সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সাহানা ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ৪)

অস্ত্রদান – একটি কাল্পনিক কথা

পর্ব ৪ – পদ্ম

নিউ্জার্সির এই মন্দিরটা সাদা, অনেকখানি জায়গা জুড়ে। মন্দিরের দিকে দিকে দেব-দেবীপ্রতিমা, দুর্গাও আছেন। জগৎজুড়ে বাঙালি পুজো করে। মায়ের মন সবই বোঝে, একবার অল্প সময়ের জন্য হলেও সব জায়গায় মুখ না দেখলে চলে? তাই মা দুর্গা ষষ্ঠী-সপ্তমী ভারত-বাংলাদেশের পুজোর হাজিরা সেরে প্রতিবছর নিউ জার্সিতে এসে এদের পুজোর অষ্টমীর অনুষ্ঠান শোনেন। এবছর লকডাউন, জুমে অনুষ্ঠান। মন্দিরে বসে মা আজও শুনছেন ল্যাপটপে – কচি গলার রিনরিনে আওয়াজে বিদেশে জন্মে বেড়ে ওঠা বছর দশেকের এই বঙ্গ-ছানার আবৃত্তি।
“বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা। আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।”
মায়ের মনে পড়লো বাচ্ছাটির গলায় গতবছরও শুনেছে স্পষ্ট বাংলা কথা। গতবছর লকডাউন ছিলোনা, ওর মা-বাবা আর মাসীর সঙ্গে অঞ্জলি দিতে এসেছিলো ও, মাসী ওকে রনি বলে ডাকলো! অবাক হয়ে মা দুর্গা শুনেছিলেন রনি স্পষ্ট বাংলায় উত্তর দিয়েছিলো মাসীকে। এমনকি ডাকটাও ‘আন্টি’ না, ‘মাসী’। অবাক হবার পালা মায়ের! যে দেশে ইংরেজি ছাড়া মানুষ বাঁচবেই না, সেখানে এমন কট্টর বাঙালিয়ানা! চাইলে তবে পারা যায়, নিজের দেশেও ভাষা ভুলতে, আর পরবাসেও ভাষায় বাঁচতে!
মনে পড়ছিলো গতবারের পুজোর দিনের কথা। কিছুকিছু বাঙালী ছেলেমেয়েদের প্রানপণ পাশ্চাত্য পোশাক ও ইংরাজীর ব্যবহার পুজোপ্যান্ডেলেও চোখে লেগেছিলো মায়ের। প্যান্ডেলের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মায়ের মনে পড়লো ষষ্ঠীর দিন খড়্গপুরের এক পুজোয় আই.আই.টি-র দুই ছাত্রীর কথোপকথন। ওরা নিজেদের হোস্টেল নিয়ে কথা বলছিলো! কথায় কথায় উঠে আসে আই.আই.টি-র মতন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানেও মেয়েদের আর ছেলেদের হোস্টেলের সংখ্যার কথা। গুনলেই আন্দাজ করা যায় – মেয়েরা বোধহয় এখনও উচ্চশিক্ষার অঙ্গনটা ছুঁতেই পারেনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে! এদিকে ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে মাথা তো ঠোকে ওই সরস্বতীর পায়ে! অন্যবারে নানান তালে থেকে ভুলে যান মা, আজ তো ভিড়ভাট্টা নেই, এই সুযোগে কৌতূহলে বিষয়টা খতিয়ে দেখার জন্যই মা রাতে অনুষ্ঠান শেষে সবাই চলে যাওয়ার পরে জনান্তিকে সরস্বতীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন
– “কি রে মা, গতবছর খড়্গপুরের পুজোয় ওই মেয়েগুলো বলছিলো যে মেয়েদের হোস্টেল এতো কম, কেন রে মা? মেয়েদের শিক্ষার কি হাল এখন?”
