গারো পাহাড়ের গদ্যে স্বপঞ্জয় চৌধুরী

উজানযাত্রা: বাংলাদেশের বলয়ে আবদ্ধ একজন প্রবাসীর আত্মজৈবনিক উপাখ্যান
উজানযাত্রা নামকরণের স্বার্থকতা বিবেচনার দিকে যদি যাই তবে দেখতে পাবো বিভ্রান্ত অলি-গলি মাড়িয়ে তৃষ্ণার্ত পথিকের সত্যিকারের উজানের পথে যাত্রার গল্প। যেখানে উঠে এসেছে একটি দেশের উৎকর্ষতা ও অবদমনতার দোলচালে একজন মানুষের আচরণগত বিবর্তন। পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে উন্নত বিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা একটি উজ্জ্বল মাথা হয়ে উঠা। যে মাথার ভেতরে চেতনারা খেলা করে। খেলা করে শৈশব ও দেশমাতৃকার ডাকে বাবার সাথে একরকম অভিমান করে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়া বিদ্রোহী যুবক মাসুদ। বাংলাদেশের অভ্যূত্থান ও বিকাশপর্বে নিজের অংশগ্রহণ । যুদ্ধ পরবর্তী দেশের আপামর জনগণ বনাম ক্ষমতাশালীদের দ্ব›দ্ব, চেতনা ব্যবসা, ইতিহাস বিকৃতি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবসা, প্রশাসনিক অবকাঠামোর চরম দুর্নীতি, নকল, খাদ্যে ভেজাল, মুনাফাখোর ও ভূমি দস্যুদের দৌরাত্ব, মিডিয়ার দখলদারিত্বসহ নানাবিধ সমস্যা উপস্থাপিত হয়েছে গল্পের প্রয়োজনে বাস্তবতার নিরিখে।
প্রফেসর মাসুদের চোখে লেখক মঞ্জু সরকার দেখতে চেয়েছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন একটি বিধ্বস্ত দেশের ঘুরে উঠবার গল্প। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির তাগিদে সময়ের প্রয়োজনে নেতৃত্ব তৈরি ও নেতৃত্বের ভাঙ্গনচিত্র। একদিকে দেশের খাদ্যাভাবে তৈরি হওয়া দূর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার্ত শিশুর জিরজিরে পাঁজর ও অপর দিকে উন্নয়নের বিস্তর এস্তেহার। রাজনৈতিক বর্ণনাগুলো বিবৃত হয়েছে সরাসরি কোনরুপ রূপক বা ছদ্মনামের আড়াল করা হয়নি। যেমন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিয়ে তার ভাইয়ের সাথে কথোপকথনগেুলো ছিল এরকম-
“ প্রফেসর মাসুদ দেশে ফেরার প্ল্যান-প্রোগ্রাম পাকা করার পর থেকেই তো ইন্টারনেটে দেশের খবর নিয়মিত পড়ত। এবারের নির্বাচনে নৌকা মার্কার বিশাল বিজয় ও বিরোধী জোটের ভরাডুবির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্র পড়েও বোঝার চেষ্টা করেছে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সংকট নিয়েও ভেবেছে। ভাইয়ের কাছে জানতে চায়, “তোদের জননেত্রী-প্রধানমন্ত্রী পিতার চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নাকি‘পিতার মতো জনপ্রিয় হয়তো নয়, কিন্তু দেশ পরিচালনায় বাপের চেয়েও হাজার গুন বেশি সাফল্য দেখিয়েছে। দলেও তার কোন বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর আজকের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকেই এয়ারপোর্ট এসেছি আমি।”
