মার্গে অনন্য সম্মান সুতপা ব্যানার্জী(রায়) (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৭৯
বিষয় – কর্তব্য
অরণ্যরক্ষী
মিলি বসু ফরেস্ট সার্ভিসের পরীক্ষায় পাস করে
রেঞ্জার অফিসার হিসেবে ঝাড়খণ্ড বনাঞ্চলে পোস্টিং পেয়ে এসেছে। জঙ্গলের ওপর এই টান, সেটাকেই কর্মজগৎ করে নেওয়া এক প্রজন্মের ব্যাপার নয়।
এই ভালোবাসা, ভালোলাগা ও ওর মা প্রফেসর শিলাবতীর কাছ থেকে পেয়েছে। শিলাবতীর ইচ্ছে ছিল কলেজ জীবন শেষ করে ফরেস্ট সার্ভিস দেওয়ার। কিন্তু ঘরে কথাটা বলতেই-“তোর কি খাওয়ার অভাব হয়েছে যে জঙ্গলে বাঘেদের সঙ্গে থাকতে হবে?” অতএব গতানুগতিক পথে লেখাপড়া শেষ করে কলেজে জয়েন করেছিল। জীবনসঙ্গীও সেরকম জুটেছে, বাইরে কোথাও যেতে চায় না আর জঙ্গলের কথা শুনলে তো দাঁতকপাটি লাগে। যাবতীয় শখ আহ্লাদ মেয়ে মিলি পূরণ করেছে, জঙ্গলের মধ্যেই ওর বাস। মাঝে মাঝে শিলাবতীও এসে কাটিয়ে যায় এখানে। একজন নেপালি দারোয়ান আর এক আদিবাসী রাঁধুনি নিয়ে মিলির সংসার। যেটা এর আগে কোন রেঞ্জার করে নি সেই রাতের টহলও দেয় মিলি ওর দলবল নিয়ে। দিনের থেকে বেশী রাতেই রোমাঞ্চিত হয়, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পশুপাখির আওয়াজ অনেক না বলা
কথা বলতে চায়। মিলি একটা গাছের গায়ে হাত দিলেও তার স্পন্দন টের পায়। এই প্রকৃতি এই পরিবেশ যেন ওকে ডেকে বলে তুমি আমাদের সামলে রেখো। এ জঙ্গলে গণ্ডার নেই, উত্তর বঙ্গের জঙ্গলে গণ্ডার শিকার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এখানের জঙ্গলে মূলত গাছ চুরি যায়। রাতারাতি সকলের অগোচরে জঙ্গল সাফা করে দেয়। এই অবৈধ জঙ্গল সাফের জন্য আবার বরাতও দেওয়া হয়। তাই জঙ্গলের শেষ চেক পোস্টেও মাঝে মাঝে হানা দিতে হয় কোন অবৈধ লরি বিনা পারমিটে যাতায়াত করছে কিনা দেখার জন্য। এরকম ঘটনার একটা উড়ো খবর পেয়ে চেক পোস্টে গিয়ে মিলি আবিষ্কার করেছিল স্থানীয় বিধায়ক হরিপ্রসন্ন মজুমদার ওখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। দুটো ঘটনার মধ্যে কী সম্পর্ক কী যোগাযোগ আছে ভাবতে গিয়ে ওর মনে পড়েছিল ওদের ট্রেনিংয়ের সময়ের প্রফেসার ত্রিশঙ্কুরের কথা-“বুঝলে অরণ্য হল লুটেরাদের পিকনিক স্পট, ঐ সম্পদ দিয়েই ওদের মোচ্ছব চলে।”
জঙ্গলের কিছু অংশ থাকে সরকারি লিজে কোন পারমিট প্রাপ্ত সংস্থার হাতে, যেখান থেকে নির্দিষ্ট রেভিনিউয়ের বিনিময়ে মধু, মোম, রজন এগুলো সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু কিছু সংস্থা সরকারি ব্যবস্থাপনাকে কব্জা করে আস্ত বনটাকেই গিলে খেতে চায়। এইসব শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে জঙ্গল বাঁচানো মিলির কাছে একটা চ্যালেঞ্জ।
ছুটির দিনেও জঙ্গল ওকে টানে, মনে হয় পশুপাখি,
গাছপালা বলছে-“তুমি না থাকলেই আমাদের ঘোর বিপদ।” মিলি দুজন বনরক্ষীকে বলে রেখেছে,
ওর মা আসছে দুদিনের জন্য তাই ঐ দুদিন ও রাত পাহারায় থাকবে না, ওরা যেন সজাগ থাকে।
বন দপ্তর থেকে ফিরে ও দেখল মা এসে গেছে। বারান্দায় চেয়ারে এলিয়ে বসে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মায়ের এ ভঙ্গি চেনা মিলির,
মেয়ের ব্যাপারে যখন কোন সুখবর থাকে তখন শিলাবতীর এরকম হালকা মেজাজ থাকে। সেন্টার টেবিলে রাখা টিপয়ে চা ঢেলে বলল-“আয় মা, এখানে বোস কথা আছে।” ঘাম আর বুনো গন্ধের পোশাক বদলে সেই ছোটবেলার মতো মিলি মাকে জড়িয়ে ধরে বলল-“বল কী তোমার কাজের কথা?নিশ্চয়ই বিয়ে নিয়ে?তাইতো বলি আমার অল্প রাগী মা-টা আজ এত হাসিখুশী কেন,পেয়েছ খুঁজে তোমার সাত রাজার ধন মানিক সে জামাইকে?”
