গল্পেরা জোনাকি তে সুদীপা বর্মণ রায়

ভালোবাসা জিন্দাবাদ
ভারী ব্যাগটা নিয়ে হাঁটছে রিমা।মা বারবার বললো যে,আজ অন্তত গাড়িটা নিয়ে যা।কিন্তু রিমা রাজী হয়নি।
মায়ের গাল টা টিপে বলেছে,”আমার সোনা মা টা।এত ভেবো না আমায় নিয়ে,আমি ঠিক হেঁটেই যেতে পারবো।”
মা তবু চেষ্টা করে, আজ অন্তত বাপী গাড়ি করে ছেড়ে আসুক।
রিমা-না মা,বাপীর আজ বড় বিজনেস মিট আছে।আর আমি কি ছোট্ট টা আছি?
মা-তবে,দাভাই যাক,গাড়ি করে ছেড়েই চলে আসবে।কথা দিচ্ছি ও থাকবে না তোর সাথে।
সাথে সাথে দাভাই ও তৈরি।আসলে,রিমা দেবী কে সবাই চোখে হারায় যে।
দাভাই-চল, বনু,আজ একটু ঘোরা ও হয়ে যাবে।
রিমা-দাভাই,ফালতু কথা কম বক,তোর কিন্তু আজ প্রোজেক্ট সাবমিট ।রেডি হ।
আর তোমরা মা ছেলে থামো, সব জায়গায় গাড়ি যায় না।আমি হেঁটেই যাবো।
মেয়ের জেদের কাছে মা,দাদা হার মেনেছে বহু বছর।শুধু বাপী চা খেতে খেতে হাসে আর বলে, সাবধানে যাবি মা,আর ঠিক সময়ে খাবি।
রিমা-ইয়েস বস,আর তুমি ঠিক করে মিটিং করবে।
মেয়ে চুমু দেয় বাপের দুগালে।বাপী মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে রাখে একমিনিট।
মা ব্যালকনি থেকে দেখে ,মেয়ে ভারী ব্যাগ দুটো টানতে টানতে রাস্তা পেরিয়ে গেলো।
আসলে ,সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে,রাস্তাঘাট অল্পবিস্তর কাদা জমা জলে ভর্তি।
তবুও রিমা,শীত গ্রীষ্ম বর্ষা ছুটবে ভালোবাসার টানে।
যা সে পেয়েছে শৈশব থেকে তা অল্প হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
টুকটুক করে পৌঁছে গেছে রিমা।গন্তব্য দেখা যাচ্ছে।জমজমাট জায়গা টা শুনশান। তবে আসবে এখনই ভালোবাসা ।ঠিক জানে রিমা আসবে।অপেক্ষা তো থাকবেই দু তরফে।
রিমা ব্যাগ থেকে মোটা চাদর টা পেতে ফেলে।
একটি দুটি ফুটছে ফুল—ওই আসছে হেঁটে ভালোবাসার দল।
মতি, যদু, সাজিদ,অনু,টুসি, রফিক,আসলাম,পিটার, জ্যাক জমা হচ্ছে রিমার চারপাশে।
চোখে পিচুটি, নাকে শিকনি, মুখে গত রাতের কালিঝুলি।কিন্তু পাঁকে পদ্মের মত সুন্দর।
রিমা সবার হাতে গুঁড়ো মাজন দেয়, বলে, যে খেয়ে নেবে সে বিস্কুট পাবে না।
আগে না মেজে খেয়ে নিত চেটে।এখন বকুনিতে আর খায় না।
সবাই দাঁত মেজে স্টেশন এর কলে মুখ ধুয়ে ফিট বাবু।আরে লোকাল ট্রেন বন্ধ।স্টেশন যাদের ঘরবাড়ি তারা কোথায় যাবে?তাই,,,,
এবার রিমা ব্যাগ থেকে বিস্কুট বার করে দেয় সবার হাতে হাতে।
সবচেয়ে ছোট পিটার বলে ,দিদিমণি লুতি দে( রুটি আরকি!)।
রিমা -আগে অ আ ,পরে রুটি।
ব্যাগ থেকে বেরোয় সবার আলাদা আলাদা ক্লাসের বই।সব রিমার কাছেই থাকে।রোজ আনতে হয় ,কি করবে !
এদের বাপ মা কোনো খোঁজ রাখে বা রাখে না। তাই রিমাই বই খাতা নিজের কাছে রাখে।যা হয় তাতেই পড়াশোনা।
তবে খালিপেটে পড়া হয় না,কেউ আসতো না।তাই বিস্কুট,আর টিফিনে বয়স অনুযায়ী রুটি তরকারি বরাদ্দ।পড়া ভালো করলে সে একটা মিষ্টি পায়,অন্যরা তাকিয়ে দেখলেও দেয় না রিমা।পরের দিন সে চেষ্টা করে মিষ্টির লোভে।
পড়াশোনা করিয়ে সব গুছিয়ে নিয়ে ফিরে যায় বাড়ি ।পরের দিন আবার,,,
এভাবেই চলছে।বাড়িতে গিয়ে দেখে মা অপেক্ষায়।
তার মনে পড়ে যায়,সে ও ছিল এই স্টেশন এই।প্রচন্ড জ্বরে কাঁদছিলো একাই।চার বছরের শিশুকে ফেলে তার নিজের মা পালিয়েছে, পেটের ধান্দায়।
যশোদা মা কোনো কাজে গেছিল ওখানে, খোঁজ খবর করে কেউ ভার না নেওয়ায় নিয়ে আসে নিজের বাড়ি।ছেলে তখন ক্লাস এইট।স্বামী ও পুত্রের সাথে আলোচনায় স্থানীয় থানা কে জানিয়ে, বুক দিয়ে মানুষ করে তোলে রিমা কে।
আঠারো বছর বয়সে তিনজন বসে একসাথে রিমা কে সব জানিয়ে দেয়।
প্রথমে একটু আঘাত পায় রিমা কিন্তু
যেই মনে পড়ে ,ছোট থেকে বাপী,মা,দাভাই শুধু তাকেই প্রাণ দিয়ে আগলাত ,তখন আর কিছু মনে থাকে না তার।
পরদিন থেকে শুরু হয়,স্টেশন এর বাচ্ছাদের জড়ো করে পড়ানো।ন্যূনতম পরিষ্কার পরিছন্নতা শেখানো।
অনেক বাধা এসেছে,সে আর নতুন কি?
কিন্তু মা ,বাপী ,দাভাই সাহস জুগিয়েছে।বলেছে—-শিকড় ভুলতে নেই।নিজে উঠতে পারলে আরো কয়েকজন কে টেনে তুলতে হয়।
তাই রিমা দিদিমণির স্কুল চলছে,সব নিয়ম মেনেই।কারণ–পেট সবচেয়ে বড় অসুখ।
ভালোবাসা জিন্দাবাদ।