এক মাসের গল্পে সুপর্ণা বোস (অন্তিম পর্ব)

চাঁদেরকণা
ঘুম ভেঙে গেল।রাত্রি পৌনে একটা। অসহ্য রকমের গলা শুকিয়ে গেছে অথচ হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা নিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে না মিলির।স্বপ্নটা এখনো চোখের পাতার তলায় সেডিমেন্টের মত বসে রয়েছে।তেমন ভয়াবহ কিছু নয় যাকে দুঃস্বপ্ন বলা যেতে পারে।বরং অদ্ভুত একটা আরাম দেয়। এই স্বপ্নটা সে আগেও দু একবার দেখেছে ।স্বপ্নে নিজেকে কিশোরীবেলার রূপে দেখে।আকাশি রঙের ফ্রকটা সত্যিই ছিল তার।মেঘলা আকাশ মাথার ওপর।ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।যতদূর চোখে দেখা যায় সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ।সেই মাঠের ওপর দিয়ে মনের আনন্দে দৌড়োচ্ছে মিলি।হাওয়ায় উড়ছে তার চুল আর ফ্রকের প্রান্ত।হঠাৎ পড়ে গেল ঘাসের ভিতর লুকোনো এক গর্তে।সেখান থেকে সে বেরতে পারছে না আর। ঠিক তখুনি রোদেলা হাসি নিয়ে সোনা এসে দাঁড়াল।এখনকার সোনা।ঠোঁটের ওপর হাল্কা গোঁফের আভাস।একমাথা চুল।কপালের দুপাশটা একটু চাপা মত। সোনা?
সে বুঝি সত্যিই ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে! সত্যিই তো যেন পিঠোপিঠি বড় হল মা আর ছেলে।
মিলি উঠে বসল বিছানায় । একটু জল খেয়ে সোনার ঘরের দিকে দু পা এগিয়ে গিয়ে মনে পড়ল, সোনা তো নেই আজ!গতকাল অর্ণব এসেছে জয়পুর থেকে।উঠেছে নিজের বাবা মায়ের ঘরে।সেখানেই ডেকে নিয়েছে সোনাকে। এখানেও উঠতে পারত।এই ঘর কি তারও নয়? আসলে ঘর বলে কিছু হয় না।যেটা হয় সেটা বাড়ি।ইঁট কাঠ পাথরের তৈরি। ঘর থাকে মানুষের মনের ভিতর।সে ঠিক ঘর ও না। গুহা।ভালবাসার গুহা।হৃদয় কেটে বানানো।অর্ণব হয়ত এই গুহাকে ভয় পাচ্ছে।আগামিকাল মিলির সঙ্গে কোর্টে দেখা হবে।তার আগে প্রয়োজনীয় কথা হয়ে গেছে ফোনে।সোনার সঙ্গে দুটো দিন কাটাতে চায় অর্ণব।মিলি জানে, অর্ণব তার সঙ্গেও দুটো দিন কাটাতে চায়।কিন্তু সেটুকু চাওয়ার অধিকার সে নিজেই নিজের কাছে হারিয়ে ফেলেছে হয়ত।
চাইলে কিন্তু মিলি অরাজী হতো না।সামান্য আইনের কলম কখনো সম্পর্ককে বাঁধতে অথবা কাটতে পারে না।সম্পর্ক আসলে কন্দমূলের মত অস্তিত্বের গভীরে থেকেই যায়।
নাহ্ আর ঘুম আসবে না।মিলি বেসিনের ট্যাপ খুলে একটু ঘাড়ে গলায় জল দিল।ইদানিং চোখটাও ড্রাই হয়ে যাচ্ছে।চোখে দুফোঁটা ড্রপ দিতে হবে।মিলি কি ভেতরে ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে?কিন্তু তার সমগ্র জীবনীশক্তি ‘প্রস্ফুটনে’ই ঢেলে দিয়ে সে সুখী।এই ফুলবাগানের মালি সে।এই তার প্যারাডাইস। মিলি জানে ভালবাসতে বাসতে একসময় নিজের ভিতরেই আলো জ্বলে ওঠে।অভিযোগের তর্জনী তখন আর অন্যের দিকে থাকে না।নিজের খামতিগুলোও দেখতে শেখে মানুষ।আলো তার উৎস থেকে বিস্তারিত হয়ে আবার উৎসে ফিরে আসে। যেন নিজের থেকে সরে গিয়ে নিজের কাছেই ফিরে আসা।একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়।