প্রফেসর মাসুদ দেশে ফিরে নিখুঁতভাবে নিমগ্ন চিত্তে দেশের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষতে থাকেন। ঘাড় ঘুড়িয়ে চেনা রাজধানীর উন্নয়নের চেহারা চুপচাপ দেখেন। দেশত্যাগের সময় তিনি দেখেছিলেন দারিদ্রের প্রকট চেহারা। এয়ারপোর্টে রাস্তায় বিদেশি দেখলেই ছুটে আসতো ভিখিরির দল। মার্কেটে ফুটপাতে ভিড়ের দিকে তাকালেও মনে হতো প্রকাশ্যে ঘাপটি মেরে আছে ছিনাতাইকারী-বদমাশরা। স্বাধীনতা তখন পাঁচ ছয় বছরের রুগ্ন শিশুর পথচলায় যে সাবলীল গতি এসেছে, সেটা রাজধানীর রাস্তা ও বাহ্যিক চেহারাও ফুটে উঠেছে।
একটি গোড়া সমাজ ব্যবস্থায় প্রফেসর মাসুদের বিস্তর জ্ঞান ও সংশয়বাদীতা তাকে মাঝে মাঝে মুখোমুখি করেছে একটি মেকি জীবন যাপন ও সবার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার কৃত্রিমতার মধ্য দিয়ে অন্যকে জানার সুযোগ। আত্মীয়-স্বজনদের অতি উৎসাহী মনোভাব তার মনে সংশয় ও দ্বিধার উদ্রেগ ঘটিয়েছে। তার এ লাইনগুলোতে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে।
“ ধর্মকর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন ড. মাসুদ মনে মনে একটু ভয়ও পায়। মক্কার কাবাঘরে গিয়ে বিধর্মী বড় ভাইয়ের জন্য কী কামনা করেছে মুকুল ও তার স্ত্রী? যে স্বজনদের সে ভালোভাবে চেনেও না, যাদের জন্য আমেরিকা থেকে একটা সামান্য গিফট পর্যন্ত আনার চিন্তা করেনি, তাকে কাছে পাওয়ার এই আনন্দ উচ্ছ্বাস কতটা খাঁটি? প্রধান অতিথির সঙ্গে নিজেদের ছবি নেওয়ার জন্য একে একে সবাই মাসুদের চেয়ারের পাশে দাঁড়ায়, বাচ্চাটিকেও কোলে তুলতে হয়, সবার হাতে স্মার্ট ফোনের ক্যামেরা ফ্ল্যাশ হতে থাকে। মাসুদ জানে, সে নিশ্চয় এবার অনেকের ফেসবুকেও চলে যাবে। এরকম সামাজিকতায় অনভ্যস্ত কাঠখোট্টা প্রফেসর মাসুদ ঠাট্টার সুরে বলে, ‘তোমাদের খুশি দেখে মনে হচ্ছে আমি যেন কবর থেকে উঠে এসেছি”
একাকীত্বের মতো চিরায়ত সত্য আর নেই। ধার্মিক কিংবা ধর্মহীন সবাই একাকীত্বের জালে আবদ্ধ। মানুষ সামাজিক হওয়ার ভান করে মাত্র। তুমি আস্তিক হও আর নাস্তিক হও, একাকীত্বের বোধ ক্রমে দুর্বিসহ হয়ে ওঠে সবার জীবনে। অসহায় একাকীত্ব নিয়ে সর্বশক্তিমান স্রষ্টা কিংবা বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে যারা একাত্ম কিংবা আত্মনিবেদিত হতে পারেনা, তারাও অন্য মানুষের সঙ্গে মিশে সামাজিক হতে চায়, একাত্ম হতে পারলে নিরাপত্তা ও আনন্দ খুঁজে পায়। প্রফেসর মাসুদ তার জীবনদর্শনের আয়নায় এমনই চিত্র দেখে আসছেন শৈশব থেকে। তার আত্মউপলব্ধির নিরীখেই এগিয়ে গেছে ক্রমাগত উজানযাত্রা।
ধর্মীয় গোড়ামি ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ প্রবেশ করেছে। যা দেশকে প্রকৃতপক্ষে অগ্রগামী করার জন্য অন্যতম প্রধান বাধা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা অন্য যেকোন কর্মক্ষেত্রে নারীকে নিষেধাজ্ঞার বেরিতে বাঁধার জন্য পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন ধর্মতাত্ত্বিকগণ। উপন্যাসের একটি চরিত্র মোমেনা যিনি একজন স্বাস্থ্যকর্মী । ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মোমেনা এগিয়ে চলে নির্ভিকচিত্তে। তার দিকে ঘটনাক্রমে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় মাসুদ। মোমেনার পিছনে লেগে থাকা মাওলানার সাথে বাকবিতন্ডার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে সমাজের চিরায়ত অসঙ্গতি। একটি সাইকেল দূর্ঘটনায় মোমেনা ও মাসুদের মধ্যে একটি সংঘর্ষ হয়। যাতে দু’জনই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তারই প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত কথোপকথোন হয়-
“ আল্লাহর রহমতে বড় অ্যাকসিডেন্টের হাত থেকে বেঁচেছ। ওই সাইকেলে উঠলে তোমার আরো বিপদ হবে বললাম। তুমি আমার সাইকেলে বসো তো। বেপর্দা মেয়েমানুষের কথা শোনো না।’
এ সময় মোমেনা হুজুরের দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দেয়, মনে হয় আপনার দোয়াতেই অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছে আজ। এত দিন আড়াল থেকে আামর চাকরির বিরুদ্ধে লেগেছেন, এবার ইব্রাহীম পাটোয়ারিকে দিয়ে ভাইয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। আজ আবার আমার অফিসেও গেছিলেন, এখন ফাঁকা রাস্তায় সামনা সামনি লাগতে এসেছেন। বেপর্দা মেয়েমানুষ কি আপনার পাকা ধারে মই দিয়েছেন? মতলব কী আপনার?
মোমেনা এমন ঝগড়াটে গলায় দুর্ঘটনার দায়ও মাওলানার ওপর চাপাবে ভাবতে পারেনি মাসুদও। অপ্রস্তুত মাওলানা মাসুদের দিকে তাকিয়ে নালিশ জানায় যেন, দেখলে বাবা, কোনো মুসলমান ঘরের মেয়ে বেগানা কোনো পুরুষের সঙ্গে এভাবে কথা বলে। বলতে পারে? তাও আমার মতো মওলানার সঙ্গে?
‘মোমেনা বুবু তো ঠিকই বলছে হুজুর। আপনি ওর পেছনে লেগেছেন কেন? ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে আপনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বলেন। সরকার ওকে চাকরি দিয়েছে। কিন্তু লোকজনকে ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বিরুদ্ধে ফালতু ফতোয়া দেন কেন?
এই মাওলানা সাহেব সবসময় মোমেনা ও তার ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের চাকুরির বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে থাকলো নানা ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভায়। পাটোয়ারিবাড়িতে মাসুদের নামে তার বাবার কাছে নালিশ করতে আসে গফুর মাওলানা। মাসুদ বেদআতি কথাবার্তা বলে। কোরান হাদিসে তার বিশ্বাস নাই। ইসলাম যেন এক সংকটে অবতীর্ণ হয়েছে মাসুদের বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তির কাছে। গফুর মাওলানা মোমেনাকে জিনে ধরেছে বলে তার ধর্মীয় পদ্ধতিতে চিকিৎসার কথা বলেন। এ বিষয় নিয়ে মাসুদ ও মাওলানা গফুরের ডিবেট অনেক সত্যই বলে দেয়। তাদের এই কথপোকথন দ্বারা বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়।
“ কিন্তু কোরআন শরিফ যে আল্লাহর কিতাব, সেই কিতাবে জিনের কথা উল্লেখ আছে, জিন-ইনসান আল্লাহর সৃষ্টি, এটা তুমি বিশ্বাস করো না বাবাজি?