শিলাবতী-“এত ট্যাড়া,ট্যাড়া কথা বলবি না তো,এ কাজের দায়িত্ব মা ছাড়া আর কে নেবে,নিজে মা হ,তখন বুঝবি।”
“আর আমার মা হয়ে বুঝে কাজ নেই। বাঘ, হরিণ,শেয়াল এদের নিয়ে আমি বেশ ভাল আছি।”-
মায়ের অর্ধেক কথা শুনতে শুনতেই মিলির ফোন এসে গেল। বনরক্ষী হড়কা বাহাদুরের ফোন, ওকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ফিরল মায়ের কাছে। “তারপর বল তোমার জামাই হিসেবে কাকে শিকার করলে?”
“আহা মেয়ের কী কথার ছিরি,জঙ্গলে থেকে থেকে একেবারে জঙ্গলী হয়ে গেছিস।”
“হা হা হা,এটা তুমি একদম ঠিক বলেছ, তাহলে পার্টনারও তো ওরকম জঙ্গলী চাই।”
“জঙ্গলী কিনা জানি না,তবে জঙ্গলে ঘুরতে ভালোবাসে।”
“তা কর্মস্থলটি কোথায় শুনি?”
“এই অঞ্চলেরই এসডিও।”
“তাহলে আর কী,সোনায় সোহাগা,লাগিয়ে দাও।”
“হ্যাঁ তোদের মধ্যে দেখাশোনা হয়ে গেলেই তোর বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করবে। ছেলে খুব সুন্দর দেখতে তোর অপছন্দ হবে না।”
মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরেই মিলি দেখল কোন অজানা নম্বর থেকে ঈশান বলে কেউ হোয়াটসআপে কথা বলতে চাইছে। পরিচয় যা দিচ্ছে তাতে তো ওর মনে হচ্ছে এ মায়ের আদরের সেই এসডিও জামাই। পরের রবিবারে ওর বাড়িতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। কী আর করে,অনুমতি দিল
আসার জন্য। শিলাবতী সব শুনে বলল-
“আমার কোন অসুবিধে নেই,আমি থেকে যাচ্ছি পরের রবিবার অব্দি।বরং তোর বাবাকেও আসতে বলে দিই।”
পাখপাখালির ডাকে মিলির বন বাংলোতে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়। শিলাবতী সূর্য প্রণাম করছে আর তাই দেখে মিলি ভাবে ওর মা নিশ্চয়ই সূর্যদেবতার কাছে ওর মঙ্গল মানে বিবাহজনিত মঙ্গল কামনা করছে। আদিবাসী মেয়ে ফুল্লরাই ওদের গাঁয়ের হাট থেকে মিলির বাজারটা করে নিয়ে আসে। শিলাবতীর হেঁসেলে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা চলতে থাকে।
ঈশান এক বন্ধুর সঙ্গে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে আসে।
আপাতদৃষ্টিতে বেশ আমুদে আর মিশুকে বলে মনে হয় ওকে। ঈশান ইঞ্জিনিয়ারিং করে প্রশাসনিক পদে এসেছে, বন্ধুটি ওর কলেজ জীবনের। মিলি অতটা এক্সোভার্ট নয় তাই হুঁ না-তেই উত্তর সারে।
ওরা থাকতে থাকতেই হড়কা বাহাদুর রুটিন রিপোর্টিংটা করে যায়। এই এলাকার অনেককিছুই জানে ঈশান। মিলির চারবছর আগে ওর জয়েনিং, দু জায়গায় বদলি হওয়ার পর এখানে এসেছে। বদলি নিয়ে মিলির কোন বক্তব্য নেই,ওকে যেখানেই পোস্টিং দিক, ও একাই থাকতে পারবে। ঈশানরা ফিরে যেতে ওদের বাড়ি থেকে বিয়ের ব্যাপারটা নিশ্চিত করা হল। শিলাবতীর খুশীর শেষ নেই, বাবার আর