সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৩৮)

বিন্দু ডট কম 

শিয়ালদহ চত্বরে হোটেলে ঘর পাওয়া খুব কঠিন।বিশেষত সেই ঘরের দাবিদার যদি দুটি একলা মেয়েমানুষ হয়।তার ওপর হোটেলে লিফট থাকতেই হবে।বা ঘর হতে হবে একতলায়।কারণ দোতলা তিনতলায় সিঁড়ি বেয়ে তোয়াকে নিয়ে যাওয়া কঠিন।এদিকে পুরুষোত্তম প্রেসে যাবার পর থেকে তরুলতা বুঝতে পেরেছে,আর যাই হোক,শুভব্রতকে যদি সত্যিই খুঁজে বের করতে হয়,তাহলে আরও কয়েকদিন এখানে থেকে যেতেই হবে।এতো সহজে হেরে যাবার পাত্রী সে নয়।সমস্যা আরও আছে।তোয়ার ওষুধ নেই বেশি।এদিকে ঋতবানের কোনও খবর নেই।কোথায় গেল ছেলেটা?আন্দুলে তোয়ার বাড়ি থেকে সীতারাম কোনও খবর জানাতে পারলো না।

        শুভব্রতর ফোন সুইচড অফ।সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু তার পত্রিকা অনলাইনে প্রকাশের খবর।তবে কি তাকে না জানিয়েই শুভব্রত তার নম্বর পালটে ফেলেছে?এতোগুলো অনিশ্চয়তার ভিতরেও তরুলতা হেরে যাবে না কিছুতেই।এদিকে তার শরীরজুড়ে যে ছোট্ট বাগান জেগে উঠেছে,তার পরিচর্যা হচ্ছেই না তেমন।আজকাল কেমন সন্ধ্যা হলেই মাথা ঝিমঝিম করে তার।কারণে অকারণে ক্ষিদে পেয়ে যায়।

               এতোগুলো ‘কিন্তু’র মধ্যেও হঠাৎ মুক্ত বারান্দার সন্ধান পেয়ে গেল তরুলতা।অপরূপা সামন্ত।তার কলেজের বন্ধু।অপরূপার আদি পৈত্রিক বাড়ি ঝামাপুকুরের রাজবাড়ি।কতোবার যেতে বলেছে তাকে।যাওয়া হয়নি।একটা নম্বর ছিল।কে জানে সেই নম্বরটাই আছে কিনা!ভাবতে ভাবতে নিজের মোবাইলে সঞ্চয় করে রাখা অপরূপার সেই বহু পুরনো নম্বর ডায়াল করলো মরিয়া তরুলতা।আর আশ্চর্যজনকভাবে সে নম্বর লেগে যাওয়া মাত্রই রিঙ হতে শুরু করল।কী বলবে সে এতোদিন পর?ভাবতে ভাবতেই ওপারে একটি পুরুষ কন্ঠ ফোন তুলল।

-হ্যাঁ।কাকে চাই?

-আচ্ছা এটা কি মানে অপরূপার নম্বর?

-হ্যাঁ।আমি ওনার হাজব্যান্ড বলছি।বলুন?

-ওকে একটু বলুন না। ওর কলেজবেলার বন্ধু আমি।তরুলতা।খুব দরকারেই ফোন করছি।প্লিজ বলবেন।

-ঠিক আছে। 

বলতে না বলতেই ফোনটা কেটে গেল।কিন্তু তরুলতা মোবাইল ব্যাগে রাখতে না রাখতেই আবার সেটা বেজে উঠল।অপরূপা কল ব্যাক করেছে হয়তো।

-কীরে তরু।কতোদিন বাদে।কী ব্যাপার তোর?

অপরূপার শশুরবাড়ি কলুটোলা স্ট্রিট।এই কবছরে অপরূপার গলাটা আরও ভারিক্কি হয়েছে।দুটি মেয়ে তার।বর তার পারিবারিক ব্যবসাতেই যোগ দিয়েছে।তরুলতারা তখন সল্টলেকের দিকে চলেছে।বাইপাসের ধারে একটি হোটেলে ঘর পাওয়া গেছে।অপরূপাদের বই বাঁধাইয়ের ব্যবসা।সে ব্যবসাও তেমন চলছে না আজকাল।প্রথম প্রথম তাও পাঠ্যপুস্তকের অর্ডার আসতো।পরবর্তীতে ঘরে ঘরে ছোটোদের সামনে ট্যাব ধরিয়ে দেওয়া হলো।

-তোর শুভব্রতকে খোঁজা অসম্ভব হবে না রে।তুই ওর ফোন নম্বরটা দে।আমার বর অনীষের লালবাজারে জানাশোনা আছে।তাছাড়া বইপাড়ায় একবার খোঁজ করে দেখতে পারি।

এতোদিন পর শুধুই একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ফোন করতে কেমন অপরাধবোধ হচ্ছিল তরুলতার।কিন্তু তার আর কীই বি উপায়?ব্যাঙ্কের ঘটনাটা এখনও ইনভেস্টিগেশনে আছে।তাই সেখানকার চেনাজানা কারোকে বলা যাবে না।আর নিজের পরিবারের সঙ্গে তো কোনও যোগাযোগই রাখে না সে।তার গলার স্বরে কুন্ঠা ধরতে পেরে অপরূপা বলল,”তুই মিছিমিছি ভাবছিস।এই যে এই সূত্রে এতো বছর পর কতো কথা হচ্ছে,এও কী কম?”

