T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় শান্তনু ভট্টাচার্য

স্বপ্নের উড়ান
“বুদন বুড়ি লো” –
“কি লো?”
“আমার শীত কচ্ছে লো” –
” তা আমি কি কোগ্গো লো?” –
শীতের সন্ধ্যায় ঠাকুমার আমাকে লেপের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে আদরের সংলাপ।
অথবা,
“খোঁজ, খোঁজ , কোথায় গেল উইচিংরেটা !”
দু বছর বয়সেই কখন গুটিগুটি পায়ে চম্পুদার মায়ের কাছে গিয়ে রান্নাঘরে পরম নিশ্চিন্তে বসে মাছ ভাজা খাওয়া।
আমাকে খুঁজে পাওয়া নয়, এ যেন ঠাকুমার একটা বড়সড়ো আবিষ্কার – তারপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচা ও তৎক্ষণাৎ কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে আদরে আমার নাভিশ্বাস।
ক্ষীণ হয়ে আসা স্মৃতির অন্তরাল থেকে সকালের সোনা রোদে, কখনো বৃষ্টি ভেজা দুপুরে বা পড়ন্ত বিকালে অথবা রাতের গভীরে উঁকি ঝুঁকি মারে ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলো।
স্নান সেরে সকালের নিত্য পুজোর পরে তুলসী তলায় জল দিতে গিয়ে হাঁক –
“কোথায় গেল ছোঁড়াটা ?”
“এইতো” বলে দৌড়ে এসে তুলসী তলায় প্রণাম করার সময় টপ্ করে ঠাকুমার পিঠে চড়ে বসা। এ না ঘটলে যে তাঁর প্রণামেও সার্থকতা নেই!
তারপর আমায় পিঠে নিয়ে সবার মাথায় তুলসী মায়ের আশীর্বাদের হাত ঠেকানো ও অবশেষে চিনির ছোট্ট থালাটা আমার হাতে সমর্পণ। আর আমারও চেটেপুটে চিনি গুলি সাফ করা।
ঠাকুমার হাত ধরেই আমার জীবনের পথ চলা শুরু।
বাবা কাকাকে ডাকতাম নাম ধরে আর মাকে বৌমা বলে। তাদের স্নেহ আদরের ঝুলি গুলো পাশেই পড়ে থাকত। কতো আর নেবো ! আর ছিল সাথে কাকার আদর – যত আবদারের স্বয়ংসিদ্ধ কল্পতরু। সাইকেলে চেপে চুল কাটতে গেলে চুল কাটা শেষে মিষ্টির দোকানে দুটি রসগোল্লা বরাদ্দ, তাও প্লেট এবং চামচের সাথে। শাসনের বহর ও ছিল একটু আধটু তবে, এখন সে শাসনের কথা মনে পড়লে পেট থেকে অন্নপ্রাশনের ভাতও হাসির দমকের সাথে উঠে আসে। কেউ কি শুনেছে খাটের তলায় ঢুকে মাথায় জুতো নিয়ে বসে থাকাও শাস্তি হতে পারে!
সকাল থেকে সূর্য ডোবার আগে পর্যন্ত বিনা কারণে ব্যস্ততার শেষ নেই। গ্রামের মেঠো রাস্তায়, কখনো পুকুরের পাড়ে তাল কাটার সময় একটার পরে একটা তাল শাঁস, কখনো খেসারি – ছোলার খেতে।
বিকালে সাতুলিয়া, মার্বেল, গুলি ডান্ডা, লুকোচুরি আরো কত কি!
কালবৈশাখীর সময়ে কোন আমতলায় আম কুড়োনো আর, তার সাথে নুন লঙ্কা গুড় দিয়ে চটজলদি কারুর আম থেঁতো করে আনা। তারপর সব-পেয়েছি বাক্স হাতে পাওয়ার মত সবাই মিলে তার ওপর হামলে পড়ে খাওয়া – রাত্রে দাঁত শিরশির করার কারণে কিছু খেতে না পারার সাথে বাবার অথবা কাকার কানমলা এইসব আরকি! আর কিছু না!
