দরজা খুলে যাচ্ছে। বাহার হাঁটতে শুরু করল। তার আশপাশের প্রহরীরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু বাহারকে সেই বৃষ্টিবিন্দু স্পর্শ করতে পারছে না। কেউ তাকে আগলে রেখেছে। কোনও অদৃশ্য ছাতার মতো। তার পায়ে জুতো নেই। রাস্তার পাথরে ব্যথা লাগছে ইতিউতি। কিন্তু বাহার থামছে না। শুধুই গুণগুণ করে চলেছে সে। “মল্লিকা মালতী মালে গাঁথনি গাঁথিয়া ভালে কেবা দিল চূড়াটি বেড়িয়া …”।
এক শীর্ণ নদী ঘাট। কতো ঘন্টা কতো মিনিট কতো যুগ ধরে বাহার হাঁটছিল কে জানে। কিন্তু এই নদীঘাটে পৌঁছে সে এতক্ষণে চিনতে পারল যেন। বাহার মনে মনে বুঝতে পারছিল ওই যে নদীঘাটের পাশে মহাশ্মশান, আগুণের হলকা ভেসে আসছে। ওখানে তার প্রাণের মানুষটি শুয়ে আছে। সোহিনী। বাহারের মনে পড়ে গেল। কিন্তু কে সে?কী তার নাম? কিছুতেই মনে পড়ল না তার। ভোরের আলোয় শুধু সে দেখতে পেল একদল ভক্ত কীর্তন করতে করতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। আর এক লুলো ছেলে তার কামিজ ধরে টানছে।
-দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে চলো। গান গাইবে না?
বাহার কেন মাথা নাড়ল কে জানে। লুলো ছেলেটা তার লালা মাখা হাতে খপ করে ধরে ফেলল বাহারের হাত। কিন্তু বাহারের ঘেন্না করল না একটুও। সে তার পিছু পিছু হেঁটে গেল ভিতরে। লুলো ছেলেটাকে সে জিজ্ঞেস করল।
-কী নাম তোর?
-কেদার। আর তোমার নাম?
-জানি না। ভুলে গেছি। মনে পড়ছে না।
-খুব ভালো। নাম থাকতে হবে না। চলো। ভিতরে চলো। গান শুনবো তোমার।

বাহার যমুনাকিনারে মহাশ্মশানের ভিতর কেদারের হাত ধরে এগিয়ে চলল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।