দুদিন সময় চেয়ে নিল সে।শুভব্রতর মোবাইল নম্বরটা তাকে দিয়ে দিল তরুলতা।হঠাৎ তার মনে হলো,বেলদার ব্যাঙ্ক জালিয়াতি,অখিলেষ,সমরজিত,সব ধামিচাপা পড়ে গেল নাকি?ঋতবান কোথায় গেল কে জানে?ভাবতে ভাবতেই গাড়ি পৌছে গেল বাইপাসের হোটেলটায়।ঠিক উল্টোদিকে যুবভারতীর খেলার মাঠ।হঠাৎ  মৃদু বৃষ্টি পড়ছে চারপাশে।আর গাড়িটাকে ছেড়ে দিতে হবে।ড্রাইভারের বয়স ওই পরশুরামের মতোই হবে।তবে এই ছেলেটা বোধহয় মুসলমান।গাড়ি ভাড়া ছাড়াও বাড়তি একশো টাকা দিল তরুলতা।অনেক সাহায্য করেছে ছেলেটা তোয়াকে নামাতে ওঠাতে।উল্টোদিকের মাঠের দিকে একমনে তাকিয়ে তোয়া বিড়বিড় করে,”কলেজ রো।নম্বর মনে পড়ছে না।”

-কী?

-মনে হচ্ছে কলেজ রোর একটা ভাড়াবাড়ির ঠিকানা ছিল শুভব্রতবাবুর সৌজন্যকপিতে।কিন্তু নম্বরটা…

-তোমার ঠিক মনে আছে তোয়া?

-হ্যাঁ দিভাই।কলেজ রো।মনে আছে।

আবার যেন আশার আলো জ্বলে ওঠে তরুলতার দুই চোখে।কলেজ রো তো খুব বড় রাস্তা নয়।কাল তাহলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া যাবে।ভাবতে ভাবতেই আবার তার ফোনটা বেজে উঠল।অচেনা নম্বর!সামান্য লাগেজ আর তোয়ার ওষুধ ব্যাগ নিয়ে রিসেপশনে যেতে যেতে ফোনটা ধরে নিল তরুলতা।

-অবন্তিকা বলছি।আপনি সেফ আছেন তো?

-হ্যাঁ।আপনি?অনেক কিছু বলার আছে যে আমার। 

-তার আর কোনও প্রয়োজন নেই।সমস্ত ঘটনার সবরকমের দায়ভার স্বীকার করে নিয়ে আজ ঋতবান পুলিশ কাস্টোডিতে আত্মসমর্পণ করেছে।

-কিন্তু ….

-ভয় পাবেন না ম্যাডাম।আমি পুরো ব্যাপারটাই জানি।এটা একটা আন্তর্জাতিক নেক্সাস ছিল।কেউটে বের হবে খুব শিগগিরই।তার উপর আমরা তিন তিনজন পুলিশ অফিসারকে এই মিশনে হারিয়েছি।তাই ঋতবানবাবু রাজসাক্ষী হয়ে গেলে ওনার শাস্তি অনেকটাই কমে আসবে।

-ওহ।

-কিন্তু কাল একবার আপনাকে লালবাজার আসতে হবে দুপুরের দিকে।ঋতবানবাবু কয়েকটা জিনিস আপনাকে হ্যাণ্ডওভার করতে বলে গেছেন।বললেন খুব জরুরি।ম্যাটারটা তার বোন তোয়া চ্যাটার্জিকে নিয়ে।প্লিজ আসবেন।এটা আমার নম্বর।ইচ্ছে হলে সেভ করে রাখুন।

বিচিত্র এই জগত।এক্ষুণি যে অবন্তিকার সঙ্গে তরুলতার কথা হলো তার সঙ্গে বেলদা ব্রাঞ্চের সেই ছটফটে পেটপাতলা কনট্রাকচুয়াল মেয়েটির প্রায় কোনও মিলই নেই।ঋতবান কি তবে তরুলতাকে বাঁচাতেই সব দায় নিয়ে নিল নিজের কাঁধে?ফোন কেটে কাচের ক্যাপস্যুল লিফট দিয়ে উঠে যাচ্ছিল দুটি মানুষ।দুজনেরই গন্তব্য যেন এক বিন্দুতে মিশে যাচ্ছে অচীরেই।তোয়া তাকিয়ে থাকে খেলার মাঠের দিকে।এই ঘাসে সে আর কখনো পা রাখতে পারবে কি?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।