সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৫)

জন্ম কলকাতায়(২৭ নভেম্বর ১৯৮০)।কিন্তু তার কলকাতায় বসবাস প্রায় নেই।কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়ান গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।সেখান থেকেই হয়তো ইন্ধন পেয়ে বেড়ে ওঠে তার লেখালিখির জগত।প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আকাশপালক "(পাঠক)।এর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হলো শিকারতত্ত্ব(আদম), আড়বাঁশির ডাক(দাঁড়াবার জায়গা), জনিসোকোর ব্রহ্মবিহার(পাঠক), কানাই নাটশালা(পাঠক),বহিরাগত(আকাশ) ।কবিতাথেরাপি নিয়ে কাজ করে চলেছেন।এই বিষয়ে তার নিজস্ব প্রবন্ধসংকলন "ষষ্ঠাংশবৃত্তি"(আদম)।কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্য ও গল্প লিখতে ভালোবাসেন।প্রথম উপন্যাস "কাকতাড়ুয়া"।আশুদা সিরিজের প্রথম বই প্রকাশিত "নৈর্ব্যক্তিক"(অভিযান)।'মরণকূপ' গোয়েন্দা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অভিযান,যদিও তার বিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে সে একেবারেই স্বতন্ত্র।এই সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস 'সাহেববাঁধ রহস্য '(চিন্তা)।সম্পাদিত পত্রিকা "শামিয়ানা "। নেশা মনোরোগ গবেষণা,সঙ্গীত,অঙ্কন ও ভ্রমণ ।
অজস্র পোকার মতো কারা যেন পিল পিল করে ধেয়ে আসছে।আর শুভব্রত প্রাণপণে দৌড়ে চলেছে।তবে কি এই কীটগুলিই এখন তার জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে?তাই হবে।চিরকাল শুভব্রত তো এই কীটদের দ্বারাই অণুপ্রেরিত।ঠিক যেমন কয়েক সংখ্যা আগের এক দিন।শুভব্রতর চাকরি করবার একমাত্র কারণ দোয়াব।এই চাকরির মাইনের একটা অংশ সে কেকের সবচেয়ে সুস্বাদু টুকরোর মতো তুলে রেখে দেয় ব্যাঙ্কে ।সেটুকু জমতে জমতে একদিন ‘দোয়াব’ পত্রিকার এক একটি সংখ্যার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।কফিহাউজের মেঝে কামড়িয়ে সেদিনও শুভব্রতর দিকে তেড়ে এসেছিল একদল পোকা!তরুণ একঝাঁক ছেলে।প্রতিদিন সকালে একটা ‘ইজম’ ভাঙে আর রাতে একটা ‘ইজম’ গড়ে।ওদের ব্যাচটা প্রতি শনিবার বিকেলবিকেল কফিহাউজের মাঝের টেবিলে আড্ডা দিতে আসতো।শুভব্রতরা অবশ্য নির্জীব কাকপক্ষীর মতো ঘরের অন্যকোণে দাগী অপরাধীর মতো সন্তর্পণে থাকতো।বহুবচনে শুভব্রত ছাড়াও ছিল মৈনাক মন্ডল।তিনি “কর্ণ” নামক একটি সাক্ষাৎকারের কাগজ করেন।এই সাক্ষাৎকার নেবার ধরনটিও বেশ নতুন ধাঁচের।ধরা যাক ঘটতকচ প্রামাণিক এক বিশ্ববরেণ্য ঔপন্যাসিক।মৈনাক কিন্তু তার উপন্যাসের অভিনিবেশ রূপকল্প নিয়ে বিন্দুমাত্রও আগ্রহী নন।তার আগ্রহ সেই ঔপন্যাসিকের মুদ্রাকরকে নিয়ে।মানে বাংলা কথায় যিনি তার লেখাগুলি ডিটিপি করে দেন।তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন অদ্ভুত সব প্রশ্ন।যেমন,’আচ্ছা, ডিটিপি করার ফাঁকে লেখাতে চোখ বুলিয়ে আপনার কেমন লাগলো?’ বা ‘ঘটতকচবাবু জীবনের উপন্যাসের খাতায় কেমন মানুষ?’ এইসব।শুভব্রত প্রশ্ন করলে মৈনাক বুক চিতিয়ে জানান দিত যে এটা তার প্রতিবাদের নিজস্ব ধরণ।শুভব্রতদের শনিবারের আড্ডায় তৃতীয় সদস্য ছিলেন বিমলেন্দুবাবু।বিমলেন্দু মৈত্র।সত্তরোর্ধ্ব বয়স।চোখে ঠিকঠাক দেখতে পারতেন না।তবু এই আড্ডার টেবিলে তাঁর হাজিরা থাকতো ঘড়ির কাঁটা মেপে।একসময় কবিতা লিখতেন দু একটি কাগজে।তবে বিশেষ সাড়া মেলেনি।এক ফর্মার দুটো কবিতার বই আছে যা সমালোচকরা ওষুধ খেয়েও মনে করতে পারবেন নি আর।কিন্তু তার আসল পরিচয় ছিল ‘ত্রিবন্ধ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ।এমন একটি পত্রিকা যার বাৎসরিক সংখ্যার ক্রমিক অর্ধশতাব্দী স্পর্শ করেছিল!সেদিনের আড্ডার মাত্র এক সপ্তাহ আগে তার পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা বের হয়েছে।কফিহাউজের কেন্দ্রে বসে থাকা ছেলেগুলির একজনের তাঁর পত্রিকায় একটা কবিতা ছিল।বিমলেন্দুবাবু আড্ডার মধ্যেই তাকে একবার ডেকে পাঠালেন।
