গ এ গদ্যে শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

আলো
‘ দেখিস বাবা, তুই তো সেট করে দিচ্ছিস…পরে আবার কানেকশন এর কোনো গোলমাল হবে না তো? বুঝতেই তো পারছিস, পুরনো দিনের সব ওয়্যারিং, ক্ষয়ে যাওয়া তার…।’
‘ কোনো চিন্তা করবেন না কাকু। আপনার ঐ তারের সঙ্গে আমার নতুন তারের কোনো যোগই নেই। দীপ দার সাথে কি আমার সেই সম্পর্ক যে যেমন তেমন কিছু একটা করে দিয়ে চলে যাবো?’
‘ সেতো বুঝলাম। তবু এই দুজন বুড়ো, বুড়ি দিনের প্রায় সারাটা সময় একা থাকি তো…ভয় হয়। কোথা দিয়ে কি হয়ে যাবে…এই তো দ্যাখ না, পরশু দিন কি ঝড় বৃষ্টিটাই না হলো! সন্ধ্যে হতে না হতেই যেন রাতের অন্ধকার..! তার সঙ্গে থেকে থেকে বিভৎসভাবে ঐরকম বাজ পড়ার শব্দ। ওদিকে ছেলে অফিসে বসে চিন্তা করছে, বারেবারে ফোন করে চলেছে আমাদের কাছে…আর এদিকে দুই বুড়ো বুড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের মধ্যে একা…. হ্যারিকেন আছে, তেল নেই। চার্জার লাইটটায় গাফিলতি করে বহু দিন চার্জ না দেওয়ায় সেও অকেজো। ঘরের বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার এতটাই ঘন যে লোডশেডিং কেও বুঝি হার মানিয়ে দেয়…! বাড়ি ফিরে এসব শুনে ছেলে তো ভয়ে ময়ে আমাদের কথা চিন্তা করে সেদিনই সীদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, আর নয়…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিনে আনতে হবে….অগত্যা আর কি…দেখিস বাবা দেখিস…সাবধানে তোল।’
সাড়ে সাতশো ওয়াটের ব্যাটারিটা মৃন্ময় আর ওর হেল্পার দুজনে মিলে কসরত করে তুলে অবশেষে জায়গা মতো বসিয়ে দেওয়া গেল।
‘ যে জিনিস দিলাম না কাকু, এক নম্বর মেশিন। তেমনি ব্যাটারীর কোয়ালিটি…আট দশ বছর হেঁসে খেলে চলে যাবে…আপনাদেরকে এ জিনিস বেচে আমি লস যেমন করিনি আবার লাভও করিনি… সবার সাথে কি আর লাভ লোকসানের হিসেেবের খাতা খুলে বসা যায় বলুন? আপনি দীপ দার বাবা…আপনাদের সঙ্গে আমার সাধারণ কাস্টমারের রিলেশান নয়…তার চেয়েও বেশি কিছু….।’
ব্যাটারিটা সেট করতে করতে বলছিল মৃন্ময়।
‘আসুন কাকু একটু দেখিয়ে দিই ফাংশন গুলো…। কাকিমা..আপনারও একটু দেখে নেওয়া দরকার…ঠ্যাকায় বেঠ্যাকায় কখন প্রয়োজন পড়ে…।’
কিরন বাবুর স্ত্রী মালা দেবী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন,’ আমি আর কি বুঝি…হ্যাঁ গো তুমি কিন্তু ভালো করে দেখে নিও… তাছাড়া ছেলে তো রয়েইছে…কোনো অসুবিধা হলে ও ই….। অফিসে ছুটি পাবে না বলে বেচারি আর থাকতেই পারলো না আজকের দিনে…ফিরতে সেই কোন রাত্তির…!’
