সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সাহানা ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ৬)
অস্ত্রদান – একটি কাল্পনিক কথা
পর্ব ৬ – ত্রিশূল
মনিপুরের বাঙালীদের আয়োজিত দুর্গাপুজোয় সাড়ম্বরে আজ নবমীর অনুষ্ঠান চলছে। অভিনীত হচ্ছে মনিপুররাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার কাহিনী। শিবের বরে বংশে ‘কভু পুত্রী জন্মিবে না’, তাই চিত্রাঙ্গদা হলেন বাহুবলী, অথচ কুরূপা। নারীর কুরূপ তাকে ব্যথিত করে। যারা অভিনয় করছে সেই কুরূপা-সুরূপা দুজনেই বড় মিষ্টি দেখতে দুই মেয়ে। কুরূপাকে কুরূপা সাজানোর জন্যই যেন পোশাকে ও প্রসাধনে পুরুষালি আরোপ। এরকম ধারণা কেন, সে প্রশ্ন এলো মা দুর্গার ধনুকনিন্দিত দুই ভ্রূতে। নারীর বল কি কেবল তার রূপে? কুরূপাকে সুরূপা হয়ে এক বছর ধরে রমণীয় আচরণ করে তবে পেতে হলো পরম পুরুষ? এ কেমন নারীশক্তি, যা কেবলমাত্র রূপ দিয়ে চিহ্নিত? কেন একজন বলশালী নারী কেবলমাত্র একজন মানুষ হিসাবে উত্তীর্ণ হতে পারেন না?
মা দুর্গা নিজে ভুবনমোহিনী রূপসী, দশপ্রহরণধারিনী শক্তিস্বরূপা। তিনি এই দ্বন্দ্বের মানেটাই ধরতে পারছেন না। কেন একজনকে রূপসী দেখানো হলে তাকে শক্তিশালী দেখানো যাবে না? বাহুবল আর নারীসুলভ কমনীয়তা তো পরস্পরবিরোধী নয়, তাহলে?
ওদিকে এই মনিপুরেরই অপর প্রান্তে কাঙাতেই বলে এক ছোট্ট গ্রামে এক অত্যন্ত গরীব ঘরের একটি আপাত মিষ্টিমুখের অধিকারিণী কিশোরী তখন সিংহের মতো বিক্রমে অভ্যাস করে চলেছে বক্সিংয়ের। বাবা ভাগচাষী, ঝুমচাষ থেকে সামান্য আয়, সংসারে টানাটানি। গরিব গৃহস্থঘরের বড়মেয়েটি ঘরের কাজ ইত্যাদি নারীসুলভ কমনীয়তা শিক্ষা করে বিবাহযোগ্য হয়ে উঠলে বাবামায়ের একটু সুবিধে হতো, কিন্তু তা হবার জো নেই। কিন্তু মেয়েটির যে ভীষণ লড়াইয়ের নেশা, এবং সে নেশা পাওয়া তার বাবার থেকেই। সংসারের চাপ এসে পড়ায় মেয়েটির জন্মের আগেই তার বাবার কুস্তি বন্ধ হয়ে যায়। তাই হয়তো বড়মেয়ের মধ্যে নিজের স্বপ্নকে বেঁচে উঠতে দেখতে চেয়েছিলেন বাবা। স্কুলের পড়া, বাবা-মায়ের কর্মক্ষেত্রে হাতেহাতে সাহায্যের পাশাপাশি লড়াকু মেয়েটি একটু একটু করে বেড়ে উঠছিলো। হিলহিলে দেহ স্প্রিঙের মতন নমনীয়, চিতার মতো ক্ষিপ্র। প্রাকটিসের কোর্টে কিশোরী মেরির লড়াই, জেদ দেখে মা দুর্গার মনে এক অদ্ভুত দোলাচল আজ। কিছু বছর আগে উজ্জ্বল হাস্যমুখী অন্ধ্রপ্রদেশের মেয়েটি, কর্নম মালেশ্বরীর পরে কেউ তো পারেনি এখনো অলিম্পিকের সম্মান আনতে! এ মেয়ের অদ্ভুত জেদ, অসাধারণ অধ্যাবসায় । পারবে কি, মনিপুরের এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা গরীব মেয়ে মেরি বক্সিংয়ে কোনো জায়গা করে নিতে? তাহলে কি সত্যিই মেয়েরা খেলাধুলোয় পিছিয়ে থাকে আদ্যিকালের চিত্রাঙ্গদার সুরূপ-কুরূপের দ্বন্দ্বে? রমণীকে কি সর্বদা রমণীয় হয়েই থাকতে হবে? রক্ষক পুরুষের এভাবে মেয়েরা কি চিরকাল ভক্ষক পুরুষের পাল্লায় পরেই শেষ হবে তবে? দুর্গা মা নিজের আলতা-নূপুরে সজ্জিত রাঙাচরণের দিকে তাকিয়ে আনমনা হলেন। কাল কেউ দেখেনি, কেউ জানে না নিয়তি কি লিখেছে ভারতীয় নারীদের জন্য। সত্যি কি শুধুমাত্র পুরুষকার দিয়ে সবটুকু জয় হয়?