মেয়ের বিশেষ কোন প্রকাশ নেই। শিলাবতীর চিন্তা, ওদের অনুপস্থিতিতে মেয়ে একা হয়ে যাবে তাই একটা সঙ্গীর দরকার। তবে মিলি জানে ওদের প্রজন্মে স্থিরতা বলে কিছু নেই, সবটাই অস্থির। বর্ষা নামলে গাছের স্নান দেখতে দেখতে মিলির অন্তর্মুখী মন কেমন কাব্যিক হয়ে ওঠে, গলায় উঠে আসে রবীন্দ্র আবৃত্তি,গান। এরকম দিনে ফুল্লরা খিচুড়ি, ওমলেট বানায়, বুনো ফুলের গন্ধ মেখে সেই ভোজন মিলির কাছে পরমান্ন হয়ে ওঠে। ঈশান ইদানীং ফোন করা শুরু করেছে, ফোনেতে যতটা সম্ভব রোমান্টিক হতে চায়। মিলিও সেসব কথা আগ্রহ ভরে শুনে টুকটাক হুঁ হাঁ দেয়, বেশীরভাগ সময়ে ও শ্রোতা হয়েই থেকে যায়।জঙ্গল যখন হলুদ রাধাচূড়া ও লাল কৃষ্ণচূড়ায় ভরে গেছে তখন ঈশানের দেওয়া লাল সিঁদুরে মিলির সিঁথি রেঙে উঠেছে। কলকাতার থেকে ফেরার পর ফুল্লরার নেতৃত্বে সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করেছে টুকুন,মাধো, হারাণ, শিমুলরা। সাথে ঈশান ও মিলিও পা মিলিয়েছে। সুন্দর কাটতে থাকে ওদের দিন। শিলাবতীও নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে গেছে তার ঘরকুনো বরের কাছে। মিলি ও ঈশান কোথাও মধুচন্দ্রিমা করতে যায় নি, বনবাংলোর পরিবেশই নবদম্পতিকে ভরিয়ে রেখেছে। ঈশান এখান থেকেই নিজের কর্মস্থলে যাতায়াত করে। শান্ত মিলির দেহে ও মনে ঈশান ঝড় তোলে। নিশিরাতের চাঁদ, জোনাকি আর দূরে পেঁচার ডাক রোজ ওদের রাতের বাসর সাজায়। মিলির বাংলোয় একদিন হরিপ্রসন্ন মজুমদার আসে, ও অবাক হয়ে ভাবে বুঝি ওর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছে বিধায়ক। ঈশানের সঙ্গে বিধায়কের পূর্বালাপের ধরণে মিলি আরো অবাক হয়। তবুও চা-জলযোগের মাধ্যমে আতিথেয়তা করতে হয়। ওদের হাবেভাবে মিলির মনে হয় সরকারি টেণ্ডারে ভদ্রলোক ঈশানের আনুকূল্য পেয়ে থাকে। ঈশানের স্বার্থটা এ ক্ষেত্রে কী মিলি তা ঠিক বুঝতে পারে না,তবে কি ঈশান ওনার সম্পর্কে ভাল করে জানে না? ও স্থির করে ঈশানকে এ বিষয়ে সাবধান করতে হবে। এরমধ্যে শীলাবতির শরীর খারাপ হওয়ায় মিলিকে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়িতে যেতে হয়। ওখানে মায়ের চিকিৎসার সব বন্দোবস্ত করে ওর ফিরে আসতে সপ্তাহ খানেক লেগে যায়। যেদিন ফিরে আসে সেদিন সোজা ও বিট অফিসে যায়। অফিস খোলা দেখে ভাবে অন্য কর্মচারীরা ভেতরে আছে।কয়েক পা এগিয়ে বারান্দায় উঠতেই ঈশানের গলা পেল। আশ্চর্য হতে যাবে এ সময় হরিপ্রসন্ন-র গলা পায়-“কেমন বুদ্ধিটা দিলাম ভায়া, বনের চিড়িয়া একদম আপনার খাঁচায় এসে বসল।”
“তা যা বলেছেন,তবে পুরোপুরি খাঁচায় বসেছে কিনা বলতে পারছি না।”
“সে কি মশাই, এখনো সন্দেহ আছে নাকি?”