‘ আমারও তো খোকার কথা মনে হচ্ছে বারবার..।’
‘ জিনিসটা কেমন হয়েছে বলুন কাকিমা? দীপ দা নিজে ক্যাটালগ দেখে পছন্দ করেছে। আমায় বললো ” যদি এটা এক নম্বর হয়, তাহলে এটাই দিতে। আমিও আর সেকেন্ড টাইম ভাবলাম না।”
‘ পারেও ছেলেটা। কেন যে এত পয়সা খরচ করতে যায়..! ‘
মায়ের মন যাই বলুক, ভেতরে ভেতরে আনন্দ আর উচ্ছলতা যেন চলকে ওঠে মালা দেবীর মুখে…নজর এড়ায় না কিরন বাবুর। এ আনন্দ,উচ্ছলতাকে বুঝি আর কোনো কিছুর সাথেই তুলনা করা যায় না। নতুন চাকরি পেয়ে ছেলে ইনভার্টার কিনে এনেছে বাড়িতে…ঝড়,বৃষ্টি, অন্ধকারে বুড়ো বাপ মাকে একা একা ঘরে রাখতে সাহস পায় না বলে…এই ভালোবাসাটুকুর চাইতে বড় প্রাপ্তি জীবনের প্রৌঢ়ত্ববেলায় পৌঁছে আর কি ই বা থাকতে পারে! আর কয়েকমাস পর খোকা( ভালো নাম দীপ)র বিয়ে। হবু বৌমা অনেক বড় ঘরের। ঘর আলো করে যে মেয়েটা আসতে চলেছে, তাকে অন্ধকারে রাখতে মন চায় না কিরন বাবুরও।
‘মেশিন সেট করে দিয়েছি কাকু। একবার অফ অন সুইচের ব্যাপারটা দেখে নিন। এই যে এই…একদম সহজ…ব্যাস আর কিচ্ছু করতে হবে না…আর এই যে দেখছেন বড় গোল সুইচটা…এটা শুধুমাত্র বহুসময় চলতে চলতে যদি চার্জ ফুরিয়ে যায় তবেই…আর এই যে..ঘরের এই মেইন সুইচটা ইমিডিয়েট চেঞ্জ করে নেবেন…এখন চলে যাবে…ঝড় বৃষ্টিতে বাজ পড়লে তখন একটা রিস্ক থাকে…সেদিন যেরকম থান্ডারিং হয়ে গেল.. কাঁচরাপাড়া, কল্যানী আর আমাদের এখানকার স্টেশন সংলগ্ম কিছু জায়গা মিলিয়ে আমার সাতাশটা পার্টির বাড়িতে বাজ পড়ে ইনভার্টার খারাপ হয়েছে….রাত্তির বেলাতেও বসে বসে মেশিন সারাই করছি। আলো না থাকলে কি হয়…সেদিন একের পর এক ইনভার্টার আর অন্ধকার জায়গাগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি…!’
‘ বলো কি!’
‘ তাহলেই বুঝুন। দেখেছেন বোর্ডটা কেমন খুলে এসেছে…পারলে কালই একটা বত্রিশ অ্যাম্পিয়ারের মেইন সুইচ…আমার লোক আছে…যদি বলেন তো…।’
‘ হ্যাঁ গো, ও তো ঠিকই বলেছে…এত ভালো মেশিনটা যদি এর জন্য খারাপ হয়ে যায় তবে তো…তুমি বরং কালই…।’
পাশে দাঁড়িয়ে মালা দেবী আশংকা প্রকাশ করেন।
‘ না না তুই কালই মালপত্র কিনে এনে লাগিয়ে দিস বাবা। চল্লিশ বছরের বাড়ি…বাবার আমলের…কতকাল এইভাবেই পড়ে রয়েছে…আমাদেরও বয়স হয়েছে…বুঝিসই তো…কে করবে…ছেলে বলেও ছিল এগুলো সব সারিয়ে নেবে..ওরও নতুন চাকরি…সময় পায় না বেচারি একদম…তাহলে ঐ কথাই রইলো…।’
‘ আপনারা চাইলে নিজেরাও অবিশ্যি মালপত্র গুলো কিনে আনতে পারেন…আমি সেট করে দেবো।’
‘ কি যে বলিস। তুই হলি আমার ছেলের বন্ধু। এখন থেকে আমাদের নিজেদের লোক৷ হ্যাঁ রে, তা তোর বাড়িটা কোথায়? ‘
‘ এখান থেকে আরো খানিকটা ভেতরে কাকু। সাঁকো পেরিয়ে প্রাইমারি স্কুলের যে মাঠ পড়বে, ঐ মাঠ ধরে সাইকেলে কুড়ি মিনিট…আনুলিয়া গ্রাম। আপনাদেরই মতো এরকম পুরোনো বাড়ি। ঠাকুর্দার আমলের। গ্রামে আজও দাদুর নাম করলে একবাক্যে সবাই…। পনেরো বছর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন কিনা…পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে তদ্বির করে আমাদের গাঁয়ে প্রথম বিদ্যুতের লাইন বসানোর ব্যবস্থা দাদুই করে দেন।’
‘ ওঁর নামটা কী বলতো?’