ক্রমে আর একটু বড় হওয়া, শরতের কাশফুলের শুভ্র বর্ণচ্ছটায় বিমুগ্ধ নয়ন, শিউলির সুবাসকে ভর করে পরম প্রকৃতির সাথে একাত্মবোধ।
গ্রামের প্রাইমারি গণ্ডি পেরিয়ে বাবার হাত ধরে শিল্প শহরের স্কুলে ভর্তি। এখানে পরিচয় হলো প্রাক শারদীয়ার জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্বকর্মা পূজোর সাথে আর সেই উৎসব মুখরিত সকালে ঘুড়ি ওড়ানোর সাথে। গ্রামে থাকতেই শীতের ছুটিতে ঘুড়ি ওড়ানোর অভিজ্ঞতা হয়েছিল কাকার হাত ধরে। সেখানে তো ঘুড়ির সাথে নিজের শৈশবের স্বপ্নগুলোকে নীল আকাশে মেলে দিয়ে নির্ভাবনায় তাদের শূন্যে সন্তরণ উপভোগ করা। উঃ সে কি অবিমিশ্র রোমাঞ্চ! কিন্তু এখানে আর এক খেলা। সে হল ঘুড়িতে ঘুড়িতে লড়াই- কেউ হয়ে গেল ভোকাট্টা স্বপ্নগুলোর ও তার সাথে নিয়ত ভাঙ্গা গড়ার খেলা। কাটলেই যেন বিশ্বজয়ী আর কাটা গেলেই চরম বিষাদগ্রস্ত মন। তারপর বাবার স্বান্তনা। মন তো মানতে নারাজ! আবার নতুন ঘুড়ি আবার নতুন স্বপ্ন, মান্জা দেওয়া সুতো লাটাই এলো, হাতটাও পটু হল। পরের বছর, একটার পরে একটা ঘুড়ি কাটা- স্বপ্নগুলো সামনের অজানা ভবিষ্যতে পা বাড়িয়ে পথের বাধাগুলোকে এই ভাবেই ভো কাট্টা করতে করতে পথ তৈরি করে চলতে লাগলো। শিখলাম জয়ের আনন্দের পাশাপাশি পরাজয় কেও স্বীকার করে নিতে।
পায়ে পায়ে কখন যে পেরিয়ে গেছে ছেলেবেলা, তার শৈশবের মনটাকে ফেলে রেখে, জানতেও পারিনি।
পড়ন্ত বেলায় তাই আমেদাবাদ(আমার কর্মক্ষেত্র) শুরু হল আবার সেই, এবার কিন্তু পৌষ সংক্রান্তিতে। ওখানে তো সবরমতী নদীর ধারে পুরোদস্তুর ‘কাইট ফেস্টিভ্যাল’! দেশ-বিদেশের বহু লোকের সমাগম আর কত রকমারি ঘুড়ি! দুদিন চলতো – সবার সাথে দিনে রাতে ঘুড়ি ওড়ানো, রাতে ঘুড়ির সাথে আলো লাগিয়ে। কি মজা, কি মজা দুজনে বাঁধনছাড়া আনন্দে মেতে উঠতাম। রান্না করার ব্যস্ততা নেই কারণ সোসাইটি থেকে চাঁদা নিয়ে হতো সকালের জলখাবার ও দুপুরের খাবার ব্যবস্থা। এছাড়া ছিল সন্ধ্যাবেলায় ফানুস ওড়ানো। তার সাথে, আমাদের স্বপ্নগুলো ছাড়া পেয়ে মুক্তবিহঙ্গের মতো অসীম নীল আকাশে মেলে দিত ডানা।
2019… শেষ ঘুড়ি ওড়ানো। তারপর তারপর জীবনের ছন্দপতন। কোথায় কোন আকাশে বাতাসে সেই ঘুড়ি ওড়ানোর তুফান শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন ।আজও যেন সেই স্বপ্নের খোঁজে কেটে যায় …।জানিনা, হয়তো এভাবেই কেটে যাবে বাদবাকিটাও …