– “এদেশে বলছো মা? তুমি বিদেশে গিয়ে দেখো! সারা দুনিয়া জুড়ে মেয়েদের শিক্ষার গ্রাফ আজও ছেলেদের চেয়ে পিছিয়ে”
– “কিন্তু কেন রে মা! এই যে গতবছর অভিজিত বাঁড়ুজ্জের বৌকে নিয়ে কত লেখালেখি হলো, সে তো বিদেশী মেয়ে! এই যে এতো এতো মেয়ের নাম শুনি দিকে দিকে খবরের কাগজে!”
– “মা গো! ঘরে ঘরে আজও কত মা, কত কাকিমা গৃহবধূ! তাদের দিনের পর দিনের সাংসারিক কাজের হিসেব কেউ রাখে না যে মা! এখনো বাড়িতে ‘কাজের মাসী’র সংখ্যা অনেক বেশি, ‘কাজের লোক’ কম। তাদের তেলেই সংসারের চাকা মসৃন ঘোরে অবিরাম। ডিগ্রী খুঁজতে গিয়ে দেখো, এসব বিচক্ষণ বুদ্ধিমতীদের সারাদিন কেটে যায় শুধুই সাংসারিক-রাজনীতিতে আর ছেলেপুলে মানুষ করতে”
– “কি বলিস রে মা?”
– “ঠিক বলছি মা গো! এখনো গ্রামে বাচ্ছা মেয়ে ঋতুমতী হলেই পড়াশোনার বদলে রুটি বেলা শেখানো হয়”
– “কিন্তু রুটি বেলাও তো শিখতে লাগে রে মা, তুই যে এতো সুন্দর রুটি বানাস”
ঝলমলিয়ে হেসে সরস্বতী বললেন
– “শুধু রুটি? চতুরানন জামাই তোমার, তার চার মুখে যে কত খাইখাই সারাদিন! সব শিখে গেলাম এই করে। রুটি শুধু কেন মা গো? রান্না যে কত বড় শিল্প, তা আজ সারা পৃথিবী জুড়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে! কিন্তু ক’জন বাড়ির বৌ রান্নাকে শিল্প বা ব্যবসার কাজে লাগাতে পেরেছে মা? বেশিরভাগ শেফ পুরুষ, মহিলা কোথায়! অথচ করতে গেলে যে কি করা যায়! আর শুধু কি রান্না? তা ছাড়াও মেয়েরা পদেপদে বাধা পায় সব জায়গায়! দাদা বা ভাইয়ের পড়ার খরচ চালানোর জন্য বোনের পড়া বন্ধ – এ কি দেখোনি আগে মা?”
– “দেখেছি, কিন্তু যুগ বদলাচ্ছে, দিকে দিকে এতো নারী স্বাধীনতা নারী শিক্ষার কথা শুনি …..”
– “পুরোনো বোতলে নতুন মদ, মা! কালকের চেয়ে আজ হয়তো মেয়েদের শিক্ষার হার একটু বেশি, কিন্তু তাই বলে নারী-পুরুষ সমান-সমান হয়ে ঘর-বাইরে দশহাতে সামলাবে – এসব দিন আসতে এখনো অনেক অনেক বছর বাকি। এর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে একটা সম্প্রদায় – অর্ধশিক্ষিত বা ছদ্মশিক্ষিত সম্প্রদায়”
– “সেকি! তাহলে বলতে চাস শিক্ষিতের ছদ্মবেশ?”
– “ভয়াবহ ছদ্মবেশ! এরা কিছুদূর শিক্ষা পেয়ে বাড়ি ছেড়ে বাইরে যেতে শিখে বাইরের মন্দগুলো দেখছে! ভালো-মন্দ তফাৎ করার ক্ষমতা তৈরী হয়নি, কারণ তার জন্য যে জ্ঞান দরকার তা তো তৈরী হয়নি এখনো! অতএব এরা বাইরে চাকরি করবে, তারপর বাড়ি এসে পরনিন্দা-পরচর্চা-হিপোক্রিসিতে ডুববে। এরা রোজগারও করবে, ওদিকে সামান্যতম উচ্চ মননশীলতার অধিকারিণী সহকর্মিনীকে নির্বিচারে নিন্দা করবে, তার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে নিয়ে নোংরা শব্দ ব্যবহার করবে! এমন ইঙ্গিত আসবে যেন মেয়েটি শুধুমাত্র নারীশরীরটুকুর অধিকারিণী বলেই কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করছে। বলো তো মা, মেয়েরা যদি মেয়েদের এমনধারা শত্রু হতে থাকে, তাহলে তারা এগোবেই বা কিকরে, জ্ঞানলাভ করবেই বা কিকরে?”