‘ স্বর্গীয় অবিনাশ রায়। নিশ্চই চিনবেন।’
‘ বিলক্ষন। কাজের সূত্রে কতবার দেখা হয়েছে ভদ্রলোকের সাথে..! তুই ওনার নাতি? বলবি তো! কিরকম আরো একটা পরিচয় তৈরি হয়ে গেল..!’
‘ একদম। তবে ইনভার্টারের ব্যবসা যবে থেকে শুরু করলাম, দীপ দার সঙ্গে আমার পরিচয় তারও অনেক আগে। আমরা একই সাথে স্কুল মাঠে খেলতাম…সেই থেকে আলাপ, ঘনিষ্ঠতা…।’
বলতে বলতে কারেন্ট চলে গেল।
‘ ঐ যাঃ…কাজের সময় লোডশেডিং..! ‘ বলে ওঠেন কিরন বাবু।
মালা দেবী ক্ষোভের সুরে বলেন,’ রোজ এই পালা করে যাওয়া শুরু হয়েছে…একবার গেলে দু ঘন্টার দায়ে…!’
মৃন্ময় ফিরে তাকায়,’ লোডশেডিং হলেই বা কি হয়েছে….আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে কাকু। এবার আলোগুলো জ্বালিয়ে দিলাম…।’
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষন। লোডশেডিং আর অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে মুখ ঢাকা চারপাশের পরিবেশের মাঝে ঝলমল করে ওঠে কিরন বাবুর বাড়ি ‘ আনন্দভিলা।’
ছেলে ফোন করে খবর নিয়ে নেয় বাবা মায়ের কাছ থেকে।
মৃন্ময় বলে,’ তাহলে আমি আসি কাকু। ব্যাস, আলো নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই….।’
‘ তা নেই। তবে আজকের দিনেই লোডশেডিং হতে হয়? ‘
দরজা দিয়ে বাইরের আঁধারে ডুবে যাওয়া পৃথিবীটা দেখতে দেখতে বলেন মালা দেবী।
কিরন বাবু স্ত্রীর দিকে তাকান। মালার কথায় যেন অন্য কিসের সুর ভেসে বেড়ায়….
‘ আমরা পাচ্ছি, এক পাড়ায় এতকাল পাশাপাশি থেকে ওরা আর আলো পেল না..কেমন দ্যাখো…।’
কিছু বললেন না কিরন বাবু। হয়তো বলতে পারলেন না আর।
বেরোতে গিয়েও চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে মৃন্ময়। কি একটু ভাবে। তারপর হেসে বলে, ‘কে বলেছে ওরা আলো পাবে না? তোমরা ওদের পথ দেখাও, তাহলেই দেখবে….দেখেছো, বলতে বলতে কখন তুমিতে চলে এলাম….!’
ডোর বেল বেজে ওঠে। কিরন বাবু উঠে দরজাটা খুলে দেন।
ছেলে অফিস থেকে এসেছে। একমুখ হাসি নিয়ে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে দীপ।
‘ ইনভার্টারের এক্সপেরিয়েন্স কেমন বাবা?’
‘ এই যে দ্যাখ না….এখনো কারেন্ট আসে নি… ঘরের মধ্যে ছিলাম বলে বুঝতেই পারিনি একদম.! ‘
ছেলের জন্য গর্ববোধ কিংবা ভেতরকার খুশিটাকে চেপে রেখে এদিক ওদিক বাইরে তাকিয়ে বলেন কিরন বাবু।
মালা দেবী এগিয়ে আসেন।
‘ খোকা এলি? আয় আয় বাবা, শান্তিতে পাখার তলায় বোস দেখি। যা ভ্যাপসা গরম পড়েছে..! তোর বাবাকে ঐ মৃন্ময় বলে ছেলেটি সব বুঝিয়ে দিয়েছে…কিভাবে কি করতে হবে.. মনটা খচখচ করছে রে…এত পয়সা কেন খরচ করতে গেলি বাবা…ঘরে তো আলো জ্বলা নিয়ে কথা…ওর চাইতে অল্প দামী জিনিস কি ছিল না?’