ভালবাসা বড় জরুরী অনুভব।তলিয়ে থাকা নিজের ভিতর থেকে ডুবুরির মত নিজেকে তুলে আনা যায়।অন্যদিকে ভালবাসাই সেই বস্তু যার মধ্যে নিজেকে পুরোপুরি গলিয়ে মিশিয়েও দেওয়া যায়। জীবনের অনেকটা পথ জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর দিয়ে হেঁটেছে মিলি।এতদিনে কি তবে মাসলো সাহেবের পিরামিডের শিখরবিন্দুতে পৌঁচেছে?একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নিজের জন্যে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যে যা সে করতে পারত, যতটুকু করতে পারত সে কি করতে পেরেছে?ওশো রজনীশের একটা কথা মনে পড়ে গেল মিলির “Christ is the actualized Adam.” মিলিই বোধহয় সেই একচুয়ালাইজড আদম।সোনা পৃথিবীতে না এলে যা সম্পন্ন হতো না।সোনা তার কাজ করার প্রেরণা।
‘জীবন এক টলটলে জল দিঘি।সেখানে ঢলঢলে চাঁদ ভাসে।তুমি সেই জল তোলপাড় করে ডাঙায় উঠলেও শূন্য হাতেই উঠবে।একদিন তুমি নিজেই বুঝবে যে চাঁদকে করতলে ধরার জন্যে তুমি বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ছ সেটা আসলে চাঁদের প্রচ্ছায়া।’তোমার হাতের মুঠো আপনি যাবে খুলে।বন্ধ হবে না।যাকিছু তোমার আছে তা কেবল আঁত্মজের জন্যেই নয়, এমন আরো অনেকের জন্যে বর্ষিত হবে অকাতরে।
মিলি তার চেয়ারে ফিরল।নতুন বাচ্চাদের কেসহিস্ট্রিগুলো দেখে নিতে হবে।ওপরের পাঁশুটে রঙের ফাইলটা খুলে ফেলে মিলি।রক্তিম সামন্ত।বয়স সাত।অনেকগুলি ডোমেইন নিয়ে কাজ করতে হবে।তাছাড়া তো হোলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট সম্ভবও নয়।খেলাধুলার মাধ্যমে কিছু ইনোভেটিভ অ্যাক্টিভিটি প্রোগ্রাম রেডি করতে হবে।বিষয়টা ভীষণভাবেই সাবজেক্টিভ।শিশুর সামগ্রিক ডেভেলপমেন্টের জন্যে খেলাধুলার বিকল্প হয় না।সেই ছোট্টবেলায় টুকিটুকি খেলা দিয়ে শুরু হয় অবজেক্ট পারমানেন্সের ধারণা।যা এই মুহূর্তে চোখের সামনে নেই তা কোথাও না কোথাও আছে! তার একটা মনছবি গড়ে ওঠে শিশুর মধ্যে।অটিস্টিক বাচ্চারা এই খেলা খেলতে পারে না।মিলির হঠাৎ মনে হয়, শিশুকালের এই অবজেক্ট পারমানেন্সের ধারণাই যেন বড়মানুষের জন্মান্তরবাদের ধারণার সূক্ষ্মতম রূপ।মানুষের জীবন থেকে যাকিছু হারিয়ে যায় তা কোথাও না কোথাও কোনো না কোনোভাবে থেকেই যায়।ছবি, স্মৃতি অথবা ছায়া হয়ে।
ছোটছোট বাচ্চাদের ওপর কত শাসন মা বাবার।এটা করবে না ওটা করবে না।পরীক্ষায় এক নম্বর ছেড়ে এলে কেন?আরো কতকিছু।মিলি কিছুই চায়নি সোনার কাছে।সে যে চোখের সামনে আছে এই অনেক। সামান্য কিছু করলেও মিলির আনন্দে বুক ভরে ওঠে।ডিজেবিলিটি নয়।মিলি স্ট্রেইন্থ খোঁজে।আছে।কিছু তো নিশ্চয়ই আছে।না হলে প্রকৃতি নিজেই সরিয়ে দিত।মিলি সোনাকে ছেড়ে কখনো থাকেনি।মনকেমন করছে।যদিও মিলি জানে বাবার কাছে সে ভালই থাকবে।হয়ত ছোটবেলার মত অর্ণবের গায়ে পা তুলে শুয়ে ঘুমুচ্ছে ছেলে।মিলি কি কখনো আর আপদে বিপদে সুখে দুখে অর্ণবকে ডাকতে পারবে?অর্ণবও আর কখনো বলবে না, ‘ কতদিন তুমি আর আমাকে আদর করো না মিলু।আমি যে আছি তোমার জীবনে তাইই বুঝি ভুলে গেছ তুমি’! এই গভীররাতের একলা ঘরে হঠাৎই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মিলি।ক্রমশ কান্নার বেগ বাড়তে থাকে।এক সময় স্তিমিত হয়ে আসে। পূব আকাশে তখন লালিমা দেখা দিয়েছে।।
সমাপ্ত