সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৩২)

বিন্দু ডট কম

আচ্ছন্নতা গ্রাস করেছিল তরুলতাকে।তাই সে বুঝতে পারেনি ঋতবান কখন তাকে জঙ্গলের পথ থেকে শহরে নিয়ে এসেছে।সদর সড়ক থেকে সামান্য গতিবেগ কমিয়ে ডানদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল ঋতবান।তার ভিতর এতোদিন হারিয়ে যাওয়া সেই স্ফুলিঙ্গ যেন আবার জ্বলে উঠেছে।গাড়ির ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা ভাঙলো তরুলতার।সরু পিচরাস্তা পার হয়ে গাড়ি একটি মাঠে প্রবেশ করেছে।মাঠের একপ্রান্তে বড় বড় থামওয়ালা প্রকাণ্ড প্রাচীন ইমারত।তার প্রতিটি অনাদরে বেঁচে থাকা স্তম্ভ যেন ইতিহাসবইয়ের পাতার মতোই অভিমানে জীবন্ত।থামের ভিতর জীর্ণ সিঁড়ি বারান্দায় এসে থামলো তরুলতাদের গাড়িটা।জঙ্গলের পত্রছায়ায় সে এতোক্ষণ বুঝতে পারেনি তাদের এই গতিপথ আলোকিত করে রেখেছে এক আকাশ মহাজাগতিক তারা।লুব্ধক,অশ্লেষা,কালপুরুষ।সিঁড়িবারান্দায় জ্বলতে থাকা ছোট একশো ওয়াটের বাল্ব সেই মহাজাগতিক আলোমালার কাছে যেন বিনিত নতিস্বীকার করে নিচ্ছে।
-আসুন ম্যাডাম।আমরা পৌছে গেছি।
তরুলতা গাড়ির দরজা খুলে মাটিতে পা রেখে বুঝতে পারে তার পাদুটো চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।হাঁটুর কাছটা টনটন করছে।মাথা ঘুরছে তার।হয়তো সে কথা ঋতবান বুঝতে পারে।তাই সে বলে।
-তাড়া নেই।ধীরে ধীরে আসুন।
তরুলতা ভাঁটার নদীস্রোতের মতো গাড়িদালানের প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ পার হয়।শেষ ধাপে মনে হয় তার চারপাশ টলছে।আধখোলা সদর দরজার ভিতরে ভগ্নপ্রায় দরবারের সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা বিগতযৌবনা ঝাড়বাতির মতোই টলে ওঠে তার আশপাশ।তরুলতার মনে হয় এক প্রকাণ্ড ঢেউ তাকে আছড়ে ফেলে দিচ্ছে সমুদ্রতটে।নিজেরই অজান্তে ভূমিষ্ঠ হবার ঠিক আগের মুহূর্তে সে তার নিজস্ব পিউপাটিকে দুহাতে রক্ষা করতে চায়।সেটুকু আন্দাজ করে ঋতবান তাকে ধরে ফেলে সিঁড়ির দুই পাশের মার্বেলের বসবার সিটে তরুলতাকে শুইয়ে দেয়।
হাওড়ার আন্দুলের এই পড়ন্ত রাজবাড়িতে কেউ আসে না।থাকে দুটি মাত্র মানুষ।ঋতবান জানে তাদের একজন তারই রেখে যাওয়া সীতারাম বাড়ই।তার বয়স ষাটোর্ধ্ব।কিন্তু তিনপুরুষ ধরে সে তাদের পরিবারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে।ঘর পাশেই মাঠের ওদিকটায় নায়েবঘরে।রাতে সীতারাম ঘরে ফিরে যায় হয়তো।বোনের রক্ষণাবেক্ষণ করতে করতে হয়তো তার সামান্য বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল।সদর দরজা পেরিয়েই দরবারঘর।সেখানে এক কোণে একটা হুইলচেয়ার রাখা।ঋতবান সেই চেয়ারটা টেনে নিয়ে আসে বাইরে।তরুলতাকে তার উপরে বসিয়ে দেয়।দরবার ঘর পার করে কাঠের সিঁড়ি।আজকাল আর তা ব্যবহার হয় না।ওই সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদের দিকে।দরবারের অন্যপ্রান্তে একটা বন্ধদরজার নিচ থেকে একচিলতে জোনাকির মতো আলো ভেসে আসছে।ঋতবান জানে তার বোন এখনও জেগে আছে।সে সারারাত জেগে থাকে।তার জন্য অপেক্ষা করে।
তরুলতাকে নিয়ে ঋতবান সেই একটুকরো আলোর দিকে এগিয়ে যায়।এই দরজা ভিতর থেকে বন্ধ।ঋতবান কড়া নাড়ে।ভিতর থেকে ক্ষীণ একটি স্বর বলে ওঠে,”কে?কে ওখানে?সীতারামদা,দেখো তো?কে দরজার কড়া নাড়ছে।”