” হ্যাঁ, নিজের মনে থাকে তো তাই কি ভাবছে সেটা বোঝা যায় না।”
“সে কি মশাই, আপনি তো ডোবাবেন দেখছি। আপনার পেছনে এত টাকা ইনভেস্ট করলাম।”
“হ্যাঁ আমি তো চেষ্টায় আছি জঙ্গলের একমাত্র অধীশ্বর যেন আপনি হন। আর একটু ধৈর্য্য ধরুন।”
মিলির ওদের কথাবার্তায় গা রি রি করে ওঠে।
হঠাৎ করে সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করলে হবে না।
ওখান থেকে সোজা বাড়ি চলে যায় ও। ফ্রেশ হয়ে একটা বদলির আবেদন করে। যতদিন এখানে আছে সবাইকে সতর্ক করে দিতে হবে, ওখানে যাতে ওরা বিশেষ করে রাতের পাহারা জোরদার করে। ঈশানের ওপর ঘেন্নায় মনটা বিষিয়ে আছে, বাড়িতে বললে শীলাবতী হয়ত মেয়ের সংসার বাঁচানোর জন্য সব কিছু মেনে নেওয়ার কথা বলতে পারে। উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সেদিনে ঈশানদের সব কথোপকথনের ভিডিও তুলে হেড অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। সাথে নিয়েছে নিজের পুলিশ প্রোটেকশন।
অ্যাডভোকেট বান্ধবী বিদিশাকে মেইল করে ডিভোর্স পেপারও আনিয়ে রেখেছে। পরদিন ঈশান উদ্ভ্রান্তের মতো বাংলোয় ফিরে উত্তেজিত হয়ে বলল-
“কেউ আমার পেছনে লেগেছে মনে হয়,ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে, কিছুদিন ছুটিতে যেতে বলা হয়েছে।
পরে অন্য কোন জায়গায় বদলি হবে। তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?”
” তোমার ওটা ছুটি নয়, সম্ভবত সাসপেনশন হবে।”
“তুমি এত নিশ্চিত হোচ্ছ কিভাবে?’
“কারণ আমার হাতে সব প্রমাণ আছে,তোমার জঙ্গল প্রেমের নাটকটা আর ধোপে টিকবে না।”
“মানে?”
“মানে তুমি আমার জীবন থেকেও বদলি হয়ে গেছ।
চাইলে এখনই ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে পার। নাহলে বাড়িতে চিঠি যাবে।”
“তুমি..তুমি আমাকে..”
“আর নাটক করতে হবে না, বিট অফিসে ঐ হরিপ্রসন্ন
মজুমদারের সঙ্গে তোমার সব কথা আমি শুনেছি।”
“ইউ..ইউ..বিচ, আমি তোমাকে..”
গণ্ডগোল শুনে পুলিশ ইনস্পেকটর শুভরঞ্জন তখন ঘরের ভেতরে-
“ম্যাডাম কী করব?”
“যা ভাল বুঝবেন করবেন, সঙ্গে ফিজিক্যাল অ্যাসাল্টের কথাও রিপোর্টে জুড়ে দেবেন।”
শুভরঞ্জন ঈশানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে মিলি
হড়কা বাহাদুরকে ডেকে নেয়। হড়কা-“ম্যাডাম জী আজ আপনি নাইট ভিজিটে যাবেন?”
