গল্পেরা জোনাকি তে সুদীপা বর্মণ রায়

সমুদ্রে
সবুজ সমুদ্র ওপর থেকে শান্ত ,স্থির। বুকে লুকিয়ে রাখে সম্পূর্ণ আলাদা রঙিন জগৎ। তীরে দাঁড়িয়ে হদিস পাওয়া যায় না।
কয়েকদিনের ছুটি পেয়েছে সমর।তাই হুট করেই রাতারাতি আন্দামানে আসা।নীপাকে টিকিট কেটে তবেই জানিয়েছে।
“কোথায় যাবে?”জিজ্ঞাসা করেনা কোনদিনই।নিয়ে যায় সাথে এই ঢের।
আনমনে একটু দূরে দূরে হাঁটছিল নীপা। সমর এগিয়ে গেছে ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে অনেকটা। পাশাপাশি হাঁটার দায়মুক্ত সে। বৃষ্টিটা ধরলেও আকাশের কালো মেঘ ডুবতে চাইছে সমুদ্রে। প্রবালের মৃতদেহ জমে তৈরি প্রাকৃতিক বিচের অনুপম সৌন্দর্য বারবার অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে নীপাকে। বুকের মধ্যে এত ছিদ্র ,তবুও কত সুন্দর। ভাঙচুর হয়েছে কিছু জায়গা কত অজানা কারণে!বৃষ্টির জল জমেছে যেখানে , সেখানে চুপটি করে আকাশের ছবি ভাসছে। একলাই প্রকৃতিকে নিজের ভিতরে জমিয়ে এগোয় নীপা।
বাড়িঘর গাছপালা মানুষজন সবকিছুই এত চেনা ,মনেই হচ্ছে না নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে অনেকটা দূরে তারা এখন।
এখানে পাঁচশ বাহাত্তরটা দ্বীপের মধ্যে মাত্র আটত্রিশটা দ্বীপে মানুষ তিলেতিলে গড়ে তুলেছে নিজের একান্ত আস্তানা।তাই
দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে মানুষগুলো মিলেমিশে মনেপ্রাণে এমন সজীব। পর্যটন এখানকার প্রধান আয়ের রাস্তা। দুহাত বাড়িয়েই রাখে স্থানীয় মানুষ দুদিনের জন্য ঘুরতে আসা পর্যটকদের আপন করতে। স্বাধীনতার পরবর্তী দেশভাগ পর্যায়ে ওপার বাংলা থেকে প্রাণভয়ে ছুটে আসা মানুষগুলো যারা মূল ভূখণ্ডে জায়গা করে উঠতে পারেনি মাথা গোঁজার ,তাদেরই এক বড় অংশ বহু বছর ধরে লড়াই করে করে এখানকার মাটিকেই নিজেদের দেশ বানিয়ে তুলেছে।এখানকার আবহাওয়া ,রোগ,নোনাজল সবকিছুর সাথে লড়ে তাদের থেকেই বেঁচে থাকার উপকরণ সংগ্রহ করেছে, কিন্তু–লড়তে লড়তে নিজের ভিতরের মিষ্টতা হারায় নি এতটুকু।নিজের সাথেই রেখে দিয়েছে বাংলাদেশের সেই অতিথিবৎসল মনটা ।
সমস্ত দ্বীপেই মানুষ জঙ্গলের সহাবস্থান।সবুজ শীতল মায়ায় সংক্রমিত এখানকার বন আর মানুষের মন।কিন্ত জঙ্গলে হিংস্র প্রাণী বা মানুষের মনে হিংস্রতা অনুপস্থিত।
আবার বৃষ্টি পরছে ঝিরিঝিরি। কিন্তু সবুজ সমুদ্রের তীরে বৃষ্টির ছুঁয়ে যাওয়া মধুরলাগছিল।
সঙ্গী অটোচালকের রক্তে বাংলাদেশের , “আয়েন কত্তা বয়েন ” মনোভাব। জমিয়ে “বাড়ির খবর,হাঁড়ির খবর’ নিতে নিতে ঝুলন্ত প্রাকৃতিক কোরাল ব্রিজের কাছাকাছি। প্রবাল নিজের মৃতদেহ জমিয়েছে ক্রমাগত নিজের খেয়ালে।মানুষ কেটেকুটে আকার দিয়েছে সিঁড়ির।ধাপে ধাপে পেরোনোর সময় দুপাশে তাজা ফলের পসরা সাজিয়ে স্থানীয় মানুষের ডাকে,
“ও দিদি এসো, তাজা ফল নাও।”
দুদন্ড থেকে গল্প করতে মন চায় নীপার।
ফেরার পথে দেখা যাবে ,আপাতত উদ্দাম সমুদ্রের তীর ডাকছে আরো।
বিমল অনেকক্ষন ধরেই অপেক্ষা করছিল , ব্রিজ দেখতে আসা টুরিস্টই তার রুজিরোজগার।