কোরআনে লিখা থাকলেই তো বিশ্বাসযোগ্য হয় না। আপনি ওয়াজ করে বলেন, নবীজির হাতের ইশারায় চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়েছে, তার ছায়া ছিল না। এসব কি বিশ্বাসযোগ্য? শবেমিরাজে নবী (সা.) বোরাকে চড়ে সপ্ত আসমান ও আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার যে গল্প শোনান, তারও কোনো প্রমাণ দেন না, কিন্তু এমনভাবে ওয়াজ করেন যেন নিজের চক্ষে দেখেছেন। তাছাড়া জোড় গলায় বলেন নামাজ না পড়লে সবাই দোযখে যাবে। নামাজি মুসলমান ছাড়াও পৃথিবীতে আরো কত ধর্মের লোক আছে, ইসলাম আসার আগেও কত লোক ছিল, তারা কি সবাই দোজখে যাবে?
‘তুমি কি তবে নিজেকে মুসলমান ভাবোনা মাসুদ? আজ পর্যন্ত কোনো মুসলমান আল্লাহ বা নবীজির বিরুদ্ধে কথা বলেনি।”
‘আপনার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই তো আল্লাহ-নবীজীর বিরুদ্ধে কথা বলা নয়। সেদিন শেখ মুজিবও তো জনসভায় আপনাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ভয় দেখিয়ে বাঙালিদের শাসন করছে, ধর্মের নামে শোষণে করছে, আর আপনাদের দলের বিরুদ্ধেও বলেছেন শেখ মুজিব। এ দেশের মা-বোনেদের কলস নিয়ে নদীর ঘাটে না গেলে সংসার চলেনা, আপনারা তাদেরকেও বোরকা পরানোর ফতোয়া দেন!
গফুর মওলানা এবার ঠাট্টার ভঙ্গিতে হেডমাস্টারকে বলেন, ও ভাই, লেখাপড়ার পাশাপাশি ছেলেকেও আপনার নেতা ও দলের পলিটিকসে নামিয়েছেন দেখছি। তোমার সঙ্গে বাহাস করে তো পারব না বাবাজি! তবে তোমার আব্বার দল করো আর যে দলই করো, আমরা যে মুসলমান, আমাদের ধর্ম যে ইসলাম- এটা কী অস্বীকার করতে পারবে? তোমার বাবাও তা অস্বীকার করতে পারবে না।
দুষ্টু মওলানা দল পাকিয়ে মোমেনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। মাসুদের বাবা হেডমাস্টার এয়াকুব পাটোয়ারির সাথে মোমেনার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে গফুর। কিশোর বয়সী মাসুদ কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলো না। তবে মাসুদের মাকে তার বাবা কিছুটা ভয় পেতো। তাই এ যাত্রায় মোমেনাকে বিয়ে করার খায়েস দূর হয়েছে মায়ের চোখ রাঙানিতে। এয়াকুবও তার পরিবারের কথা চিন্তা করে বিয়ের ভূত মাথা থেকে নামিয়ে মোমেনার পাশে দাঁড়ান। শত্রুদের সকল চক্রান্তকে অসফল করে দেন। মাসুদেরও তার পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায় বহুগুন। মওলানার ধর্মের নামে মিথ্যাচারিতা বাড়েতেই থাকে। মসজিদের লোকজনকে জিন ভূত দেখানো, পরাকালের আজাবের ভয় দেখানোসহ নানা ভন্ডামিতে মেতে ওঠেন।
উজানযাত্রা উপন্যাসে লেখক মঞ্জু সরকার এমনই কিছু সামাজিক বাস্তবতার নিরীখে কাহিনী ও গল্পচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন- সামাজিক সংকট, ধর্মীয় গোড়ামি, মিথ্যাচারিতা, শঠতা, দুর্নীতি, যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ও যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের চিত্র। প্রবাসে থেকে ফিরে এসে তার শৈশব ও কৈশরকালীণ কথাগুলো একে একে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যা তাকে নতুন ভাবে ভাবাতে বাধ্য করে। যার ফলস্রুতিতেই মাসুদ চরিত্রের বয়ানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে উজানযাত্রার চিরায়ত বাংলার জনগোষ্ঠীর ঠুনকো ধূম্রজালে বন্দি থাকার কথাচিত্র।