“হ্যাঁ বাহাদুর অনেকদিন রাতের জঙ্গল দেখা হয় নি,
ওখানে গেলে একটু শান্তি পাব, তুমি জিপ রেডি কর,
আমি আসছি।”
মিলির উদ্ভ্রান্ত মন জিপের গতিকেও হার মানাচ্ছিল। শুরু থেকে ঈশানের ব্যবহারের সঙ্গে ওর এই কদর্য চেহারাটা মেলাতে পারছিল না। বাড়িতে মা-বাবার প্রতিক্রিয়া কী হবে তাই নিয়ে চিন্তা হচ্ছে ওর। হেডঅফিস থেকে সব ইনস্পেকশান শেষ হলে
ও একবার বাড়ি যাবে ঠিক করল। সামনাসামনি বাবা-মাকে সবটা বুঝিয়ে বলবে। ভাবনার ঘোর কাটে হঠাৎ,ওটা কী গাড়ির সামনে? হেডলাইটের আলোয় কোন আহত বন্যপশু মনে হচ্ছে। হড়কা বাহাদুরকে নামতে বলে মিলি নিজেও নেমে পড়ে জিপ থেকে। হঠাৎ থাবার আঘাত পেড়ে ফেলল মিলিকে। হড়কা বাহাদুর ভয়ে পালাচ্ছে। থাবার ভেতর থেকে আনত ছুরির ঘায়ে মিলি রক্তাক্ত হয়ে বুঝতে পারল ও শত্রুর পেতে রাখা ফাঁদে পড়েছে।ও মরে যাওয়া মানে তো সব প্রমাণ লোপাট হয়ে যাওয়া। বরাহের ছদ্মবেশের আড়াল থেকে গর্জে উঠল বন্দুক। এ ফোঁড় ও ফোঁড় হয়ে থেমে গেল সব প্রতিবাদী চেষ্টা। সকালে সবাই আবিস্কার করল এক সৎ সাহসী রেঞ্জারের দেহ। ঈশান পুলিশ কাস্টোডি থেকে এসে অনেক মায়া কান্না কাঁদল। হরিপ্রসন্নের বিরুদ্ধে প্রমাণগুলো আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তবে এরপর ঐ জঙ্গল এক অলিক মায়ায় আচ্ছন্ন হল।জঙ্গলে কোন অসৎ উদ্দেশ্যে আসা লোকেরা সহজে নিস্কৃতি পায় না,হয় মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে বা বজ্রপাতে মারা যায়। হরিপ্রসন্নের অবৈধ চোরাচালান হাজার ঘুষের ব্যবহারেও লাটে উঠেছে। ঈশান বড় উকিল লাগিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার তালে ছিল,কিন্তু ছাড়া পাওয়ার আগের দিনেই জেলে কুঠরির মধ্যে ওর হার্ট অ্যাটাক হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা ছিল আকস্মিক ভয় পাওয়াই মৃত্যুর কারণ। শিলাবতী আর ওনার স্বামী
মিলির বন বাংলোয় এসে হড়কা বাহাদুরের থেকে সব শুনেছে। ঈশানকে জামাই হিসেবে নির্বাচন করা যে কত ভুল ছিল তা সব হারিয়ে ওনারা বুঝতে পেরেছেন।বনদপ্তর থেকে মিলির বন বাংলো ফাঁকা করার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু নতুন রেঞ্জাররা কেউ টিকতে পারে না ওখানে। কেউ শোনে মাঝরাতে হাসির শব্দ, কেউ বা পায় অঝোরে কান্নার শব্দ। কখনো বা মাঝরাতে কেউ জিপগাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে ঘরে আলোর বাতি ঘুরে বেড়ায়,ঘাড়ের কাছে কারো নিশ্বাস পড়ে। এইভাবে
বন রক্ষার শপথ মিলির অতৃপ্ত আত্মাও রাখতে
চেষ্টা করে। শুধু হড়কা মাঝে মাঝে অলিখিত নির্দেশ শোনে। ফুল্লরাদের বস্তি কিন্তু মিলিকে ভোলে নি।
ওরাই ওর জন্মদিন, মৃত্যু দিন পালন করে। মিলিকে বনবিবি জ্ঞানে পূজো করে,বটগাছ তলায় মিলির নাম নিয়ে মানত করে,পূজো দেয়।
এক অসাধারণ মানবী এখন ঐ সমস্ত গ্রামের জাগ্রত দেবী,ওদের সুখ-দুঃখের পাহারাদার। ওর নাম,ওর মিথ জড়িয়ে গেছে ওর কর্মস্থলের সঙ্গে এক আশ্চর্য পরিবেশ প্রহরী হয়ে।