“ওই যে সম্পূর্ণ প্রবাল দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক ব্রিজ” যে কেউ বলে দেবে।
তবুও দেখার বাকি থেকেই যায় অনেককিছু। প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার রাস্তার সন্ধান দেয় বিমলেরা। দ্বীপের ভূমিরূপ চাষবাসের উপযুক্ত না হওয়ায় বিমলদের মত স্থানীয়দের জন্য পড়ে আছে —হোটেলে কাজ,টুকিটাকি ব্যবসা আর গল্পের ছলে পর্যটকদের এখানকার প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া।শুধু চোখের দেখা নয় –অনুভব করা।
বকবক করতে করতে এগোচ্ছিল বিমল –স্যার কে খুশি করতে, এই সমুদ্রসৈকতের কত অজানা দৃশ্য উন্মোচিত হচ্ছিল।
সৈকতের মাঝে মাঝেই জমা জল ছোট্ট ছোট্ট জলাশয়ের মত,তাতে কোথাও অর্ধমৃত প্রবাল ,অর্ধজীবিত ও বটে),কোথাও অক্টোপাস।
কোথাও অন্যরকম ফুল বেগুনী রঙের,মুখটা খুলছে ,বন্ধ হচ্ছে ,ভিতরে হাত ঢোকালে আঙ্গুল কেটে নেবে।
বিস্ময় আর বিস্ময়।কথা বন্ধ সবার –শুধুই অবাক হওয়ার পালা।সমস্ত প্রকৃতি যেন মূর্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে,এক অচেনা অজানা অল্প শিক্ষিত গাইডের গলায়।নোনাহাওয়াতেও ছড়িয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত মিষ্টতা।
পকেট থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বার করে বিমল।অবাক তিনজন–মৃদু হেসে ,একটা ছোট্ট জল জমা গর্তে বিস্কুট গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দেয়। এক দুই তিন –গোনার সাথে সাথে ছুটে আসে অজস্র রঙিন মাছ। আনন্দে কলকল করছে সবাই।
নীপার ভীষণ ইচ্ছা করছিল ,একটু নিজে হাতে খাওয়াতে। মনুষ্যেতর প্রাণীদের দায় নেই ,নিজেদের অনুভূতি লুকিয়ে রাখার।কিন্তু চিৎকার করে বেসুরো গলায় গাইলে , হঠাৎ আনন্দে লাফিয়ে উঠলে, আনন্দে নাচতে চাইলে – মান কমে যায় সভ্য মানুষের।
যেন তার মনের ইচ্ছাটা বকবক থামিয়ে, পড়ে ফেলে ,ওই “অল্প শিক্ষিত “ছেলেটা। বিস্কুটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে , ” ম্যাডাম একটু খাওয়ান নিজের হাতে ,খুব ভালো লাগবে”।
নীপা স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে।তারপর কয়েকটা বিস্কুট গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে দেয় ।
ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন মাছের দল,
অদ্ভূত এক ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত মনে।
ফেরার পথে হালকা এক রোদের আভাস মিললো কি কোথাও!
সবকিছু নিয়ম মেনেই হবে এমন লেখেনি কোথাও।
কিছু ভালো লাগা অকারণেই ছড়িয়ে যায়।
“ম্যাডাম ,আপনার ফোনটা দিন ,আর ঠিক ওখানে গিয়ে দাঁড়ান।পিছন থেকে সমুদ্র আর ওই দিক থেকে আসা আলোয় আপনার ছবিটা খুব ভালো করে উঠবে?”
অচেনা এক অল্প শিক্ষিত যুবক কেন তাই দেখতে পারছে যা অন্য কেউ দেখার অপেক্ষায় কেটে গেলো এতগুলো বছর।
ওই তো এগিয়ে যাচ্ছে সবাই তাকে ফেলে নিশ্চিন্তে।
এগিয়ে দেয় নীপা ফোনটা।কোথাও থেকে যাক কিছু কিছু ছবি।