ছেলেটির নাম প্রদ্যুত সরকার।তখন তার নাম ব্যতিক্রমী তরুণ কবি হিসেবে বেশ আলোচনা হচ্ছে।বছর আঠাশ বয়স।দৃপ্ত চলন,চোখেমুখে ঔদ্ধত্য।বিমলেন্দু মৈত্রকে সে বিশেষ গ্রাহ্যই করলো না।দু একবার তাকে বিনীতভাবে ডাকবার পর শুভব্রতদের টেবিলে এসে সে পত্রিকাটা নিয়ে গেল।তার হাতে পত্রিকার সৌজন্যকপি তুলে দিতে দিতে সেদিন বৃদ্ধ বিমলেন্দু বলেছিলেন,”খুব ভালো লিখছো তুমি।বাবা।পত্রিকা কেমন লাগে জানিও।”উত্তরে একটা তাচ্ছিল্যভরা ‘হুঁ’ ছাড়া কিছুই ফিরে পেলেন না তিনি।হয়তো তেমনটি আশা করাটাও উচিত ছিল না তার।রাত হলে কফি হাউজ থেকে বেরোবার সময় শুভব্রতই প্রথম খেয়াল করেছিল ঘটনাটা।কফি হাউজের মেইন গেটের ফুটপাথ লাগোয়া ড্রেনে পড়ে আছে প্রদ্যুতকে দেওয়া বিমলেন্দুবাবুর ‘ত্রিবন্ধ ‘ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের সংখ্যা।শুভব্রত সেদিন নিজেকে আটকাতে পারেনি।ড্রেন থেকে তুলে নিয়েছিল বইটাকে।তারপর সে আর মৈনাক আবিষ্কার করে বইটার যে পাতায় প্রদ্যুত সরকারের কবিতা ছাপা হয়েছিল সেই পাতা গুলো ব্লেড দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে!তাদের অনতিদূরেই আসছিলেন বিমলেন্দুবাবু।সেইদিন তার এতোদিনের সাধনাকে এভাবে অপমানিত হতে দিতে চায়নি শুভব্রতরা।তাই সেই বইটি শুভব্রত লুকিয়ে ফেলেছিল তার পাঞ্জাবির তলায়।বিমলেন্দুবাবু থাকতেন হাওড়ার রামরাজাতলায়।কলেজ স্ট্রিটের মোড় থেকে বাস ধরতেন।এটুকু পথ তারা একসঙ্গে হেঁটে যেত।বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সেদিন বিমলেন্দুবাবু বলেছিলেন,’ছেলেটি আমাকে কী বলে গেল জানো?’
শুভব্রত আর মৈনাক পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
-ও বলল এই সব ফালতু পত্রিকা করে কেন বাংলাসাহিত্যের ভার বাড়িয়ে তুলছেন?কী হবে এই সব লিটল ম্যাগাজিন করে?
-আখ্যানরচয়িতা সমীরণ সেনগুপ্তর সাক্ষাৎকার পড়বার পরেও একথা বলতে পারলো?তাঁর ইন্টারভিউ তো আপনিই প্রথম ছাপলেন।
-নাহ।পড়েনি।কী করে পড়বে?বইটাই তো ফেলে দিয়েছে ড্রেনে।জানো ওই একটা বই করতে ইমার সাড়ে চারশো টাকা খরচা হয়।পেনশনের টাকা ভাঙ্গিয়ে করি।
-দুঃখ করবেন না বিমলেন্দুদা।ওরা তো তরুণ।অবুঝ।
-না।ওরাই ঠিক।আমিই ভুল।বইটা ফেলে দাও শুভব্রত।তোমার পাঞ্জাবির কানায় নোংরা লেগে যাবে।
বাস আসতে উঠে গিয়েছিলেন বিমলেন্দুবাবু।পরের সপ্তাহে আর শুভব্রতরা তাঁকে কফিহাউজের টেবিলে পায়নি।এই ঘটনা ঘটার তিনদিনের মাথায় বিমলেন্দুবাবুর স্ট্রোক হয়ে যায়।তার দুদিন বাদেই কোমা ও মৃত্যু।কে বা কারা খুন করলো এই নির্বিবাদী মানুষটাকে?কী অপরাধ ছিল তার।শুভব্রত সেদিনও অজস্র কীট ধেয়ে আসতে দেখেছিল তার দিকে।পরপর দোয়াবে ঝড় উঠলো।বিমলেন্দুবাবুর এই ঘটনা গোপন রইলো না।তরুণ কবি প্রদ্যুত সরকার ঘোষণা করলো সে শুধু বানিজ্যিক পত্রিকায় লিখবে।তার প্রতিভা সে লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় বিলিয়ে দেবে না।কফিহাউজ বয়কট করলো তাকে।আর এই কলরোল তাকে বিখ্যাত করল।পরের বছর একাদেমি তাকে পুরস্কৃত করলো।এখন সে বাংলা ভাষার নাম করা কবি।কিন্তু শুভব্রত আজও সেদিনকার কথা ভুলতে পারেনি।কোনও দিন পারবে না।
আজও তার কাছে প্রদ্যুত সরকার একটা পোকা।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।