সেদিন ভবিষ্যৎ দেখতে পেলে মা দুর্গার মনে তখন প্রশ্নগুলো হয়তো আসতো না। সেদিন মা দুর্গার নজরে পড়েনি আর কিছু বছর পরেই হরিয়ানার বাস কন্ডাক্টারের মেয়ে সাক্ষীকে বরণ করে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসার পর যখন পাড়ায় হইচই হবে, তখন ময়দানে খ্যাপা ষাঁড়ের মতো লড়ে অলিম্পিক ব্রোঞ্জ জিতে আনা মেয়েটারও চোখ ছল্ছলিয়ে উঠবে। পাঞ্জাবী ভাষায় যাকে বলে ‘মর্দাঙ্গি’ আর বাংলায় যাকে বলে লালিত্য তার বিরল মেলবন্ধন হবে সাক্ষীর রূপে। আরো কিছু পরে সিনেমার নায়িকাদের যেকোনো মুহূর্তে টক্কর দিতে পারার মতো রূপ এবং তাদেরকে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যাওয়ার মতন গুণের সমাহার সাইনা ও সিন্ধুর হাজার ওয়াটের হাসি টিভির পর্দায়, রাস্তার বড় বড় বিজ্ঞাপনের হোর্ডিঙ জুড়ে থাকবে। ভারতীয় আদর্শ নারীর রূপে বলিউড যখন করব চৌথ ব্রত করে, বাংলা সিরিয়াল যখন ‘পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য’ থিওরিতে বাড়ির বৌমাকে কাজের জায়গায় নাম-কে-ওয়াস্তা সাফল্যের সার্টিফিকেট ধরিয়ে দৈনন্দিন জীবনের রান্না-খাওয়া, শাশুড়ী-ননদের কূটকচাল, স্বামীর দু-চারটে পরকীয়ার পরেও সিঁথির সিঁদুরের অমূল্যতার জয়গান গাইতে বাধ্য করে, সে সময় নারী রোদে-ঝড়ে-জলে পুড়বে-ভাঙবে-ভিজবে, মাথা উঁচু করে চলবে, দিকে দিকে জয়গান গাইবে। মা দুর্গার ত্রিশূলের বহুমুখিতা, বৈচিত্র্য, শক্তি ও রাজকীয় রূপ একত্রিত হবে নারীর সৌন্দর্য্যে ও শক্তিতে। মা দুর্গা সেদিন জানতো না চিত্রাঙ্গদার সুরূপ-কুরূপ মিলেমিশে এক হয়ে যাবে। নারীর মধ্যে পুরুষের দেওয়া ভ্যালিডেশন বা প্রশংসাপত্রের খিদেটা চলে যাবে। নারী হয়ে উঠবে স্বয়ংসম্পূর্না, স্থির, শক্তিস্বরূপা মনোহারিণী – ত্রিশূলের মতো রূপসী।