– “তাহলে বলছিস নারীশিক্ষার হার এই জন্য এতো কম? তার গোড়ায় গলদ বিবেচনার অভাব?”
– “জ্ঞানের অভাব, মা গো! শিক্ষার অভাব নয়! শিক্ষা বা ডিগ্রি দিয়ে কি জ্ঞান আসে? চেতনা হয়?”
চিন্তায় পড়লেন মা। সরস্বতীর কথাগুলো ফেলে দেয়া যায় না। ইতিমধ্যে জুমে শুরু হয়েছে আরো একটি অন্য অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হচ্ছে লন্ডন থেকে। সুন্দরী সঞ্চালিকা লন্ডনে থাকে, ওখানেই কর্ম ও সংসার। মেয়েটি স্পষ্ট বাংলায় পাঠ করে চলেছে বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রবর্তনের ইতিহাসের ওপর স্বরচিত স্ক্রিপ্ট, সম্পূর্ণটা বাংলায় লেখা। শুনতে শুনতে হঠাৎ খেয়াল হলো – মেয়েটি মিলি, তাই না? কোথায় দেখেছেন ভাবতে ভাবতে মা দুর্গার মনে পড়লো, ছোট্ট মিলিকে তিনি জার্মানির পুজোয় আবৃত্তি করতে দেখেছেন! ছবির মতো মনে পড়তে লাগলো চোখের সামনে জার্মানিতে জন্ম ও শিক্ষা পাওয়া মেয়েটির বেড়ে ওঠা! এতো সুন্দর বাংলা বলা? এতো সুন্দর লেখা? মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠলো সরস্বতীর বলা শেষ কথাগুলো – শিক্ষা বা ডিগ্রি দিয়ে কি জ্ঞান হয়? নাঃ, সত্যিই হয়না।.দেশেই হোক বা সুদূর প্রবাসে, নিজের মনের মধ্যে নিজের সত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, বিদেশের সংস্কৃতিকে আয়ত্ত করার জন্য, হাজার রসালো পরনিন্দা-পরচর্চা-হিপোক্রিসির মাঝে মেরুদন্ড সোজা করে নিজের মর্যাদা ও বিবেচনাবোধকে ধরে রাখতে জ্ঞান দরকার, চেতনা দরকার।
চটকা ভাঙলো মন্দিরের দরজার শব্দে। প্রচুর সতর্কতা অবলম্বন করে এ বছরে দর্শনার্থীদের একজন একজন করে ভেতরে আসতে দেয়া হচ্ছে এ বছর। মিষ্টি গন্ধটা নাকে এলো মায়ের – পদ্মগন্ধ। কালকের বাচ্ছাটা এসেছে আজ, মুখ ঢাকা মাস্কে, কিন্তু সরল ভক্তিভরা চোখদুটো যাবে কোথায়? বাচ্চাটি এসে নিজের মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে নিখুঁত উচ্চারণে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলো, চোখ ভক্তিতে বন্ধ।
মায়ের দশহাতের একটিতে ধরা ব্রহ্মার দেওয়া অস্ত্র – জ্ঞানের প্রতীক এই পদ্ম। মা বুঝলেন, তিনি তাঁর অস্ত্রদানের লোক পেয়ে গেছেন।
(কবিতাঋণ – ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
কৃতজ্ঞতা – মিলি দি ও রনির প্রতি)।।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।