ঋতবানের চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে।আহা।কতোদিন পর সে আবার তার ঘরে ফিরে আসতে পারলো।যেন স্বর্ণকলসের মুষ্টি ভেদ করে কোনও পতঙ্গ আবার ফিরে এসেছে তার নিজস্ব মধুভাণ্ডে।তরুলতা অনুভব করল তার বাম কাঁধটা ফোঁটা ফোঁটা জলে ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ।ঋতবান কাঁদছে।সেই কম্পমান স্বরেই সে বলতে চাইছে।
-দরজা খোল বোনু।আমি তোর দা ভাই।
দরজার ওইপারে যেন খানিকটা ডানা ঝটফট শুনতে পেল সে।তারপর দরজা খুলে গেল।দরজার ওইপারে হুইল চেয়ারে রাতের পোশাক পরে বসে আছে একটি ফ্যাকাসে কঙ্কালসার অল্পবয়সী মেয়ে।চোখদুটি তার কোটরাগত।ওষ্ঠাধরে কতোদিন আর্দ্রতা আসেনি কে জানে!পা দুটি লিকলিকে তিরকাঠির মতোই সরু।মেয়েটি তাকিয়ে থাকে তরুর দিকে।তরু হঠাৎ বিস্ময়ে চমকে ওঠে।মেয়েটির কোলে একটুকু চেনা বিন্দু তাকে নাড়িয়ে দেয়।’দোয়াব’।মেয়েটির কোলে ‘দোয়াব’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা।এই সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল তরুলতার শুভপরিণয় মুহূর্তে।কে এই দিব্যাঙ্গী জীবন্মৃত তরুণী।
-আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।আমার বোন।তোয়া চ্যাটার্জি।ওর জন্মর পর থেকেই পোলিওমাইলাইটিসে দুটি পাই পঙ্গু।তারপর ধীরে ওর দেহের স্নায়ু শুকিয়ে আসছে একেএকে।ডাক্তারবাবুরা বলেন অ্যামাওট্রোপিক ল্যাটারাল স্লেরোসিস।ধীরে ধীরে অনেক বছর আগেই ওর কথা বন্ধ হয়ে যেত।হয়নি আপনার স্বামীর জন্য!
তরুলতা আবার অবাক হয়।শুভব্রত?তোয়াকে শুভব্রত চেনে?
-আপনার স্বামীর পত্রিকা ‘দোয়াব’ হলো তোয়ার বেঁচে থাকবার একমাত্র উদ্দেশ্য।অথচ তোয়া কখনও তার সম্পাদককে চাক্ষুষই করেনি।শুধু তার কবিতাগুলো বালিকাবধূর ললাটের আলপনার মতো রাঙা হয়ে পৌছে গেছে দোয়াবের পাতায় পাতায়।
তরুলতা বুঝতে পারছিল তার বুকের মাঝখানটা ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ।তরুলতাও কি তবে কাঁদছে?তোয়া এবার বলে ওঠে।
-তোমাকে আমি চিনতে পেরেছি দিদি।তুমি তরুলতা!
-কী করে চিনলে?
-দোয়াবের পাতায় পাতায় তোমার গন্ধ পাই রোজ।ভাবি একদিন আলাপ হবেই।আজ হয়ে গেল।
-আর শুভব্রত?
-সম্পাদক!তিনি পাঠাবেন তো।আমার জন্য সৌজন্যকপি।আমার হাত কাঁপে আজকাল।লিখতে পারিনা তেমন।কে জানে।হয়তো আমার শেষ কবিতাগুচ্ছ বের হবে পত্রিকায়।
আয়না ও তার প্রতিবিম্ব যেন পরস্পর পরস্পরকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করছে।কিন্তু এরই মধ্যে ঋতবানের মনে পড়ে যায়।তোয়ার এই মারণরোগের কাছে সমর্পণ করেনি সে।মাসে দেড়লাখ টাকার সেই ওষুধ।সেই ফাঁদেই প্রজাপতিকে জালবন্দি করতে চেয়েছিল অখিলেশ।এখন সে অর্থ কোথা থেকে আসবে সে জানে না।কিন্তু তার মন বলছে তোয়ার অসুখ এইবার সেরে যাবে।নিশ্চিত সেরে যাবে।কিন্তু আপাতত অবন্তিকাকে তার অবস্থান জানানো দরকার।নয়তো বিপদ ঘটতে পারে।তাই ঋতবান এইবার দুজন চলন্তিকা মানবীর কথোপকথোনে যেন অনাবশ্যক ছেদ টেনে তরুলতাকে বলল,”আপনারা কথা বলুন।আমি একটু আসছি।”সদর দরজা হয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে ঋতবান বলল দরজার ওইপার থেকে ক্ষীণ স্বরে তার বোনু তাকে বলছে,”দা ভাই।দেরি করিস না।তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস।”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।