সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩১)

রেকারিং ডেসিমাল

দাদু আদরের নাতি ছুটি নিয়ে আছে দেখে আহ্লাদিত হন।
বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নাতির কাঁধে হাত রাখেন আড্ডার ইচ্ছেতে।
আরে কি করলিটা এত দিনে , হ্যাঁ ?
কুলীনের ছেলে আরেকটা বউ ত অন্তত জোগাড় করবি ? এই একখান আধ হাত বউ নিয়ে বসে আছিস? আমার বাবা অব্ধি দুটো অন্তত বউ বিয়া করেছেন। তুই নাকি ভালো চাকরি করছিস, তা তার কোন চিহ্নই ত দেখিনা।
সত্যি কথাই। দাদুর বাবার দুটি স্ত্রী ছিল। দাদু মাকে দেখেননি। সৎ মাকেই দেখেছেন।
বাবা মা কাউকেই পাননি কাছে ছোট বেলায়। আগের পক্ষের ছেলেদের কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বাপ বড় ছেলের সঙ্গে।
সবার বড় ছেলে বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসে কলকাতার পুলিশে চাকরি নিয়ে কোয়ার্টারের বন্দোবস্ত করেছিল আগে।
তার কাছে গোখেল রোডের কোয়ার্টারেই দাদু বড় হয়েছেন। ইংরেজি শিখেছেন গোরা পুলিশদের কাছে।
উপস্থিত বুদ্ধি আর পরিশ্রম করার অদম্য ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নিজের একটুকরো জমি কিনে ছিলেন অনাদরে বেড়ে ওঠা মানুষটি।
এমন পাত্রের জন্য ত আর কেউ আদরের মেয়ে দেবে না।
মামাবাড়িতে মামার দয়ায় বড় হওয়া ভাগ্নীকে বউ করে নিয়ে আসতে বলেছিল বরিশালের গ্রামের পরিচিত আত্মীয়।
দুই বাপ মায়ের আদর ছাড়া বড় হয়ে ওঠা মানুষ নিজেদের লড়াকু মানসিকতার গাঁটছড়া বেঁধে জীবনযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল সেই থেকে।
অপরিসীম পরিশ্রম করেছেন দু জনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। একজন বাইরে। একজন ঘরে।
গোখেল রোডের কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে কাছে শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিটে বাড়ি ভাড়া নিয়ে প্রথম নিজস্ব সংসার। ইতিমধ্যে দুই মেয়ে আর প্রথম ছেলে হয়ে গেছে।
এগারো মাসের মাথায় দু নম্বর ছেলে।
ডাক্তার নাতবউ ভাবে, শুধু মাত্র জন্ম নিরোধক কন্ট্রাসেপটিভ কোন পদ্ধতি হাতে নেই বলে মানবী জীবনের ওপর কি ভয়ানক চাপ। তার হাসি, কথা, আনন্দ, সৃষ্টিশীলতা, সুর, ছবি ; সব সব চাপা পড়ে আছে শুধু সন্তান ধারনের তলায়।
কুর্নিশ জানায় আধুনিক নারী এই অদম্য মানুষদের যারা এর মধ্যেও অজস্র কোলাহল করে প্রতিদিন হেসেছে। সুন্দর আলপনা দিয়ে ঘর সাজিয়েছে নান্দনিক ভাবে। সামান্য অর্থের জিনিসপত্র কিনে হাতের গুণে স্বাস্থ্যসম্মত কিন্তু সুস্বাদু খাদ্য তৈরি করে বাড়ি ভর্তি সন্তান আর স্বামীকে পাথরের মত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে জীবন যুদ্ধে জিতে আসার উৎসাহ দিয়ে চলেছে অনবরত।
দিদার নয়টি সন্তান। যেমন চেহারা তেমনি স্বাস্থ্য।
আশি বছরের পরেও এদের মায়ের প্রাণশক্তিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে একালিনী।
ভাবে আমেরিকার পায়োনিয়ার মেয়েদের নিয়ে কত নভেল উপন্যাস, আমাদের মানুষীরা তাদের চেয়ে কম হল কিসে ?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।