‘আঃ মা….ওসব নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না। দ্যাখো কাকে নিয়ে এসেছি। আয় আবার লজ্জা করে…।’
পাশের ঝুপড়ি বাড়ির ছেলে সুমন। মা নেই। বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। জন খাটে। এক বুড়ি দিদা রান্না করে দেয়।
মাথা নীচু করে দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে বারো বছরের সুমন। হাতে একটা গোটানো বড় সাদা কাগজ। খারাপ চোখে হাই পাওয়ারের পুরু লেন্সের চশনা, মাথাভর্তি পাখির বাসার মতো তেলকাষ্ঠা চুল, কালোকোলো ক্ষয়াটে অপুষ্টির শরীর,ছেঁড়া তাপ্পি দেওয়া জামা, হাফ প্যান্টের নীচ থেকে দৃশ্যমাণ সরু লিকলিকে হাত পা…।
কিরন বাবু আর মালা দেবী দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন দুজনের।
‘অন্ধকার রাস্তা…টর্চ নিয়ে হেঁটে আসছি…দেখি ঘরের দাওয়ায় হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় এই মক্কেল মাথা নীচু করে বসে বসে একটা সাদা কাগজে ছবি আঁকছে। অন্য সময় হয়তো নজরে পড়তোও না। পাশ দিয়ে যেতে যেতে হট করেই চোখটা পড়ে গেল। এত সুন্দর একটা আঁকা হ্যারিকেনের নিভু নিভু আলোয় কি করে আঁকছিল ছেলেটা…ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। তারিফ না করে পারলাম না কিছুতেই।
কিন্তু তারপর ওর মুখে যেটা শুনলাম, তাতে যতটা মায়া হলো ঠিক ততটাই যেন কষ্ট…!
আমায় বললো,”এই অন্ধকারে আঁকতে গিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে চোখের …কাল ইস্কুলে জমা দিতে হবে এটা আমায়..তাই আজ তাড়াতাড়ি করে…।”
দ্যাখো দ্যাখো, পেন্সিলে যে ছবিটা এঁকেছে, বোঝা যায় দেখে সেভেনে পড়া ছেলের আঁকা? দ্যাখা দেখি একটু সবাইকে…।’
কাগজটা দু হাতে মেলে ধরে সুমন।
পেন্সিলে আঁকা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষ প্রতিকৃতি।
সবাই একবাক্যে বলে ওঠে.. ‘ হ্যাঁ রে, তুই যে এত সুন্দর আঁকতে পারিস এতো আমরা জানতামই না..!’
লাজুক মুখে রিনরিনে গলায় সুমন বলে,’ কাল বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। আমাদের ইস্কুলে হাতে আঁকা ছবি জমা দিতে বলেছে। চোখ দিয়ে জল পড়ছিল…আর রঙ করতে পারলাম না… পেন্সিলেই এঁকে ফেললাম…।’
কিরন বাবু আস্তে আস্তে এগিয়ে আসেন সুমনের দিকে। ওর পিঠে হাতখানা রেখে বলেন,’ এবার থেকে লোডশেডিং হয়ে গেলে তুই এই বাড়িতে এসে লেখাপড়া করবি। দু পা হাঁটলেই তো পৌঁছে যাবি। খোকা ওর বাবাকে কথাটা একটু বলে দিস কেমন? যে চোখ দিয়ে আজ এই ছবিটা আঁকলি তাকে নষ্ট হতে দিস না। চোখই জীবন। চোখই আলো।’
অবাক হয়ে গেল দীপ। এগুলো যে তারই মনের কথা…!
মনে মনে ঠিক করে নিল সে…সুমনের বাবাকে রাত্তিরে স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া…সে বুঝি ভগবানেরও অসাধ্য। অফিস থেকে ফেরার পথে ওর দিদাকেই কথাটা জানিয়ে রাখতে হবে।।